৫। সূরা আল মায়িদাহ
প্রাচীন রোমান সভ্যতায় ক্যালেন্ডারে বছরে ১০ মাস ছিল। আল্লাহ আল কুরআনে ঘোষনা করেছেন বছরে মাস ১২ টি।
شهر (শাহরুন) শব্দের অর্থ মাস। বছরে মাস মোট ১২ টি; আল কুরআনে শাহরুন শব্দটি এসেছে মোট ১২ বার! (২:১৮৫, ২:১৮৫, ২:১৯৪, ২:১৯৪, ২:২১৭, ৫:২, ৫:৯৭, ৯:৩৬, ৩৪:১২, ৩৪:১২, ৪৬:১৫, ৯৭:৩)। বেশ সুন্দর মিল!!!
আরবী ভাষায় 'আম' এবং 'সানাহ' শব্দ দুটি দিয়ে বছর বোঝায়। তবে আম শব্দটি ব্যবহার হয় ভাল অর্থের ক্ষেত্রে ও সানাহ শব্দটি ব্যবহার হয় খারাপ অর্থের ক্ষেত্রে। আল্লাহ বললেন, তবে তা ৪০ বছর পর্যন্ত তাদের জন্য নিষিদ্ধ হল, উদভ্রান্তের মত তারা যমীনে ঘুরে বেড়াবে, কাজেই এই অবাধ্য সম্প্রদায়ের জন্য হা-হুতাশ করো না। (৫ নং সূরা মায়িদা, আয়াত ২৬)
শাস্তি স্বরূপ বানী ইসরইল জাতীকে আল্লাহ দিকভ্রান্ত করে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় করে দিয়েছিলেন ৪০ বছর। এই খারাপ শাস্তির বছর প্রকাশ করতে আল্লাহ বছরের ইতিবাচক শব্দ ‘আম’ ব্যবহার না করে নেতিবাচক শব্দ ‘সানাহ’ ব্যবহার করেছেন।
কাকের কাছ থেকে ১ম দাফন শিক্ষা। ৫ম সূরা আল মায়িদা, আয়াত ৩১।
মৃত মানুষের দাফন শেখাতে আল্লাহর পাঠানো কাক মাটি খুঁড়তে লাগলো, এর মাধ্যমে আদম এর এক ছেলে তার ভাইকে হত্যা করার ও দাফন করার উপায় খুঁজে না পাওয়ায় কাকের চেয়েও অধম মনে করে অনুতপ্ত হয়ে শিক্ষা নিল। অবশেষে কাকের শেখানো পদ্ধতিতে হত্যাকৃত ভাইকে দাফন দিল
আল্লাহর প্রিয় মানুষদের বৈশিষ্ট্য আল্লাহ বিভিন্ন জায়গায় বর্ণনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সৎকর্মশীল (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ১৯৫, ৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৪, ১৪৮), , তাওবাকারী (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ২২২), পবিত্রতা অর্জনকারী (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ২২২, ৯ম সূরা আত তাওবা, আয়াত ১০৮), মুত্তাকী (৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৭৬, ৯ম সূরা আত তাওবা, আয়াত ৪, ৭), ধৈর্যশীল (৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৪৬), তাওয়াক্কুলকারী (ভরসাকারী) (৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৫৯), ন্যায় বিচারক (৫ম সূরা আল মায়িদাহ ৪২, ৪৯ তম সূরা আল হুজুরত আয়াত ৯), আল্লাহর পথে সুশৃঙ্খল লড়াকু (৬১ তম সূরা আস সফ, আয়াত ৪)। এই গুনগুলো মানুষের মৌলিক সুন্দর গুণাবলী। আল্লাহ চান আমরা এসব গুণাবলী অর্জন করি। এগুলো অর্জন করার জন্য আল্লাহ বিভিন্ন ইবাদত, নিয়ম নীতি দিয়েছেন।
৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৫২ তে বলা হয়েছে; অতঃপর ঈসা যখন তাদের অবিশ্বাস অনুভব করল, তখন বলল, কেউ আছে যে আল্লাহর পথে আমার সহায়ক হবে। হাওয়ারীগণ বলল, ‘আমরাই আল্লাহর সাহায্যকারী, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি এবং সাক্ষী থাকুন যে, আমরা মুসলিম’। যখন তারা নবির আহবানে সাড়া দিয়ে ঈমানের ঘোষণা দিয়েছে তখন بِاَنَّا (নিশ্চয়ই) ব্যবহার করে বিষয়টি বর্ননা করেছে। সেই সাথে কেবলমাত্র আল্লাহর উপর ঈমান আনার বিষয় উল্লেখ করেছে, অন্য কোন বিষয় নয়।
অন্যদিকে ৫ম সূরা আল মায়িদাহ, আয়াত ১১১ তে বলা হয়েছে; স্মরণ কর যখন আমি হাওয়ারীদের অন্তরে ইলহাম করেছিলাম যে, আমার প্রতি আর আমার রসূলের প্রতি ঈমান আন; তারা বলেছিল, অবশ্যই, নিশ্চয়ই আমরা ঈমান এনেছি আর সাক্ষী থাকুন যে, আমরা মুসলিম। যখন তারা আল্লাহর ইলহামের অনুপ্রেরণায় ঈমানের ঘোষণা দিয়েছে তখন بِاَنَّـنَا (অবশ্যই, নিশ্চয়ই) ব্যবহার করে বর্ননা করেছে। সেই সাথে শুধু ঈমান আনার বিষয় উল্লেখ করে আল্লাহসহ সকল বিষয়ে ঈমান আনার বিষয় উল্লেখ করেছে।
সুতরাং নবির আহবানে নিশ্চয়তাসহ ঈমান আনা এর বিপরীতে আল্লাহর ইলহামের কারনে অধিক নিশ্চয়তাসহ ঈমান আনা এর বিষয় উল্লেখ রয়েছে। সেই সাথে নবির আহবানে শুধু আল্লাহর উপর ঈমান আনা এর বিপরীতে আল্লাহর ইলহামের কারনে ঈমানের সকল দিক উদ্ভাসিত হবার বিষয়টি উল্লেখিত হয়েছে। নবীর চাইতে আল্লাহর প্রভাব বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক।
কিছু মানুষ ভাবে- ধর্ম পালন করলে জীবন কঠিন হয়, নানা নিয়ম মেনে চলতে হয়, কিন্তু আল্লাহ আমাদের শেখাচ্ছেনঃ আল্লাহর আইন মেনে চললে আসলে জীবন সহজ হয়। যার প্রমান ৬৬ নং আয়াত।
জান্নাতের কথা বলা হয়েছে আগের (৬৫ তম) আয়াতে। যদি আল্লাহর কিতাব সঠিকভাবে মানা হয় তাহলে দুনিয়ার জীবনই আখিরাতের জান্নাতের কাছাকাছি চলে যায়।
আয়াত ৬৬ এর ২য় অংশে আল্লাহ বলেছেনঃ তাদের মধ্যে কিছু লোক সত্যপন্থী হলেও অধিকাংশই অত্যন্ত খারাপ কাজে লিপ্ত।
আল্লাহর কাছ থেকে আসা কিতাবসমূহ প্রতিষ্ঠিত না থাকার ফলাফলঃ অল্প কিছু মানুষ সত্যপন্থী থাকলেও অধিকাংশ মানুষ নানা অপরাধ ও খারাপ কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। সুতরাং দুনিয়াতেই অধিক পরিমানে রিযিক ও নিয়ামত পেতে চাইলে, অধিকাংশ মানুষ এর কাজকর্ম ন্যায়ভিত্তিক হওয়ার আশা করতে চাইলে আল্লাহর কিতাব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আমরা যদি আল্লাহর বিধান, কিতাব, ধর্ম পালন ও প্রতিষ্ঠা কঠিন মনে করে তা বাদ দিয়ে দুনিয়ার পিছনে ছুটতে থাকি তাহলে দুনিয়া অধরাই রয়ে যাবে।
আর যদি আল্লাহর বিধান, কিতাব, ধর্ম পালন ও প্রতিষ্ঠা করতে থাকি তাহলে আখিরাত তো আমাদের জন্য থাকবেই (ইনশা আল্লাহ) উপরন্তু দুনিয়া নিজে এসে আমাদের হাতে ধরা দেবে।
সূরার ৮৩ আয়াতে রব্বানা শব্দটি এসেছে। ‘রব্বি’ ও ‘রব্বানা’ শব্দটি মূলত দুটি করে শব্দ। ‘ইয়া রব্বি’ ও ‘ইয়া রব্বানা’। কিন্তু ‘ইয়া’ বা ‘হে’ শব্দটি আল্লাহর ক্ষেত্রে বিলুপ্ত করে ব্যবহার করা হয়। আল্লাহ আমাদের খুবই কাছের, আপন বিধায় দূরবর্তি সংক্রান্ত শব্দ ‘হে’ বাদ দিয়ে শুধু রব্বি বা রব্বানা বলা হয়। সুবহানাল্লহ!
৫ম সূরা আল মায়িদাহ এর ৯২ নং আয়াতের মত প্রায় একই শব্দ বিশিষ্ট আরেকটি আয়াত আছে। সেটা হল ৬৪ তম সূরা তাগাবুন, আয়াত ১২। দুটি আয়াতের মধ্যে সূরা আল মায়িদাহ এর ৯২ নং আয়াতে 'আর সতর্ক থাক' এই অংশটুকু বেশি রয়েছে। এর কারন, আগের ৯০-৯১ আয়াতে নিষিদ্ধ বিষয় মদ, জুয়া, মূর্তিপূজা ও ভাগ্য নির্নয় সম্পর্কে বলা হয়েছে তাই পরের ৯২ নং আয়াতে সতর্ক থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে।
অপরদিকে ৬৪ তম সূরা তাগাবুন, আয়াত ১২ এর আগের ১০-১১ আয়াতে আল্লাহ সম্পর্কে বর্ননা এসেছে, নিষিদ্ধ বিষয় সম্পর্কে বলা নাই তাই আয়াত ১২ তে আলাদাভাবেটসতর্ক থাকার কথার কোন উল্লেখ নাই। কি দারুন আল্লাহর শব্দচয়ন ও প্লেসমেন্ট










মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন