৬১। সূরা আস সফ
সূরা আস-সফ ‘মুসাব্বিহাত’ সিরিজের একটি সূরা। এই সূরার শুরুতে ‘সাব্বাহা লিল্লাহ’ রয়েছে। এই মুসাব্বিহাত সূরাগুলো মাদানী সূরা এবং এই সূরাগুলোয় আল্লাহ মুসলিমদের বিশ্বাসের পরিপূর্নতা ও ইসলামের গাম্ভীর্য বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। দলে দলে অনেক মুসলিম হলেও ঈমান, ইসলাম, আল্লাহর পথে থাকা, ইসলামের বিজয়ের জন্য প্রচেষ্টা ইত্যাদি সম্পর্কে সবার পূর্ন জ্ঞান ছিলো না। এজন্য আল্লাহ এই সব বিষয় ব্যাখ্যা করেছেন।
সূরার সারসংক্ষেপঃ ২ টি রুকু ও ১৪ টি আয়াত নিয়ে সূরাটি গঠিত। সূরার শুরুতে ১ম আয়াতে আল্লাহ বলছেন, আসমান ও যমীনের সবই পুরাপুরি আল্লাহর অনুগত কিন্তু সৃষ্টির সেরা হয়েও মানুষ এবং মানুষের সেরা হয়েও মুমিনরা পুরাপুরি আল্লাহর অনুগত নয়, কাজকর্ম যথাযথ নয় একথা ২য় আয়াতে তিনি বলেছেন। ৩য় আয়াতে আল্লাহ কি (কথা ও কাজের অমিল) অপছন্দ করেন ও ৪র্থ আয়াতে আল্লাহ কি (একত্রে আল্লাহর রাস্তায় লড়াই) পছন্দ করেন তা বলেছেন।
৫ম ও ৬ষ্ঠ আয়াতে আল্লাহ বনী ইসরাঈলদের জন্য প্রেরিত ২ জন শক্তিমান নবী; মূসা (আঃ) (১ম) ও ঈসা (আঃ) (শেষ) এর আহবান ও তার বিপথগামী অনুসারীদের অবাধ্যতার কথা বর্ননা করেছেন। ৬ষ্ঠ আয়াতের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এই আয়াতে মুহাম্মাদ (স) এর আগমনের কথা ঈসা (আঃ) এক কাছ থেকে পাওয়া গেছে।
৭ম আয়াতে আল্লাহ বিরুদ্ধবাদীদের কাজ ও আল্লাহর প্রতিদানের কথা বলেছেন।
৮ম ও ৯ম আয়াত মূলত আল্লাহ ও তার রাসূলের। ৮ম আয়াতে মূলত আল্লাহর প্ল্যান (নূর তথা ইসলামকে পরিপূর্ন বিজয়ী করা) ও কাজ এর কথা এবং আল্লাহর রসূল কে পাঠানোর কারন ও রাসূলের কাজ (আল্লাহর প্ল্যানের বাস্তবায়ন) সম্পর্কে অল্প কথায় সুন্দরভাবে বর্ননা করেছেন।
এরপর আল্লাহ মুমিনদের কাজ (আল্লাহর প্ল্যান অনুযায়ী রাসূল এর দেখানো পথে, তার সাথে থেকে আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার চেষ্টা করা ) এর সম্পর্কে বলেছেন। এটাকে তিনি ব্যবসার সাথে তুলনা করেছেন। এর পুজি (জান ও মাল), লাভ (আসল এবং আল্লাহর দৃষ্টিতে মূল লাভঃ জাহান্নাম থেকে বেঁচে জান্নাত লাভ করা এবং সেকেন্ডারী হিসাবে; যা মুমিনরা পছন্দ করেঃ আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়)। এ বিষয়গুলো বর্নিত হয়েছে ১০-১৩ আয়াতে।
১৪ তম আয়াতে অর্থাৎ শেষ আয়াতে ঈসা (আঃ) এর অনুসারীদের সাথে আল্লাহ মুহাম্মাদ (স) এর অনুসারীদের তুলনা করেছেন এবং ঈসা (আঃ) এর অনুসারীদের কিছু তাকে সাহায্য করেছে, কিছু তাদের কথা অনুযায়ী কাজ করে নাই (যে দোষের কথা আল্লাহ শুরুতে বলছেন)। আলাহর প্ল্যান (নূর তথা ইসলামকে পরিপূর্ন বিজয়ী করা) যেহেতু হয়েই আছে এবং নবী তার বাস্তবায়ন করবেনই তাই যারা তার সাথে থাকবে তাদের তিনি ঈসা (আঃ) ও তার সঠিক অনুসারীদের মতই বিজয় (আল্লাহর দৃষ্টিতে আসল এবং মূল বিজয়ঃ জাহান্নাম থেকে বেঁচে জান্নাত লাভ করা ) দান করবেন।
সুতরাং সূরাটা একটা সুন্দর ধারাবাহিক বর্ননার মাধ্যমে আল্লাহ পথে লড়াইয়ের রুপরেখা অঙ্কন করেছে। যা অল্প কথায় এভাবে দেখানো যায়ঃ
সাধারন মানুষ ও জীন জাতিকে আল্লাহ সার্বক্ষনিক একটানা তাসবিহ পাঠকারী (মুসাব্বিহুন) হিসাবে বিশেষ্যবাচক শব্দে উল্লেখ করেননি বরং তাসবিহ পাঠ করা সংক্রান্ত ক্রিয়া বাচক শব্দে (সাব্বাহা) উল্লেখ করেছেন। কারন তারা দিনের কিছু সময় তাসবিহ পাঠ করলেও সারাক্ষন একটানা তাসবিহ পাঠ করা হয়ে ওঠে না। এই সূরার শুরু হয়েছে এভাবে।
তবে ব্যতিক্রম হযরত ইউনুস (আ), তিনি মাছের পেটে চলে যাওয়ার পর মুসাব্বিহুন হয়ে একটানা তাসবিহ পাঠ করতে থাকেন, যার ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তাকে উদ্ধার করেন। (সূরা আস সফফাত আয়াত ১৪৩ )
সেই সাথে ফেরেশতারাও একটানা তাসবিহ পাঠকারী (মুসাব্বিহুন) যার প্রমান মেলে সূরা আস সফফাত এর ১৬৬ নং আয়াতে
আল্লাহর প্রিয় মানুষদের বৈশিষ্ট্য আল্লাহ বিভিন্ন জায়গায় বর্ণনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সৎকর্মশীল (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ১৯৫, ৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৪, ১৪৮), , তাওবাকারী (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ২২২), পবিত্রতা অর্জনকারী (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ২২২, ৯ম সূরা আত তাওবা, আয়াত ১০৮), মুত্তাকী (৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৭৬, ৯ম সূরা আত তাওবা, আয়াত ৪, ৭), ধৈর্যশীল (৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৪৬), তাওয়াক্কুলকারী (ভরসাকারী) (৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৫৯), ন্যায় বিচারক (৫ম সূরা আল মায়িদাহ ৪২, ৪৯ তম সূরা আল হুজুরত আয়াত ৯), আল্লাহর পথে সুশৃঙ্খল লড়াকু (৬১ তম সূরা আস সফ, আয়াত ৪)। এই গুনগুলো মানুষের মৌলিক সুন্দর গুণাবলী। আল্লাহ চান আমরা এসব গুণাবলী অর্জন করি। এগুলো অর্জন করার জন্য আল্লাহ বিভিন্ন ইবাদত, নিয়ম নীতি দিয়েছেন।
বিশেষ কিছু কথাঃ # আল্লাহ এই সূরায় সারিবদ্ধ ভাবে লড়াই কারীদের পছন্দ করেন বলে বর্ননা করেছেন। সারিবদ্ধতা শৃঙ্খলার একটি অন্যতম উপাদান। এই সারি বদ্ধভাবে দাড়ানোর বিষয়টা নামাজেও রয়েছে। সুতরাং নামাজ আমাদের সারি বদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করার জন্য তার সৈনিক হিসাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। মুমিনদের পথচলার ক্ষেত্রে opponent হিসাবে পাওয়া যাবে ফাসিক (আয়াত ৫), যালিম (আয়াত ৭), কাফির (আয়াত ৮), মুশরিক (আয়াত ৯) দেরকে। তাদের মোকাবেলায় আমাদের মুসলিমদের একতাবদ্ধ হওয়া ছাড়া কি উপায় আছে?
# মূসা (আঃ) তার জাতিকে ‘ইয়া কওম’ বলে (সূরা আস সফ এর আয়াত ৫ এ) সম্বোধন করলেও ঈসা (আঃ) তার জাতিকে ইয়া বানী ইসরঈল বলে (আয়াত ৬ এ) ডেকেছেন। ‘কওম’ বলা হয় সেই জাতিকে যখন সম্বোধনকারীর পিতা ঐ জাতিরই হয়ে থাকে। যেহেতু ঈসা (আঃ) এর কোন পিতা ছিলো না তাই তিনি ইয়া কওম বলেন নি। এভাবে সম্পূর্ন আল কুরআনের কোথাও ঈসা (আঃ) কে ‘ইয়া কওম’ বলে সম্বোধন করতে দেখা যায় নাই, যেখানে অন্য সব নবী ‘ইয়া কওম’ বলে সম্বোধন করেছেন।
সুবহানাল্লহ। কত precise আল্লাহর বর্ননা!!! আল্লহু আকবার।
# মূসা (আঃ) এর সাথে মুহাম্মাদ (স) এর অনেক মিল আছে কিন্তু এই সূরায় ঈসা (আঃ) এর কথাও এসেছে। মূসা (আঃ) লড়াই করেছেন কিন্তু ঈসা (আঃ) এর লড়াই ছিলো Ideological. সুতরাং জিহাদ বলতে শুধু ‘কিতাল’ বুঝায় না। জিহাদ বলতে আল্লাহর রাস্তায় সসস্ত্র লড়াই যেমন বুঝায় তেমনি Ideological লড়াইও বুঝায়। শেষ আয়াতে আল্লাহ ঈসা (আঃ) এর অনুগত অনুসারীদের বিজয়ের কথা বলেছেন। তারা কিন্তু কোন সসস্ত্র লড়াই এ জেতেন নাই। তিনি ও তার অনুগত অনুসারীরা in the long run eternally বিজয়ী হয়েছেন। সুতরাং বিজয় যে নিজের জীবদ্দশায় দেখে যাওয়াটা condition তা নয় এবং ঈসা (আঃ) এর অনুগত অনুসারীরারা মুজাহিদ এর সম্মান পেয়েছেন।
বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কালের ক্রিয়ার কাল মোট ৩ টি হলেও আরবীতে ২ টি শব্দে তা প্রকাশ করা হয়ে থাকে। মাদ্বী দ্বারা অতীত আর মুদ্বারি দ্বারা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উভয়ই বুঝায়। সূরা হাদীদ, হাশর ও সফ এর শুরুতে তাসবীহ পাঠ করার মাদ্বী তথা অতীত এর ক্রিয়া আবার সূরা জুমুয়াহ ও তাগাবুন এর শুরুতে তাসবীহ পাঠ করার মুদ্বারি তথা বর্তমান ও ভবিষ্যত এর ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে।
সূরাগুলোর মূল বিষয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটা খুবই সঙ্গতিপূর্ণ। সূরা হাদীদ, হাশর ও সফ এর মূল বিষয় সূরার অতীত সংশ্লিষ্ট এবং সূরা জুমুয়াহ ও তাগাবুন এর মূল বিষয় বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সংশ্লিষ্ট। মাশা আল্লাহ, সুন্দর, প্রজ্ঞাপূর্ণ মিল
সূরা হাশর, সফ, জুমুয়া এবং তাগাবুন এর শুরু হয়েছে আসমানসমূহে যা কিছু আছে ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর তাসবিহ করে দিয়ে। এরপর আয়াতে এসেছে যমীনের সাথে সংশ্লিষ্ট নানা বিষয় তাই শুরুর আয়াতে পরের আয়াতগুলোর সাথে মিল রেখে আলাদা করে যমীনের বর্ননার সময় অতিরিক্ত وَمَا فِى শব্দ এসেছে।
অন্যদিকে সূরা হাদিদ এ আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর তাসবিহ করে দিয়ে শুরু হয়েছে। এরপর কয়েকটি আয়াতে এসেছে আল্লাহর গুনগান ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বর্ণনা।যেহেতু পরের আয়াতগুলোতে যমীনের বিষয় কম বর্ননা তাই শুরুর আয়াতে অতিরিক্ত শব্দ নাই। কি দারুন মিল। পরবর্তি প্রেক্ষাপটের সাথে পুর্ববর্তি শব্দের অপূর্ব সামঞ্জস্যতা
পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ এই (৬১ নং) সূরায় মুহাম্মাদ (সঃ) এর মিশন এর কথা এসেছে। পরের (৬২ নং) সূরা আল জুমুয়ায় (goo.gl/Cb6R1s) সেই মিশন তিনি কিভাবে বাস্তবায়ন করেছেন তার কথা এসেছে।
জোড়াঃ
জোড়া এই সূরায় অনেক বিষয়ই আল্লাহ জোড়ায় জোড়ায় উল্লেখ করেছেন। ১ম আয়াতে আসমান-যমীন, ২য় আয়াতে আসমান যমীনের সাথে মুমিনদের, ৩য়, ৪র্থ আয়াতে আল্লাহর অপছন্দ-পছন্দ এর কথা বর্ননা করেছেন। ৫ম, ৬ষ্ঠ আয়াতে হযরত মূসা (আঃ) ও ঈসা (আঃ), ৮ম আয়াতে কাফেরদের ইচ্ছা ও আল্লাহর ইচ্ছা, ৮ম, ৯ম আয়াতে আল্লাহর কাজ-রাসূলের কাজ, কাফের, মুশরিক এর বিষয়গুলো এসেছে। ১১ আয়াতে মুমিনদের কাজ হিসাবে ঈমান-জিহাদ, আবার ঐ জিহাদ করতে হবে জান-মাল দিয়ে সে কথা বলা হয়েছে। ১০ম ও ১২ তম আয়াতে জাহান্নাম- জান্নাত এর কথা এসেছে। ১২, ১৩ তম আয়াতে বড় সাফল্য (জান্নাত) ও সেকেন্ডারী সাফল্য/ মুমিনদের কাম্য হিসাবে সাহায্য ও বিজয় এর ব্যাপারটির উল্লেখ আছে। সবশেষে ১৪ তম আয়াতে ঈসা (আঃ) এর উম্মত-মুহাম্মাদ (সঃ) এর উম্মত এর জোড়া সৃষ্টি করা হয়েছে।
রেফারেন্স ও কৃতজ্ঞতাঃ বিভিন্ন তাফসীর, বিশেষ করে Nouman Ali Khan এর তাফসীর, বিভিন্ন লেকচার, ভিডিও ইত্যাদি।








মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন