১০৫। সূরা আল ফীল (হাতি)

পটভূমি

সূরাটি ভালভাবে বোঝার জন্য পটভূমি জানা প্রয়োজন। তৎকালীন ইয়েমেন এর খ্রীস্টান শাসক ছিলো আবরাহা। কাবাকে ঘিরে মক্কায় ভৌগোলিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র ও সেই সুবিধায় অর্থনৈতিক, বানিজ্যিক কেন্দ্রে রুপান্তরিত হওয়ায় আবরহা ঈর্ষায় ফেটে পড়ে। সে কাবার সাথে চ্যালেঞ্জ করার জন্য ইয়েমেনের রাজধানী সানায় একটি বিশাল গির্জা নির্মাণ করেছিল এবং আশা করেছিল মানুষ এখানে আসবে ও নতুন কেন্দ্রে পরিনত হবে ইয়েমেন। কিন্তু এই কাজে তেমন কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। 

এজন্য সে ক্ষুদ্ধ হয়ে কাবা ধ্বংসের উদ্যোগ নেয়। যদিও সে এটাকে ধর্মীয় যুদ্ধ হিসাবে দেখাতে চায় কিন্তু তার মনে ছিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। সে বিশাল বিশাল হাতি (৯-১৩ টি) ও বিপুল সৈন্য (৬০ হাজার) নিয়ে কাবার অভিমুখে রওনা হয়।  

প্রতি যুগের ফেরাউন, নমরুদ, শাদ্দাদ এবং আধুনিক যুগের হিটলারসদৃশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের সর্বদা এই ধারণা থাকে যে তাদের অপরিসীম বস্তুগত শক্তি, সর্বাধুনিক ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্র, সামরিক কৌশল এবং আপাতদৃষ্টিতে অপরাজেয় বাহিনী মহাবিশ্বের প্রতিটি ব্যবস্থা, মতবাদ এবং অঞ্চলকে তাদের পদতলে পিষে ফেলতে পারে, নিয়ন্ত্রনে আনতে পারবে। তাদের মনে হয় ইতিহাসের সিদ্ধান্ত তাদের যুদ্ধশিবিরে হয়, আসলে তা  আকাশে হয়। কিন্তু যখন পৃথিবীর এই অহংকারী ও ফেরাউনী শক্তিরা, যারা তাদের প্রযুক্তির অহংকারে ঈশ্বরকে ভুলে যায়, হঠাৎ আকাশের “ঐশ্বরিক ব্যবস্থা” (Divine Order) তাদের জন্য পরিনতি এনে দেন।

রাসূল (স) জন্মের বছর এটি ঘটে। এটি এত গুরুত্ব পুর্ন একটা ঘটনা ছিল যে সেই বছরকে হস্তী বাহিনীর বছর নামে অভিহিত করা হয়। তখন কুরইশরাসহ সকলে এত বড় বাহিনী ও হাতি দেখে ভীত হয়ে দূরে অবস্থান করে।  

সূরার সারসংক্ষেপঃ  

সূরার শুরুতেই ১ম আয়াতে আল্লাহ তার নবীকে বলছেন, তুমি কি দেখনি? এখানে বলা দরকার নবী এর জন্মের আগেই ঘটেছিল তাই তাঁর এটি দেখার কথা নয়। কিন্তু এই ঘটনা এত প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল যে তা এক প্রকার দেখার মতই হয়ে গিয়েছিল।  

এরপর আল্লাহ বললেন, যে তুমি কি জানোনা যে তোমার রব কিভাবে, কি উপায়ে ব্যবহার করেছেন? ‘কি উপায়ে’ তিনি তাদের ব্যর্থ করে দিয়েছেন বলে আল্লাহ তার ডিটেইল বর্ননা এর পরেই তিনি দিয়ে দিয়েছেন। এখানে আল্লাহ ‘রব্বুকা’ মানে তোমার রব বলে নবীর সাথে তাঁর সম্পর্কের গভীরে প্রবেশ করে আশস্ত করতে চেয়েছেন যে, তোমার রব যেহেতু আগেও বিরুদ্ধচারনকারীদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে পেরেছেন তাই তোমার জন্য তিনি এখনো এই ধরনের কাজ করতে পরিপূর্ন ক্ষমতাবান।   

আল্লাহ ঐ বাহিনীকে আসহাবে ফিল বলে বর্ননা করেছেন। এর দ্বারা আরো একটি বিষয় উঠে এসেছে তা হলো আল্লাহ ঐ হতভাগার নাম নেননি এই পবিত্র কুরআনে এবং তার পরেও এমন যত হতভাগা আসবে পৃথিবীতে সবাইও একই ধরনের পরিনতির সম্মুখিন হবে। অর্থাৎ আল্লাহ ইতিহাস সংরক্ষন করেছেন। 

২য় আয়াতে বোঝানো হয়েছেঃ বৃহৎ হাতি বাহিনীসহ প্রচন্ড ক্ষমতাশালী, দাম্ভিক (হাতি বাহিনীর নেতা) আবরাহাকে আল্লাহ প্ল্যান করতে, তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে পর্যন্ত সুযোগ দিয়েছেন।   


সেসময়ে সৈন্য ও ঘোড়া, গাধা, উট ইত্যাদি সহকারে যুদ্ধ প্রচলিত থাকলেও এত সংখ্যক হাতি পোষ মানিয়ে যুদ্ধে নিয়ে আসাটা একটা ব্যতিক্রমী আয়োজন ছিল। 

হাতির ওজন প্রায় ৪ থেকে ৭ টন পর্যন্ত হতে পারে। এই বিপুল ওজনের শরীর নিয়ে একটি হাতি যখন তার সমস্ত শক্তি দিয়ে কোনো কিছুতে ধাক্কা দেয়, তখন সেই বল বা ফোর্সের পরিমাণ হয় কল্পনাতীত। হাতি তার মাথা এবং কাঁধের শক্তিশালী হাড় ও পেশী ব্যবহার করে প্রায় ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ নিউটন বা তারও বেশি বল প্রয়োগ করে ধাক্কা দিতে সক্ষম।

হাতির শুঁড় (Trunk) হলো তার শরীরের সবচেয়ে বহুমুখী এবং শক্তিশালী অঙ্গ। এটি মূলত নাক এবং ওপরের ঠোঁটের একটি সম্মিলিত রূপ, যাতে কোনো হাড় থাকে না। হাড় না থাকলেও এতে প্রায় ৪০,০০০ বা তারও বেশি স্বতন্ত্র পেশী থাকে। একটি হাতি তার শুঁড় দিয়ে অনায়াসে ২৭০ থেকে ৩৫০ কেজি ওজনের গাছের গুঁড়ি বা ভারী বস্তু মাটি থেকে ওপরে তুলে ছুড়ে ফেলতে পারে। শুঁড়ের শক্তি যেমন বিশাল, এর নিয়ন্ত্রণও তেমনই সূক্ষ্ম। একই শুঁড় ব্যবহার করে হাতি যেমন বিশাল গাছ উপড়ে ফেলে, ঠিক তেমনি মাটি থেকে একটি ছোট্ট কয়েন বা ব্লেডও নিখুঁতভাবে তুলে নিতে পারে।
হাতি যখন তার পুরো শরীরের ওজন কোনো একটি পায়ের ওপর এনে কোনো বস্তু বা মানুষের ওপর ভর দেয়, তখন সেখানে কয়েক টন ওজনের চাপ তৈরি হয়। এই প্রচণ্ড চাপের মুখে মানুষের হাড় বা শরীরের যেকোনো অঙ্গ মুহূর্তের মধ্যে পিষে সম্পূর্ণ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। প্রাচীন আমলে অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য হাতি দিয়ে মাথা বা শরীর পিষে ফেলার আইনি প্রথাপ্রচলিত ছিল, যা এদের এই ভয়ংকর ক্ষমতারই প্রমাণ দেয়। এটা তখনকার যুগের “হেভি ব্যাটল ট্যাঙ্ক” (Heavy Battle Tanks) বা “ওয়েপন অব ম্যাস ডেস্ট্রাকশন” (WMD) -এর মতো মর্যাদা রাখত

এই আয়োজনের বহর দেখে ঐ সময়ের আরবের নেতারা নিজেদের শক্তিমত্তা বিবেচনায় যুদ্ধে অংশগ্রহন করাকে বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক মনে না করে আল্লাহর ঘরকে আল্লাহই রক্ষা করতে পারেন বিশ্বাস করে নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়েছিলেন।  

এই আয়াতের ‘ইয়াজয়াল’ দ্বারা বুঝায় যে কোন কিছু ছিল এবং তা রুপান্তর করা হলো; অর্থাৎ আল্লাহ তাদের প্ল্যানকে শুরু থেকে ঠিকঠাক মত হতে দিয়েছেন, বাঁধা দেন নাই। এবং তা শেষ মুহুর্তে রুপান্তর করে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে দিয়েছেন। আল্লাহ হস্তী বাহিনীকে শুরু থেকে প্ল্যান করে এগিয়ে যেতে দিয়েছেন; মাঝপথে বাঁধা দেন নাই, বুঝতে দেন নাই যে শেষে তিনি কি করবেন। অর্থ জোগাড়, আর্মি ট্রেনিং, সাজসজ্জা, সফর ইত্যাদি সব করে কাবাঘর পর্যন্ত পৌছে দিয়েছেন। কিন্তু সবশেষে তাদের পুরা প্ল্যান, আয়োজন সব কিছু ভন্ডুল করে দিয়ে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছেন।   

‘কায়িদা’ শব্দটি এখানে ব্যবহার করা হয়েছে যার অর্থ গোপন ষড়যন্ত্র। এখানে গোপন কি ছিল? আক্রমন তো প্রকাশ্য ছিল। আসলে তার আক্রমন টি ধর্মীয় কাবাঘরের প্রতি ধর্ম যুদ্ধের লেবাস পরিহিত থাকলেও গোপনে তার উদ্দেশ্য ছিল মক্কার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্য সরিয়ে ইয়েমেন এ আনা।    ‘তাদলিল’ এর অর্থ এমনভাবে ধ্বংস হওয়া যার আর ব্যবহার যোগ্যতা না থাকে। তার এই আক্রমন এমনভাবে বিফলে গিয়েছিল যে সে ওখানে না মরে ইয়েমেন এ গিয়ে মরে এবং পরে ইয়েমেন বাসী আর কাবাকে আক্রমনের কথা চিন্তা করেনি। তার সেই গির্জাও আর চালু হয়নি।    

এরপর (৩য় আয়াতে জানা যায়) তাকে শায়েস্তা করতে আল্লাহ তাঁর ক্ষুদ্র পাখিকে ব্যবহার করেছেন। এখানে ‘তইরন’ একটি সমষ্টিবাচক বহুবচন যার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পাখিকে বোঝানো হয়েছে এবং শব্দের উপর ‘তানভিন’ বিষয়টার ভয়াবহতা প্রকাশ করেছে। আবাবিল অর্থ ঝাঁকে ঝাঁকে বহু পাখি। পাখিগুলো তাদেরকে চিবানো খড় কুটার মত করে সকল দাম্ভিকতাসহ ছোট পাথরের মাধ্যমে (৪র্থ আয়াত অনুযায়ী) গুড়িয়ে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এখানে তারমিহিম এর রমি অর্থ নির্দিষ্ট টার্গেটে নিক্ষেপ করা। এখানে পাখিদের ২ পা ও ঠোটে বহন করে আনা পাথর তারা হস্তিবাহিনীর প্রত্যেকের মাথার খুলি বরাবর টার্গেট করে নিক্ষেপ করে।

আবরাহা তখনকার স্থল বাহিনীর সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে আক্রমন করেছিল। তার ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী স্থলজ প্রানী হাতি এবং শক্তিশালী পদাতিক বাহিনী। কিন্তু সে ধারনা করতে পারে নাই যে আল্লাহর আক্রমন হবে ‘এয়ার অ্যাটাক’ অর্থাৎ আকাশ পথে আল্লাহর আক্রমন আসবে এবং শুধু তাই নয়; ক্ষুদ্র পাখির সাহায্যে আক্রমন করে তাকে চরম অপমান ও অপদস্ত করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন।   
আল্লাহ যে শুধু আবরাহাকে পরাস্ত করেছেন তা নয়, আগেও বহু জাতি ও সীমা লঙ্ঘনকারীদেরকে আল্লাহ পরাস্ত করেছেন, শাস্তি দিয়েছেন। বর্তমানেও দিচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও দিবেন।  

সূরা আল ফিল থেকে সব যুগের সব অসৎ, অত্যাচারী, দাম্ভিক ক্ষমতাশালীরই শিক্ষা নেওয়া উচিৎ আর তাদের মোকাবেলায় আল্লাহ যে কতটা পারদর্শী সে সম্পর্কে সকল যুগের সকল মুমিনেরই বিশ্বাস রাখা উচিৎ।  

আল্লাহ তাআলা এই সূরায় ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, কাবার মর্যাদা যারা লঙ্ঘন করতে যাবে তাদেরকে তিনি অমর্যাদাকর পরিনতি দান করবেন। আগে আবরাহা কাবার ক্ষতি করতে এসেছিল, আর রাসূল (স) এর যুগের কাবার তত্ত্বাবধায়করাও কাবার অমর্যাদা করছিল একে শিরকের মধ্যে ডুবিয়ে রাখার মাধ্যমে। আর মুহাম্মাদ (স) কে আল্লাহ এই সূরায় এই বিষয়টি দেখিয়েছেন যে, পূর্বে যেমন আল্লাহ কাবাকে রক্ষা করেছেন তেমনি সামনে মুহাম্মাদ (স) এর রবই মুহাম্মাদ (স) এর মাধ্যমে কাবার নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার দ্বারা কাবার বিরোধীদের শায়েস্তা করবেন, কাবাকে বিপদমুক্ত করবেন।   

আল্লাহ আবরাহার বাহিনীর করুন পরিনতি মুহাম্মাদ (স) কে জানানোর মাধ্যমে তাঁর মনে প্রশান্তি এনে দিয়েছিলেন এবং সেই সাথে ভবিষ্যতে পবিত্র কাবাঘর হতে মূর্তি/শিরক অপসারনের প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন  


জানা যায় যে, আবরাহা তখন মরে নি। পরে সে ইয়েমেনে কোন রকমে ফিরে যেতে সক্ষম হয় এবং বিকৃত দেহসহ সেখানে মৃত্যু বরন করে। তার এই পরিনতি দেখে ইয়েমেন বাসী আর কখনো কাবাকে আক্রমন করার সাহস দেখায়নি। এই পুরা ঘটনা সেসময়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই পুরা ঘটনার পর কাবার মর্যাদা আরো বৃদ্ধি পায়। মানুষ শক্তভাবে বিশ্বাস করে যে আল্লাহ এই কাবাকে রক্ষা করেছেন নিজ নিয়ন্ত্রনে।   

আমরা এই সূরায় আল্লাহর রণকৌশল (war strategy) এর কিছু পয়েন্টের সারসংক্ষেপ (summary) করতে পারি এভাবে

১। আল্লাহ প্রতিপক্ষকে তার প্ল্যান করতে দিয়েছেন এবং শেষ সময়ে গিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে দেননি। এতে প্রতিপক্ষের সার্বিক ক্ষতি হয়েছে। শুরুতে থামিয়ে দিলে এত ক্ষতি হত না। এটা যুদ্ধের একটা বড় কৌশল যাকে বলা যায় ছদ্ম পিছু হটা (Feigned Retreat)। 
২। বিশাল বাহিনীকে আল্লাহ একটা নির্দিষ্ট  stategic point এ (কাবার কাছে) এনে ফাঁদে ফেলে Entrapment Strategy তে ঘেরাও কৌশল ব্যবহার করে (Encirclement) চূড়ান্ত Kill Zone এ নিয়েছেন। 
৩। সাধারন জনগন আগেই সরে গিয়েছিল (civil people, war area separation)। এর ফলে আল্লাহ মূল লক্ষ্যবস্তু নয়, কিন্তু যুদ্ধের পার্শপ্রতিক্রিয়ায় বেসামরিক লোকজন বা সিভিলিয়ান কিংবা স্থাপনার ক্ষতি (no civil casualty, Collateral Damage) হতে দেন নাই। 


৪। আল্লাহ তার প্রতিপক্ষকে অতি ক্ষুদ্র বিমানবাহিনী (পাখি)র মাধ্যমে তাদের কল্পনার বাইরে গিয়ে বিশেষ বাহিনী দিয়ে (air stike from unimaginable source) বিশেষ মারণাস্ত্র (special lehal weapon) ব্যবহার করে আক্রমন করেছেন
৫। প্রতিপক্ষকে "খাওয়া খড়ের" (যা চিবিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে) সাথে তুলনা করে লজ্জাজনক ভাবে পরাজয়ের সাথে সম্পূর্ণ ধ্বংস, বিলুপ্ত (total defeat and disgraceful annihilation) করেছেন। 
৬। আল্লাহ তার মুল  stategic স্থাপনা দুর্গ, মিলিটারি বেজ, Garrison (কাবা) এর পুর্ন সংরক্ষন করেছেন
৭। আল্লাহ এই রণকৌশলকে (war cronicle) Military Records সহকারে দলিলীকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে (War Documentation) আজীবন ইতিহাস (Official War History) হিসাবে সংরক্ষন (preservation)  করেছেন কিয়ামত পর্যন্ত হেফাজতকৃত কুরআনে উল্লেখ করার মাধ্যমে। এটি কোন পৌরাণিক গল্প (Mythology) বা শিশুদের শোনানো লোককথা নয়; বরং এটি “ইতিহাসের দর্শন” (Philosophy of History), “সভ্যতার সংঘাত” এবং “আধুনিক সামরিক বিজ্ঞান” (Military Science)-এর সেই জীবন্ত ও জ্বালাময়ী ঐশ্বরিক শিক্ষা যেন যুগে যুগে প্রতিপক্ষ এই কাহিনী জেনে সতর্ক হয়। “শক্তির নেশা”, “সামরিক অহংকার” এবং সভ্যতার উত্থান এর যে পতন হতে পারে তা খুব ভালভাবে জানা যায়। এটা তিনি বারবার প্রচারের (publicity) ও সুযোগ করে দিয়েছেন যেন মানুষের মনে সদা জাগরুক থাকে। 

আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ আগের ১০৪ নং সূরা আল হুমাঝাহ তে আল্লাহ আখিরাতে শাস্তির কথা বলেছেন। এটিই আখিরাত সম্পর্কিত শেষ  সূরা। এখানে জাহান্নামের ভয়াবহতাকে খুব বেশি করে বর্ননা করা হয়েছে।  ‘হুতামাহ’ শব্দ দ্বারা চূর্ন-বিচুর্ন করা বুঝায় যা একটি কঠিন শাস্তি। আল্লাহ আখিরাতেই যে শুধু কঠিন শাস্তি দিতে পারেন তা নয় বরং দুনিয়াতেও চূর্ন বিচূর্ন করে শাস্তি দিতে পারেন এবং তাঁর প্রমান হলো এই ১০৫ তম সূরা আল ফিল। এখানে আল্লাহ আবহারা ও তাঁর হস্তিবাহিনীকে চূর্ন-বিচুর্ন করে পিষে ফেলে চর্বিত ভুষির মত করে দিয়ে সেই কথারই প্রমান দিয়েছেন। অর্থাৎ সূরা আল হুমাঝাহ  তে আখিরাতে শাস্তির কথা ও ১০৫ তম সূরা আল  ফিল এ দুনিয়ায় শাস্তির কথা বলা হয়েছে এবং সত্য উদাহরন দিয়ে আখিরাতের বিশ্বাসযোগ্যতাকে বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। 

পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ ১০৬ তম সূরা আল কুরইশ (goo.gl/zfWSpu) এর সাথে ১০৫ তম সূরা আল ফিলের মিল খুব বেশি। অনেকে এই ২ টিকে একসাথে মিলিয়ে পড়েন ও একই ধারাবাহিক সূরা মনে করেন। সূরা ফিলে কুরইশদের আবরাহার ভীতি থেকে মুক্ত করে নিরাপত্তা দানের কথা বলা হয়েছে, যা সূরা আল কুরইশ এর শেষ আয়াতেও পুনরায় আল্লাহ বলেছেন। অর্থাৎ ১০৫ তম সূরা আল ফিল এ কুরইশদের শান্তি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা এবং ১০৬ তম সূরা আল কুরইশে কুরইশদের সমৃদ্ধির (অর্থনৈতিক ও খাদ্যের) কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎসূরা আল ফিল এ আবরাহার বাহিনীর আক্রমন প্রতিহত করে আল্লাহ কুরইশদের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন এবং সূরা আল কুরইশ এ চলাচল ও ব্যবসায়িক নিরাপত্তা দানের মাধ্যমে আল্লাহ কুরইশদের ক্ষুধা ও ভয় হতে নিরাপদ করেছেন। 

অবাক করা ব্যাপার হলো, এই চাওয়া ছিলো কিন্তু মুসলিমদের জাতির পিতা, কাবা ঘর ও এই মক্কা নগরীর প্রতিষ্ঠাতা হযরত ইবরহীমের!!! দেখুন তিনি কি দোয়া করেছিলেনঃ  আর এও স্মরণ করো যে, ইবরাহীম দোয়া করেছিলঃ “হে আমার রব! এই শহরকে শান্তি ও নিরাপত্তার শহর বানিয়ে দাও। আর এর অধিবাসীদের মধ্য থেকে যারা আল্লাহ‌ ও আখেরাতকে মানবে তাদেরকে সব রকমের ফলের আহার্য দান করো।” জবাবে তার রব বললেনঃ “আর যে মানবে না, দুনিয়ার গুটিকয় দিনের জীবনের সামগ্রী আমি তাকেও দেবো। কিন্তু সব শেষে তাকে জাহান্নামের আযাবের মধ্যে নিক্ষেপ করবো এবং সেটি নিকৃষ্টতম আবাস।” (সূরা আল বাকারা, আয়াত ১২৬)  আল্লাহ তাঁর দোয়াকে কবুল করেছেন যার প্রমান সূরা ফিল ও কুরইশ। আল্লাহু আকবার।    

সূরা আল ফিল এর ১ম আয়াতে আল্লাহ নিজেকে মুহাম্মাদ (স) এর রব হিসাবে পরিচয় দেন। সূরা আল কুরইশ এর ৩য় আয়াতে আল্লাহ নিজেকে কাবা এর রব হিসাবে পরিচয় দেন। সূরা আন নাছর এর ১ম আয়াতে আল্লাহ মুহাম্মাদ (স) কেকাবার নিয়ন্ত্রণ দেন। অর্থাৎ সূরা আল ফিল ও আল কুরইশ এ যথাক্রমে মুহাম্মাদ (স) ও কাবার রব হিসাবে আল্লাহ নিজেকে পরিচিত করার মাধ্যমে অতি দ্রুতই তিনি তাঁর রাসূলকে তাঁর ঘরের নিয়ন্ত্রণ দিবেন মর্মে ইঙ্গিত দেন। এই ইঙ্গিত বাস্তবে রূপ নেয় সূরা আন নাছরে; আল্লাহর সাহায্যে মুহাম্মাদ এর মক্কা বিজয় ও কাবার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার মাধ্যমে। 

এটা এমন হয়েছে যে, এক সূরায় আল্লাহ বীজ লাগান, আরেক সূরায় গাছ জন্মায়, আরেক সূরায় তাঁর ফুল ফোটে, ফল হয়! এখানে আল্লাহ সূরা আল ফিল এ বীজ, আল কুরইশ এ গাছ ও সূরা আন নাছর এ ফুল ও ফল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।    

বিশেষ কিছুঃ  আল্লাহ হস্তিবাহিনী বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এখানে উদ্ধত আবরাহার নাম পর্যন্ত নেন নাই। তিনি আবরাহাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে বরং হাতির দিকে ফোকাস করিয়েছেন।   

কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে এমন  জীব জন্তুর (মানুষ বাদে) সংখ্যা অনেক। এর মধ্যে সবচেয়ে শেষে বর্ননা করা হয়েছে ‘হাতি’ এর নাম। যেই হাতি হলো সচারচর দেখা যায় এমন সবচাইতে বড় প্রানী। সর্বপ্রথম উল্লেখ করা হয়েছে কোনটি জানেন? সচারচর দেখা যায় এমন সবচেয়ে ক্ষুদ্র ও আপাতদৃষ্টিতে সবচেয়ে দূর্বল; মশার কথা।  “অবশ্য আল্লাহ‌ লজ্জা করেন না মশা বা তার চেয়ে তুচ্ছ কোন জিনিসের দৃষ্টান্ত দিতে। যারা সত্য গ্রহণকারী তারা এ দৃষ্টান্ত –উপমাগুলো দেখে জানতে পারে এগুলো সত্য, এগুলো এসেছে তাদের রবেরই পক্ষ থেকে, আর যারা (সত্যকে) গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয় তারা এগুলো শুনে বলতে থাকে, এ ধরনের দৃষ্টান্ত –উপমার সাথে আল্লাহর কী সম্পর্ক? এভাবে আল্লাহ‌ একই কথার সাহায্যে অনেককে গোমরাহীতে লিপ্ত করেন আবার অনেককে দেখান সরল সোজা পথ” -(২য় সূরা আল বাক্বারা- আয়াত ২৬)।   

সুতরাং, একদম শুরুতে ছোট ও একদম শেষে বড়। কি সুন্দর আল্লাহর sequence!!! হবেই বা না কেন বলুন? সবই তো তারই সৃষ্টি ।  

কাব্য, ছন্দ পারদর্শিতার আরব যুগে আল কুরআন দিয়েছে শৈল্পিক কাব্য, ছন্দের অনন্য উদাহরন। একারনে ঐ যুগেও আল কুরআন ছিল এক বিস্ময়কর সাহিত্য।  সূরা আল ফীল এর সব আয়াতের শেষেই ل ‘লাম’ এর অপূর্ব ছন্দ পাওয়া যায়। 

সূরা ফিল এবং পরের ৯ টা মোট ১০ টা সূরা একসাথে গাঁথা। এই সম্পর্কের শুরু ইবরাহীম (আ)-এর দুআ। কাবা নির্মাণের সময় তিনি মক্কার জন্য দুটি জিনিস চেয়েছিলেন: এই শহর যেন নিরাপদ থাকে, আর এর অধিবাসীরা যেন ফলমূলের রিজিক পায়। নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধি।


সূরা ফীল: আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতির প্রথম অংশ রক্ষা করলেন। হাতির বাহিনী নিয়ে আবরাহা এলো কাবা ধ্বংস করতে—আল্লাহ আবাবিল পাখি দিয়ে তাদের চিবানো ঘাসের মতো করে দিলেন। মক্কা রইলো নিরাপদ।
সূরা কুরাইশ: প্রতিশ্রুতির দ্বিতীয় অংশ।—শীত ও গ্রীষ্মের বাণিজ্য সফর। কুরাইশদের ব্যবসা চলে নির্বিঘ্নে, ক্ষুধায় তিনি খাদ্য দিলেন, ভয় থেকে দিলেন নিরাপত্তা। সমৃদ্ধিও পূর্ণ হলো। তাহলে দাঁড়ালো—ফীল ও কুরাইশ হলো ইবরাহীম (আ)-এর দুআর দুই ডানা।
সূরা মাউন: কিন্তু এবার প্রশ্ন—আল্লাহ তো তাঁর দিক থেকে প্রতিশ্রুতি রাখলেন; ইবরাহীমের যে সন্তানেরা এখন কাবার দায়িত্বে, তারা কি তাদের দিকটা রেখেছে? উত্তর: না। ইয়াতিমকে দূরে ঠেলে দেওয়া, লোক দেখানো নামাজ—এই হলো তাদের অবস্থা। সূরা মাউন যেন আদালতে পেশ করা প্রমাণ: কুরাইশরা ইবরাহীমের উত্তরাধিকারের যোগ্য নয়।
সূরা কাউসার: তারা যদি যোগ্য না হয়, তাহলে যোগ্য কে? উত্তর এলো—নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি। কাবার প্রকৃত উত্তরাধিকারী হলেন রাসূলুল্লাহ (স)। কেন? কারণ তিনিই ইবরাহীম (আ)-এর আদর্শকে পুনরুজ্জীবিত করবেন। আর সেই আদর্শের সারকথা এই সূরাতেই: —আপনার রবের জন্য নামাজ পড়ুন এবং কুরবানী করুন। নামাজ আর কুরবানী—ভেবে দেখুন, এই দুটোই তো ইবরাহীম (আ)-এর জীবনের সারমর্ম! যে কুরবানীর প্রস্তুতি তাঁকে এই ঘর নির্মাণের যোগ্য বানিয়েছিল, আর নির্মাণের সময় যাঁর দুআ ছিল—হে রব, আমাকে ও আমার বংশধরদের নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী বানান।

সূরা কাফিরুন: এখন সমস্যা হলো, যোগ্য আর অযোগ্য—দুই পক্ষই এক শহরে, এক কাবা ঘিরে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে সবাই বুঝি একই ধর্মের। তাই এবার এলো প্রকাশ্য বিচ্ছেদের ঘোষণা: বলুন, হে কাফেরগণ... তোমাদের দ্বীন তোমাদের, আমার দ্বীন আমার। উপাসনালয় এক হলেও ধর্ম এক নয়। আর সেই যুগে গোত্রের আনুগত্য ত্যাগ করার অর্থ কী জানেন? যে গোত্র আপনার নিরাপত্তার একমাত্র ঢাল, তাকেই প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলা। কাফিরুন ঘোষণার পর সংঘাত অনিবার্য হয়ে গেলো।
সূরা নাসর: আর সংঘাত হলে কেউ জিতবে, কেউ হারবে। কে জিতবে? যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে...—আর আপনি দেখবেন, মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে। ভাবুন, এই প্রতিশ্রুতি যখন আসছে, মুসলিমরা তখন নির্যাতিত সংখ্যালঘু!
সূরা মাসাদ (আরেক নাম সূরা লাহাব): এত বড় প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসযোগ্য করতে চাই একটা নমুনা, একটা টোকেন।—ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত। ইসলামের সবচেয়ে কঠিন শত্রুদের একজনের ধ্বংসের অগ্রিম ঘোষণা—প্রমাণ যে বড় বিজয়টাও আসছে।
সূরা ইখলাস: এবার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক মুহূর্ত। বছরের পর বছর কোনো মিশনে লেগে থাকলে মানুষ কী ভুলে যায়? কেন শুরু করেছিল, সেটাই! বিজয়ের প্রতিশ্রুতি এসে গেছে; এখন মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি—এই এত সংগ্রাম কীসের জন্য ছিল। ইবরাহীম (আ) কেন কাবা বানিয়েছিলেন? একটাই কারণে—তাওহিদ

সূরা ফালাক ও সূরা নাস: কিন্তু এই যে ইখলাস—নিয়তের এই বিশুদ্ধতা—এটা কি একবার অর্জন করলেই চিরদিন টিকে থাকে? না; এটা সার্বক্ষণিক আক্রমণের মুখে থাকা এক অমূল্য সম্পদ। তাই শেষে এলো দুটি সুরক্ষা-কবচ। বাইরের হুমকি থেকে—রাতের অন্ধকার, জাদু, হিংসুকের হিংসা। আর ভেতরের হুমকি থেকে— সেই কুমন্ত্রণাদাতা, যে মানুষের বুকের ভেতরে ফিসফিস করে। এত কষ্টে অর্জিত ঈমান আর ইখলাসকে এবার পাহারা দিন—বাইরে থেকে, ভেতর থেকে।

উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)