১১৩। সূরা আল ফালাক (নিশিভোর)

মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত সংখ্যা ৫  

সাধারনত যেকোন বিপদ আপদ হতে আশ্রয় চাওয়ার জন্য এই সূরা ও পরের সূরা এর আমল সুন্নাত। মহানবী (স) ও বিপদে আপদে, অসুস্থতায় এই ২ টি সূরার উপর আমল করতেন। তাঁকে যাদু করে রশিতে ১১ টি গিট দেওয়া হয়েছিলো এবং এই ২ সূরা মিলিয়ে ১১ টি আয়াত পড়ে ১১ টি গিট খোলা হয়েছিল।    

সূরার সারসংক্ষেপঃ   আশ্রয় চাওয়াই হলো এই সূরার মূল বক্তব্য। আশ্রয় সম্পর্কিত ২ টি বিষয় এখানে ফুটে উঠেছে।   

১। এক সত্তার কাছে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে  

২। কিছু হতে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে   

১ম আয়াতে যে সত্তার কাছে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে তার পরিচয় দেওয়া হয়েছে এবং বাকি আয়াতগুলোতে কি কি হতে আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে তা বর্ননা করা হয়েছে। এই সূরায় যা যা হতে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে তা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।    

১ম আয়াতের ১ম শব্দ ‘ক্বুল’ এর তাৎপর্য অনেক। আল্লাহ এখানে ‘ক্বুল’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন কারন তিনি চান মানুষ তাঁর দূর্বলতাকে মুখে প্রকাশ করুক। মুখে প্রকাশ করা বা বলার মাধ্যমে অহংকার দূর হয়, আমার কোন সাহায্য, আশ্রয়ের দরকার নাই এমন চিন্তা দূরিভূত হয়। মুখে বলে আশ্রয় চাওয়ার কারনে রবকে মান্য করার বিষয়টি চলে আসে। আমি যাকে মান্য করি তাঁর কাছেই চাইতে পারি। এজন্য ‘ক্বুল’  শব্দ ব্যবহার করে আল্লাহ তাঁর বান্দাহকে তাঁর অনুগত বাধ্যগত থাকার সুযোগ করে দিয়েছেন। এছাড়া শুধু নিজে নয়, অন্যকেও বলার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার পরামর্শ দেওয়ার জন্যও ‘ক্বুল’ এর তাৎপর্য রয়েছে। এটি এমন বুঝায় যে, এই আশ্রয় চাওয়াটা একতা ঐচ্ছিক কাজ নয় বরং আল্লাহ কুল বলে বোঝাতে চান যে এটা সিরিয়াস বিষয়, অবশ্যই আশ্রয় চাওয়া উচিৎ।  

আঊযু বলতে এমন কারো কাছে আশ্রয় চাওয়া বোঝায় যিনি আশ্রয় প্রার্থণাকারীর চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান   ‘ফালাক’ শব্দটি কোন কিছু ভেদ করে নতুন কিছুর আত্মপ্রকাশ বুঝায়। যেকোন সৃষ্টির জন্যই এটি সত্য। বীজ মাটি ভেদ করে গাছ হিসাবে বের হয়, ঝরনা পাহাড় ভেদ করে, বৃষ্টি মেঘ ভেদ করে, মানুষসহ বিভিন্ন প্রানী গর্ভ ভেদ করে আবির্ভুত হয়। বিগ ব্যাং ও ভেদ করে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে। প্রভাত (আলো, সত্য) বা ভোরও অন্ধকার (সকল বাধা বিপত্তি, অন্যায় ও) ভেদ করে হয়। এজন্য সূরা ফালাকের শুরুতে প্রভাতের (এবং সকল সৃষ্টি প্রক্রিয়ার) রবের কাছে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।  

২য় আয়াতে সৃষ্টির ক্ষতি থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। ১ম আয়াতে সব কিছুর স্রষ্টার কাছে আশ্রয় চাওয়ার পর এবার সেই সৃষ্টিসমূহের সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। অন্য সৃষ্টির পক্ষ থেকে আমাদের উপর অনিষ্ট আসতে পারে আবার আমাদের পক্ষ থেকেও অন্য সৃষ্টির প্রতি অনিষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই ২ বিষয়েই আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে।   

এখানে একটা বিষয় লক্ষনীয় এখানে সব ‘শার’ বা ক্ষতি আসছে আল্লাহর সৃষ্টি থেকে/ আল্লাহর নিজের তরফ থেকে কোন ক্ষতি, অবিচার, মন্দ আসে না। তাই এই ক্ষতি আল্লাহর দিকে আরোপ করা করা যাবে না বরং তাঁর সৃষ্টির দিকেই আরোপ করতে হবে।  

৩য় আয়াতে রাতের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে। এখানে রাত দ্বারা অন্ধকার, খারাপ, সব কিছু বোঝানো হবার। সাধারনত অপরাধ, পাপ, অশ্লীলতা রাতেই বেশি হয়। এখানে কি করা হয় অনেক সময়েই জানা থাকে না, চোখের আড়ালে হয় তাই বিপদ থেকে আগাম প্রস্তুতিও নেয়া কঠিন হয়।  

৪র্থ আয়াতে গিরায় ফুঁক প্রদানকারীর অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে, অর্থাৎ কালো যাদুকর থেকে।    

৫ম আয়াতে হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। নিজে হিংসা করা ও অন্যের হিংসার কারন হওয়া এই ২ বিষয় থেকেই আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। আগের আয়াতের যাদুকরের অনিষ্টের মূল কারন হলো এই হিংসা।  পুরা সূরাতেই অন্ধকার (মিথ্যা, অন্যায়) ভেদ করে আলোর (সত্য) প্রকাশ এর কথা এসেছে। সরাসরি রাতের অন্ধকার এর কথা এসেছে যা সাধারনভাবে শয়তান বা খারাপ কিছুর পরিচায়ক। এর পর যাদুর কথা এসেছে যা একটি কালো বস্তু (Dark Magic), শিরকের একটি অন্ধকার পর্যায়। হিংসা; চরিত্রের একটি অন্ধকার দিক। সুতরাং এই সব ধরনের অন্ধকারকে ভেদ করে আলোর প্রকাশকারী আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া হয়েছে এই সূরায়।   

এই সূরায় এমন বিষয় হতে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে যেগুলো মানুষের কন্ট্রোলে নেই। প্রথমেই আশ্রয় চাওয়া হয়েছে ন্যাচারাল সৃষ্টি, শক্তির অনিষ্ট থেকে। এই সৃষ্টি ও শক্তির ব্যপ্তি অনেক বেশি। এই শক্তি বা বস্তু শত্রু নয় কিন্তু এটা ঐ শক্তি বা বস্তুর একান্ত সাধারন কর্মকান্ড/বৈশিষ্ট্য। এরপর আশ্রয় চাওয়া হয়েছে সৃষ্টির একটি উপাদান অন্ধকার, খারাপ থেকে। অর্থাৎ যা আলোকে ঢেকে দেয় বা ভালো কিছুতে বাধা সৃষ্টি করে। এরপর আশ্রয় চাওয়া হয়েছে খারাপের একটি উদাহরন গিরায় ফুঁৎকারদানকারীদের (বা কারিনীদের) (plural)  অর্থাৎ যাদু যারা করে তাদের কাছ থেকে এবং সবশেষে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে ঐ যাদুর পিছনের মূল কারন প্রত্যেক individual (singular) হিংসুকের থেকে। এভাবে অনির্দিষ্ট broader (প্রশস্ত) থেকে আস্তে আস্তে নির্দিষ্ট narrower (অপ্রশস্ত) ক্ষতিকারী এর বর্ননা দেওয়া হয়েছে।   

এভাবে সারসংক্ষেপ করা যায় পুরা সুরক্ষা ব্যবস্থাটিকে, সামরিক ভাষায়ঃ

১। সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সুরক্ষা (Supreme Command Protection): আমাদের রব্ব (Sustainer Authority) এর কাছে আশ্রয় চাওয়া। 

২। বহিঃশক্তি থেকে হুমকি শনাক্তকরণ ও আশ্রয় প্রার্থনাঃ (External Threat Identification) যাবতীয় বহিঃশক্তি (দৃশ্য বা অদৃশ্য) এর হুমকি সম্পর্কে জানা ও বোঝা। এই বহিশক্তির মধ্যে সামাজিক, মানবিক শত্রুতা (জাদু, হিংসা) ও (Human hostility: Black Magic, Envy) রয়েছে যা প্রচলিত যুদ্ধ (Conventional Warfareনা। 

৩। এই প্রতিরক্ষা সিস্টেমটি প্রাক প্রতিরক্ষামূলক (Pre-Emptive Defensive Doctrine) অর্থাৎ শত্রুর আক্রমণের পর নয়, বরং আগেই পড়া হয়। এটা Preventive Defense Strategy, Attack before infiltration (দোয়া দিয়ে আগেই সুরক্ষা)

আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ  এই সূরা (১১৩ তম) আল ফালাকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। আগের সূরা (১১২ তম) আল ইখলাস এর মূল বিষয় হলো তাওহীদ ও আল্লাহর পরিচয়। একে Touch stone of theology ও বলা যায় মানে ধর্মতত্তের পরশপাথর। ১১২ তম সূরায় তাওহীদ ও ইসলামের মূলবিষয়বস্তু কে বর্ননা ও প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে এবং পরের ২ সূরায় তা বজায় রাখা ও সমুন্নত রাখার জন্য প্রতিরক্ষা কবচ হিসাবে অবতীর্ন হয়েছে।   

আগের সুরা আল ইখলাসের সাথে এই সূরার কিছু সম্পর্ক আছে। সূরা ইখলাসে আল্লাহ কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি বিষয়টি এসেছে এবং সূরা আল ফালাকে আল্লাহর সৃষ্টি করার বিষয়টি এসেছে। তিনিই সব সৃষ্টির মূল কারিগর এজন্য তাঁকে জন্ম দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।   সূরা ইখলাসে আল্লহকে ‘সমাদ’ (অমুখাপেক্ষী) হিসাবে বর্ননা করা হয়েছে। তিনি কারো কাছে কিছু চান না বরং সবাই তার কাছে desperate ভাবে চায়। এর প্র্যাকটিকাল প্রমান হিসাবে পরের ২ টা সূরায় তার কাছে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে, আমাদের মুখাপেক্ষিতার প্রমান দেওয়া হয়েছে।    

পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ সূরা আল ফালাক হলো বাহ্যিক আক্রমন থেকে তাওহীদ ও ইসলামকে প্রতিরক্ষার কবচ আর সূরা আন নাস হলো আভ্যন্তরীন আক্রমন থেকে তাওহীদ ও ইসলামকে প্রতিরক্ষার কবচ।  

সূরা আল ইখলাস হলো দ্বীন/তাওহীদের মূল বিষয়বস্তু। সূরা আল ফালাক হলো তার বাহ্যিক রক্ষাকবচ এবং সূরা আন নাস হলো তার আভ্যন্তরীণ রক্ষাকবচ। 
সূরা আল ফালাকের শেষ হয়েছে হিংসুকের হিংসার অনিষ্ট থেকে। সূরা আন নাসে মূলত কুমন্ত্রনা দানকারী শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে যে কিনা মানুষের সবচাইতে বড় ও বিপদজনক হিংসাকারী ও ক্ষতিকারী। মানুষ যারা হিংসুক আছে তাদের মনেও কুমন্ত্রনা দেয় ঐ শয়তান। সুতরাং সূরা ফালাকের শেষ আয়াতের সাথে সূরা আন নাসের শেষ ৩ আয়াতের গভীর সম্পর্ক আছে।  এছাড়াও আরো অনেক সম্পর্ক আছে অসাধারন এই ২ টা সূরার মধ্যেঃ

সূরা ফালাকে বর্নিত ৪ টি বিপদ ও ক্ষতিগুলো শারীরিক ক্ষতি/বিপদ যা দুনিয়া সংশ্লিষ্ট। অন্যদিকে সূরা আন নাসে বর্নিত ১ টি ক্ষতি/বিপদ দুনিয়ার পাশাপাশি আখিরাত এও প্রভাব ফেলে যার ফলে এটি বেশি মাত্রায় ক্ষতিকর। এইজন্য সূরা ফালাকে আল্লাহর ১ টি নাম, পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য বর্ননা করা হলেও সূরা আন নাসে ৩ টি নাম, পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য বর্ননা করা হয়েছে। তাকে বেশি বেশি স্মরন করে তার কাছে বেশি করে সাহায্য ও আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। 



উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)