৮২। সূরা আল ইনফিতার (বিদীর্ন করা)
সূরার সারসংক্ষেপঃ ১ম আয়াতে আকাশ ফেটে যাওয়ার বিষয়টি এসেছে। আকাশকে আল কুরআনে মাঝে মাঝে ছাদ এর সাথে তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ আমাদের উপরের ছাদ ফেটে যাবে এমন ঘটনার বর্ননা দেয়া হয়েছে এই আয়াতে।
২য় আয়াতে এসেছে তারার কথা। তারকাগুলো খসে পড়ার অন্যতম কারন হলো ওগুলোর মূল ধারক আকাশ এর ফেটে যাওয়া; যা বর্নিত হয়েছে আগের আয়াতে। ‘কাওয়াকিব’ বলা হয় বড় বড় তারকাগুলোকে যেগুলো দেখে পথ চলা হয় বা নেভিগেশন করা হয়। এখানে কিয়ামতের ভয়াবহতা এভাবে বর্নিত হয়েছে যে, সেদিন বড় বড় পথ প্রদর্শক তারারাও পথ হারিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে খসে পড়বে!
৩য় আয়াতে বলা হয়েছেঃ সমুদ্র ফাটিয়ে ফেলার ফলে তা উত্তাল হয়ে আছড়ে পড়বে। পানি যেখানে থাকার কথা সেখানে না থেকে গতি লাভ করে চলমান হয়ে সবদিকে ছড়িয়ে যাবে। এভাবেই একটি ভয়াবহ অবস্থার চিত্র বর্ননা করা হয়েছে এই আয়াতে।৪র্থ আয়াতে বোঝানো হয়েছে যে, কবরকে এলোমেলো করে ফেলা হবে এবং ভিতরে যা আছে বের করা হবে। অর্থাৎ কবরের ভিতরের মৃত মানুষগুলোকে আবার জীবিত করে তোলা হবে।
১-৪ আয়াতে আশেপাশের পরিবেশের কথা বলে আল্লাহ এরপর মানুষের ব্যাপারে বলেছেন। ৫ম আয়াতে সামনে পাঠানো বলতে বুঝায় ভালো বা খারাপ যাই হোক মানুষ তা অর্জন করে মূল্যায়নের জন্য সামনে পাঠিয়েছে। যা পিছনে ফেলে রেখেছে বলতে বোঝায় সেইসব ভালো ও খারাপ কাজ যা করার সুযোগ ছিলো কিন্তু তা করতে পারে নাই বা দূরে থেকেছে।৬ষ্ঠ আয়াতে আল্লাহ খুব হতাশ ও অবাক হয়ে, দুঃখ করে বলছেন যে, ইনসান (মানুষ) কিভাবে তাঁর মহান রবকে ভুলে থাকতে পারে? রবের ব্যাপারে ধোঁকায় থেকে তাঁর থেকে দূরে থাকতে পারে? এখানে ‘রব’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন আল্লাহ। এই শব্দটি একটি সম্পর্কযুক্ত শব্দ। ‘রব’ এর সাথে ‘আবদ’ (বান্দাহ/দাস) সম্পর্কযুক্ত। দাস এর উচিত নয় রব মহান সেই সুযোগ নিয়ে দূরে চলে গিয়ে ধোঁকায় পড়া।
৭ম আয়াতে বলা হয়েছেঃ আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন। শুধু সৃষ্টি করেই ছেড়ে দেন নাই বরং অতি সুন্দর গঠনে সোজা- সুঠাম করেছেন। তিনি মানব জাতিকে সুসামঞ্জস্য (balanced) করে গড়েছেন যার ফলে মানুষ নিজের বিবেক বুদ্ধি খাটিয়ে যৌক্তিকভাবে কাজ করার ক্ষমতা রাখে।৮ম আয়াতে বলা হয়েছেঃ আল্লাহ মানুষের সব কিছু তাঁর একান্ত ইচ্ছায় সুন্দরভাবে সম্পর্কযুক্ত করে তৈরি করেছেন; যেন তিনি নিজেই মানুষের গঠনের সূক্ষাতিসূক্ষ ডিজাইন করেছেন।
আল্লাহ মানুষকে এত সুন্দর ও সামঞ্জস্যপূর্ন করে সৃষ্টি করলেও মানুষ দ্বীনকে অস্বীকার করে (আয়াত ৯)! ১০ম আয়াতে আল্লাহ মানুষদের উপর পাহারাদার/ পরিদর্শক নিযুক্ত করে দিয়েছেন। তারা সর্বাবস্থায় মানুষের সকল কর্মকান্ডের উপর নজর ও হিসাব রাখেন। আধুনিক এই যুগে তা খুবই বোধগম্য একটা বিষয় কারন আমরা ডিভিও ক্যামেরার দ্বারা সবকিছুর অডিও, ভিডিও চিত্র ধারন ও তথ্য সংরক্ষনের জন্য মেমরী/আর্কাইভ সম্পর্কে ধারনা রাখি।এখানে ১১ তম আয়াতে আল্লাহ আমলনামার লেখক (ফেরেশতা) বৃন্দকে সম্মানিত ও বিশ্বস্ত হিসাবে উল্লেখ করেছেন; অর্থাৎ তাদের লেখা ও কাজ প্রশ্নাতীত ও সন্দেহাতীত। বিচারের দিনে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করার কোন সুযোগ থাকবে না।
১২ নং আয়াতে বলা হয়েছে যে তারা সব কাজ সম্পর্কে জানেন। কোন কাজই তাদের অগোচরে ও অজানা থাকে না। এমন প্রশ্নাতীত ও সন্দেহাতীত প্রমানের পর পরিনতি কি হতে পারে তা বর্ননা করা হয়েছে পরের ২ আয়াতে।
১৩ নং আয়াতে ভালো/নেক মানুষদের ভালো পরিনতির কথা বলা হয়েছে। ১৪ নং আয়াতে খারাপ/পাপী মানুষদের খারাপ পরিনতির কথা বলা হয়েছে।
‘ফুজ্জার’ ব্যবহার করা হয়েছে যা বিশেষ্য। বিশেষ্য হলো স্থায়ী। অর্থাৎ পাপীরা পাপ করতে করতে স্থায়ীভাবে খারাপ হয়ে গিয়েছে। এই ধরনেরই একটি শব্দ ‘ফুজ্জিরত’ ব্যবহার করা হয়েছে ৩য় আয়াতে যা সমুদ্র বিক্ষিপ্ত, বিস্ফোরিত হয়ে যাবে এমন বোঝানো হয়েছে। সেই শব্দের সাথে মিল রেখে আল্লাহ এখানে পাপে বিক্ষিপ্ত, বিস্ফোরিত মানুষকে বোঝাতে ‘ফুজ্জার’ ব্যবহার করলেন। অসাধারন শব্দচয়ন!
এরপর আল্লাহ ১৫ তম আয়াতে সেই বিচারের দিন সম্পর্কে বলেছেন ও সেই দিনটি কেমন তা প্রশ্ন করে নিজেই উত্তর দিয়েছেন। ১৬ তম আয়াতে বলা হয়েছে যে, সেই দিন তারা (পাপীরা) কোনভাবেই দৃষ্টির বাইরে পলায়ন করতে বা দূরে থাকতে পারবে না। ১৪ আয়াতের ‘জাহীম’ (জাহান্নাম) শব্দটির সাথে এই ১৬ তম আয়াতের দৃষ্টির বাইরে থাকার অপারগতার মিল রয়েছে। আল্লাহ জাহান্নামকে বোঝাতে অন্য শব্দ ব্যবহার না করে ‘জাহীম’ ব্যবহার করেছেন; কারন ‘জাহীম’ বলা হয় এমন আগুনকে যা রাগান্বিত, কড়া দৃষ্টি রাখে বলে মনে হয়! কি অসাধারন আল্লাহর শব্দচয়ন!
১৭ আয়াতে সেই দিনটি কেমন তা প্রশ্ন করার পর ১৮ তম আয়াতে ২য় বার আবার প্রশ্ন করেছেন সেই দিনের ভয়াবহতা বোঝাতে ও দৃষ্টি আকর্ষন করতে এমনটি করেছেন। ১৯ তম আয়াতে আল্লাহ বলছেন যে সেদিন আর মানুষের কিছু করার থাকবে না, সব কিছু থাকবে আল্লাহর নিয়ন্ত্রনে। তাই সময় থাকতে যা করার তা করতে আল্লাহ উপদেশ দিচ্ছেন।
আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ আগের ৮০ নং সূরা আবাসাতে আল কুরআন হতে দূরে সরে যাওয়া (আয়াত ১৭) এর বিষয়টি উঠে এসেছে। আল কুরআন সম্পর্কে গাফেল থেকে তা থেকে দূরে থাকার ফলে যার মাধ্যমে এই কুরআন মানুষের কাছে এসেছে সেই মহান মানব থেকেও মানুষ দূরে সরে গিয়েছে; যার বর্ননা এসেছে ৮১ নং সূরা আত তাকবীর এ (আয়াত ২৬)। আর আল কুরআন থেকে দূরে থাকার ফলে মুহাম্মাদ (স) থেকে দূরে থাকা হয়েছে যার চুড়ান্ত পরিনতি হিসাবে আল্লাহ থেকে দূরে থাকা হয়ে গেছে। এই সূরায় (৮২ নং সূরা আল ইনফিতার) সেটিই প্রবলভাবে ফুটে উঠেছে (আয়াত ৬ এ)।
আগের সূরা আত তাকবীর এর শেষে (আয়াত ২৯) কোন কিছু চাওয়ার বিষয়ে মানুষের অক্ষমতা ও আল্লাহর পূর্ন নিয়ন্ত্রনের কথা বর্নিত হয়েছে। এই সূরার শেষে (আয়াত ১৯) কোন কিছু করার বা নিয়ন্ত্রনের বিষয়ে মানুষের অক্ষমতা ও আল্লাহর পূর্ন নিয়ন্ত্রনের কথা বর্নিত হয়েছে।পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ এই সূরার ৭ নং আয়াতে আল্লাহ মানুষকে পারফেক্টলি ব্যালান্সড ভাবে তৈরি করেছেন তা বলছেন। আবার শেষ বিচারের দিনও আল্লাহ পারফেক্ট বিচার করবেন বলে সূরার শেষে আল্লাহ জানিয়েছেন (আয়াত ১৯)। পরের সূরা (৮৩ তম সূরা) আল মুতফফিফীন এর শুরুতে আল্লাহ দেখিয়েছেন যে মানুষ বিচার ফয়সালার ক্ষমতা মানুষের হাতে দিলে কিছু মানুষ কি চরম চালাকি, অনিয়ম করে! তারা মাপে কম দেয়, আদান-প্রদানে কম বেশি করে।
এই সূরায় আমলনামার সঠিক Documentation এর ব্যাপারে বলা হয়েছে (আয়াত ১০-১২)। আর পরের সূরায় আমলনামার নিরাপদ Preservation এর কথা বলা হয়েছে (আয়াত ৭-৯, ১৯-২১)। তারও পরের (৮৪ তম) সূরা আল ইনশিক্বক (goo.gl/6n5FdR) এ আমলনামার সঠিক Handover ও Presentation এর কথা বলা হয়েছে আয়াত ৭-১২ তে। কি অসাধারন সিকুয়েন্স!














মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন