৯২। সূরা আল লাইল (রাত)
সারসংক্ষেপ: এখানে ১ম আয়াতে রাতের কথা বলা হয়েছে যা ঢেকে দেয়। এখানে রাত কোন জিনিসকে ঢেকে দেয় সেটা বলা হয়নি, অর্থাৎ আল্লাহ মানুষকে চিন্তা করে বের করার আমন্ত্রন জানিয়েছেন। রাতকে জাহেলিয়াতের সাথেও তুলনা করা যায়। যা আস্তে আস্তে ঈমানকে ঢেকে দিতে পারে।
২য় আয়াতে রাতের অন্ধকার দূরে ঠেলে অল্প সময়ের মধ্যেই দিনের উদ্ভাসির হবার বিষয়টি উঠে এসেছে। দীর্ঘ ও ধীরে ধীরে ঘনীভূত হওয়া রাতের পর হঠাৎই দিনের আলো সব কিছুকে আলোকিত করে তোলে। ঈমানের আলো তেমনি জাহেলিয়াতের অন্ধকারকে দূরীভূত করে।এরপরের আয়াত ৩ এ পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ এর কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ সব ধরনের সৃষ্টির জোড়ার কথা এখানে বলা হয়েছে। এদের মধ্যে কিছু পার্থক্য ও বিপরীতধর্মীতা থাকলেও একে অপরের প্রয়োজন পূরন করে পূর্নতা পায়, একটি বৃহৎ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়।
এই ৩ আয়াতে শপথ করার পর আল্লাহ ৪র্থ আয়াতে মূল বিষয়টি বলেছেন। মানুষ নানা ধরনের কাজ ও চেষ্টা করে থাকে। দিন, রাত; নারী-পুরুষ যেমন আলাদা, বৈচিত্রময় তেমনি মানুষের কাজ ও আলাদা, বৈচিত্রময়। কিন্তু কোন কাজগুলো ভাল ও কোনগুলো খারাপ সেটা আল্লাহ বলেছেন কিছু পরেই।
৫ম আয়াতে ‘আ’ত-’ মানে অধিক পরিমানে দেয়া। অনেক দেয়ার কথা বলা হয়েছে; কি দেয়া হচ্ছে, কাকে দেয়া হচ্ছে সেটা বলা হয়নি। অর্থাৎ যে দেয়ার কাজে লিপ্ত থাকে যাই হোক (হতে পারে সময়, শ্রম, মেধা ইত্যাদি), যাকেই হোক। সে মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল। সেই সাথে সে তার স্রষ্টার প্রতিও অনুগত। সুতরাং সে হাক্কুলাহ ও হাক্কুল ইবাদ ২ বিষয়েই ভাল।
সে অনেক বেশি দান করে কারন সে এটাকে নিজের নয় বরং আল্লাহর মনে করে এবং ভালো ইনভেস্টমেন্ট মনে করে। তাই বিনা দ্বিধায় দান করে। বিনিয়োগের অনেক অপশন আছে; মানুষ এগুলোর রিস্ক, লাভ, রিটার্ণ বিবেচনা করে। বিবেচনার পর ব্যবসা, জমি, বাড়ি, গাড়ি বা অন্য কিছু বেছে নেয়। দানে বিনিয়োগ রিস্ক ফ্রি এবং আছে বেস্ট লাভ ও রিটার্ণ এই বিষয়টি যারা বিশ্বাস করেন তারাই প্রচুর দান করতে পারেন।৬ষ্ঠ আয়াতে বলা হয়েছে সে ভালোকে সত্য হিসাবে মেনে নিয়েছে। যখন ভালো তার কাছে এসেছে, সে সেটাকে সহজেই মেনে নিয়েছে, কোন প্রকার অহংকার না করেই।
এই ২ (৫ম ও ৬ষ্ঠ) আয়াতের কারনে আল্লাহ অতি দ্রুত সহজতর পথ ও কাজকে তার জন্য সহজ করে দিবেন। ভাল কাজ করা ও ভাল পথ স্বাভাবিক ভাবে সহজ। গুনাহ এর কাজ করা কঠিন। আল্লাহ ভালো মানুষদের এই ভালো কাজ করার সহজ বিষয়টিকে আরো সহজ করে দেন।
অন্যদিকে ৮ম আয়াতে বিপরীত ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে। সেই ব্যক্তি দান করে না, কৃপন; কারন সে মনে করে সব ধন সম্পদ তার নিজের জন্যই দরকার। এজন্য সে নিজেকে বড় মনে করে, অন্য কারো সাহায্য প্রয়োজন নেই বলে মনে করে এবং সে অহংকারী হয়ে ওঠে।
৯ম আয়াতে ফুটে উঠেছে সেই ব্যক্তির চুড়ান্ত হঠকারীতার কথা। সে ভালকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। একারনে আল্লাহ তাঁর প্রতিদান দেন যা খুবই ভয়াবহ। সেই ব্যক্তির জন্য কঠিন কাজটিই সহজ হয়ে যায়। মূলত খারাপ কাজ করা মানুষের স্বভাব বিরুদ্ধ। সেই কাজগুলোই তার জন্য সহজ হয়ে ওঠে। এই বিষয়টি ই ফুটে উঠেছে ১০ম আয়াতে। ১১ আয়াতে তাই জানানো হয়েছে, তার জমানো ধন সম্পদ কোন কাজে আসে না, তার পতন ঠেকাতে পারে না।
১২, ১৩ আয়াতে বলা হয়েছে হেদায়াত দেয়া অর্থাৎ সঠিক পথ দেখানোর দায়িত্ব এবং সেই পথের চুড়ান্ত পরিনতি আল্লাহর অধীনেই। ১৪-১৬ আয়াতে আল্লাহ ভয়ংকর আগুন সম্পর্কে অবহিত করেছেন। এই স্পেশাল টাইপের ভয়ংকর জ্বলন্ত আগুনে শুধুমাত্র তারাই জ্বলবে যারা হেদায়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে এবং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। অর্থাৎ তারা চরম হতভাগা, নিজেদেরকে সেই আগুনের যোগ্য করে তুলেছে।
সেই আগুন থেকে কাদের বাঁচিয়ে দেয়া হবে এবং তাদের পরিচয় দেয়া হয়েছে ১৭, ১৮ আয়াতে। তাদের বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে এই সূরারই ৫ নং আয়াতের রেশ ধরে।
মানুষ তার নিজ যোগ্যতা বলে এই নিয়ামত পাবে এমনটি নয় বরং এটি আল্লাহর করুনা ও বড়ত্ব যে তিনি মানুষকে এতটা দান করেন ও করবেন। মানুষের শুধু এতটুকু যোগ্যতা আছে যে সে মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টি কামনা করতে পারে। আর এরই প্রতিদান হিসাবে অবশ্যই আল্লাহ তাঁদের উপর সন্তুষ্ট হবেন। এই বিষয়গুলোই সুন্দরভাবে বর্ণনা করা হয়েছে শেষ কয়টি আয়াতে (আয়াত ১৯, ২০ এবং ২১) ।
আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ ৯১ তম সূরা আশ শামছ এর শুরুর দিকে দিনের প্রকাশ হওয়া ও রাতের ঢেকে যাওয়া বিষয়টা এসেছে। ৯২ তম সূরা আল লাইল এও প্রায় একই ভাবে বিষয়দুটি এসেছে একটু ভিন্নভাবে এবং বিপরিত সিকুয়েন্স/ধারাবাহিকতায়। ৯১ তম সূরায় দিনে সূর্যের প্রকাশ ও রাতে সূর্যের ঢেকে যাওয়ার কথা বর্নিত হয়েছে; অর্থাৎ সূর্য এখানে Object (বিধেয়) এবং প্রকাশ পাওয়া ও ঢেকে যাওয়া হলো Verb (ক্রিয়া)। সূরা আল লাইল এ প্রকাশ পাওয়া ও ঢেকে যাওয়া এর কথা বর্নিত হলেও Object (বিধেয়) হিসাবে সূর্যের নাম প্রকাশ করা হয়নি। এ যেন এমন যে আগের সূরায় যেহেতু এটা বলা হয়েছে তাই পরের সূরায় আর বলার প্রয়োজন নেই।
সূরা আশ শামছ এ আকাশ ও পৃথিবী এর কথা এসেছে কিন্তু পরের সূরায় পুরুষ ও নারীর কথা এসেছে। এই দুই ধরনের বিষয়ের মধ্যে বেশ মিল বিদ্যমান। আকাশ হতে বৃষ্টি আকারে পানি পড়ে এবং তার কারনে পৃথিবীতে জীবন (মানুষ ও গাছপালা) এর ধারা চলতে থাকে। অর্থাৎ আকাশ ও পৃথিবী একসাথে কাজ করে জীবন এর ধারাকে চালিয়ে নিয়ে যায়। তেমনিভাবে পুরুষ ও নারী একসাথে কাজ করে জীবন এর ধারাকে চালিয়ে নিয়ে যায়।
৯১ তম সূরায় 3rd person এ বিষয়গুলো বর্নিত হয়েছে এবং পরের সূরায় 2nd person এ বিষয়গুলো বর্নিত হয়েছে। অর্থাৎ সাধারন থেকে বিশেষভাবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে ভালোভাবে Address করার জন্য।
সূরা আশ শামছ এর ৯ নং আয়াতে নাফসের পরিশুদ্ধির কারনে সফলতার কথা বলা হয়েছে এবং পরের সূরা আল লাইল এ সেই পরিশুদ্ধি কারীদের বৈশিষ্ট্য ও ফলাফল বর্নিত হয়েছে (আয়াত ৫,৬,৭)। এই সূরার ১০ নং আয়াতে নাফসকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার সুফল ও না করার কারনে ব্যর্থতার কথা বলা হয়েছে এবং সূরা আল লাইল এ সেই সফলতা ও ব্যর্থতার কারন বিস্তারিতভাবে বর্নিত হয়েছে ৮,৯ ও ১০ নম্বর আয়াতে।
সূরা আশ শামছ এ অবাধ্যতা, বিদ্রোহ পতনের অন্যতম কারন হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে (আয়াত ১১) এবং পরের সূরায় অর্থ লোভ পতনের অন্যতম কারন হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে (আয়াত ১১)।
সূরা আশ শামছ এ আল্লাহর নিদর্শন (উটনী) থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে কিন্তু অপরাধীরা কাছে এসে তা লঙ্ঘন করেছে। আর পরের সূরায় আল্লাহর নিদর্শন (আল কুরআন/হেদায়াত) এর কাছে আসতে বলা হয়েছে কিন্তু অপরাধীরা দূরে চলে গিয়ে তা লঙ্ঘন করেছে।
৯১ তম সূরায় আল্লাহর নবী সামূদ জাতির অপরাধীদের সতর্ক করেছেন (আয়াত ১৩) আর পরের সূরায় আল্লাহ নিজেই মুহাম্মাদ (সঃ) ও তার পরবর্তি জাতিদের সতর্ক করেছেন (আয়াত ১৪)।
আশ শামছ এ হতভাগ্য ব্যাক্তির চরিত্র বর্নিত হয়েছে (আয়াত ১২) এবং দুনিয়ায় তার পরিনতির কথা বলা হয়েছে (আয়াত ১৪)। পরের সূরা আল লাইল এ হতভাগ্য ব্যাক্তির চরিত্র ও আখিরাতে পরিনতির কথা বর্নিত হয়েছে (আয়াত ১৫, ১৬)
৯১ তম সূরা আশ শামছ এর শেষে আল্লাহ শাস্তি দেওয়ার কথা বলেছেন ক্ষোভের সাথে (আয়াত ১৪,১৫) কিন্তু পরের সুরায় আল্লাহ শাস্তি থেকে দূরে রাখার ফলে বাঁচিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন সন্তুষ্টির সাথে (আয়াত ১৮)। অর্থাৎ এই সূরায় আল্লাহর Destructive attitude ও পরের সূরায় আল্লাহর Protective attitude প্রকাশিত হয়েছে।
সূরা আশ শামছ এ আল্লাহর শাস্তির ক্ষেত্রে পরিমান ও ভয়াবহতার কথা বলা হয়েছে (আয়াত ১৪) কিন্তু পরের সূরায় পুরষ্কারের ক্ষেত্রে কোন পরিমান এর কথা বলা হয়নি, অর্থাৎ মানুষ আসলে চিন্তাও করতে পারে না সেই পুরস্কারের পরিমানের কথা কারন আল্লাহ অশেষ পুরষ্কার দানকারী। অর্থাৎ এই সূরায় আল্লাহর Limited punishment ও পরের সূরায় আল্লাহর Unlimited reward এর কথা প্রকাশিত হয়েছে।
পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ সূরা আল লাইলে মূলত ভালো মানুষের একটি স্তর (সাহাবী) এর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পরের ২ টি সূরায় সরাসরি মুহাম্মাদ (স) এর কথা এসেছে। ৯৩ তম সূরা দুহায় মুহাম্মাদ (স) কে সান্তনা দেওয়া হয়েছে ও তাঁর প্রতি অনুগ্রহ বর্ননা করা হয়েছে এবং পরের সূরা আল ইনশিরাহ তে মুহাম্মাদ (স) কে সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। আল্লাহ ৯২-৯৪ এই ৩ সূরায় মানুষের ভালো থেকে ভালোর দিকে অর্থাৎ উচু থেকে উচু স্তরে ক্রমানুসারে উঠিয়েছেন (সাহাবী-নবী মুহাম্মাদ)। পরে আবার ৯৫-৯৬ তম সূরায় নিচু থেকে নিচু স্তরের মানুষদের বর্ননা এসেছে।










মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন