৭। সূরা আল আরাফ
সূরার সারসংক্ষেপঃ
আয়াত ১১ এর ১ম অংশ তে বর্নিত আছে যে, আদম (আঃ) কে আল্লাহ সুন্দরভাবে সৃষ্টি করে আকৃতি দিয়ে তাঁকে মর্যাদাবান করেছেন। সাথে সাথে ফেরেশতাদের সিজদা করতে বললে তারা সিজদা করে।
কিন্তু ইবলিশ বাদে। সে কেন আদম (আঃ) কে সিজদা করে নি? আয়াত ১২ তে আল্লাহ শয়তানের কথাকেই সরাসরি quote করেছেন। এই আয়াত হতে বোঝা যায় যে, ইবলিশ মূলত অহংকার এবং হিংসা করেছিলো।১৪ নং আয়াত এ বর্নিত শয়তান এর প্রার্থনার পর ১৫ নং আয়াতে আল্লাহ তাঁকে মরন বা ধ্বংস না দিয়ে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত বেঁচে থাকার অবকাশ দিলেন। মানুষকে কুমন্ত্রনা দেয়ার ক্ষমতাও বহাল রাখলেন এবং এর মাধ্যমে তিনি আমাদের (মানুষদের) পরীক্ষা করারও একটি পদ্ধতি রেখে দিলেন।
১৭ নং আয়াতে শয়তান সব দিক দিয়ে আক্রমনের কথা বললেও উপর দিকের কথা বলেনি; কারন উপর দিক থেকে আসে আল্লাহর সাহায্য। তাই উপর থেকে আসা আল্লাহর কিতাব ও শিখিয়ে দেয়া দোয়ার সাহায্যে শয়তানের মুকাবেলা করতে হবে।
আয়াত ২২ তে আল্লাহ বলছেনঃ এভাবে সে তাদের দুজনকে ধীরে ধীরে প্ররোচিত করলো।সূরার ২৩ আয়াতে রব্বানা শব্দটি এসেছে। ‘রব্বি’ ও ‘রব্বানা’ শব্দটি মূলত দুটি করে শব্দ। ‘ইয়া রব্বি’ ও ‘ইয়া রব্বানা’। কিন্তু ‘ইয়া’ বা ‘হে’ শব্দটি আল্লাহর ক্ষেত্রে বিলুপ্ত করে ব্যবহার করা হয়। আল্লাহ আমাদের খুবই কাছের, আপন বিধায় দূরবর্তি সংক্রান্ত শব্দ ‘হে’ বাদ দিয়ে শুধু রব্বি বা রব্বানা বলা হয়। সুবহানাল্লহ!
সবুজ শব্দটি কুরআনে এসেছে ৮ বার। জান্নাতের দরজা ৮ টি। জান্নাতের সাথে সবুজ শব্দটি সবচেয়ে সম্পর্কিত। আল কুরআনের সূরা আনআম, ইউসুফ, কাহাফ, হজ্জ, ইয়াসীন, রহমান, দাহরে এসেছে সবুজ শব্দটি। কালো শব্দটি কুরআনে এসেছে ৭ বার। জাহান্নামের দরজা ৭ টি। জাহান্নামের সাথে কালো শব্দটি সবচেয়ে সম্পর্কিত। আল কুরআনের সূরা বাকারা, আলে ইমরান, নাহল, ফাতির, জুমার, জুখরুফ এ এসেছে কালো শব্দটি।
অর্থাৎ জান্নাত ও জাহান্নামের দরজা মোট ১৫ টি। আল কুরআনে দরজা শব্দটির বহুবচনঃ দরজাসমূহও এসেছে ১৫ বার। এগুলো এসেছে বাকারা, আনআম, আরাফ, ইউসুফ, হিজর, নাহল, সোয়াদ, জুমার, মুমিন, জুখরুফ, কমার, নাবা তে। মজার ব্যাপার হলো, ৭ম বারে আসা দরজা শব্দটির আয়াতটি জাহান্নামের দরজা সম্পর্কিত এবং ৮ম বারে আসা দরজা শব্দটির আয়াতটি জান্নাতের দরজা সম্পর্কিত। কি দারুন মিল!
আয়াত ৪৪ অনুযায়ী, জান্নাতে গিয়ে জান্নাতিরা জাহান্নামিদের উদ্দেশ্য করে বলবে আমাদের রব আমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা সত্য, তোমাদের রব যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা কি সত্য পেয়েছ? এখানে লক্ষণীয় যে, জান্নাতিরা কিছুটা ব্যঙ্গ করে বা উপহাস করে জাহান্নামীদের এ কথা বলবে। হতে পারে দুনিয়ায় যারা মুমিনদের ব্যঙ্গ করে বা উপহাস করে কথা বলতো জান্নাতে গিয়ে সেই মুমিনরাই সেই অপরাধিদের এমন প্রশ্ন করবে।
আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য তা হল, এখানে রব জান্নাতিদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বর্ননা করতে গিয়ে জান্নাতিরা বলবে, আমাদের রব আমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, অন্যদিকে জাহান্নামীদের বেলায় তোমাদের রব তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন না বলে বলবে, তোমাদের রব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, অর্থাৎ আল্লাহ চান না কাউকে জাহান্নামে পাঠাতে এজন্য তিনি নির্দিষ্ট করে কাউকে জাহান্নামের প্রতিশ্রুতিও দেন না। আবার জাহান্নামে গেলে তাদের নাম বা তাদের উল্লেখ ও তিনি করতে চান না, সেই হিসাবেও তাদেরকে বর্ননা করা থেকে বিরত থাকা হয়েছে।
অবাক করা বিষয় হল চাঁদ পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতে ২৭ দিন সময় লাগে। তবে এই সময়ে পৃথিবী আবার সূর্যকে কেন্দ্র করে ২ দিন এগিয়ে যায়। এজন্য চাঁদকে আরও দুদিন বেশি ঘুরতে হয় এজন্য চন্দ্র মাস ২৯ দিনে হয়।
আল কুরআনের আলোকে ২ ধরনের বাতাসের পার্থক্যঃ বহুবচনের বাতাস ‘রিয়াহ’ এই বাতাস নিয়ামত হিসাবে আসে। হেলেদুলে প্রবাহিত হয়, কখনও এদিক থেকে কখনও ওদিক থেকে বিক্ষিপ্তাকারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বইতে থাকে; কেমন যেন সেখানে অনেকগুলো বাতাস থাকে । এমন উদাহরন আছে বিভিন্ন সূরা ও আয়াতে। যেমনঃ ২:১৬৪, ৭:৫৭, ১৫:২২, ১৮:৪৫, ২৫:৪৮, ২৭:৬৩, ৩০:৪৬, ৩৫:০৯, ৪৫:০৫
অপরদিকে এক বচনের বাতাস ‘রীহ’। এই বাতাস আযাব হিসাবে আসে। বজ্রকঠিন ও একে অন্যের সাথে লাগোয়া। অনেক বেশি জমাটবাঁধা, ঘনীভূত ও সঙ্ঘত; কেমন যেন একটাই মাত্র তাবাস থাকে। এমন উদাহরন আছে বিভিন্ন সূরা ও আয়াতে। যেমনঃ ৩:১১৭, ১৪:১৮, ১৭:৬৯, ২২:৩১, ৩০:৫১, ৩৩:৯, ৪২:৩৩, ৪৬:২৪ সাধারনভাবে একবচন ও বহুবচন নেকই ধরনের অর্থ প্রকাশ করলেও আল কুরআন এখানে বহুবচনে নিয়ামত ও একবচনে আযাব প্রকাশ করেছে।
সূরা আল আরাফ এর ৬০ নং আয়াতটি নুহ (আ) সম্পর্কে বলা হয়েছে। তিনি অনেক বছর ধরে দাওয়াত দিলেও তার সম্প্রদায়ের সকল সর্দাররাই তার বিরোধিতা করে। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে তার পরীক্ষা অপেক্ষাকৃত বেশি কঠিন ছিল। আল্লাহর বর্ননার perfectness বোঝা যায় যেহেতু তারা সকলেই এতে যুক্ত ছিল তাই সকলকেই তিনি অন্তর্ভুক্ত করে বর্ননা করেছেন।
অন্যদিকে ৬৬ নং আয়াতটি হুদ (আ) সম্পর্কে বলা হয়েছে। তিনি দাওয়াত দিলে তা সম্প্রদায়ের শুধু কুফরি করা সর্দাররা তার বিরোধিতা করে। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে তার পরীক্ষা অপেক্ষাকৃত কম কঠিন ছিল। আল্লাহর বর্ননার perfectness বোঝা যায় যেহেতু তারা কিছু নির্দিষ্ট মানুষ এতে যুক্ত ছিল তাই শুধু তাদেরকেই তিনি অন্তর্ভুক্ত করে বর্ননা করেছেন।
অন্যদিকে সূরা আন নাজম, আয়াত ৫২; এই আয়াতটিতে নুহ (আ) এর সম্প্রদায়ের সম্পর্কে বলা হয়েছে। তারা অন্য নবীর সম্প্রদায়ের চাইতে বেশি জালিম ও অবাধ্য।
অর্থাৎ নুহ (আ) তার সম্প্রদায়কে অনেক বছর ধরে দাওয়াত দিলেও তারা বিরোধিতা করেছে বেশি সংখ্যায়, বেশি ব্যাপ্তিতে, বেশি তীব্রতায়।
মূসা আলাইহিস সালাম-এর লাঠি সাপ হয়ে যাওয়া বিষয়ক যে আয়াতগুলো আছে, সেগুলোর দিকে তাকালে দেখবেন সাপের জন্য কোথাও হাইয়াতুন (حية) আর কোথাও সু’বানুন (ثعبان) শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু বাংলা অনুবাদ খুলে দেখুন সবখানে ‘সাপ’ লেখা আছে। সাপের আরবী শব্দ ব্যবহারের ভিন্নতার কারণে অর্থ ও মর্মতে যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে অনুবাদে সেটা প্রকাশিত হয়নি।১৭৮ নং আয়াতে হিদায়াত প্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক কম ও আল্লাহর প্রিয় বিধায় একবচনে ও নিকটবর্তি সর্বনামে (সে) উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে পথভ্রষ্ট মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি ও আল্লাহর অপ্রিয় বিধায় বহুবচনে ও দূরবর্তি সর্বনামে (ওরা) উল্লেখ করা হয়েছে। কি বিজ্ঞতাপূর্ন ভাষা, শব্দের ব্যবহার!

















মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন