১০৩। সূরা আল আছর (সময়)
বর্ননাঃ
১ম আয়াতে সময়ের শপথ করা হয়েছে। আছর বলতে দিনের শেষ বেলা, আছরের নামাজ ও এর সময় এবং যুগ বা সময়ের সমষ্টিও বোঝায়। অর্থাৎ পুরা বিষয়টিই সময়ের সাথে রিলেটেড।
শপথ করার সাথে কয়েকটি বিষয় জড়িত।
১। যে বিষয়ের শপথ করা হয় তা সাধারনত বড়, বিশেষ কিছু হয়।
২। কোন বিষয়ের শপথ করা হলে তারপর মূল বিষয়টি বলা হয়। তাই যে বিষয়ের শপথ করা হয় সেটা বিধেয় (Object) এবং যে বিষয়ের জন্য মূলত শপথ করা হচ্ছে (যা সাধারনত পরে বর্নিত হয়) তাকে উদ্দেশ্য (Subject) বলা যেতে পারে।
৩। যে বিষয়ের শপথ করা হয় (Object) তা সাধারনত যে বিষয়ের জন্য মূলত শপথ করা হচ্ছে (Subject) তার প্রমান ও সাক্ষ্য বহন করে।
মানুষের জীবন হলো সময়ের সমষ্টি। যেকোন কাজ করা হোক না কেন তা সময়ের মধ্যেই করতে/করা হয়। এই সময় প্রতিটি কাজ ও বিষয়ের সাক্ষী।
প্রতিটি মানুষ লাভ/সাফল্য এর আশায় বিভিন্ন ব্যক্তি বা বস্তুর পিছনে ছুটতে থাকে। সময় ব্যয় করে মানুষ সঙ্গী, অর্থ-সম্পদ, বাড়ি গাড়ি ও উপকরনের পিছে ছুটতে থাকে। শুধু ইন্ডিভিজুয়াল মানুষ নয়, অনেক ক্ষেত্রে পুরা জাতিই ছুটতে থাকে। সময়ঃ বিভিন্ন যুগে ইন্ডিভিজুয়াল মানুষ ও জাতির ছুটতে থাকার সাক্ষী। প্রকৃত লক্ষ্যকে বাদ দিয়ে লাভ/সাফল্য এর আশায় সময় নষ্ট করে বিভিন্ন ব্যক্তি বা বস্তুর পিছনে ছুটতে থাকা মানুষ ও জাতি যে আসলে ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত তার সবচাইতে বড় প্রমান ও সাক্ষী হলো সময় নিজেই!
আছর বলতে সময়ঃ যা তাড়াতাড়ি চলে বা শেষ হয়ে যাচ্ছে বোঝায়। ততকালীন আরবে আছর বলতে দিনের শেষ সময় বোঝানো হতো যখন সবাই খুব ব্যস্ত হয়ে পড়তো আর বেশি সময় না থাকার কারনে। শুধু সময় নয় বরং নির্দিষ্ট একটি সময়ের শপথ করে আল্লাহ গুরুত্ব ও দ্রুততার সাথে বিষয়টি গ্রহনের আহবান জানিয়েছেন। আহবানে সাড়া দেওয়ার জন্য মানুষের যে বেশি সময় নেই, তাড়াতাড়ি না করলে ক্ষতির মধ্যে পড়তে হবে সে বিষয়টিও এখানে উঠে এসেছে।তাই এখানে সময়ের শপথ করাটা খুবই যুক্তিযুক্ত হয়েছে।
ঈমান আনার মধ্যে অন্তরে বিশ্বাস, মুখে স্বীকার ও তা কাজে পরিনত করার বিষয়টি রয়েছে তাঁর পরও আল্লাহ বলছেন সৎকাজ করতে হবে। এর কারন হলো অনেকেই ভুলে যায় যে শুধু অন্তরে ঈমান আনলেই সব হয়ে যায় না। আবার এরপরেই বলা হচ্ছে একে অপরকে সত্যের উপদেশ দিতে থাকতে হবে এবং ধৈর্য্যের উপদেশ দিতে থাকতে হবে। এই দুটাই তো সৎ কাজের মধ্যেই পড়ে তাহলে আবার আলাদাভাবে কেন বলা হলো? কারন এই ভাল কাজগুলোকে অনেকেই ছোট মনে করে ভাল কাজ হিসাবে গোনায়ই ধরে না, অবহেলা করে কিন্তু এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ন।
৩য় আয়াতের শুরুতে সেই সব মানুষদের ব্যতিক্রম হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে; যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে। যেহেতু এরা ব্যতিক্রম তাই এদের সংখ্যা তুলনামূলক কম এবং তাই এদের কাজের গুরুত্ব, আয়তন ও মর্যাদা অনেক বেশি।
যেহেতু এমন ধরনের মানুষেরা কম সংখ্যক হয় তাই এদের মধ্যে সম্পর্ক গাঢ় হওয়া চাই। তারা যেন অন্য বেশিরভাগ মানুষের মত না হয় যায় তাই পরষ্পরকে সত্যের উপদেশ দিতে থাকে এবং ঈমান, সৎ কাজ, উপদেশ দেওয়ার কারনে তাদের উপর যে সমস্যা ও বাঁধা আসে তা মোকাবেলায় পরষ্পরকে ধৈর্য্যের উপদেশ দিতে থাকে। এখানে লক্ষ্যনীয় যে, উভয়ের কাছ থেকে উভয়ে শুনতে ও পরামর্শ নিতে হবে। দ্বিপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক আলোচনা, উপদেশ চালাতে হবে, নিজেকে সেরা, বস মনে করে একক চিন্তায় সব কাজ করা যাবে না। নিজেরও পরামর্শ প্রয়োজন, সহায়তা প্রয়োজন।একে অপরকে উপদেশ দিতে থাকা একটি কঠিন কাজ। কাউকে উপদেশ দিতে হলে সেই কাজটি নিজে করে দেখাতে হয় এবং তার উলটা কোন কাজ করা যায় না; তা না হলে সেই উপদেশের প্রকৃত মর্যাদা থাকে না। কিছুক্ষন বা কিছুদিন সত্য ও সবরের উপর থেকে পরে বিচ্যুত হয়ে গেলে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না। সুতরাং এখানে নিজে সত্য ও সবরের উপর সব সময় অটল থাকা এবং অন্যকেও অটল রাখলে সাহায্য করতে থাকা বিষয়টি সময়ের (যার কসম শুরুতে করা হয়েছে) সাথেও সম্পর্কযুক্ত। অপরকে যেমন সহায়তার প্রয়োজন হয় তেমনি নিজেরও পরামর্শ, সহায়তার প্রয়োজন। তখন গাল ফুলিয়ে, গর্ব ভরে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না বরং পারস্পরিক সহায়তায় এক শান্তিপূর্ন, নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টিতে চেষ্টা করে যেতে হবে।
এই সূরার শুরুতে শুরুতে আল্লাহ বলেছেন মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। ক্ষতি সাধারনত ব্যবসায় হয়। দুনিয়ার সচারচর হিসাবে মূলত লাভ হয় অর্থ উপার্জন করলে। ক্ষতির প্রতিষেধক হিসাবে আল্লাহ দিলেন দুনিয়ার নরমাল লজিকের ব্যতিক্রম ৪ টি বিষয়।
ঈমান আনা। দুনিয়ার হিসাবে এতে তেমন কোন লাভ হয় না, ইনকাম হয় না। বরং ঈমানদার রা এখন পদে পদে ঠকছে, অত্যাচারিত হচ্ছে, বঞ্চিত হচ্ছে। এরপর সৎ কাজ করা। এটাও বর্তমানে লস প্রজেক্ট। সৎ কাজের চেয়ে অসৎ কাজে ইনকাম বেশি। গ্লামার জগত, চোরাকারবারি, ড্রাগ, অস্ত্রব্যবসা এগুলোতেই বেশি লাভ অর্থাৎ খারাপ কাজে লাভ বেশি। যেহেতু শুরুতে সময়ের শপথ করা হয়েছে তাই দুনিয়াবী নরমাল হিসাবে ঈমান আনা ও সৎ কাজ করা এমনিতেই লসের/ক্ষতির কাজ তার উপর এগুলোর পিছে সময় ব্যয় করা আরো বড় ক্ষতির কাজ।
এরপর থাকে একে অপরকে সত্যের উপদেশ ও ধৈর্য্যের উপদেশ দিতে থাকা। এগুলোর পার্থিব ম্যাটেরিয়াল ভ্যালু বা লাভ খুঁজে পায় না বস্তুবাদীরা; এই কাজে সময় ব্যয় করাকেও ক্ষতি থেকে ফিরে থাকার উপায় মনে করে না। বরং এগুলো না করে খারাপ কাজে সময় ব্যয় ও এই কাজে একে অপরের সাথে ব্যবসা করে ব্যবসায়িক পার্টিনার হয়ে ব্যাংক ব্যালেন্স বেশি করে গুটিকয়েক মানুষের হাতে বেশিরভাগ অর্থ জড়ো করার উতসবে মেতে উঠে সফলতা/লাভ খোঁজে তারা।
কিন্তু আল্লাহ এই সময়, মানুষ, ক্ষতি এগুলোর স্রষ্টা। তিনি এগুলোর সফলতা ও স্বার্থকতার প্যারামিটার সেট করেছেন এই সূরায়। অনন্য সেই প্যারামিটার। এই ফিল্টারে আটকা পড়ে সকল বস্তুবাদী। উতরে যায় বিশ্বাসীরা। তারাই ক্ষতি থেকে বাচতে পারে। আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষতি হতে রক্ষা করুন। আমীন। অন্যান্য অনেক সূরায় মানুষের নানা পর্যায়ের সাফল্যের বিষয়, উপায়, বৈশিষ্ট্য ও কাজ বর্নিত হয়েছে কিন্তু সূরা আল আছর এর বিষয় বিষয় হলো এই সূরায় মানুষের বেঁচে/টিকে থাকার জন্য অবশ্য করনীয় বিষয়, উপায়, বৈশিষ্ট্য ও কাজ বর্ননা করা হয়েছে। মানুষ যেমন টিকে থাকার সংগ্রামে, জীবন বাঁচানোর জরূরী মুহুর্তে সাফল্যের কথা চিন্তা না করে প্রানে রক্ষা পাবার কথা চিন্তা করে তেমনি এই সূরায়ও সাফল্য বা অন্য কিছু সম্পর্কে না বলে সংক্ষেপে শুধু বেঁচে/টিকে থাকার উপায় বলা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা বোঝাতে চেয়েছেন, সাফল্য তো পরের কথা আগে বেচে/টিকে থাকার নূন্যতম উপায়গুলো জেনে নাও।
এ যেন পরিস্থিতি এমন যে, মানুষ একটা ঘরে আটকা পড়ে গেছে আর সেখানে আগুন ও ধোঁয়ায় ঘর ভরে যাচ্ছে। বেঁচে/টিকে থাকার জন্য দরজা খুলে বাইরে বের হওয়ার বিকল্প নেই। এমন জরুরী বিপদকালীন সময়ে যে ৪ টি কাজ এর কথা আল্লাহ সূরা আল আছরে বলে দিয়েছেন তা হলোঃ ঈমান আনা, সৎকাজ করা, পরষ্পরকে সত্যের উপদেশ দেওয়া ও পরষ্পরকে ধৈর্য্যের উপদেশ দেওয়া।সূরা আল আছর বুঝতে আরেকটি বিষয় কল্পনা করে তা থেকে শিক্ষা নেয়া খুব ইজি। আসুন দেখে নেই। এমন একটা অবস্থার কথা চিন্তা করা যাক...
মানুষ পানির (ক্ষতির) মধ্যে নিমজ্জিত। এবং সে অজ্ঞান। এই অবস্থায় তার সময় খুব অল্প। কাজ না করলে সে ডুবে মারা যাবে। সুতরাং ১ম কাজ হলো জেগে উঠে বিশ্বাস করা যে সে কোন রঙিন স্বপ্ন দেখছে না বরং ক্ষতির মধ্যে আছে।
২য় কাজ হলো সাঁতার কেটে উপরে উঠতে থাকা অর্থাৎ ভাল কাজ করা। কিন্তু এই কাজ করতে গিয়ে সে দেখলো যে তার পা শেকল দিয়ে বাঁধা এবং অপর প্রান্তে তারই পরিচিত একজন বাঁধা যে কিনা অচেতন অবস্থায় ডুবে যাচ্ছে।
৩য় কাজ হলো অবচেতন অবস্থায় রঙিন স্বপ্ন দেখতে থাকা পরিচিতকে জাগিয়ে তুলে সত্যের উপদেশ দিতে থাকা ও বোঝানো যে সেও ক্ষতির মধ্যে আছে এবং দুজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া বাঁচা সম্ভব না।
৪র্থ কাজ হলো অবচেতন অবস্থায় রঙিন স্বপ্ন দেখতে থাকা পরিচিতের অনীহা সত্তেও ধৈর্য্য সহকারে তাকে জাগিয়ে একসাথে সাঁতরানো এবং এরপর অন্যান্য মানুষদেরকেও বেঁচে ওঠার ক্ষেত্রে ধৈর্য্যের উপদেশ দিতে থাকা।
আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ ১০২ নং সূরা আত তাকাসূর এ মূলত বর্ননা করা হয়েছে যে মানুষ গাফিলতিতে আচ্ছন্ন হয়ে আছে এবং তা তাকে কবর পর্যন্ত পৌছে নিয়ে যায় এবং তা শেষ পর্যন্ত জাহান্নাম পর্যন্ত নিয়ে যায়। ১০৩ নং সূরা আল আসর এ বলা হয়েছে যে ঐ কবরে যাওয়ার আগেই সময় থাকতে জেগে উঠে ভালো কাজ করতে হবে আর যারা না করবে তারা ক্ষতি (‘খুসর’) এর মধ্যে নিমজ্জিত।
আগের সূরার শেষে বলা হয়েছে মানুষকে নিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে, এই সূরার শুরুতেই অন্যতম বড় নেয়ামত ‘সময়’ এর কথা বলা হয়েছে। আগের সূরায় মানুষ গাফেল থাকে বলা হয়েছে কিন্তু কি থেকে গাফেল থাকে তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি। এই সূরায় মানুষ ৪ টি বিষয় ও কাজ থেকে গাফেল থাকে তা খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে।
পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ এই (১০৩ নং) সূরা আল আসর এ সময়কে গুরুত্ব দিয়ে ৪ টি কাজ করতে বলা হয়েছে। ঈমান আনা, সৎকাজ করা, সত্যের উপদেশ দেওয়া, ধৈর্য্যের উপদেশ দেওয়া। এর পরের সূরা; ১০৪ নং সূরা আল হুমাঝাহ (goo.gl/UoIY43) এ গুরুত্বহীন ৪ টি কাজ এর কথা বলা হয়েছে। সামনে নিন্দা করা, পিছনে নিন্দা করা, অর্থ জমা করা এবং তা গুণে গুণে রাখা, অর্থ চিরকাল থাকবে মনে করা।
সূরা আল আসর এর ৪ টি কাজ সূরা আল হুমাঝাহ এর ৪ টি কাজের সাথে বিপরীত ভাবে প্রতিসম!!!এক কথায় সূরা আল আসরে আল্লাহ ৪ টি গুরুত্বপূর্ন বিষয়ে ভালো পরামর্শ দিলেও সূরা আল হুমাঝাহ তে মানুষ সেই উপদেশ না শুনে ৪ টি অগুরুত্বপূর্ন ও ক্ষতিকর কাজ করে আল্লাহর উপদেশকে অবজ্ঞা করে।















খুব সুন্দর করে উপস্থাপন করেছেন।মাশাআল্লাহ।
উত্তরমুছুনসুন্দর উপস্থাপনা। মাশাআল্লাহ ।আল্লাহ তায়ালা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
উত্তরমুছুন