৮৪। সূরা আল ইনশিক্বক (খন্ড বিখন্ডকরন)
সূরার সারসংক্ষেপঃ ১ম আয়াতের শুরুতে ‘যখন’ বলার অর্থ হলো এটি অবশ্যই হবে। এই সূরায় আকাশ ফেটে চৌচির হয়ে যাবে এমন বর্ননা করা হয়েছে যা আগের অন্য সূরাসমূহে (৭৮ তম সূরা আন নাবা এর ১৯ নং আয়াত, ৮২ তম সূরা আল ইনফিতারের ১ নং আয়াত) বর্নিত আকাশে ফেটে যাওয়ার বর্ননার চুড়ান্ত রুপ। এটাই তার অবশ্যম্ভাবী পরিনতি।
২য় আয়াতে বলা হয়েছে যে, ঐ অবশ্যম্ভাবী পরিনতি হবে তার রব আল্লাহরই নির্দেশের বাস্তবায়ন। এই নির্দেশ পালন যে অতি প্রতিক্ষীত ও স্বেচ্ছায় হবে এবং এটাই তার পরিনতি হিসাবে নির্ধারিত ছিলো তা ঐ আয়াতের শব্দের গঠন থেকে বোঝা যায়।
শুধু আসমানে আল্লাহর ক্ষমতা ও বাহাদুরি আছে, যমীনে/পৃথিবীতে নয় (যা অনেক মানুষ ভাবে) এমনটি নয় বরং ৩য় আয়াতে যমীনের চুড়ান্ত পরিনতির কথা বলা হয়েছে। পৃথিবী সব কিছু (মৃতদেহ, সম্পদ ইত্যাদি) ফাঁকা করে দিয়ে (৪র্থ আয়াত অনুযায়ী) চুড়ান্ত রুপ ধারন করবে
এবং তা হবে তার রব আল্লাহরই নির্দেশের বাস্তবায়ন যা বর্নিত হয়েছে ৫ম আয়াতে।
৬ষ্ঠ আয়াত অনুযায়ী মানুষ পরিশ্রমের সাথে একটা কাজ থেকে আরেকটি কঠিন কাজ করে এগিয়ে যাচ্ছে। এক সময় সে তার রবের কাছে পৌছে যাবে; কোন থামাথামি নেই। মানুষ ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক তাকে তার রব ও তার কর্মফলের দিকে যেতেই হবে।
৭ নং আয়াত হতে বোঝা যায়ঃ বাম হাত থেকে ডান হাতকে বেশি মঙ্গলজনক মনে করা হয় এবং ভালো কাজ সাধারনত ডান হাত দিয়েই করা হয়। সুতরাং যার কিতাব (আমলনামা) তার ডান হাতে দেয়া হবে সে সন্তুষ্ট চিত্তে ডান হাতে গ্রহন করবে।৮ম আয়াতের বর্ননা অনুযায়ী সহজ হিসাব নেয়া হবে বলতে হাল্কাভাবে হিসাব গ্রহন করা হবে বুঝায়, অর্থাৎ ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকবে। সৎকাজগুলো সহজে গ্রহণ করে নেয়া হবে এবং অসৎকাজগুলো উপেক্ষা করে মাফ করে দেয়া হবে। আয়াত ৯ এ আল্লাহ বলেছেনঃ "এবং সে হাসিমুখে পরিবার পরিজনের কাছে ফিরে যাবে"৷
১০ম আয়াতে বর্নিত পিছন দিক থেকে কিছু দেয়াকে সাধারনত অকল্যানকর হিসাবে ধরা হয়৷ এর দ্বারা পিঠে বোঝার দিকেও নির্দেশ করা হতে পারে। অর্থাৎ অকল্যানকর আমলনামার বোঝা তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।
এর পরের ১১ তম আয়াত এ বলা হয়েছেঃ "সে মৃত্যুকে ডাকবে" মৃত্যুকে ডাকার অর্থ হলো অকল্যান সহ্য করতে না পেরে হতাশ হওয়া ও তা থেকে মুক্তি কামনা করা। সে পরিস্থিতি বুঝে তখন নিজের ধ্বংসই কামনা করবে।
আল্লাহ আগের ৯ম আয়াতে সফল মানুষদের পরিবার পরিজনের মধ্যে থাকার কথা বলেছেন এবং সেটার উল্লেখ করেছেন আখিরাতে। অর্থাৎ তারা দুনিয়ায় পরিবার পরিজনের মধ্যে উল্লাসে মেতে থাকার পরিবর্তে আরো গুরুত্বপূর্ন ভাল কাজ করে তা আখিরাতের জন্য জমা রাখে।
অন্যদিকে আল্লাহ এই আয়াতে (১৩ তম) বিফল মানুষদের পরিবার পরিজনের মধ্যে থাকার কথা বলেছেন এবং সেটার উল্লেখ করেছেন দুনিয়াতে। অর্থাৎ তারা দুনিয়ায় পরিবার পরিজনের মধ্যে উল্লাসে মেতে থেকে গুরুত্বপূর্ন ভালো কাজ থেকে বিরত থাকে তাই আখিরাতে বঞ্চিত হবে। “মাসরূরা” শব্দের মাধ্যমে অন্তরের প্রশান্তি সহকারে আনন্দ ও সুখ বোঝায়। আখিরাতে সফল মানুষেরা এমন আনন্দেই থাকবে কারন তারা দুনিয়াতে আনন্দ উল্লাসে মেতে থেকে আত্মহারা হয়ে তার লক্ষ্য ও কাজ হতে গাফেল ছিলো না, যেমনটি ছিলো বিফল মানুষেরা। কি সুস্পষ্ট তাদের (সফল ও বিফল মানুষদের) পার্থক্য! কি অসাধারন আল্লাহর বাচনভঙ্গি! কি যুক্তিপূর্ন প্রকাশভঙ্গি।
১৫ তম আয়াতে বর্নিত হয়েছে যে তার রব সকল কার্যকলাপ দেখছিলেন; এমনকি তার মনের চিন্তাও তিনি জানতেন। কারন আগের আয়াতে বলা হয়েছে যে সে মনে করেছিলো, সে যা করছে তা ঠিক করছে এবং কখনই ফিরে গিয়ে জবাবদিহী করতে হবে না। আল্লাহ তার এই চিন্তা ও কার্যকলাপ সম্পর্কে পরিপূর্নরূপে জ্ঞাত।
১৬-১৮ নং আয়াতে পরিবেশের শেষ/চুড়ান্ত পরিনতির কথা বলা হয়েছে। ১৬ তম আয়াতে সূর্যের, ১৭ তম আয়াতে রাতের এবং ১৮ তম আয়াতে চাঁদের চুড়ান্ত পরিনতির কথা বলা হয়েছে।অবাক করা বিষয় হল চাঁদ পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতে ২৭ দিন সময় লাগে। তবে এই সময়ে পৃথিবী আবার সূর্যকে কেন্দ্র করে ২ দিন এগিয়ে যায়। এজন্য চাঁদকে আরও দুদিন বেশি ঘুরতে হয় এজন্য চন্দ্র মাস ২৯ দিনে হয়।
১৯ তম আয়াতে মানুষ এর পথচলা এখানে বর্নিত হয়েছে। পরিবেশের অন্য সব কিছুর মতই মানুষও চুড়ান্ত অবস্থায় পৌছে যাবে। মানুষের পৃথিবীতে জন্মের আগের অবস্থা, এরপর মায়ের পেটে তারপর পৃথিবীতে আসা ও নানা স্তর পেরিয়ে পার্থিব জীবনের প্রান্তে চলে যাওয়া। এরপর কবর, কিয়ামত, হাশর ইত্যাদির পর চুড়ান্ত পরিনতির জন্য তার রবের সামনে হাজির হওয়া।
২১ তম আয়াতে সেই সকল মানুষের কথা বলা হয়েছে যাদের সামনে আল কুরআন পড়া হলে তারা সিজদা করে না (আসুন আমরা এই আয়াত পড়ে সিজদা করি কারন এটা সিজদার আয়াত)। সিজদা করা শুধু শারিরীক সিজদা নয় বরং এর দ্বারা অবাক, আশ্চর্য হওয়া, নিজেকে সমর্পন করাও বোঝায়। তারা আসলে আল কুরআন এর অলৌকিকত্ব, সৌন্দর্য্য বুঝতে পেরেও নিজের অহংকার ফেলে দিয়ে আল কুরআনের সামনে মাথা নত করে না।সুতরাং, এই সূরা এর বক্তব্যকে মোটামুটি ৪ ভাগে ভাগ করা যায়।
১ম অংশ (আয়াত ১-৫) তে এসেছে কিয়ামত এর ঘটনার বর্ননা। এই বিশ্ব ব্যবস্থা কিভাবে ধাপে ধাপে চুড়ান্ত পরিনতির দিকে এগিয়ে যাবে তার বর্ননা।
২য় অংশ (আয়াত ৬-১৫) তে এই কিয়ামত এর সাথে সবচেয়ে বেশি সংশ্লিষ্ট মানুষের জীবনের পথচলা বর্নিত হয়েছে। মানুষ কিভাবে ধাপে ধাপে তার চুড়ান্ত পরিনতির দিকে এগিয়ে যাবে তার বর্ননা এসেছে।
৩য় অংশ (আয়াত ১৬-২১) তে বলা হয়েছে যে, শুধু মানুষ নয়, তার আশেপাশের সবকিছুই এমন! আশেপাশের পরিবেশ কিভাবে ধাপে ধাপে চুড়ান্ত পরিনতির দিকে এগিয়ে যায় তার বর্ননা এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহন এর কথা বলা হয়েছে এখানে।
৪র্থ অংশ (আয়াত ২২-২৫) হলো শেষ অংশ। আগের সব আলোচনার প্রেক্ষিতে আল্লাহ এর পক্ষ থেকে চুড়ান্ত পরিনতি হিসাবে আযাব ও পুরষ্কারের সতর্কবানী দিয়ে শেষ হয়েছে এই সূরা। সকল সূরারই একটি মূল বিষয় আছে। এই সূরার মূল বিষয় হলো অবশ্যম্ভাবী পরিনতি বা নিয়তি। সব কিছুই বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে একটি চুড়ান্ত পরিনতি বরন করে।
আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ আগের কয়েকটি সূরার সাথে এর গঠনের মিল আছে। ৮১ তম সূরা আত তাকবীর, ৮২ তম সূরা আল ইনফিতার এর শুরুর সাথে এই সূরার শুরুর মিল রয়েছে সবই কিয়ামতের ঘটনা দিয়ে শুরু । ৮৩ তম সূরা আল মুতফফিফীন ও কিয়ামত সম্পর্কিত এবং ঐ সূরার ৫ম আয়াতের কঠিন দিবসের কিছু বর্ননা এই সূরায় এসেছে।
পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ পরের সূরায়ও আকাশের কথা রয়েছে। তবে এই সূরা ও আগের সূরায় আকাশের ফেটে যাওয়ার কথা থাকলেও পরের ৮৫ তম সূরা আল বুরুজ এ আকাশের স্থিতির কথা বর্নিত হয়েছে। আগের সূরা ও এই সূরায় ভবিষ্যতে আকাশের অবস্থা বর্নিত হলেও পরের সূরায় আকাশের বর্তমান ও অতীতের অবস্থা বর্নিত হয়েছে।












মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন