৩৬। সূরা ইয়াসীন
বর্ননাঃ সূরার শুরুতেই দুটি বর্ন ‘ইয়া’ এবং ‘সীন’ দিয়ে থেমে যাওয়া হয়েছে। এই শব্দ এর অর্থ জানা নাই।
২য় আয়াতে আল কুরআনকে আল হাকীম বলা হয়েছে। ‘হাকীম’ শব্দটি প্রধানত ৩ টি বিষয় এর সাথে সংশ্লিষ্টঃ জ্ঞান/বিজ্ঞতা, রায়/বিচার এবং সামঞ্জস্যপূর্ন/ভারসাম্যপূর্ন। আল কুরআন মূলত জ্ঞান ও বিজ্ঞতার সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন, সঠিক রায় ও ন্যায় বিচার প্রদানকারী এবং পরিপূর্ন ও নির্ভুলভাবে সামঞ্জস্যপূর্ন ও ভারসাম্যপূর্ন। এজন্যই আল কুরআনকে আল হাকীম বলা স্বার্থক হয়েছে।
৩য় আয়াতে অন্য নবীদের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ মুহাম্মাদ (স) কে সাহস দিয়েছেন যে তিনি একা নন; নব্যুওয়াতের ধারাবাহিকতায় তিনি এসেছেন। ‘মুরসালীন’ বলতে এমন বার্তাবাহক বোঝায় যিনি নিজের বার্তা নয় বরং অন্য কারো বার্তা বহন করেন। ৪র্থ আয়াতে অন্য নবীরা যে পথে চলেছে সেই সরল পথেই তিনি আছেন বলে আল্লাহ আশ্বস্ত করেছেন। ৫ম আয়াতে বোঝানো হয়েছে যে, তিনি এমন কিতাব/বার্তা বহন ও প্রচার করেন যা নিজের নয়, পরাক্রমশালী ও পরম দয়ালু সত্ত্বা থেকে অবতীর্ন।
সুতরাং ৫ম আয়াতে আল্লাহ নিজের পরিচয় দিয়েছেন এমন ২ টি শব্দ (আগে আসা ‘আল-আজীজ’ ও পরে আসা ‘আর-রহীম’) দ্বারা যা যথাক্রমে ঐ আগে (২য় আয়াতে) আসা বার্তা ও পরে (৩য়, ৪র্থ আয়াতে) আসা বার্তাবাহকের বৈশিষ্ট্যের সাথে মিলে যায়! কি অসাধারন সঙ্গতি!
৬ষ্ঠ আয়াতে আল্লাহ মূলত তৎকালীন আরবের মানুষদের অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তৎকালীন আরবরা নিজেদের বংশ, গোত্রের অনেক অহংকার করতো কিন্তু আল্লাহ তাদের সেই অহংকার ভেঙ্গে দিয়ে তাদের বিশেষ নামে বা সরাসরি ইঙ্গিত না করে কৌশলে ‘একটি জাতি’ বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া তারা বাপ দাদাদের নিয়েও অনেক গর্ব করতো যা এই আয়াতে ভেঙ্গে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে তাদের বাপ দাদাসহ তাদের নিজেদেরকে গাফেল বলার মাধ্যমে।
১৩ নং আয়াত থেকে একটি জনপদে ৩ জন নবী পাঠানোর ঘটনার উল্লেখ আছে। কেমন ব্যতিক্রম তাই না? ৩ জন নবী একসাথে! একটি মাত্র জনপদে! সেখানকার বাসিন্দারা ঐ ৩ জন নবীকে অস্বীকার করেছিলো। নবীগন ও বাসিন্দাদের কথোপকথন চলেছে ১৯ আয়াত পর্যন্ত। এর পরের আয়াতে অর্থাৎ ২০ আয়াতে নগরীর দূর প্রান্ত থেকে এক বিশ্বাসী এসে নবীদের কথা মেনে নেওয়ার জন্য ঐ বাসিন্দাদের দাওয়াত দেয়। যার ফলশ্রুতিতে তারা তাকে হত্যা করে ফেলে এবং তার কারনে তাদেরকে শব্দের আওয়াজে আল্লাহ ধবংস করে ফেলেন। এভাবে ২৯ আয়াত শেষ হয়। এখানে দ্রষ্টব্য যে, ঐ ৩ জন নবীর চাইতে ঐ বিশ্বাসী বান্দাহ এর কথা বেশি ফোকাস করেছেন আল্লাহ। নবীরা নবীদের কাজ করে গেছেন, উম্মত তার নিজস্ব কাজ করে গেছে। নবী থাকা সত্ত্বেও সেই বিশ্বাসী বান্দাহ মনে করেন নাই যে আমার কি দরকার দাওয়াত দিয়ে? নবীরা তো আছেনই। কিন্তু না, তিনি নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিয়েছেন দাওয়াত দিয়ে এবং নবীরা থাকা অবস্থায়ই।
এই ঘটনা বর্ননার কিছুক্ষন পর আল্লাহ প্রকৃতির দিকে নজর ঘোরাতে বললেন এবং ৪০ নং আয়াতে সূর্য ও চাঁদের কথা বললেন। ২ টিরই আলাদা কক্ষপথ আছে এবং তাদের কাজও আলাদা। ঠিক যেমন নবী ও তাদের উম্মতগন। নবীদের কাজ তারা করবেন তাই বলে উম্মতরা কিছু না করে পার পেয়ে যাবে তা হবে না। তাদের কাজের কক্ষপথ আলাদা। তাই নবীদের সূর্যের সাথে তুলনা করা যায় এবং উম্মতদের চাঁদের সাথে তুলনা করা যায়।
সূর্য সবসময়ই একই রকম অবস্থায় থাকে কিন্তু চাঁদ কমে বাড়ে। এই বিষয়টাও খুব সুন্দরভাবে নবী ও উম্মতদের সাথে মিলে যায়। নবীরা আল্লাহর পথে পূর্ন ঈমান নিয়ে সবসময় অবিচল থাকেন। কিন্তু উম্মত সবসময় পূর্ন ঈমান নিয়ে অবিচল থাকতে পারে না। কখনো তারা পূর্নিমার চাঁদের মত হয় আবার কখনও খেজুরের শুকনা ডালের মত হয়ে যায় (আয়াত ৩৯)
চাঁদ যে ঘুর্নায়মান তা এই আয়াত থেকে ধারনা পাওয়া যায়। ঘুর্নায়মান থাকার কারনে তার আকৃতিতে আপাত পরিবর্তন দেখতে পাওয়া যায়।
সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়ে যেমন চাঁদ অন্য কিছুকে আলোকিত করে তেমনি নবীরূপ সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়ে চাঁদরূপ উম্মত অন্যকে আলোকিত করবে এটাই কাম্য। মুহাম্মাদ (স) কেও সূর্যের সাথে তুলনা করা হয়েছে। সুতরাং তার উম্মতকেও চাঁদের ভূমিকা পালন করতে হবে। এভাবে যতবার আমরা সূর্যের দিকে, চাঁদের দিকে তাকাবো ততবারই আল্লাহ আমাদেরকে নবীদের কথা ও তাদের কাজের কথা এবং আমাদের কাজের কথা স্মরন করিয়ে দিতে চান!!!
অবাক হওয়া এখনো বাকি। ঐ যে ৪০ নং আয়াতে সূর্য ও চাঁদের কথা বলা হয়েছে- ওখানে ‘ইয়ামবাগি’ শব্দটা ব্যবহৃত হয়েছে
৪০.) না সূর্যের ক্ষমতা আছে চাঁদকে ধরে ফেলে এবং না রাত দিনের ওপর অগ্রবর্তী হতে পারে, সবাই এক একটি কক্ষপথে সন্তরণ করছে। আবার কিছুদূর গিয়ে আল্লাহ ৬৯ আয়াতে বলছেন,
৬৯.) আমি এ (নবী)-কে কবিতা শিখাইনি এবং কাব্য চর্চা তার জন্য শোভনীয়ও নয়। এ তো একটি উপদেশ এবং পরিষ্কার পঠনযোগ্য কিতাব।
এখানেও ‘ইয়ামবাগি’ শব্দটা ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ কি সুন্দরভাবে সূর্য, চাঁদের ঐ ৪০ নং আয়াত এবং মুহাম্মাদ (স) এর ৬৯ নং আয়াত ‘ইয়ামবাগি’ শব্দটা দিয়ে লিঙ্ক করেছেন। আর আমাদের সুক্ষ ইঙ্গিত দিয়ে দিয়েছেন যে সূর্য সূর্যের কাজ করবে, চাঁদ চাঁদের কাজ করবে নিজের অবস্থান বজায় রেখে। চাঁদ সূর্য থেকে আলোর সাহায্য নেয় তেমনিভাবে মুহাম্মাদ (স) এর রেখে যাওয়া আল কুরআন ও হাদীস থেকে আমরা চাঁদের আলো নেওয়ার মত করে সাহায্য নিবো!
"না সূর্যের ক্ষমতা আছে চাঁদকে ধরে ফেলে এবং না রাত দিনের ওপর অগ্রবর্তী হতে পারে,সবাই এক একটি কক্ষপথে ঘূর্নায়মান রয়েছে" ।(৩৬ তম সূরা ইয়াসীনঃ ৪০)। এখানে ঘূর্নায়মান বলা হয়েছে َّيَّسۡبَحُوۡنَ দ্বারা। يَّسۡبَحُوۡنَ এর ي কে কেন্দ্র করেই বাকি বর্নগুলো ঘুরছে !!! সুবাহানাল্লহ !!!
পৃথিবীর মত সূর্যেরও নির্দিষ্ট কক্ষপথ ও গতি আছে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। এরপর এক সময় এগুলোর পরিসমাপ্তি হবে। বিজ্ঞানের এই আবিষ্কারের পূর্বেই আল কুরআন এর ইঙ্গিত দিয়েছে। বিভিন্ন সূরার আয়াতে। যেমন আল কুরআন ১৩ : ২, ৩৫ : ১৩, ৩৬ : ৩৮, ৩৯ : ৫
মানুষের সৃষ্টির সূচনা আল্লাহ নিখুঁতভাবে বর্ননা করেছেন। যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই তো জানেন কিভাবে এই সৃষ্টি হয়েছে। তাই তিনি মানুশকে তার সৃষ্টি সম্পর্কে অন্ধকারে রাখেননি, বিভিন্ন আয়াতে বলে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি ‘নুতফাহ’(নগণ্য পরিমান তরল/শুক্রাণু) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এটি পাওয়া যায় আল কুরআনের ১৬:৪, ১৮:৩৭, ২২:৫, ২৩:১৩, ৩৫:১১, ৩৬:৭৭, ৪০:৬৭, ৫৩:৪৬, ৭৫:৩৭, ৮০:১৯ তে।
সবুজ শব্দটি কুরআনে এসেছে ৮ বার। জান্নাতের দরজা ৮ টি। জান্নাতের সাথে সবুজ শব্দটি সবচেয়ে সম্পর্কিত। আল কুরআনের সূরা আনআম, ইউসুফ, কাহাফ, হজ্জ, ইয়াসীন, রহমান, দাহরে এসেছে সবুজ শব্দটি। কালো শব্দটি কুরআনে এসেছে ৭ বার। জাহান্নামের দরজা ৭ টি। জাহান্নামের সাথে কালো শব্দটি সবচেয়ে সম্পর্কিত। আল কুরআনের সূরা বাকারা, আলে ইমরান, নাহল, ফাতির, জুমার, জুখরুফ এ এসেছে কালো শব্দটি।
অর্থাৎ জান্নাত ও জাহান্নামের দরজা মোট ১৫ টি। আল কুরআনে দরজা শব্দটির বহুবচনঃ দরজাসমূহও এসেছে ১৫ বার। এগুলো এসেছে বাকারা, আনআম, আরাফ, ইউসুফ, হিজর, নাহল, সোয়াদ, জুমার, মুমিন, জুখরুফ, কমার, নাবা তে। মজার ব্যাপার হলো, ৭ম বারে আসা দরজা শব্দটির আয়াতটি জাহান্নামের দরজা সম্পর্কিত এবং ৮ম বারে আসা দরজা শব্দটির আয়াতটি জান্নাতের দরজা সম্পর্কিত। কি দারুন মিল!













মাশাআল্লাহ। অসাধারণ হয়েছে।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
মুছুন