১০৪। সূরা আল হুমাঝাহ (পরনিন্দাকারী)
সূরার সারসংক্ষেপঃ শুরুতেই ১ম আয়াতে পরিনতি হিসাবে ধবংসকে (ওয়াইল বলতে খারাপতম দূর্ভোগ বোঝায় আবার জাহান্নামের খুবই খারাপ একটা স্থান বুঝায় যার থেকে স্বয়ং জাহান্নাম পানাহ চায়) সামনে আনা হয়েছে কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের অধিকারী মানুষদের জন্য। যারা সামনে ও পিছনে মানুষের দোষ ত্রুটি বর্ননা করে/প্রকাশ করে তাদেরকে ‘হুমাঝাহ’ ও ‘লুমাঝাহ’ বলা হয়। কখনো কখনো কণ্ঠস্বর নকল করে, শারিরীক বৈশিষ্ট্য নকল, ইশারা, ইঙ্গিতের মাধ্যমেও তারা তা প্রকাশ করে। আবার সরাসরিও নিন্দা করা এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত।
এরপর (আয়াত ২, ৩) সম্পদের প্রতি লোভী মানুষের কথা বর্ননা করা হয়েছে যারা তা (নিয়মতান্ত্রিকভাবে দান না করে) জমাতে থাকে আর বার বার গননা করে থাকে আনন্দে এবং ভবিষ্যতের (long term) নিশ্চয়তার জন্য এবং মনে করে তা চিরজীবন থাকবে। বার বার গননা করে একটি উদ্দেশ্যে যে দেখে সেটা কত বাড়ছে। এবং এগুলো তাদের খুব প্রিয় হওয়ায় তার সান্নিধ্য পেতে চায় বেশি বেশি। তারা অর্থ জমা করতে থাকে তার মানে হচ্ছে তাদের অর্থের প্রাচুর্য থাকে এবং বার বার গুনতে থাকে এই কথা বলার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কার্পণ্য ও অর্থ লালসার ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
১ম ও ২য়, ৩য় আয়াতের এই দুই বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক হলোঃ যেহেতু তাদের নিজেদের মধ্যে সমস্যা ও কৃপনতার ত্রুটি আছে, মানুষ তাদের সমালোচনা করতে পারে তাই তারা নিজেরা অগ্রবর্তী হয়ে আগেই মানুষের সমালোচনায় লিপ্ত হয়ে পড়ে তাদের ত্রুটি ঢাকার জন্য। এ যেন the best defense is the offense!!! যেহেতু তাদের অর্থ আছে তাই তারা এটি আরো গর্বকরে করে এবং ভাবে যে তাদের প্রটেস্ট করার কেউ নাই।
যারা অন্যদের দোষ খুঁজে বেড়ায় এবং প্রচার করে বেড়ায় তারা মূলত নিজেরা দোষ মুক্ত নয়; বরং তারা তাদের নিজেদের দোষ ঢাকতেই অন্যের দোষ বলে বেড়ায়, অন্যের উপর দোষ চাপায়। তারা নিজেদের খারাপ দিকগুলো খুঁজে পায় না বলেই অন্যের ভালো কাজ গুলোও খুঁজে পায় না।৩য় আয়াতে বলা হচ্ছেঃ তারা ধন সম্পদ আহরনে এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে যায় যে, সেটার পিছনেই বেশির ভাগ সময় দিতে থাকে। এক সময় মনে করে অর্থ -সম্পদ চিরকাল থাকবে এবং তা তাকে অমর করে রাখবে। অর্থের কথা চিন্তা ও তাঁর পিছনে সময় দিতে থেকে তারা মৃত্যুর কথা ভুলে থাকে এবং এক সময় পুরাপুরি তা ভুলে যায়। সে মন করে এই অর্থ তাকে অমর করে ফেলবে। অর্থ দিয়ে সে ভালো চিকিৎসা করে বহুদিন বেঁচে থাকবে এমন আশাও করে। আবার এই অর্থ তাকে ধনী, সফল, লিজেন্ড, অভিজাত বংশের মানুষ হিসাবে মানুষের মনে চিরকাল রেখে দেবে এমন চিন্তাও তাদের থাকে।
কিন্তু না। ৪র্থ আয়াতে আল্লাহ বলছেন, তারা একান্ত অবজ্ঞাভরে (তারা নিজেরা নিজেদেরকে দুনিয়ায় অনেক উচ্চমর্যাদার ভাবতো এবং কিছু ক্ষেত্রে তা বাস্তবও ছিলো কিন্তু আখিরাতে) নিক্ষিপ্ত হবে হুতমাহ তে। তারা এতগুলো খারাপ কাজের পরিনতি হিসাবে শুধু হুতমাহ পাবে? মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এই একটা মাত্র জিনিস আর এমন কি ই বা হবে? কিন্তু না। ‘হুমাঝাহ’ ও ‘লুমাঝাহ’ যারা তারা তাদের তীব্র খারাপ কাজের সাথে মিল রেখে একই ধরনের শুনতে (শব্দ ও শ্রুতিগত দিক থেকে কাছাকাছি) তীব্র পীড়াদায়ক হুতমাহ তে জায়গা পাবে। তাদের অর্থ সম্পদের জন্য দুনিয়ায় তারা সম্মান পেলেও আখিরাতে চরম লাঞ্চনা সহকারে নিক্ষেপ করা হবে আগুনে। তাকে অপমান করে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে কোন দাম না দিয়ে এবং সে যেহেতু তাঁর কথা, কাজ দিয়ে অন্য মানুষকে অপমান করতো (১ম আয়াত অনুসারে) তাই তাকেও চরম অবজ্ঞাভরে ছুড়ে ফেলা হবে।
৫ম আয়াতে আল্লাহ জবাব দিলেন, তুমি কি জানো এই হুতমাহ কেমন? প্রশ্ন করার মাধ্যমে এখানে আল্লাহ কথার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়ে নিজেই উত্তর দিয়েছেন ৬ষ্ঠ আয়াতে। এটা আল্লাহর প্রজ্বলিত চূর্ন বিচূর্নকারী আগুন। তারা যেমন অন্যের নিন্দা করে মনকে (সামনে নিন্দা করে), সম্পর্ককে (অন্যের অবর্তমানে নিন্দা/গীবত করে) চূর্ন বিচূর্ন করে দিতো তেমনি তাদের স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাদেরকে চূর্ন বিচূর্নকারী আগুন দিয়ে উপযুক্ত আযাব দেওয়া হবে। এই সূরায় ‘নারুল্লহ’ বলার মাধ্যমে আল্লাহ আগুনের সর্বাধিক তীব্রতা বুঝিয়েছেন; যেন তিনি নিজেই তা জ্বালিয়েছেন, দুনিয়ার আগুন নিভে যাওয়ার চান্স থাকে কিন্তু এই আগুন সর্বদা প্রজ্বলিত। এটি এতো মারাত্মক যেঃ সেটা তাদের গোশত (তারা গীবত করতো যা হলো মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার চেয়ে জঘন্য ), চামড়া (তারা নির্লজ্জ, চর্মহীনের মত নিন্দা করতো ও সম্পদ বিলি না করে জমাতো) কে খেয়ে, হাড়কে চূর্ন বিচূর্ন করে স্টেপ বাই স্টেপ ভাবে সবচেয়ে protected স্থান হৃদয়ে পৌছে যাবে এবং সেখানে গিয়ে বার বার পোড়াতে থাকবে যেটা ছিলো লোভ ও অন্যের প্রতি অবজ্ঞার মূল আবাসস্থল। (আয়াত ৭)
এভাবে আল্লাহ তার সবচেয়ে কঠিন আগুন (যা কখনও নিভবে না, noun হিসাবে এসেছে যা স্থায়ী) এবং জাহান্নামের সবচেয়ে কঠিন আযাব দিয়ে তাদেরই কৃতকর্মের প্রতিফল দিবেন। তারা অর্থ সম্পদ জমা করে রাখতো ভবিষ্যত ভালো করার জন্য তাদের ভবিষ্যত এর চিন্তা বলতে মৃত্যু পর্যন্ত ছিলো যা আগে সূরা আত তাকাসূরে বর্ননা করা হয়েছে। কিন্তু তাদের আসল সুদূর ভবিষ্যত (পরকাল) হবে ভয়াবহ যার কারন ঐ অর্থ সম্পদের প্রতি লোভ ও তা বজায় রাখার জন্য অন্যের প্রতি অবজ্ঞা।
৮ম আয়াতে বর্নিত হয়েছে যে, তাদের জাহান্নামে আটকে রাখা হবে এবং তা আবৃত থাকবে। এর কারনে তাপ বা আগুন বের হতে পারবে না। এতে দরজা থাকবে কিন্তু তা বন্ধ থাকবে। দরজা দেখে তারা আশান্বিত থাকবে কিন্তু আল্লাহ তাদের মুক্তি দিবেন না। এতে তাদের আশা বেঁচে থাকবে কিন্তু তাদের আশা পূরন হবে না, যার ফলে কষ্ট আরো বেড়ে যাবে।
শেষ (৯ম) আয়াতে অনেক উচু স্তম্ভ দ্বারা সেই স্থান বানানো এমন বলা হয়েছে। তারা দূর থেকে দরজা খোলার আশায় থাকবে যার কারনে তাদের কষ্ট আরো বেড়ে যাবে।
একটা কল্পিত প্রতিকী চিত্র আঁকার চেষ্টা করা হয়েছে।
এছাড়াও কুরআনের আরো কিছু সূরার আয়াতের সাহায্যে জাহান্নামের আরো কিছু আযাবের চিত্র এখানে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।
আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ ১০২ নং সূরা আত তাকাসূর এ মূলত বর্ননা করা হয়েছে যে মানুষ গাফিলতিতে আচ্ছন্ন হয়ে আছে এবং তা তাকে কবর পর্যন্ত পৌছে নিয়ে যায় এবং তা শেষ পর্যন্ত জাহান্নাম পর্যন্ত নিয়ে যায়। ১০৩ নং সূরা আল আসর এ বলা হয়েছে যে ঐ কবরে যাওয়ার আগেই সময় থাকতে জেগে উঠে ভালো কাজ করতে হবে আর যারা না করবে তারা ক্ষতির (‘খুসর’ এর) মধ্যে নিমজ্জিত। সেই ক্ষতিটি আসলে কেমন এবং ভালো কাজ না করে খারাপ কাজ করলে শেষ পরিনতি (‘ওয়াইল’, ‘হুতমাহ’) কি হবে তা ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে এই সূরায় ।
১০৩ নং সূরা আল আসর এ সময়কে গুরুত্ব দিয়ে ৪ টি কাজ করতে বলা হয়েছে। ঈমান আনা, সৎকাজ করা, সত্যের উপদেশ দেওয়া, ধৈর্য্যের উপদেশ দেওয়া। এর পরের সূরা; ১০৪ নং সূরা আল হুমাঝাহ এ গুরুত্বহীন ৪ টি কাজ এর কথা বলা হয়েছে। সামনে নিন্দা করা, পিছনে নিন্দা করা, অর্থ জমা করা এবং তা গুণে গুণে রাখা, অর্থ চিরকাল থাকবে মনে করা।
সূরা আল আসর এর ৪ টি কাজ সূরা আল হুমাঝাহ এর ৪ টি কাজের সাথে বিপরীত ভাবে প্রতিসম!!!এক কথায় সূরা আল আসরে আল্লাহ ৪ টি গুরুত্বপূর্ন বিষয়ে ভালো পরামর্শ দিলেও সূরা আল হুমাঝাহ তে মানুষ সেই উপদেশ না শুনে ৪ টি অগুরুত্বপূর্ন ও ক্ষতিকর কাজ করে আল্লাহর উপদেশকে অবজ্ঞা করে।
পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ এই সূরাতে আল্লাহ আখিরাতে শাস্তির কথা বলেছেন। এটিই আখিরাত সম্পর্কিত শেষ সূরা। এখানে জাহান্নামের ভয়াবহতাকে খুব বেশি করে বর্ননা করা হয়েছে। ‘হুতামাহ’ শব্দ দ্বারা চূর্ন-বিচুর্ন করা বুঝায় যা একটি কঠিন শাস্তি। আল্লাহ আখিরাতেই যে শুধু কঠিন শাস্তি দিতে পারেন তা নয় বরং দুনিয়াতেও চূর্ন বিচূর্ন করে শাস্তি দিতে পারেন এবং তাঁর প্রমান হলো পরের ১০৫ তম সূরা আল ফিল । এখানে আল্লাহ আবহারা ও তাঁর হস্তিবাহিনীকে চূর্ন-বিচুর্ন করে পিষে ফেলে চর্বিত ভুষির মত করে দিয়ে সেই কথারই প্রমান দিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ ১০৪ নং সূরা আল হুমাঝাহ তে আখিরাতে শাস্তির কথা ও ১০৫ তম সূরা আল ফিল এ দুনিয়ায় শাস্তির কথা বলা হয়েছে।
বিশেষ বিষয়ঃ আল কুরআনে ২ টি সূরা ‘ওয়াইল’ (ধবংস) দিয়ে শুরু হয়েছে। ২ টি সূরা হলো ৮৩ তম সূরা আল মুতাফফিফীন ও ১০৪ তম সূরা আল হুমাযা। এই দুই সূরাতেই সম্পদের লোভে মোহাচ্ছন্ন মানুষদের জন্য ধবংস এর কথা বলা হয়েছে। আসুন আমরা নিজেদের কাছে প্রশ্ন করি। আমরা কি ধন-সম্পদের মোহে মোহাচ্ছন্ন? আমাদের জন্য কি ধবংস অপেক্ষা করছে?








মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন