৮৮। সূরা আল গশিয়াহ (আচ্ছন্নকারী)

 প্রশ্নের মাধ্যমে এই আয়াতে (আয়াত ১) আল্লাহ দৃষ্টি আকর্ষন করেছেন। এখানে তুলনামূলক বড় বিষয় ‘ঐ দিন’ এর চাইতে ‘ঐদিনের খবর’ টি ছোট বিধায় এখানে ‘জা-আ’ ব্যবহার না করে ‘আতা’ ব্যবহার করেছেন আল্লাহ। গশিয়াহ অর্থ ঢেকে ফেলা, আচ্ছন্ন করা; এটি অন্য সব কিছু (ঘটনা, অবস্থা, চিন্তা, কাজ) কে ঢেকে ফেলবে। এটি অবশ্যই আসবে সেটার নিশ্চয়তা দিতেই প্রশ্ন ও অতীতকাল আকারে আয়াতটি বর্নিত হয়েছে।     

২য় আয়াতে ‘কিছু মুখ/চেহারা’ বলার মাধ্যমে অন্য কিছু মুখ/চেহারাও যে সেদিন থাকবে এবং তাদের পরিনতি যে ভিন্ন হবে তার একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বাক্যের সাধারন গঠন থেকে ব্যতিক্রমী উপায়ে আল্লাহ ঐ ‘দিন’কে বাক্যের মাঝে এনে দিনের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছেন। অন্য অঙ্গের কথা না বলে চেহারায় ভীত ভাব এর কথা প্রকাশের মাধ্যমে আল্লাহ সেদিন পাপীদের অবস্থা খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন।

৩য় আয়াতে বলা হয়েছে বিচার দিনের নানা কঠিন কর্মকান্ডে (আশ্রয় খোজা, দাঁড়িয়ে থাকা, জবাব দেওয়া) তারা ক্লান্ত হয়ে পড়বে। এছাড়া দুনিয়ার অর্থহীন কর্মকান্ডের কথা এবং সামনের সম্ভাব্য ভয়াবহতার কথা মনে করেও তারা হতাশায় ক্লান্ত হয়ে পড়বে।      

দুনিয়ায় বিলাসিতা, জাঁকজমকপূর্ন জীবন যাপন এ অভ্যস্ত হওয়ার জন্য বিচার দিনের কঠিনতায় তারা অন্যদের চেয়ে বেশি ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হয়ে পড়বে।      

৪র্থ আয়াতে বলা হয়েছে যে, তারা নিজেরাই আগুনে প্রবেশ করবে, অন্য কেউ করাবে না। এছাড়া تَ (‘তা’) দ্বারা আগের আয়াতের মুখ/চেহারার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ তারা নিজেরাই নিজেদের চেহারা আগে আগুনে প্রবেশ করাবে যেখানে সাধারন অবস্থায় মানুষ নিজে আগুনে প্রবেশ করে না এবং যেকোন কিছুর আগে চেহারাকে সংরক্ষন করে বা বাঁচিয়ে রাখে; কিন্তু বিচার দিনের পরিস্থিতি ভিন্ন হবে।     

‘হামিয়াহ’ শব্দ দ্বারা এমন আগুন বোঝায় যা খুবই তীব্র এবং রোধকারী। এই আগুন চামড়াকে এমনভাবে পুড়িয়ে দেয় যেন যন্ত্রনা রোধ না হয় বরং যন্ত্রনা হতেই থাকে।    

আগুন থেকে বাঁচার জন্য সাধারনত মানুষ পানি ব্যবহার করে কিন্তু ৫ম আয়াত অনুযায়ী জাহান্নামের পানি হবে ফুটন্ত। পাপীরা দুনিয়ায় হারাম পানি পান করতো, যার বিনিময়ে আখিরাতে তাদেরকে গরম পানি দেওয়া হবে। এই গরম পানি তাদের আগুন ও আযাবের কষ্ট হতে পরিত্রাণ তো দিবেই না বরং কষ্ট আরো বাড়িয়ে দিবে।  
৬ষ্ঠ আয়াতে তাদের জন্য কোন খাবার থাকবে না বলার মাধ্যমে আল্লাহর শাস্তি ও অন্য আরেক দলের (নেককারদের) জন্য খাবার থাকবে এবং সেটা আল্লাহর দয়া এটা বোঝা যাচ্ছে। খাবার না থাকার কথা বলার পর শুধু কাটাযুক্ত শুকনো ঘাস থাকবে বলার মাধ্যমে সেই পাপীদের আকাঙ্খিত, খুজতে থাকা খাদ্যটিও চরম শাস্তির মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। দুনিয়ার এই ধরনের ঘাস উট খায় যার মাধ্যমে আল্লাহ এখানে পাপীদেরকে পশুর সাথে তুলনা করেছেন।    
পশুর সাথে তুলনীয় হবার পরও কোন কোন কাফের নির্লজ্জভাবে ঐ উটের খাদ্য তেমন খারাপ বা কঠিন কিছু হবে না, তারা তা খেয়ে ফেলতে পারবে মনে করে উপহাস করতে থাকে। তাদের উত্তম ও কঠোর জবাব দেয়া হয়েছে পরের ৭ম আয়াতে। খাদ্য সাধারনত মানুষের দেহকে পুষ্ট ও বৃদ্ধি সাধন করে এবং ক্ষুধা নিবারন করে। কিন্তু জাহান্নামের ঐ খাদ্য কোনটাই করবে না। ঐ খাদ্য মূলত আযাবের উপকরন হিসাবেই ব্যবহৃত হবে। খাদ্য তাদের জন্য কোন কল্যাণ তো বয়ে আনবেই না বরং ক্ষুধার মাত্রা ও আযাব আরো বাড়িয়ে দিবে।  
কিছু চেহারা সেদিন খুশিতে পরিপূর্ন হবে। ‘নায়িমাহ’ বলা হয় সেই আনন্দপূর্ন অবস্থা যখন মানুষ কোন নিয়ামত বা উপহার পেয়ে খুশি থাকে। এখানে ৮ম আয়াতে ‘সেদিন’ শব্দটি ব্যবহার করার মাধ্যমে আখিরাতের দিন বুঝিয়ে আল্লাহ বোঝাতে চেয়েছেন যে সাফল্য অর্জনকারী মুমিনরা দুনিয়াতে খুব একটা আনন্দতে থাকবে না; ঐ দিনের তুলনায়।   

এখানে ২য় আয়াতে বর্নিত ব্যর্থ মানুষদের ভীত চেহারার বিপরীতে ৮ম আয়াতে সফল মানুষদের চেহারার কথা এসেছে। দুনিয়ায় পাপী মানুষদের পূর্ন ভীত চেহারা তেমন দেখা যায় না এবং ভাল মানুষদের পূর্ন আনন্দোজ্জল, নিশ্চিন্ত চেহারা দেখা যায় না কিন্তু ‘সেদিন’ (পরকালে) এমন ঘটনা ঘটবে। কিছু মানুষ পরিপূর্ন আনন্দে থাকবে আর কিছু মানুষ ভীত থাকবে।      

জান্নাতে শুধু যে মর্যাদার দিক থেকে সুউচ্চ তা নয় বরং এটি অবস্থানগত ভাবেও উচু হবে। মানুষ নিচু জায়গার চেয়ে উচু জায়গায় যেতে ও থাকতে ভালোবাসে। উচু ভবন, পাহাড় থেকে দৃশ্য দেখতে পছন্দ করে। জান্নাতে সেটাই হবে যা বলা হয়েছে ১০ম আয়াতে।     

আয়াত ১১ থেকে জানা যায়; সেই জান্নাত এমন একটি জায়গা যেখানে কোন অনাকাঙ্খিত কথা শোনা যাবে না। মুমিনরা ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে দুনিয়ায় নানা প্রকার আজে বাজে কথা, অশ্লীল গালাগালি, আপমানকর অপবাদ শুনে থাকে তাদের বিরোধীদের মুখ থেকে। কিন্তু জান্নাতে সেই অবস্থা থাকবে না। তারা ভাল ভাল কথা শুনতে পাবে। হৃদয়বিদারী কথা কেউ বলবে না। এটা পরম প্রশান্তির পাওয়া। 
১২ তম আয়াতে বলা হচ্ছেঃ জান্নাতিরা থাকবে বহমান ঝরণাধারার পাশে। বিলাসবহুল হোটেল বা বাড়িতে কৃত্তিম ঝরণাধারা থাকে কারন মানুষ ঝরণা, পানি পছন্দ করে। জান্নাতে সেই সুবিধাই চিরস্থায়ী হবে।
আয়াত ১৩ এর ‘মারফুয়াহ’ বলতে কারো জন্য স্পেশালি বানানো বুঝায়। উঁচু আসন  উচ্চ মর্যাদা, স্থায়িত্বকে প্রকাশ করে। উচু আসনে বসে নিজের আধিপত্য ও আওতাধীন বিষয়গুলো একটু উচু থেকে ভালভাবে দেখা যায়। উচু আসনে বসে আল্লাহর নিয়মতগুলো দেখে জান্নাতীদের প্রশান্তি আরো বেড়ে যাবে। 
১৪ নং আয়াতে বর্নিত ‘আকওয়াব’ বলতে এমন অভিজাত পানপাত্র বুঝায় যার হাতল নেই; যা সৌন্দর্য্য ও আভিজাত্যকে বাড়াতে থাকবে। এটি এমনভাবে নিচু করে সাজানো থাকবে যেন নিতে কোন কষ্ট না হয়। অভিজাত কোন দাওয়াতে যেমন টেবিলে সব কিছু রেডি করা থাকে তেমন, একবার শেষ হলে আবার তেমনিভাবে বার বার ভরা, সাজানো থাকবে। 
জান্নাতে উৎকৃষ্ট বুননের জাকজমকপূর্ন বিছানা পাতা থাকবে। জান্নাতিরা আরামে সেখানে বসবে ও অখন্ড অবসর সময় অতিবাহিত করবে।      
জান্নাতের বর্ননা দেয়ার পর আল্লাহ পৃথিবীতে চোখ দিয়ে আশেপাশে বিভিন্ন নিদর্শন দেখতে বলেছেন। ১ম এই ১৭ নং আয়াতে বলা হচ্ছে উটের কথা। আল কুরআন নাযিলকালে তখনকার মানুষদের কাছেই উট ছিল এক বিস্ময়কর ও উপকারী প্রানী। যানবাহনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল ঐ উট। মরুর কঠিন পরিবেশে চলার জন্য বিশেষভাবে দৈহিক গঠনের উট আসলেই আল্লাহর একটি বিস্ময়কর নিদর্শন। এই নিদর্শন দেখেও তো স্রষ্টাকে চেনা যায়! যা ১৭ নং আয়াতে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কয়েকটি বিষয়



পিঠ অতিরিক্ত ভার বহনক্ষম
লম্বা পা মরুভুমির তপ্ত বালু থেকে দেহকে দূরে রাখে 
পেটে পানি জমিয়ে রাখা পানি পেলে একবারে অনেক পানি পান করে জমিয়ে রাখতে পারে
চিকন নাকের ছিদ্র যেন বালি ঢুকতে না পারে
২ টি স্তরের চোখের পাপড়ি ঘন, লম্বা  ধুলাবালি, মরুঝড়  থেকে রক্ষা করে সানগ্লাসের মত
কুঁজে সঞ্চিত চর্বি কয়েকদিন না খেয়ে থাকলে দেহ এখান থেকে ব্যবহার করে
কম প্রস্রাব, শুকনা পায়খানা  পানি যেন দেহ থেকে কম বের হয় 
ছড়ানো পায়ের পাতা মরুভুমির বালিতে সহজে চলতে  সাহায্য করে  
দুধ উচ্চ খাদ্যগুন সম্পন্ন যেন মনিব তা পান করে সবল থাকে
পুরু ঠোট,জিব  রুক্ষ, কাটাযুক্ত গাছও খেতে পারে
পুরু পশম  তীব্র শীত ও গরমে দেহকে রক্ষা করে
ঘন রক্ত  ও  ডিম্বাকার  রক্তকনিকা গরমে সহায়ক ও শরীর সুস্থ রাখতে সাহায্য করে
লম্বা অন্ত্রের নাড়ি পানি ধরে রাখে  

১৮ তম আয়াতে বিস্তৃত আকাশের কথা বলার পর ১৯ নং আয়াতে পাহাড়কে আল্লাহ সুদৃঢ় করে স্থাপন করেছেন। এটি একটি অসমান, এক জায়গায় স্তুপকৃত ও উঁচু বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি যা স্থায়িত্বকে প্রকাশ করে।
মোটাদাগে সূরাটিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। আয়াত ১-৭ এ পরকালে খারাপ মানুষদের পরিনতি এর কথা বর্ননা করার পর তার বিপরিতে পরকালে ভালো মানুষদের পরিনতি বর্ননা করেছেন আয়াত ৮-১৬ তে। এখানে লক্ষ্যনীয় যে, ভালো পরনতির ডিটেইল আল্লাহ এখানে খারাপ পরিনতির চেয়ে বেশি ভালভাবে দিয়েছেন, বেশি আয়াত ব্যবহার করেছেন। আয়াত ১৭-২০ তে দুনিয়ায় নিদর্শন দেখে পরকালের যৌক্তিকতা খোঁজার আহবান করা হয়েছে। আয়াত ২১-২২ এ আহবানকারীর বৈশিষ্ট্য বর্ননা করে আয়াত ২৩-২৬ এ আহবান না শোনার ও না মানার পরিনতি বলার মাধ্যমে সূরাটি শেষ হয়েছে। 
আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ     আগের ৮৭ তম সূরা  আল আ’লা (goo.gl/FJWkzZ) এর অন্যতম বিষয় হলো পরিশুদ্ধি। ৯ম ও ১০ আয়াতে উপদেশ দান করা, মনে করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পরিশুদ্ধিতে সহায়তার কথা বলা হয়েছে। মানুষ  শুধু আরেকজনকে উপদেশ দিতে পারে। অন্যকে পরিশুদ্ধ করতে পারে না। যার নিজের  মধ্যে আল্লাহর ভয় আছে সেই নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নিতে পারে। এই বিষয়টির আরো  বিস্তারিত ব্যাখ্যা এসেছে পরের (৮৮ তম) সূরা আল গশিয়াহ তে।   

(৮৮ তম) সূরা আল গশিয়াহ এর ২১ ও ২২ নং আয়াতে সূরা আল আ’লা এর কন্টিনিউএশন করে বলা হয়েছে; আমাদের কাজ শুধু উপদেশ দেওয়া, মনে করিয়ে দেওয়া। মানুষকে বল প্রয়োগ করে পরিশুদ্ধ করা যায় না। কারন হেদায়াত আল্লাহর হাতে। এভাবে ঐ বিষয়ের একটা মোটামুটি সামগ্রিক ধারনা পাওয়া গিয়েছে।   

উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)