১১২। সূরা আল ইখলাস (বিশুদ্ধ/খাটি)
মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত সংখ্যা ৪
বর্ননাঃ সূরার শুরুতেই ১ম আয়াতে ‘বলো’ শব্দটির মাধ্যমে আল্লাহ এই কথার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছেন। একজন বললে সাধারনত অন্য কেউ শোনে তাই ‘বলো’ বলার পর পরের কথাটি/কথাগুলো প্রচার করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ নিজেও শুনতে হবে, বলতে হবে, অন্যকেও বলে দিতে হবে এই গুরুত্বপূর্ন কথাগুলো।
এছাড়া কেউ কেউ আল্লাহ কে? কেমন? তিনি কি? এইসব প্রশ্ন করছিল। ‘বলো’ বলার মাধ্যমে এই প্রশ্নগুলোর জবাবও আল্লাহ দিয়ে দিচ্ছেন। এই জবাব আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে এজন্য ‘বলো’ বলাটা পারফেক্ট হয়েছে। এটি এমন নয় যে আমি আপনি চিন্তা ভাবনা করে এই কথাগুলো বের করতে পারবো বরং এর জ্ঞান রাখেন একমাত্র আল্লাহ যিনিই এই বাক্যগুলো শেখাচ্ছেন।
‘হুয়া’ অর্থ সে/তিনি যা একটা সর্বনাম। সাধারনত আগে বিশেষ্য ব্যবহৃত হয়ে পরে সেই বিশেষ্য এর পরিবর্তে সর্বনাম ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এখানে আল্লাহ এখানে শুরুতেই আল্লাহর নাম না নিয়ে সর্বনাম ব্যবহার করেছেন; এমন যে তাঁর (আল্লাহর) কথাই বলা হচ্ছে এটা নিশ্চিত।
‘আহাদ’ বলতে বুঝায় আল্লাহ অনেকের মধ্যে একজন নন বরং এককভাবে একমাত্র একজনই।
এই আহাদ শব্দটি আল্লাহর একত্ববাদ প্রকাশের মূল শব্দ। আল্লাহর অন্য অনেক নাম আল কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় বর্নিত হলেও মূল তাওহীদের ভিত্তিমূলক নাম এই আহাদ।
২য় আয়াতে বুঝানো হয়েছে যেঃ আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন বরং অন্য সবাই ও সব কিছু আল্লাহর মুখাপেক্ষী। অন্য সকল সৃষ্টি অন্য কারো না কারো, বা কোন না কোন কিছুর উপর নির্ভর করে, কিন্তু আল্লাহই একমাত্র সত্ত্বা যিনি কারো উপর নির্ভর করেন না, তাঁর কাউকে দরকার হয় না; একাই স্বয়ংসম্পূর্ন।
এর মাধ্যমে আরো বোঝা যাচ্ছে যে, আল্লাহ উত্তরাধিকার সূত্রে কিছু পাননি (যেমন একজন সন্তান জন্মগ্রহন করে পায়) এবং তিনি কোন ওয়ারিশ ও রাখেন না (যেমন মানুষ সন্তান জন্ম দিয়ে ওয়ারিশ রেখে যায়)
৪র্থ আয়াতের মূল বক্তব্য হলোঃ আল্লাহর সাথে কারো বা কোন কিছুর তুলনা চলে না। আল্লাহর সমতূল্য কোন ব্যক্তি বা বস্তু নাই। ‘কুফু’ বলা হয় যাদের মধ্যে সামঞ্জস্য/জুটি থাকে, যেমন যুদ্ধে ২ প্রতিপক্ষ/বর কনে। কোন ব্যক্তি বা বস্তুর সাথে অন্য কোন ব্যক্তি বা বস্তুর তুলনা করা গেলে অবশ্যই তা/তিনি আল্লাহ নয়। অর্থাৎ দুটি ব্যক্তি বা বস্তুর দিকে আঙ্গুল তুলে মিল খুজে দেখানো গেলে বা আয়নার মত একই রকম বিম্ব খুজে পাওয়া গেলে সে/সেই বস্তু আল্লাহ হবে না। আল্লাহ সম্পুর্ন আলাদা, স্বতন্ত্র। এখানে বাক্যের গঠন টা একটু ব্যতিক্রম। সাধারন ব্যকরণের নিয়ম অনুসারে হওয়া উচিৎ ছিল ‘ওয়া লাম ইয়াকুন আহাদুন কুফুওয়ান লাহু’ এভাবে। কিন্তু আল্লাহ লাহু শব্দটি আগে নিয়ে এসে বিশেষভাব প্রকাশ করেছেন। যখন বিশেষভাবে শুধুমাত্র অর্থে ব্যবহার করা হয় তখন এভাবে শব্দের স্থান পরিবর্তন হয়। অর্থাৎ শুধুমাত্র তাঁর ক্ষেত্রেই সমকক্ষ নেই।
সূরার সব বাক্যই ‘দাল’ এর মাধ্যমে মাধ্যমে শেষ হয়ে এক সুন্দর কাব্যিক মূর্ছনা সৃষ্টি করেছে। এটি যেমন শুনতে মধুর তেমনি হৃদয়ে সহজে গেঁথে যায়, মুখস্ত হয়।
এই সূরায় ইখলাস (যার অর্থ বিশুদ্ধ/খাটি) শব্দটি না আসলেও তাওহীদের মূল, বিশুদ্ধ বক্তব্য ও আল্লাহর আসল পরিচয় অল্প কথার মাধ্যমে এখানে এসে গেছে। এই সূরাকে Touch stone of theology বলা যায় যার মানে ধর্মতত্ত্বের পরশপাথর। কেউ বা কোন বস্তু যদি নিজেকে খোদা/রব/ইলাহ দাবী করে বা তাঁকে দাবী করা হয় তাহলে এই সূরা দ্বারা তাকে/সে বিষয়টিকে পরীক্ষা করা যায়। এই Touch stone of theology তে উত্তীর্ন হলেই তবে তাঁকে খোদা/রব/ইলাহ মানা যাবে। আল্লাহ ছাড়া আসলে এই পরীক্ষায় কেউই উত্তীর্ন হতে পারে না।
বিশেষ বিষয়ঃ আল কুরআন এর বিষয়বস্তুকে মূলত ৩ টি ভাগে ভাগ করা যায়। ১। তাওহীদ, ২। রিসালাত, ৩। আখিরাত সূরা ইখলাস তাওহীদ এর মূল ধারনা প্রদান করে বিধায় এই সূরাকে আল কুরআনের ১/৩ (এক তৃতীয়াংশ) বলা হয়।
আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ আগের (১১০ তম) সূরা আন নাসর এ বিজয় লাভ ও (১১১ তম) সূরা লাহাব (goo.gl/oSnGwU) এ শত্রুর পরাজয়ের পর পরই আসলে মুল লক্ষ্যের দিকে ফোকাস করতে হয়। এমনটিই করেছেন আল্লাহ । তাওহীদের মুল বক্তব্য তুলে ধরছেন এই (১১২ নং) সূরা আল ইখলাসে। এই তাওহীদের কারনেই মুল দ্বন্দ্ব হয়েছিলো ২টি পক্ষের মধ্যে এবং তা আজীবন চলতে থাকবে।
আগের সূরা লাহাবের শেষ আয়াতের শেষ অক্ষর ‘মাসাদ’ এর সাথে এই সূরা আল ইখলাসের ১ম আয়াতের শেষ অক্ষর ‘আহাদ’ এর ছন্দের মিল রয়েছে। এ যেন এক কাব্যিক কন্টিনিউএশন।
সূরা লাহাবে বর্নিত শত্রুর পরাজয়ের পর পরই আসলে মুল লক্ষ্যের দিকে ফোকাস করতে হয় এবং তাওহীদের শক্ত ভিত্তি দাড় করাতে হয় তার নমুনা আল্লাহ সূরা ইখলাসে দিয়ে দিয়েছেন। এভাবে ভাবগত, ছন্দ ও কাব্যিক মিলের মাধ্যমে দুটি সূরার সম্পর্ক আরো জোরালো হয়েছে।
পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ এই সূরা (১১২ তম) আল ইখলাস এর মূল বিষয় হলো তাওহীদ ও আল্লাহর পরিচয়। সূরা আল ইখলাসে তাওহীদ ও ইসলামের মূলবিষয়বস্তু কে বর্ননা ও প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে এবং পরের ২ সূরায় (১১৩ তম সূরা আল ফালাক ও ১১৪ তম সূরা আন নাস) তা বজায় রাখা ও সমুন্নত রাখার জন্য প্রতিরক্ষা কবচ হিসাবে অবতীর্ন হয়েছে। অর্থাৎ সূরা আল ইখলাস হলো দ্বীন/তাওহীদের মূল বিষয়বস্তু। সূরা আল ফালাক হলো তার বাহ্যিক রক্ষাকবচ এবং সূরা আন নাস হলো তার আভ্যন্তরীণ রক্ষাকবচ।
এই সূরা আল ইখলাসে আল্লাহ কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি বিষয়টি এসেছে এবং পরের ১১৩ তম সূরা আল ফালাক (goo.gl/c51SHJ) এ আল্লাহর সৃষ্টি করার বিষয়টি এসেছে। তিনিই সব সৃষ্টির মূল কারিগর এজন্য তাঁকে জন্ম দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
সূরা ইখলাসে আল্লহকে ‘সমাদ’ (অমুখাপেক্ষী) হিসাবে বর্ননা করা হয়েছে। তিনি কারো কাছে কিছু চান না বরং সবাই তার কাছে desperate ভাবে চায়। এর প্র্যাকটিকাল প্রমান হিসাবে পরের ২ টা সূরায় (১১৩ তম সূরা আল ফালাক ও ১১৪ তম সূরা আন নাস) তার কাছে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে, আমাদের মুখাপেক্ষিতার প্রমান দেওয়া হয়েছে।







মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন