৭৮। সূরা আন নাবা (মহাসংবাদ)
সূরার সারসংক্ষেপঃ নাবা বলতে এমন কিছু বোঝায় যা কেউ জানতো না যদি না সেটা জানানো হতো। এজন্য কিয়ামতকে নাবা বলা হয়েছে। নাবা যারা আনেন তাদের বলা হয় ‘নাবী’ (নবী)
১ম অংশে অদেখা আখিরাত সম্পর্কে কাফেরদের বিদ্রুপ এর আল্লাহর জবাবে আল্লাহ বিষয়টাকে না বোধকভাবে উপস্থাপন করে একটি সূচনা দিয়েই ছেড়ে দিয়েছেন।
২য় অংশে মানুষের চোখের সামনে দেখা আল্লাহর সৃষ্টির যোগ্যতা, বড়ত্ব বর্ননা করে মানুষের সৃষ্টির সাথে আল্লাহর সৃষ্টির তুলনা করেছেন।
এর মাধ্যমে আল্লাহ বোঝাতে চেয়েছেন যে আখিরাতকে এত অসম্ভব বা অকল্পনীয় মনে হয় তোমাদের অথচ কি নিপুন, অবাক করা সৃষ্টির মাঝে তোমরা রয়েছ। আল্লাহ এসব কিছু সৃষ্টি করতে পারলে আখিরাত ঘটাতে কেন পারবেন না? আল্লাহ সৃষ্টি করতে পারলে কেন তা ধ্বংস করতে পারবেন না? আর একবার সৃষ্টি করতে পারলে ২য় বার কেন পারবেন না?
৩য় অংশে আল্লাহ আবার ১ম অংশে থামিয়ে রাখা আখিরাত সম্পর্কে আল্লাহর বক্তব্য পুনরায় নিয়ে এলেন
১ম অংশে যে কথা চলছিলো তার জবাব এ আসলে ঘটনা আল্লাহ বলতে শুরু করলেন। ২য় অংশে বর্নিত পাহাড় (আয়াত ৭) ও আকাশ (আয়াত ১২) এর এত সুন্দর সৃষ্টি যে ধবংস হয়ে যাবে তা আল্লাহ বর্ননা করলেন এবং ৪র্থ অংশে আযাবের ভয়াবহতার একটি চিত্র আল্লাহ আঁকলেন।
এছাড়া ১ম অংশে আল্লাহ পুরো বিষয়টাকে নাকচ করেছেন ২ বার; যার প্রমান মিলবে ১ম এ কিয়ামতে, ২য় বার জাহান্নামে। সেই সিচুয়েশনই বর্ননা করা হয়েছে ৪র্থ অংশে- প্রথমে কিয়ামতের বর্ননা ও পরে জাহান্নামের বর্ননার মাধ্যমে।
৫ম অংশে মূলত আখিরাতে অবিশ্বাসী মানুষের পরিনতির কারন বর্নিত হয়েছে। তারা অন্তরে ও কাজে বিরোধী আচরন করতো এবং ২য় অংশে বর্নিত আল্লাহর আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করতো। সেই কারন অনুসন্ধান করে উপযুক্ত পরনতির ব্যবস্থাও আল্লাহ করে দিয়েছেন এই অংশে৬ষ্ঠ অংশ হলো ৪র্থ অংশের বিপরীত চিত্র। এই অংশে আখিরাতে বিশ্বাসী, তাকওয়াবান মানুষের পরিনতি বর্নিত হয়েছে।
৭ম অংশে এসে আল্লাহ সূচনার unsettled বিষয়টার ইতি টেনে সূরা শেষ করে দিয়েছেন। আখিরাত যে আসলেই আসবে এবং এটি পরম সত্য তা বর্ননা এবং সেদিনে মানুষসহ ফেরেশতাদের অবস্থাও আল্লাহ এখানে বর্ননা করেছেন।
পূরা সূরাকে এভাবে মোটাদাগে ৭ অংশে ভাগ করা যায় যা একটু সুন্দর ধারাবাহিকতায় এগিয়েছে এবং সমাপ্তি হয়েছে। অসাধারন আল্লাহর কুরআনের ছন্দ, অপূর্ব এর প্রকাশভঙ্গি!
সূরার শুরু ও শেষের সম্পর্কঃ বেশির ভাগ বড় সূরার শুরুর কথাকে আল্লাহ শেষে নিয়ে এসে সুন্দর পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন। এই সূরা তার ব্যতিক্রম নয়। সূরার শুরুতে কাফেররা নানা রকম কথা বলছিলো (আয়াত ১, ২) শেষে (আখিরাতে) তাদের মুখ বন্ধ হয়ে গিয়েছে (আয়াত ৩৭)। দুনিয়ায় তারা নানা বানোয়াট কথা বলছিলো, তাদের নিজেদের মধ্যেই দ্বিধা-দ্বন্দ ছিলো কিন্তু আখিরাতে তারা কথা বলতে পারবে না আর বলতে পারলেও শুধুমাত্র সত্য কথা বলতে পারবে। শুরুতে আল্লাহ বলেছিলেন শীঘ্রই তারা জানতে পারবে আসল ঘটনা তাই আল্লাহ সূরার শেষে আসল ঘটনা বলে দিলেন। এবং আসলেই কাফেররা মারা যাওয়ার পর আখিরাতে গিয়ে সব বুঝতে পারবে যা দূরে নয়, খুব কাছেই।
আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ আগের (৭৭ তম) সূরা আল মুরসালাত এর মূল বক্তব্য হলো وَيۡلٌ يَّوۡمَٮِٕذٍ لِّلۡمُكَذِّبِيۡنَ অর্থাৎ সেদিন ধ্বংস রয়েছে মিথ্যা আরোপকারীদের জন্য যা বার বার (১৫, ১৯, ২৪, ২৮, ৩৪, ৩৭, ৪০, ৪৫, ৪৭, ৪৯ নং আয়াত) এসেছে ঐ সূরায় । এই সূরায় (৭৮ তম) সেই মিথ্যা প্রতিপন্ন কারীদের কথা এসেছে শুরুতেই। আর আল্লাহ শেষ অংশে বলে দিয়েছেন তাদের পরিনতি। অর্থাৎ আগের সূরার মানুষদের প্রকৃত রূপ ও পরিনতি এই সূরায় ফুটে উঠেছে।
পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ এই সূরার মূল বক্তব্য হলো কিয়ামত, আখিরাত এবং শেষ দিকে (আয়াত ৩৭-৪০) কিয়ামত ও বিচারের দিনের কথা এসেছে খুব স্পষ্টভাবে। পরের সূরা (৭৯ তম সূরা আন নাযিয়াত) এর শুরুতে কিছু শপথের পর পরই আল্লাহ কিয়ামতের ভয়াবহতা বর্ননা করেছেন। এভাবে এই সূরার সাথে পরের সূরার যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে।
বিশেষ কিছু বিষয়ঃ উদ্ভিদ এর জন্য প্রয়োজনীয় উপকরনঃ ১৬ নং আয়াতে আল্লাহ বলছেনঃ “শস্য, শাক সবজি ও নিবিড় বাগান (তৈরি করি)” এর আগের আয়াতগুলোতে এর পিছনে কি কি দরকার তা বলে দিয়েছেন তিনি। ১৪ নম্বর আয়াতে বলেছেন পানির কথা। ১৩ নং আয়াতে বলেছেন সূর্যের কথা। ১২ নম্বর আয়াতে সাত আসমান অর্থাৎ বায়ুমন্ডল এর কথা বলেছেন। এই পানি ও সূর্য ও বায়ুমন্ডল উদ্ভিদ জন্মানো থেকে শুরু করে বৃদ্ধি ও অন্যান্য সকল কার্য্যক্রমে অতি দরকারী। সালোক সংশ্লেষণ, পানি চক্র এগুলোর বিষয়ে ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে এই সব আয়াতে। এর কিছু আগের আয়াত নং ৬ এ আল্লাহ যমীনের কথা বলেছেন। অর্থাৎ উদ্ভিদ এর জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান সমূহঃ মাটি, বায়ুমন্ডল, আলো, পানি সবই তিনি সুন্দরভাবে বর্ননা করেছেন; আর করবেনই বা না কেন? তিনিই তো সব কিছুর স্রষ্টা, তিনি ছাড়া আর কে ভালোভাবে বলতে পারবে, জানাতে পারবে এই বিষয়গুলো? আল্লাহু আকবার।
জিবরাঈল (আঃ) এর অবস্থানঃ জিবরাঈল (আঃ) কে রূহ হিসাবে বর্ননা করে অন্য ফেরেশতাদের সাথে তাঁর উপস্থিতিকে কুরআনে বর্ননা করা হয়েছে। তবে তাঁর কথা এক জায়গায় (সূরা আন নাবা) আগে ও এক জায়গায় (সূরা আল কদর) পরে বলা হয়েছে। এর কারনটা খুব ক্লিয়ার; আল্লাহ অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান। নেতা কোথাও সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালে অন্যদের সামনে দাঁড়ান। আবার কোন কাজ করতে গেলে শেষে যান, সব কিছু ঠিকঠাক আছে কিনা দেখেন। সূরা আন নাবাতে অন্য ফেরেশতাদের সাথে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর কথা বলা আছে তাই ওখানে তিনি আগে দাঁড়ান তাই তাঁর কথা আগে এসেছে। অন্যদিকে, সূরা আল কদরে ফেরেশতারা মালিকের সব ধরনের আদেশ নিয়ে অবতরন করে বলা হয়েছে এখানে নেতা জীবরাঈল (আঃ) এর কথা পরা বলা হয়েছে কারন নেতার কাজের পার্টটা সাধারনত পরেই হয়। আল্লাহ কি সুন্দরভাবে আমাদের শেখাচ্ছেন!!! আলহামদুলিল্লাহ।একই ধরনের আয়াত কিন্তু কত পার্থক্য!!! জাহান্নামীদের পরিপূর্ন ন্যায়বিচার করে যতটুকু তাদের প্রাপ্য শুধুমাত্র ততটুকুই শাস্তি দেওয়া হবে , কোন প্রকার অবিচার বা অতিরিক্ত কিছু করা হবে না। কিন্তু জান্নাতীদের প্রাপ্যের চেয়ে বেশি এবং অতিরিক্ত পুরষ্কার দিবেন আল্লাহ এবং তা এমন পর্যায়ে পৌছাবে যে তারা বলবে, যথেষ্ট হয়েছে আর দরকার নেই। এছাড়া জাহান্নামীদের প্রতিদানের কথা বলার সময় আল্লাহ তার নিজের বরকতপূর্ন নামের উল্লেখ করেন নাই কিন্তু জান্নাতীদের প্রতিদানের কথা বলার সময় আল্লাহ তার নিজের কথা উল্লেখ করেছেন।
সবুজ শব্দটি কুরআনে এসেছে ৮ বার। জান্নাতের দরজা ৮ টি। জান্নাতের সাথে সবুজ শব্দটি সবচেয়ে সম্পর্কিত। আল কুরআনের সূরা আনআম, ইউসুফ, কাহাফ, হজ্জ, ইয়াসীন, রহমান, দাহরে এসেছে সবুজ শব্দটি। কালো শব্দটি কুরআনে এসেছে ৭ বার। জাহান্নামের দরজা ৭ টি। জাহান্নামের সাথে কালো শব্দটি সবচেয়ে সম্পর্কিত। আল কুরআনের সূরা বাকারা, আলে ইমরান, নাহল, ফাতির, জুমার, জুখরুফ এ এসেছে কালো শব্দটি।
অর্থাৎ জান্নাত ও জাহান্নামের দরজা মোট ১৫ টি। আল কুরআনে দরজা শব্দটির বহুবচনঃ দরজাসমূহও এসেছে ১৫ বার। এগুলো এসেছে বাকারা, আনআম, আরাফ, ইউসুফ, হিজর, নাহল, সোয়াদ, জুমার, মুমিন, জুখরুফ, কমার, নাবা তে। মজার ব্যাপার হলো, ৭ম বারে আসা দরজা শব্দটির আয়াতটি জাহান্নামের দরজা সম্পর্কিত এবং ৮ম বারে আসা দরজা শব্দটির আয়াতটি জান্নাতের দরজা সম্পর্কিত। কি দারুন মিল!












মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন