১৭। সূরা বানী ইসরাঈল

মা বাবার সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘ইহসান’ শব্দটি ব্যবহার করে হয়েছে প্রায় সব ক্ষেত্রেই তবে একটি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে ‘হুসন’ শব্দটি। আরবীতে শব্দের ক্ষেত্রে একই ধরনের শব্দে বর্ণ সংখ্যা বেশি হলে তার অর্থতেও সেই প্রভাব পড়ে, বেশি বর্ণ মানে বেশি প্রকট অর্থ বুঝায়। স্বাভাবিকভাবে ২:৮৩, ৪:৩৬, ৬:১৫১, ১৭:২৩, ৪৬:১৫ আয়াতগুলোতে নেককার মা বাবা হওয়ায় তাদের প্রতি ইহসান বা সর্বোচ্চ সুন্দর ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ। অন্যদিকে ২৯:৮৮ আয়াতে সর্বোচ্চ সুন্দর ব্যবহারের চেয়ে কম মাত্রার অর্থবহ ‘হুসন’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে সেই সকল মা বাবার প্রতি যারা শিরক করার জন্য চাপ দেয়। আল্লাহর শব্দ ব্যবহার কত যুক্তিপূর্ণ ও নিখুঁত!  

সূরা বানী ইসরঈল এর ২৪ নং আয়াতে রব্বি শব্দটি এসেছে। ‘রব্বি’ ও ‘রব্বানা’ শব্দটি মূলত দুটি করে শব্দ। ‘ইয়া রব্বি’ ও ‘ইয়া রব্বানা’। কিন্তু ‘ইয়া’ বা ‘হে’ শব্দটি আল্লাহর ক্ষেত্রে বিলুপ্ত করে ব্যবহার করা হয়। আল্লাহ  আমাদের খুবই কাছের, আপন বিধায় দূরবর্তি সংক্রান্ত শব্দ ‘হে’ বাদ দিয়ে শুধু রব্বি বা রব্বানা বলা হয়। সুবহানাল্লহ!


আল কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় মানুষের শ্রবণেন্দ্রীয়, দর্শনেন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণ/মন মস্তিষ্ক এর ব্যাপারে উল্লেখ আছে (যেমন ১৬:৭৮, ১৭:৩৬, ২৩:৭৮, ৩২:৯)। এই ইন্দ্রীয়গুলোর ক্রম মায়ের পেট এ সূচনা ও উন্নয়ন এর ক্রম অনুসারেই লিপিবদ্ধ হয়েছে! অর্থাৎ সবার আগে কানের এর পর চোখের ও পরে হৃদয় ও মস্তিস্কের গঠন ও পূর্নতা সাধিত হয়েছে! পরে প্রাপ্ত বয়স্ক হয়েও এই ধারা কার্যকরী। 

কোন কথা প্রথমে শুনেই হুট করে বিশ্বাস না করে নিজের চোখ দিয়ে দেখে যাচাই করা উচিৎ এরপর শোনা ও দেখা বস্তুটি সম্পর্কে অন্তর ও বুদ্ধি বিবেক দিয়ে যাচাই ও পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিৎ। 

আল কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় 'হাযাল কুরআন' অর্থাৎ এই কুরআন  আবার কোথাও 'যালিকাল কিতাব' অর্থাৎ ঐ কিতাব (বই) বলা হয়েছে। যেমন ৪১ নং আয়াত। এর কারন কি?    

কিতাব শব্দটি লেখার সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেহেতু মূল গ্রন্থটি লিখিত অবস্থায় লাওহে মাহফুয এ আছে যা দূরে অবস্থিত এজন্য এক্ষেত্রে ‘যালিকা’ (দূরবর্তীবাচক শব্দ) ব্যবহার  করা হয়েছে।   


কুরআন শব্দটি পড়ার সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেহেতু কুরআন গ্রন্থটি পড়ার মাধ্যমে এসেছে ও পৃথিবীতে তা পড়া হয় এবং যা কাছে অবস্থিত এজন্য এক্ষেত্রে ‘হাযা’ (নিকটবাচক শব্দ) ব্যবহার করা হয়েছে।   

৭৮ তম আয়াতে আল কুরআনকে ‘ফযর’ এর সাথে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে, যা একটি ব্যতিক্রম। ফযরের সময় নামাজে কুরআন পাঠ, অর্থসহ তেলাওয়াত ও এর ব্যাখ্যা চিন্তা করা সবচাইতে কার্যকরী কারন হয়তো আল্লাহ নিজেই এর সাক্ষী থাকেন, সাথে থাকেন ফেরেশতারা ও আল্লাহর খাস বান্দাহরা কারন ফযরের নামাজ পড়া সবার জন্য খুব সহজ হয় না।      

আয়াত ১০৭, ১০৮ আমাদের শিক্ষা দেয় যে,   
শিক্ষা মানুষকে নিজের বড়ত্ব জাহির করতে শেখায় না। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা মানুষকে বিনীত করে, অন্যকে শ্রদ্ধা করতে শেখায়। আচার ব্যবহারে মার্জিত হতে শেখায়। শিক্ষার ভার মানুষকে উদ্ধত নয় বরং অহংকার ভুলে নত হতে সাহায্য করে।     

আল কুরআনের আলোকে ২ ধরনের বাতাসের পার্থক্যঃ  বহুবচনের বাতাস ‘রিয়াহ’  এই বাতাস নিয়ামত হিসাবে আসে। হেলেদুলে প্রবাহিত হয়, কখনও এদিক থেকে কখনও  ওদিক থেকে বিক্ষিপ্তাকারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বইতে থাকে; কেমন যেন সেখানে অনেকগুলো বাতাস থাকে । এমন উদাহরন আছে বিভিন্ন সূরা ও আয়াতে। যেমনঃ ২:১৬৪, ৭:৫৭, ১৫:২২, ১৮:৪৫, ২৫:৪৮, ২৭:৬৩, ৩০:৪৬, ৩৫:০৯, ৪৫:০৫

অপরদিকে এক বচনের বাতাস ‘রীহ’। এই বাতাস আযাব হিসাবে আসে। বজ্রকঠিন ও একে অন্যের সাথে লাগোয়া। অনেক বেশি জমাটবাঁধা, ঘনীভূত ও সঙ্ঘত; কেমন যেন একটাই মাত্র বাতাস থাকে। এমন উদাহরন আছে বিভিন্ন সূরা ও আয়াতে। যেমনঃ  ৩:১১৭, ১৪:১৮, ১৭:৬৯, ২২:৩১, ৩০:৫১, ৩৩:৯, ৪২:৩৩, ৪৬:২৪ সাধারনভাবে একবচন ও বহুবচন নেকই ধরনের অর্থ প্রকাশ করলেও আল কুরআন এখানে বহুবচনে নিয়ামত ও একবচনে আযাব প্রকাশ করেছে।    



১৭  তম সূরাটা হলো সূরা বানী ইসরঈল। এর শেষ আয়াতে বলা হলো; "বলো সকল  প্রশংসা  আল্লাহর জন্য..." আর সূরা আল কাহাফ (১৮ তম সূরা) শুরু করা হলো এভাবে, "সকল   প্রশংসা আল্লাহর জন্য..." । আগের সূরা বানী ইসরঈল এর শুরু হয়েছে মুহাম্মাদ  (সঃ) আল্লাহর হেদায়াত বানী  পেতে ও সান্নিধ্য অর্জন করতে উর্ধ গমন করেছেন  সেই ঘটনা দিয়ে। অর্থাৎ  মুহাম্মাদ (সঃ) হেদায়াত নিতে আল্লাহর কাছে গিয়েছেন।  আর এই সূরা অর্থাৎ সূরা আল কাহাফ শুরু হয়েছে  আল্লাহ মুহাম্মাদ (সঃ) এর কাছে হেদায়াত বানী পাঠিয়েছেন অর্থাৎ হেদায়াত  মুহাম্মাদ (সঃ) এর কাছে এসেছে এই কথা দিয়ে। এক সূরার পর আরেক সূরার  প্লেসমেন্ট যে এতটা নিখুত তা আগে বুঝতে পারতাম না।         

১৭ তম সূরা  বানী ইসরঈল ও ১৮ তম সূরা আল কাহাফ এর ১ম ও শেষ আয়াতে সুন্দর ছন্দ বিদ্যমান।  এখানে সুবহানল্লহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লহ ও আল্লহু আকবার এই ৪  টি কালিমার সুন্দর ছন্দময়, চক্রাকার ব্যবহার (সরাসরি ও অর্থগত মিল) রয়েছে।   

   

 

উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)