৬। সূরা আল আনআম

৬ নং সূরা আন আনফাল আয়াত ৩৩ একই আয়াতে দুই ধরনের স্থায়িত্ব। তুমি তাদের মাঝে থাকা অবস্থায় আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দিবেন না এবং এবং তারা ক্ষমা প্রার্থনারত থাকবে সে অবস্থায় আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দিবেন না। 

আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সঃ) তাদের মাঝে বেঁচে থাকা অবস্থাটি সাময়িক; তাই এখানে শাস্তি দেয়ার বিষয়টিতে অস্থায়ী ক্রিয়াবাচক শব্দ لِيُعَذِّبَهُمۡ দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে। 

ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে যা মুটামুটি স্থায়ী একটি সুযোগ তাই এখানে শাস্তি দেয়ার বিষয়টিতে স্থায়ী বিশেষ্যবাচক শব্দ مُعَذِّبَهُمۡ দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে।  অন্যদিকে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টিকে স্থায়ী বিশেষ্যবাচক শব্দ দিয়ে ব্যবহার না করে অস্থায়ী ক্রিয়াবাচক শব্দ يَسۡتَغۡفِرُوۡنَ‏  দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থাৎ সারাক্ষন তাওবা না করে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় কিছু তাওবা করলেই ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য হবার সূবর্ন সুযোগ আল্লাহ দিয়েছেন।   

গাছ থেকে ঝরা পাতার হিসাবও আল্লাহ রাখেন! 

কত অসংখ্য পাতা পড়ছে এটার হিসাব মেইনটেইন করা কত কঠিন। আল্লাহ আমাদের কাছে নগন্য অপ্রয়োজনীয় বিষয়ের ও হিসাব রাখেন। যেহেতু তিনি এটি করছেন তাই আমাদের কৃতকর্মের চুলচেরা হিসাব রাখাও তার পক্ষে সম্ভব ও সেটাই যৌক্তিক!

চাঁদ (কমার) শব্দটি আল কুরআনে এসেছে ২৭ বার (৬ঃ৭৭, ৬ঃ৯৬, ৭ঃ৫৪, ১০ঃ৫, ১২ঃ৪, ১৩ঃ২, ১৪ঃ৩৩, ১৬ঃ১২, ২১ঃ৩৩, ২২ঃ১৮, ২৫ঃ৬১, ২৯ঃ৬১, ৩১ঃ২৯,৩৫ঃ১৩, ৩৬ঃ৩৯, ৩৬ঃ৪০, ৩৯ঃ৫, ৪১ঃ৩৭, ৫৪ঃ১, ৫৫ঃ৫, ৭১ঃ১৬, ৭৪ঃ৩২, ৭৫ঃ৮, ৭৫ঃ৯, ৮৪ঃ১৮, ৯১ঃ২)। 

অবাক করা বিষয় হল চাঁদ পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতে ২৭ দিন সময় লাগে। তবে এই সময়ে পৃথিবী আবার সূর্যকে কেন্দ্র করে ২ দিন এগিয়ে যায়। এজন্য চাঁদকে আরও দুদিন বেশি ঘুরতে হয় এজন্য চন্দ্র মাস ২৯ দিনে হয়। 

৬ নং সূরা আনআম, আয়াত ৭৮ তে ইবরাহীম (আ.) এর শিরকের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ এর বিষয়টি  ‘বারিউন’ শব্দের মাধ্যমে সাধারন সম্পর্কচ্ছেদ বোঝানো হয়েছে। তার এই কথাটি নবী হওয়ার আগের বক্তব্য। এই বক্তব্য তে ‘ইন্নি’ শব্দের মাধ্যমে সাধারন নিশ্চয়তা প্রকাশিত হয়েছে। 
অন্যদিকে ৪৩ নং সূরা যুখরুফ, আয়াত ২৬ তে শিরকের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ এর বিষয়টি ‘বারউন’ শব্দের মাধ্যমে উচ্চমাত্রার, চূড়ান্ত সম্পর্কচ্ছেদ বোঝানো হয়েছে। তার এই কথাটি নবী হওয়ার পরের বক্তব্য। এই বক্তব্য তে ‘ইন্নানি’ শব্দের মাধ্যমে উচ্চমাত্রার নিশ্চয়তা প্রকাশিত হয়েছে। 

সবুজ শব্দটি কুরআনে এসেছে ৮ বার। জান্নাতের দরজা ৮ টি। জান্নাতের সাথে সবুজ শব্দটি সবচেয়ে সম্পর্কিত। আল কুরআনের সূরা আনআম, ইউসুফ, কাহাফ, হজ্জ, ইয়াসীন, রহমান, দাহরে এসেছে সবুজ শব্দটি। কালো শব্দটি কুরআনে এসেছে ৭ বার। জাহান্নামের দরজা ৭ টি। জাহান্নামের সাথে কালো শব্দটি সবচেয়ে সম্পর্কিত। আল কুরআনের সূরা বাকারা, আলে ইমরান, নাহল, ফাতির, জুমার, জুখরুফ এ এসেছে কালো শব্দটি।

অর্থাৎ জান্নাত ও জাহান্নামের দরজা মোট ১৫ টি। আল কুরআনে দরজা শব্দটির বহুবচনঃ দরজাসমূহও এসেছে ১৫ বার। এগুলো এসেছে বাকারা, আনআম, আরাফ, ইউসুফ, হিজর, নাহল, সোয়াদ, জুমার, মুমিন, জুখরুফ, কমার, নাবা তে। মজার ব্যাপার হলো, ৭ম বারে আসা দরজা শব্দটির আয়াতটি জাহান্নামের দরজা সম্পর্কিত এবং ৮ম বারে আসা দরজা শব্দটির আয়াতটি জান্নাতের দরজা সম্পর্কিত। কি দারুন মিল!    

প্রায় একই ধরনের বাক্যের ভিন্ন রকম সূক্ষ্ম পার্থক্য ও সৌন্দর্য্যঃ ৬ নং সূরা আল আনআম এর আয়াত ১৩১ তে ‘লাম ইয়াকুন’ শব্দটি সাধারনভাবে ব্যবহৃত হয়। এটি বিচার দিবসের সাধারন ঘটনাকে প্রকাশ করেছে। ধ্বংস করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত শব্দটি ‘মুহলিক’ যা বিশেষ্য; এটি স্থায়ীবাচক শব্দ। আখিরাত দিবসে ধ্বংস একটি চুড়ান্ত বিষয়। 

অন্যদিকে ১১ নং সূরা হুদ, আয়াত ১১৭ এ ‘ওমা কানা’ শব্দটি বিতর্কের জবাবে ব্যবহৃত হয়। এটি কাফিরদের মিথ্যা দাবীকে নাকচ প্রকাশ পেয়েছে।  ধ্বংস করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত শব্দটি ‘ইহলিক’ যা ক্রিয়া; এটি অস্থায়ীবাচক শব্দ। দুনিয়ায় শুধরে নেয়ার সুযোগ থাকায় ধ্বংস চুড়ান্ত বিষয় নয়। 

মা বাবার সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘ইহসান’ শব্দটি ব্যবহার করে হয়েছে প্রায় সব ক্ষেত্রেই তবে একটি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে ‘হুসন’ শব্দটি। আরবীতে শব্দের ক্ষেত্রে একই ধরনের শব্দে বর্ণ সংখ্যা বেশি হলে তার অর্থতেও সেই প্রভাব পড়ে, বেশি বর্ণ মানে বেশি প্রকট অর্থ বুঝায়। স্বাভাবিকভাবে ২:৮৩, ৪:৩৬, ৬:১৫১, ১৭:২৩, ৪৬:১৫ আয়াতগুলোতে নেককার মা বাবা হওয়ায় তাদের প্রতি ইহসান বা সর্বোচ্চ সুন্দর ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ। অন্যদিকে ২৯:৮৮ আয়াতে সর্বোচ্চ সুন্দর ব্যবহারের চেয়ে কম মাত্রার অর্থবহ ‘হুসন’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে সেই সকল মা বাবার প্রতি যারা শিরক করার জন্য চাপ দেয়। আল্লাহর শব্দ ব্যবহার কত যুক্তিপূর্ণ ও নিখুঁত!  

আল্লাহ আল কুরআন এ বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন যেন তোমরা হতে পারো (লাআল্লাকুম)। এটা বলার মাধ্যমে তিনি মানুষের কাঙ্খিত মূল গুণাবলীগুলোর পরিচয় দিয়েছে। তিনি বলেছেন যেন তোমরা মুত্তাকী (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ২১, ১৮৩), কৃতজ্ঞ (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ৫২, ১৬ তম সূরা নাহল, আয়াত ৭৮), সঠিক পথপ্রাপ্ত (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ৫৩, ৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৩), চিন্তা ভাবনাকারী (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ২১৯, ২৬৬), বিচক্ষণ (১২ সূরা ইউসুফ, আয়াত ২, ৪৩ তম সূরা জুখরুফ, আয়াত ৩), সফল (৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩০, ২২ তম সূরা হজ্জ, আয়াত ৭৭), উপদেশ গ্রহণকারী  (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ২২১, ১৬ তম সূরা নাহল, আয়াত ৯০), দয়া ও রহমতপ্রাপ্ত  (৬ষ্ঠ সূরা আনআম, আয়াত ১৫৫, ২৪ তম সূরা নুর, আয়াত ৫৬), 

আমাদের সেগুলো অর্জনের চেষ্টা করতে হবে।

আমাদের জীবনের সব কিছুই মূলত আল্লাহর জন্য। নিজের জীবনের সকল ইচ্ছা, কাজ (খাওয়া, পড়াশোনা, খেলাধুলা, আদর করা ও সম্মান করা এমনকি ঘুমানোও) ও সামর্থসহ সব কিছু আল্লাহর জন্য সপে দেওয়াই প্রকৃত বান্দাহ ও গোলামের লক্ষন। তাই আল্লাহর গোলাম হিসাবে স্বীকৃতির জন্য সাধারনত এই আয়াতটিই ব্যবহার করা হয়। কি সুন্দর আল কুরআনের এই আয়াতটি!!!  ﴿قُلۡ اِنَّ صَلَاتِىۡ وَنُسُكِىۡ وَمَحۡيَاىَ وَمَمَاتِىۡ لِلّٰهِ رَبِّ الۡعٰلَمِيۡنَۙ﴾  বলো, আমার নামায, আমার ইবাদাতের সমস্ত অনুষ্ঠান, আমার জীবন ও মৃত্যু  সবকিছুই আল্লাহ‌ রব্বুল আলামীনের জন্য  সূরা আল আনয়াম, আয়াত ১৬২ 




উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)