১০১। সূরা আল ক্বরিয়াহ (মহাসংকট)

সূরার মূল বিষয়বস্তুঃ প্রথমেই আল্লাহ ক্বরিয়াহ শব্দটি ব্যবহার করেছেন এবং একটি শব্দেই ১ম আয়াত শেষ করে দিয়েছেন। এর ফলে পাঠকের মনে প্রশ্ন জেগেছেঃ এই ক্বরিয়াহ কি? পাঠকের মনে জেগে ওঠা প্রশ্নটাই আল্লাহ বলে দিচ্ছেন পরের আয়াতে! যেন পাঠক অবাক হয়ে যায় যে, আমার প্রশ্নটাই উত্থাপন করা হলো, আমার মনে কথা প্রকাশ পেয়ে গেলো! এরপর আবার আল্লাহ প্রশ্ন করে বললেন তোমরা কি কোন ক্লু পেলে এই আল ক্বরিয়াহটা কি? অর্থাৎ আল্লাহ এক রকম বুঝিয়ে দিলেন যে, তিনি না বললে এ সম্পর্কে জানানোর কেউ নেই। সুতরাং তিনি বলে দিলেন।

‘ক্বরিয়াহ’ শব্দটি বেশ অর্থবহ। আল্লাহ সূরার শুরুতে ৩ বার (১ম, ২য়, ৩য় আয়াতে) এই শব্দ ব্যবহার করে এর গুরুত্ব ৩ গুন বাড়িয়ে দিয়েছেন। ৩ বার ফুৎকার দেওয়ার কথা জানা যায়, ১ম ফুঁৎকারে কিয়ামত হবে, ২য় তে সবাই মারা যাবে, ৩য় তে আবার সবাই জেগে উঠবে। এই ৩ বার ক্বরিয়াহ বলার মাধ্যমে ঐ ৩ ফুঁৎকারের ইঙ্গিত দেওয়া থাকতে পারে।  ক্বরিয়াহ বলতে এমন শব্দ বুঝায় যা বিকট, বিরক্তিকর, ভীতিকর, ধ্বংসাত্মক। যেমন দুটি বস্তুর সংঘর্ষের ফলে উৎপন্ন শব্দ বা গভীর রাতে দরজায় নক বা শব্দ যা খুবই বিরক্তিকর। ক্বরিয়াহ শব্দটি এখানে মূলত কিয়ামতের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে যেদিন মানুষ শব্দ ও ধ্বংস দেখা হতবিহবল হয়ে যাবে। ক্বরিয়াহ শব্দটি ভীতিতে কম্পমান হৃদয়কেও রিপ্রেজেন্ট করে। কিয়ামতের দিন মূলত খারাপ হৃদয়গুলো ভীতিতে কম্পিত হতে থাকবে। বৃহৎ গ্রহ নক্ষত্রও ঐদিন সংঘর্ষের ফলে বিরক্তিকর, ভীতিকর বিকট শব্দ করতে থাকবে। সুতরাং ক্বরিয়াহ শব্দটি দ্বারা আল্লাহ এক শব্দে অনেক কিছুর চিত্রায়ন করেছেন!!!     

৪র্থ আয়াতে বলা হয়েছে, সেদিন মানুষেরা হবে বিক্ষিপ্ত পতংগের মতো। তারা এদিক সেদিক লক্ষ্যহীন ভাবে ছুটতে থাকবে।

কিয়ামতের দিন পুনরুত্থানের সময় মানুষ যখন দলে দলে কবর থেকে বের হবে, সেই দৃশ্যকে পঙ্গপালের ছড়িয়ে পড়ার সাথে তুলনা করা হয়েছে। পঙ্গপালের ডিম ফুটে বাচ্চা (Nimphs) বের হওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করে আবহাওয়ার ওপর। সাধারণত শুষ্ক মরশুমের পর যখন প্রথম বৃষ্টিপাত হয় এবং মাটি ভিজে ওঠে, ঠিক তখনই অনেক অনেক বাচ্চা একসাথে ফুটতে শুরু করে। এরা মাটির নিচ থেকে দলবদ্ধভাবে ওপরের দিকে ঠেলে উঠতে শুরু করে। অনেক বাচ্চার সম্মিলিত শক্তির কারণে মাটির শক্ত স্তর ভেদ করে তারা খুব সহজেই উপরিভাগে চলে আসে। কি সুন্দর তুলনা

এখানে আল্লাহ মানুষ বোঝাতে ‘নাস’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, ‘ইনসান’ শব্দটি নয়। নাস অর্থ অনেক মানুষ বোঝায় যা এই দৃশ্য ও প্রেক্ষাপটের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ন; কারন তখন সবাই এলোমেলোভাবে ছুটতে থাকবে। ৫ম আয়াতে বলা হলোঃ পাহাড়গুলো এমন ভাবে উড়তে থাকবে যেন ধুনিত রঙ্গিন পশম । অর্থাৎ এত চূর্ন বিচূর্ন হয়ে হালকা হয়ে যাবে যে উড়তে থাকবে। পৃথিবীতে আমরা সবচেয়ে টেকসই, ভারী বস্তু বলতে পাহাড়কে বুঝি, কিন্তু সেই দিন সেটাই এত হালকা হয়ে উড়তে থাকবে তাহলে অন্য কিছুর কি হবে?!     

এরপরই ৬ষ্ঠ আয়াতে আল্লাহ বললেন, যার ওযনের পাল্লা ভারী হবে সে সুখী জীবন লাভ করবে । আগের আয়াতে বর্নিত সচারচর ভারী পাহাড় হালকা হয়ে যাবে এবং এই আয়াতে বলা হচ্ছে যে ভালো কাজে ওযনের পাল্লা ভারী হবে। কি অসাধারন তুলনা! দুনিয়ায় ভালো কাজকে অনেকে তুচ্ছ, হালকা মনে করলেও আখিরাতে তা অনেক ভারী হয়ে প্রকাশ পাবে। অপরদিকে যার ওযনের পাল্লা হালকা হবে তার মা হবে হাবিয়াহ (৮ম ও ৯ম আয়াত) । এখানে হাবিয়াহ কে তার মা হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে যা বেশ ইন্টারেস্টিং। আরবী ভাষায় ‘হুয়াত উম্মুহু’ নামে বাগধারা আছে যা বলতে বুঝায় কারও মা গিরিখাদে পড়ে গেছে (বিপদে পড়েছে) কিন্তু আল্লাহ সেটাকে উল্টিয়ে উম্মুহু হাবিয়াহ বলেছেন।  

হাবিয়াহ জাহান্নাম কে কেন এখানে ‘মা’ বলা হলো?  ১। শিশু তার মায়ের দিকে এমনিতেই, নিজ ইচ্ছাতেই এগিয়ে যায়। তেমনি পাপী মানুষেরাও নিজেরাই তাদের মা (হাবিয়াহ জাহান্নাম) এর দিকে এগিয়ে যাবে, নিজেদের দেহকে কন্টোল করতে পারবে না।      

২। মা  যেমন তার শিশুকে জন্মের আগে পেটের মধ্যে যত্নে রাখে, বড় হলেও বুকে আগলে  রাখে তেমনি হাবিয়াহ জাহান্নামও পাপীদেরকে তার ভিতরে যত্ন সহকারে আটকে  রাখবে, বের হতে দেবে না!!! হে আল্লাহ, ‘মা’ হিসাবে হাবিয়াহ জাহান্নামকে যেন আমরা না পাই সেই তৌফিক তুমি দান করো, আমীন। 

৯ম আয়াতে বর্নিত ‘হিয়া’ মানে হলো সে (মহিলা), কিন্তু এখানে হিয়া এর পরে একটা ‘হা’ যোগ করে সেটাকে গুরুত্ববহ ও ভীতিকর করে তোলা হয়েছে। ১০ম আয়াতে প্রশ্ন করার পর পরের (১১ তম) আয়াতে আল্লাহই তার উত্তর দিয়েছেন। তাহলো অতি উত্তপ্ত আগুন। হাদীস থেকে জানা যায় যে এটি দুনিয়ার আগুনের চেয়ে কমপক্ষে ৭০ গুন তীব্র! দুনিয়ার আগুন জ্বলে আবার নিভে যায়। কিন্তু জাহান্নামের এই আগুন জ্বলতেই থাকবে, নিভবে না।      

সূরার শুরু ও শেষের সম্পর্কঃ     সূরার শুরুতে আল্লাহ ‘ক্বরিয়াহ’ দিয়ে ভয় দিয়েছেন, শেষে ‘হামিয়াহ’ দিয়ে ভয় দিয়েছেন। সূরার শুরু ও শেষ হয়েছে প্রশ্ন ও উত্তর দিয়ে।      

আগের ও পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ      আগের (১০০ নং) সূরা আল আদিয়াত (goo.gl/I6N1vR) এ রবের প্রতি অকৃতজ্ঞা, বেশি বেশি ধন-সম্পদ এর লোভে মত্ততা  প্রকাশ পেয়েছে। সূরা আল ক্বরিয়াহ (১০১ নং) তে কিয়ামতের ভয়াবহতা প্রকাশিত হয়েছে।  অকৃতজ্ঞতা, লোভ ছেড়ে ভালো কাজের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। কিয়ামতের ভয়াবহতা জেনেও  মানুষ তা ভুলে থেকে ধন-সম্পদের লোভে মত্ত রয়ে যায়! এটি বর্নিত আছে (১০২ নং) সূরা আত তাকাসূর এ।    

৯৯-১০২ এই ৪ টি সূরায় অল্টারনেট ভাবে আখিরাত ও দুনিয়ার কথা এসেছে।  (৯৯ তম) সূরা আল যিলযালে যেমন আখিরাতের কথা এসেছিলো তেমনি (১০১ তম) আল ক্বরিয়াহ তে আবার আখিরাতের কথা এসেছে। ১০০ তম সূরা আল আদিয়াত ও ১০২ তম সূরা আত তাকাসুর আবার দুনিয়া বিষয়ক। আল্লাহ এভাবে আখিরাত, দুনিয়া, আবার আখিরাত, আবার দুনিয়া এর বিষয় নিয়ে এসে মানুষকে বারবার সাবধান করেছেন এবং দুনিয়ার সাথে যে আখিরাত অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত তা বোঝাতে চেয়েছেন।     

 এছাড়া (৯৯ নং) সূরা আল যিলযাল এ মানুষ উত্থিত হবে ও কর্মকান্ড দেখানো হবে তা বলা হয়েছে। (১০০ নং) সূরা আদিয়াত এ মানুষের কর্মকান্ডের পাশাপাশি মনের  লুকায়িত উদ্দেশ্যও চিন্তা প্রকাশিত হবে তা বলা হয়েছে। যেহেতু সকল কর্মকান্ড ও চিন্তা প্রকাশিত হবে তাই এর পরের লজিকাল সিকুয়েন্স হলো বিচার। সেই চুলচেরা বিচার এর কথাই উঠে এসেছে (১০১ নং) সূরা আল ক্বরিয়াহ তে। সবশেষে এই সিরিজের শেষ (১০২ নং) সূরা আত তাকাসুর এ বিচারের পর মানুষের পরিনতি দৃশ্যমান হবে তার বর্ননা এসেছে। এ যেন এক অসাধারন লজিকাল সিকুয়েন্স, Continuous process! আল্লাহু আকবার।   
বিশেষ বিষয়ঃ     ১০১ নং সূরা আল ক্বরিয়াহ এর স্টাইলের সাথে ৬৯ নং সূরা আল হাক্কহ এর স্টাইলের কি অসাধারন মিল! ১ম ৩ আয়াত এর স্টাইল যেন হুবুহু মিলে যায়। এই ২ সূরার সূচনার যে মিল আছে তা প্রমান করতেই যেন ৬৯ নং সূরা আল হাক্কহ তে ৪র্থ আয়াতেই ‘ক্বরিয়াহ’ (মহাদূর্ঘটনা) শব্দটি এসেছে! এবং এর সাথে সাথে আল্লাহ ক্বরিয়াহ এর একটু ক্লু দিয়ে রেখেছেন যা ১০১ নং সূরায় এসে তিনি বিস্তারিতভাবে বর্ননা করেছেন। 
  

   

উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ

মন্তব্যসমূহ