৬২। সূরা আল জুমুয়াহ (জমায়েত)
সূরার সারসংক্ষেপঃ ১১ টি আয়াতের মাদানী এই সূরাটি মূলত ৩ টি অংশে বিভক্ত।
# ১ম অংশে (আয়াত ১-৪) আল্লাহর অনুগ্রহ ও আয়াত (নিদর্শন) হিসাবে মুহাম্মাদ (সঃ) এর উপর আল কুরআন নাযিলের কথা বলা হয়েছে যা কিনা এমন একটি জাতি তৈরি করেছে যেটা ভেদাভেদ ব্যতিরেকে সমগ্র মানবজাতির জন্য নিয়ামত।
সাধারন মানুষ ও জীন জাতিকে আল্লাহ সার্বক্ষনিক একটানা তাসবিহ পাঠকারী (মুসাব্বিহুন) হিসাবে বিশেষ্যবাচক শব্দে উল্লেখ করেননি বরং তাসবিহ পাঠ করা সংক্রান্ত ক্রিয়া বাচক শব্দে (সাব্বাহা) উল্লেখ করেছেন। কারন তারা দিনের কিছু সময় তাসবিহ পাঠ করলেও সারাক্ষন একটানা তাসবিহ পাঠ করা হয়ে ওঠে না। এই সূরার শুরু হয়েছে এভাবে।
তবে ব্যতিক্রম হযরত ইউনুস (আ), তিনি মাছের পেটে চলে যাওয়ার পর মুসাব্বিহুন হয়ে একটানা তাসবিহ পাঠ করতে থাকেন, যার ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তাকে উদ্ধার করেন। (সূরা আস সফফাত আয়াত ১৪৩ )
সেই সাথে ফেরেশতারাও একটানা তাসবিহ পাঠকারী (মুসাব্বিহুন) যার প্রমান মেলে সূরা আস সফফাত এর ১৬৬ নং আয়াতে
১ম আয়াতে আল্লাহর বড়ত্বের কথা বর্ননা করে তার ৪ টি গুনবাচক নামের কথা এসেছে। সাধারনত আল্লাহর ৪ টি নাম একসাথে দেখা যায় না আল কুরআনে কিন্তু এখানে কেন এমন হলো? এর জবাব আছে ২য় আয়াতেই। হ্যা; ২য় আয়াতে আল্লাহর ঐ ৪ টি গুনবাচক নামের রঙ এ রঙ্গিন হয়ে তার প্রেরিত শেষ নবী ও রাসূল কিভাবে তার মিশন বাস্তবায়ন করে গেছেন তার বর্ননা এসেছে। কিভাবে? আসুন দেখা যাক।
১ম আয়াতে আল্লাহর ১ম নাম বলা হয়েছে ‘আল মালিক’ অর্থ বাদশাহ।
২য় আয়াতে মুহাম্মাদ (সঃ) এর ১ম কাজ বলা হয়েছে তাঁর (মালিকের) আয়াত পড়ে শোনানো। মালিককে চেনা যায় তাঁর নিদর্শন (আয়াত) দিয়ে।
আল্লাহর ২য় নাম বলা হয়েছে ‘আল কুদ্দুস’ অর্থ অতি পবিত্র। মুহাম্মাদ (সঃ) এর ২য় কাজ বলা হয়েছে মানুষকে পবিত্র করা। তিনি জাহেলী যুগের মানুষকে পবিত্র করে সোনার মানুষে পরিনত করে দেখিয়েছেন।
আল্লাহর ৩য় নাম বলা হয়েছে ‘আল আজিজ’ অর্থ মহাপরাক্রমশালী কর্তৃপক্ষ। মুহাম্মাদ (সঃ) এর ৩য় কাজ বলা হয়েছে মানুষকে কিতাবের শিক্ষা দেওয়া। কিতাব বা বই বা আইন আসে মহাপরাক্রমশালী কর্তৃপক্ষ থেকেই। আর তাই তিনি আল্লাহর আইন ই শিক্ষা দিয়েছেন ও তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন।
আল্লাহর ৪র্থ নাম বলা হয়েছে ‘আল হাকিম’ অর্থ জ্ঞানময়। মুহাম্মাদ (সঃ) এর ৪র্থ কাজ বলা হয়েছে মানুষকে জ্ঞান/প্রজ্ঞা শিক্ষা দেওয়া। সবচাইতে প্রজ্ঞাবান আল্লাহর কাছ থেকে জ্ঞান নিয়েই মুহাম্মাদ (সঃ) মানুষকে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন।
৩য় আয়াতে বোঝানো হয়েছে মুহাম্মাদ (সঃ) এর কাজের পরিধি যে শুধু তাঁর সময়কালেই বর্তমান থাকবে তা নয় বরং তাঁর অবর্তমানেও এই কাজ চলতে থাকবে। ৪র্থ আয়াতে মূলত বোঝানো হয়েছে যে, ইসলাম ছড়াতেই থাকবে এবং এটি মক্কার সীমানা ছাড়িয়ে সবদিকে ছড়িয়ে পড়বে এবং মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষিত হতেই থাকবে।
১ম আয়াতে আল্লাহ বলেছেন আকাশ ও যমীন আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলছে তেমনি তার সাথে মিল রেখে মুহাম্মাদ (স) ও আল্লাহর দেয়া হুকুম যথাযথভাবে মেনে কাজ করে যাচ্ছেন। এ যেন এক অনিন্দ্য সুন্দর ছন্দ! perfect harmony!
# ২য় অংশে (আয়াত ৫-৮) এ এমন এক জাতির কথা বলা হয়েছে যারা নিজেদের মর্যাদার বড়াই করতো কিন্তু তাদের কিতাবের (আল্লাহর আয়াত/নিদর্শন) মর্যাদা তারা দিতে পারে নাই। এবং এজন্য তাদের প্রতি আল্লাহর প্রতিদানের ব্যাপারেও তারা বেখেয়াল। তারা মৃত্যু, পুনরায় আল্লাহর দরবারে জড়ো হওয়ার বিষয়টি অবজ্ঞা সহকারে নেয়।
# ৩য় অংশে (আয়াত ৯-১১) আল্লাহ আমাদেরকে জুমুয়ার দিনে (ইহুদীদের শনিবার এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ন) তাঁর দরবারে জড়ো হওয়ার (যা কিনা চুড়ান্ত জড়ো হওয়ার দিন; কিয়ামতের সাথে সাদৃশ্যপূর্ন) জন্য বলেছেন। এই জুমুয়ার দিনে আল্লাহর আহবানকে গুরুত্বসহকারে (ব্যবসা ও ক্রীড়া-কৌতুক বাদ দিয়ে) সাড়া দেওয়ার মাধ্যমে সাফল্য লাভের উপদেশ দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ চলাচলের জন্য আল কুরআনে কয়েকটি শব্দ ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন সূরায়। ৬৭ নং সূরা আল মূলক এর ১৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে "হাটো", এটা মূলত রিযিক অন্বেষণের জন্য অল্প গতির চলাচল। ৬২ নং সূরা আল জুমুয়া এর ৯ নং আয়াতে নামাজে যাওয়ার ক্ষেত্রেঃ “ধাবিত হও” বলা হয়েছে যা আরেকটু বেশি গতির চলাচল।
৩ নং সূরা আলে ইমরান এর ১৩৩ নং আয়াতে জান্নাত লাভের ক্ষেত্রেঃ “পাল্লা দিয়ে দৌড়াও” বলা হয়েছে যা আরো বেশি গতির চলাচল। ৫১ নং সূরা আয যারিয়াত এর ৫০ নং আয়াতে আল্লাহর দিকে চলার ক্ষেত্রেঃ “ছুটে চলো” বলা হয়েছে যা আগের সকল গতির বেশি গতির চলাচল। এভাবে আল্লাহ গুরুত্ব ও লক্ষ্য এর বিবেচনায় চলার গতি বাড়াতে বলেছেন খুব সুন্দরভাবে। সুবহানাল্লহ।
সপ্তাহের গুরুত্বপূর্ন কাজ জুমুয়ার নামাজ আদায় করা শেষে (জুমুয়ার আযানের পর থেকে নামাজ শেষ পর্যন্ত কিছু সময় বাদে) আবার ভূ-পৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করতে বলেছেন; এর মধ্যে জীবিকার জন্য চেষ্টা করা ও অন্যান্য অনেক বিষয় অন্তর্ভূক্ত। এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করতে উপদেশ দেয়া হয়েছে এবং এসব কিছুর কারনে সফলতার আশা করার কথা বলা হয়েছে।
সুতরাং এক নজরে সূরাটিকে এভাবে দেখা যায়ঃসুতরাং শুরুতে আল্লাহ তাঁর কিতাব নাযিলের কথা বলেছেন ও সেই কিতাব এর মর্যাদা অনুযায়ী তাঁর রসূল কাজ করে একটি সার্বজনীন সমাজ গঠন করে গেছেন। সেই কিতাব এর মর্যাদা না দিলে পরিনতি কেমন হবে সেদিকে ইঙ্গিত দিতে আল্লাহ ইতিহাসে ঘুরিয়ে নিয়ে এসে আমাদের সতর্ক করেছেন এবং প্রতি সপ্তাহে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে জমায়েত হয়ে কিতাবের মর্যাদা দান করার মাধ্যমে সাফল্য অর্জনের আহবান জানিয়েছেন। এভাবেই ৩ অংশে সূরাটি গাঁথা।
আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ আগের সূরা আস সফঃ goo.gl/D3mcqi (আয়াত ৯) এ মুহাম্মাদ (সঃ) এর মিশন এর কথা এসেছে। এই সূরায় সেই মিশন তিনি কিভাবে বাস্তবায়ন করেছেন তার কথা এসেছে (আয়াত ২)। পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ ৬২ তম সূরা আল জুমুয়ায় আল্লাহর গুনে গুণান্বিত হয়ে মুহাম্মাদ (স) এর মিশন বাস্তবায়ন এর রুপরেখা বর্ননা করা হয়েছে। এই মিশন বাস্তবায়ন করার সময় সবচাইতে ক্ষতিকর ও বিপদজনক সম্প্রদায় হলো মুনাফিক। সুতরাং তাদের পরিচয়, কার্যাবলী, প্ল্যান ও এর পরিপ্রেক্ষিতে তাদের প্রতি মুহাম্মাদ (সঃ) এর আচরন কেমন হওয়া উচিত এবং তাদের প্রতি আল্লাহ নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে মুহাম্মাদ (স) এর মিশন বাস্তবায়নে দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ৬৩ তম সূরা আল মুনাফিকুন (goo.gl/TmGron)এ।
বিশেষ কিছু বিষয়ঃ # আল্লাহ তার নবীকে উম্মী (নিরক্ষর মানুষ)দের মধ্য থেকে বাছাই করেছেন। যেন অবিশ্বাসীরা এই blame দিতে না পারে যে তিনি নিজেই আল কুরআন রচনা করেছেন। এছাড়াও ২য় তিনি ‘ইয়াতলু’ করেন মানে ‘পড়ে শোনান’ বলা হয়েছে তিনি ‘বলেন’ বলা হয় নাই। অর্থাৎ তিনি নিজ থেকে কিছু বলেন না বরং আল্লাহ রচিত আল কুর আন থেকে পড়ে শোনান মাত্র। আল্লাহ যে কুরআন রচনা করেছেন, মুহাম্মাদ (সঃ) নন এই বিষয়কে আরো reinforce করে।
# আল্লাহ তার ৪ টি গুনের/ক্ষমতার কথা বলেছেন যা আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (স) এর মধ্যেও ফুটে উঠেছে। অর্থাৎ তিনি আল্লাহর রঙ্গে রঙ্গিন ছিলেন। এখন মুহাম্মাদ (স) নেই। তার দাওয়াত, কাজ করার জন্য এখনকার ইমামরা দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত। তারা জুমুয়ার খুতবার মাধ্যমে সেই দ্বায়িত্ব পালন করতে চেষ্টা করার মাধ্যমে নিজেরা আল্লাহর রঙ্গে রঙ্গিন হতে চান ও আমাদের ও আল্লাহর রঙ্গে রঙ্গিন করতে চান।
# আগে এক উম্মত আল কুর আন আল্লাহর কিতাব, আইন, জীবনব্যবস্থাকে বুঝতে পারে নাই। তাদের হৃদয়ে প্রবেশ করাতে পারে নাই এজন্য আল্লাহ তাদের গাধার সাথে তুলনা করেছেন। যে শুধু ভার বহন করে চলে কিন্তু এর অর্থ ও মূল বিষয় জানে না। আমাদের অবস্থাও কি তাই? আমরা কুর আনকে কতটুকে বুঝি?
# এক উম্মতের উপর শনিবারের পরীক্ষা হয়েছিলো মাছ না ধরার বিষয়ে আর আমাদের উপর জুমুয়াবারের পরীক্ষা হলো জাগতিক কেনা বেচার ব্যস্ততা, বিনোদন ঐ সময়ের জন্য বাদ দেওয়ার বিষয়ে। কিছু সাহাবী নবীকে দাঁড়িয়ে রেখে কেনা বেচার জন্য চলে গিয়েছিলো। জুমুয়ার দিনে আমরাও কেনা বেচা, আমোদ ফূর্তি করতে করতে একদম লাস্ট মোমেন্টে মসজিদে যাই কিনা? আমরা জাগতিক লোভ ত্যাগ করে জুমুয়াবার আল্লাহর দরবারে হাজির হতে পারি কিনা? হাজির হলেও কতটুকু খালেস নিয়তে হাজির হই? খুতবা পুরাটা শুনি কিনা? হাজির হয়েও আমরা কি ব্যবসার হিসাব নিকাশ মনে মনে করতে থাকি কিনা? ফেসবুকে ঢুকে বা গেম খেলতে থাকি (ক্রীড়া-কৌতুক) কিনা? এই প্রশ্ন বারবার চলে আসছে মনে।
# এই জুমুয়ার জমায়েত আমাদেরকে কিয়ামতের জমায়েতের কথা স্মরন করিয়ে দেয় প্রতি সপ্তাহে। এই জুমুয়ায় আমরা ইচ্ছা করে জমায়েত হই। আর কিয়ামতের সময় ইচ্ছা থাক বা না থাক আল্লাহর সামনে আমাদের জমায়েত হতেই হবে। এই সাপ্তাহিক জমায়েত হাশরের জমায়েত এরই একটা রিহার্সেল। এই ইভেন্টের আগে ফেসবুকে কোন ইভেন্ট খোলা লাগে না। কোন লিফলেট, মাইকিং লাগছে না। এমনিতেই সবাই জড়ো হয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কালের ক্রিয়ার কাল মোট ৩ টি হলেও আরবীতে ২ টি শব্দে তা প্রকাশ করা হয়ে থাকে। মাদ্বী দ্বারা অতীত আর মুদ্বারি দ্বারা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উভয়ই বুঝায়। সূরা হাদীদ, হাশর ও সফ এর শুরুতে তাসবীহ পাঠ করার মাদ্বী তথা অতীত এর ক্রিয়া আবার সূরা জুমুয়াহ ও তাগাবুন এর শুরুতে তাসবীহ পাঠ করার মুদ্বারি তথা বর্তমান ও ভবিষ্যত এর ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে।
সূরাগুলোর মূল বিষয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটা খুবই সঙ্গতিপূর্ণ। সূরা হাদীদ, হাশর ও সফ এর মূল বিষয় সূরার অতীত সংশ্লিষ্ট এবং সূরা জুমুয়াহ ও তাগাবুন এর মূল বিষয় বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সংশ্লিষ্ট। মাশা আল্লাহ, সুন্দর, প্রজ্ঞাপূর্ণ মিল
সূরা হাশর, সফ, জুমুয়া এবং তাগাবুন এর শুরু হয়েছে আসমানসমূহে যা কিছু আছে ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর তাসবিহ করে দিয়ে। এরপর আয়াতে এসেছে যমীনের সাথে সংশ্লিষ্ট নানা বিষয় তাই শুরুর আয়াতে পরের আয়াতগুলোর সাথে মিল রেখে আলাদা করে যমীনের বর্ননার সময় অতিরিক্ত وَمَا فِى শব্দ এসেছে।
অন্যদিকে সূরা হাদিদ এ আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর তাসবিহ করে দিয়ে শুরু হয়েছে। এরপর কয়েকটি আয়াতে এসেছে আল্লাহর গুনগান ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বর্ণনা।যেহেতু পরের আয়াতগুলোতে যমীনের বিষয় কম বর্ননা তাই শুরুর আয়াতে অতিরিক্ত শব্দ নাই। কি দারুন মিল। পরবর্তি প্রেক্ষাপটের সাথে পুর্ববর্তি শব্দের অপূর্ব সামঞ্জস্যতা
রেফারেন্স ও কৃতজ্ঞতাঃ বিভিন্ন তাফসীর, বিশেষ করে Nouman Ali Khan এর তাফসীর, বিভিন্ন লেকচার, ভিডিও ইত্যাদি।



.jpg)





মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন