১১০। সূরা আন নাসর (সাহায্য)
মাদানী, আয়াত সংখ্যা ৩
সূরার বিষয়বস্তুঃ সূরার শুরুতে ১ম আয়াতে ‘ইযা’ শব্দটি সচারচর ভবিষ্যত এর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। এখানে যদি ভবিষ্যত ধরা হয় তাহলে এটি আল কুরআনের একটি ভবিষ্যতবানী হিসাবে গন্য করা যায় যে ইসলামের বিজয় আসবে। এমন আরো অনেক ভবিষ্যত বানী আছে যেমন সূরা আর রুম, সূরা আল লাহাব ইত্যাদি।
আবার যদি ‘ইযা’ শব্দটি অতীত কাল এর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে ধরা হয় তাহলে মক্কা বিজয়ের পর এটি বলা হয়েছে এমন ধরা যায়। আলেমদের দুই দিকেই মত আছে। আর আল কুরআনের সৌন্দর্য্যও এমন, দু ধরনের মত পাওয়া গেলে তা যদি অর্থকে বিপরীত করে না তোলে তাহলে ২ টাই গ্রহন করা যেতে পারে।
শিরকের মূল উৎপাটন করে আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠাই ১ম আয়াতে বর্নিত মূল বিজয়। আল্লাহর সাহায্যে মক্কা বিজয় করে আল্লাহর একত্ববাদ ঘোষনার মূল কেন্দ্র কাবা ঘরকে শিরকমুক্ত করে একত্ববাদ এর কালেমা উত্তোলন এর মাধ্যমে বিজয় করাকেই এখানে বিজয় বলা হয়েছে।
এখানে শুধু সাহায্য এর কথা বলা হয়নি বরং বলা হয়েছে ‘নাসরুল্লহ’ বা আল্লাহর সাহায্য। অর্থাৎ এটা যেমন তেমন সাহায্য নয়, বিরাট সাহায্য যা সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে, অন্য কেউ এই সাহায্য করতে পারে না। এখানে ‘বিজয়’ বিষয়টা বিশেষ্য হিসাবে এসেছে, ক্রিয়া হিসাবে না। বিশেষ্য স্থায়ী কিন্তু ক্রিয়া স্থায়ী না। মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে ইসলামের পূর্ন, স্থায়ী বিজয় সাধিত হয় যা নাসরুল্লহ হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে।
এখানে আল্লাহর সাহায্যকে আগে বলা হয়েছে এবং পরে বিজয়ের কথা বলা হয়েছে। এর দ্বারা বোঝা যায় আল্লাহর সাহায্য ছাড়া এই বিজয় সম্ভব ছিলো না। বিজয় বলতে এখানে মক্কা বিজয়কে বোঝানো হয়েছে যার সূচনা হয়েছিলো মূলত হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে; যেটাকেও আল কুরআনের সুস্পষ্ট বিজয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে (৪৮ তম সূরা আল ফাতহ, আয়াত ১)। এখানে বিজয় বুঝাতে ‘ফাতহান’ বলা হয়েছে, অর্থাৎ তানভীন ব্যবহার করা হয়েছে যা ক্ষুদ্রতর বুঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। আর মক্কা বিজয় হলো বড় বা বৃহত্তর বিজয়।ফাতহ বলতে এমন সুস্পষ্ট বিজয় বোঝায় যেখানে কে বিজয়ী ও কে পরাভূত তা পরিস্কার বোঝা যায়। এই বিজয় কেন বড় ও সুস্পষ্ট বিজয় তা আসুন আমরা একটু বোঝার চেষ্টা করি।
অনেক নবীকেই আল্লাহ নৈতিক বিজয় দান করলেও রাজনৈতিক বিজয় দেননি। যেমন নূহ (আঃ) কে ৯৫০ বছর চেষ্টার পরও আল্লাহ তাকে রাজনৈতিক বিজয় দেন নাই। আল্লাহ মুহাম্মাদ (সঃ) কে নৈতিক বিজয় দান করার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিজয় দান করেছেন। ৪০ বছর বয়সে নবুয়্যাত পাওয়ার পর বাকি ২৩ বছরেই আল্লাহ তাআলা তাঁকে বৈপ্লবিক বিজয় দান করেছেন।
মুহাম্মাদ (স) তাঁর উম্মতদের নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন। তিনি ভাবতেন, তাঁর দাওয়াত কি কাজে আসছে? মানুষ ইসলাম প্রবেশ করবে তো? মূলত মক্কা বিজয়ের মাধ্যমেই ইসলামের মূল আদর্শিক বিজয় হয় এবং এর পর থেকেই শুধু একাকী নয় বরং মানুষ দলে দলে (আফওয়াজা), গোত্রে গোত্রে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিতে থাকে। এই বিষয়টা আল্লাহ তাঁর রাসূলের জীবনেই নিজ চোখে দেখার তৌফিক দিয়ে তাঁর মনকে প্রশান্ত করেছেন। এবং এখানে ‘রআইতা’ বা আপনে দেখেছেন/দেখবেন শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
এখানে ‘আন নাস’ ব্যবহার করা হয়েছে যার অর্থ বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ; এটা বলে আল্লাহ হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন যে, যারা বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন ছিল তারা সবাই ইসলাম গ্রহন করেছেন।
ইসলামের বিজয়ের কথা বলার পরই আল্লাহ তাঁর তাসবীহ পাঠ করতে, তাঁর বড়ত্ব বর্ননা করতেএবং তাওবা করতে বললেন কেন? একটু বেমানান মনে হচ্ছে? এসময় একটু আনন্দ করতে না বলে বরং ক্ষমা চাইতে কেন বললেন?
অন্য মতাদর্শের সেনাবাহিনী যুদ্ধে জয়ের কারন হিসাবে নিজের কৃতিত্বকে বড় করে দেখায়; অন্যদিকে প্রকৃত ইসলামী সেনাবাহিনী সম্পূর্ন কৃতিত্ব আল্লাহকে দেয়। মক্কা বিজয়ের পর কাবা শরীফের উপরে উঠে আযান দেওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর বড়ত্ব ও এই জয়ে তাঁর কৃতিত্ব এর ঘোষনা দেওয়া হয়।
মুসলিম বাহিনী এগুলো কিছুই করেননি। তারা নম্রভাবে, অবনত মস্তকে মক্কাতে প্রবেশ করেছেন এবং সবার মন জয় করে নিয়েছেন।
আনন্দ উল্লাসের পরিবর্তে আল্লাহ প্রশংসা, গুনগান গাইতে বলেছেন এবং ক্ষমা চাইতে বলেছেন। তাহলে কি মুসলিমদের ভুল ছিলো? মুহাম্মাদ (স) এর কোন ভুল ছিলো? মূলত মক্কা বিজয়ের ফলে ইসলামের ইবাদাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু মুসলিমদের নিয়ন্ত্রনে চলে আসে। কাবাঘর শিরকমুক্ত হয়, পরিশুদ্ধ হয়। কিন্তু কাবার (মানব দেহের বাইরের) পরিশুদ্ধি যেমন হওয়া দরকার ছিলো তেমনি দরকার হলো নিজের আভ্যন্তরীন নফসের পরিশুদ্ধি। নফসের গোলামীর মত ছদ্মবেশী শিরককে দূর করার জন্যই মূলত তাসবীহ পাঠ, আল্লাহর বড়ত্বের ঘোষনা ও তাওবা করতে বলা হয়েছে। কি অসাধারন সমন্বয় !!!
এছাড়া সূরা আন নাসরের এই শিক্ষা শুধু নবী মুহাম্মাদ (স) এর জন্যই নয় বরং সার্বজনীন। আল কুরআন সব যুগের, সব মানুষের জন্য অনুসরনীয় জীবন বিধান। বিজয়ের পর এই ধরনের অহংকারহীন, নম্রতাপূর্ন দোয়া ও আচরন ইসলামকে অন্যান্য মতবাদ, সভ্যতা ও সংস্কৃতি হতে শ্রেষ্ঠত্য দান করেছে। তাই যে কোন সময়ের বিজয়ী দলের জন্যই এই সূরার সব শিক্ষা প্রযোজ্য। সুতরাং তাওবা তো আমাদের করতেই হবে।
এছাড়াও যারা দলে দলে প্রবেশ করেছিল ইসলামে তাদের সবার মনে ঈমান তখনো পাকাপোক্তভাবে প্রবেশ করেনি। এজন্য তাদের উদ্দেশ্যেও আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষনা, প্রশংসা করা ও ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য বলা হয়।
সুতরাং এক কথায় বলা যায় যে, সূরা আন নাসর এর ১ম অংশ (আয়াত ১) তে বিজয়ের জন্য যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ন এবং বিজয়টি, ২য় অংশে (আয়াত ২) বিজয়ের ফলাফল এবং ৩য় অংশে (আয়াত ৩) বিজয় এবং বিজয়ের ফলাফল লাভ করার পর করনীয় এর বিষয় ফুটে উঠেছে।
এই সূরা নাযিল হওয়ার কিছুদিন পরেই রসূল (স) ইন্তেকাল করেন। অর্থাৎ তিনি তাঁর কর্মজীবন শেষ করাতে আল্লাহ তাকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিয়েছেন। এখানে আল্লাহ তাকে প্রি রিটায়ারমেন্ট, পোষ্ট রিটায়ারমেন্ট অবকাশ ইত্যাদি দেননি। এটা দ্বারা বোঝা যায় যে, আমাদের পুরা জীবনটাই আসলে ইসলামের জন্য কাজ করার একটি মিশন। এখানে দুনিয়ার জীবনের বসে থাকা বা রিটায়ার করে দুনিয়া উপভোগ করতে থাকার কোন অপশন নাই। যতদিন আল্লাহ হায়াত দিয়েছেন ততদিন কাজ করে যেতে হবে। রিটায়ারের পর উপভোগ করতে হবে আখিরাতে।
আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ আগের (১০৯ নং) সূরা আল কাফিরুন এ তাওহীদ ও বহু ইলাহ এর মধ্যে দ্বন্দের কথা এসেছে এবং মুহাম্মাদ (স) তাঁর জাতির অবিশ্বাসী অংশকে ‘কাফির’ বলে সম্বোধন করে তাদের দ্বীনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। যেহেতু ২ টি দল এর মধ্যে দ্বন্দ হলে একদলের জয় ও আরেক দলের পরাজয় হয়, তাই এই সূরায় আল্লাহ তাঁর রাসূল ও মুসলিমদের জন্য বিজয়ের ঘোষনা দিয়েছেন। সুতরাং কুফরী, বহু ইলাহ এর দ্বীনের পরিনতি পরাজয় এবং আল্লাহর একত্ববাদী দ্বীনের পরিনতি হলো বিজয়।
সূরা আল ফিল এর ১ম আয়াতে আল্লাহ নিজেকে মুহাম্মাদ (স) এর রব হিসাবে পরিচয় দেন। সূরা আল কুরইশ এর ৩য় আয়াতে আল্লাহ নিজেকে কাবা এর রব হিসাবে পরিচয় দেন। সূরা আন নাছর এর ১ম আয়াতে আল্লাহ মুহাম্মাদ (স) কেকাবার নিয়ন্ত্রণ দেন। অর্থাৎ সূরা আল ফিল ও আল কুরইশ এ যথাক্রমে মুহাম্মাদ (স) ও কাবার রব হিসাবে আল্লাহ নিজেকে পরিচিত করার মাধ্যমে অতি দ্রুতই তিনি তাঁর রাসূলকে তাঁর ঘরের নিয়ন্ত্রণ দিবেন মর্মে ইঙ্গিত দেন। এই ইঙ্গিত বাস্তবে রূপ নেয় সূরা আন নাছরে; আল্লাহর সাহায্যে মুহাম্মাদ এর মক্কা বিজয় ও কাবার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার মাধ্যমে।
এটা এমন হয়েছে যে, এক সূরায় আল্লাহ বীজ লাগান, আরেক সূরায় গাছ জন্মায়, আরেক সূরায় তাঁর ফুল ফোটে, ফল হয়! এখানে আল্লাহ সূরা আল ফিল এ বীজ, আল কুরইশ এ গাছ ও সূরা আন নাছর এ ফুল ও ফল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।
পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ এই সূরায় যেহেতু আল্লাহর একত্ববাদী দ্বীনের পরিনতি বর্ননা করা হয়েছে তাই পরের সূরা আল লাহাব (১১১ নং) এ কুফরী, বহু ইলাহ এর দ্বীনের পরিনতির একটা ছোট উদাহরন দেওয়া হয়েছে। আবু লাহাবের দুনিয়াবী পরিনতি (ধ্বংস) এবং আখিরাতের পরিনতি (জাহান্নাম) এর কথা বর্ননা করা হয়েছে সূরা আল লাহাবে।
১০৯ নং সূরা আল কাফিরুন এ ২ টা দ্বীন এর কথা এসেছে এবং তাদের পার্থক্যের কথা বর্নিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সত্যের চুড়ান্ত বিজয় হয় ও মিথ্যার চুড়ান্ত পরাজয় হয়। ২ টা দ্বীন এর মধ্যে ১১০ নং সূরা আন নাসরে সত্য দ্বীনের বিজয়ের নমুনার কথা ও ১১১ নং সূরা লাহাব এ মিথ্যা দ্বীনের পরাজয়ের নমুনার কথা এসেছে। কি অসাধারন সিকুয়েন্স!
বিশেষ বিষয়ঃ এই সূরায় মুহাম্মাদ (স) এর মিশনের সমাপ্তি হয়েছে এটা বর্ননা করা হয়েছে। যে কোন নবীর দায়িত্ব হলো তাঁর কওমকে তাঁর দাওয়াত প্রচার। মুহাম্মাদ (স) দাওয়াত প্রচার করেছেন এবং ইসলাম বিজয়ী হয়েছে। তাই এই সূরা দুনিয়া থেকে মুহাম্মাদ (স) এর প্রস্থান এর বিষয়ে ইঙ্গিত বহন করে।












মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন