৯০। সূরা আল বালাদ (শহর)
সারমর্মঃ আয়াত ১ এ এই (মক্কা) নগরীর শপথ করা হয়েছে।
আয়াত ২ হতে বোঝা যায়ঃ মক্কা ছিল পবিত্র ও নিরাপদ নগরী। কিন্তু ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার পর সেই সময়ে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, নবী মুহাম্মাদ (স) এর জন্য সেখানে কোন নিরাপত্তা ছিলো না। তাকে কষ্ট ও যন্ত্রনা দেয়া এমনকি তাকে হত্যা করার উপায় উদ্ভাবন করা ও তাতে চেষ্টা করা পর্যন্ত হালাল করে নেয়া হয়েছিল।
তাদের সময়ের তাদের নিজস্ব সকল আদর্শ/নিয়মকেই তারা ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। আবার অপরদিকে এই নিরাপদ শহরকে একটি বারের জন্য মুহাম্মাদ (স) এর নেতৃত্বে হালাল করে দেয়া হয়। সেই সময় ছিল মক্কা বিজয়। কিন্তু তার আদর্শ ছিল বিরোধীদের পুরা উল্টাঃ ক্ষমার আদর্শ ।
এরপরই ইতিহাসে নিয়ে গিয়ে ৩য় আয়াতে আল্লাহ এই নগরের আদি পিতা-পুত্রের কথা স্মরন করিয়ে দেন। পিতা বলতে এখানে মূলত ইবরহীম (আ) এবং পুত্র বলতে ইসমাঈল (আ) এর কথা বলা হয়েছে। তারাই এই কাবা ও মক্কা নগরীর ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তিতে তাদেরই বংশধর হিসাবে মুহাম্মাদ (স) এসেছেন। আদি পিতা পুত্রের সেই আদর্শকেই লালন ও বাস্তবায়ন করতে এসেছেন মুহাম্মাদ (স)। তাহলে কি মক্কার অধিবাসীরা তাদের পিতৃত্ব ও তাদের ঔরসে জন্ম নেয়া বংশধরদের অস্বীকার বা বিরুদ্ধাচরন করতে চায়?
এই সকল শপথের পর আল্লাহ মূল বিষয়বস্তুর দিকে যান আয়াত ৪ এ। এই যে মক্কা নগরীর গঠন, এই নগরীতে বিশৃংখলা, পিতা পুত্রের কাজ সবই আসলে মানুষের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সৃষ্টি ও নিয়তির প্রমান। মানুষকে চরম কষ্ট, পরিশ্রম করতেই হবে। মানুষকে সেভাবেই যোগ্য করেই সৃষ্টি করা হয়েছে। এটি মানুষের উচ্চ মর্দাদার একটা কারনও বটে। সে ভালো পথে কষ্ট করুক বা খারাপ পথে; কঠিন পরিশ্রম তাকে করতেই হবে। হতাশ হলে চলবে না, এটাই নিয়তি।কষ্ট করে মানুষ যখন একটা পর্যায়ে পৌছে তখন কিছু মানুষ অহংকারী হয়ে ওঠে। আয়াত ৫ এ বলা হচ্ছেঃ অহংকারী মানুষ এমন চিন্তাভাবনা করে যে কেউ তার উপর ক্ষমতাবান হতে পারবে না, তাকে পরাজিত করতে পারবে না। মূলত সে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না, তাই ভবিষ্যত সম্পর্কে নিশ্চিন্ত ভাব পোষন করে। অতীত কাহিনী বা বর্তমানে অনেককেই বৃহৎ ক্ষমতার কাছে পদানত দেখার পরও অহংকারীরা নিজেদেরকে সর্বময় ক্ষমতাধর মনে করে থাকে।
ক্ষমতার অহংকারের পাশাপাশি কিছু মানুষ অর্থের দাপট ও দেখাতে থাকে। আয়াত ৬ এ অহংকারী বক্তা “আমি প্রচুর ধন সম্পদ খরচ করেছি” না বলে বলছে, “আমি প্রচুর ধন সম্পদ উড়িয়ে দিয়েছি” অর্থাৎ সে চরম অহংকারী হয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য সহকারে নিজের অপচয়ের কথা বলছে। সাথে সাথে সেই অহংকারী কৃপন এই কথাও ইংগিতে জানিয়ে দিচ্ছে যে, সে দান করতে আগ্রহী নয় কারন সে ইতোমধ্যে অনেক ধন সম্পদ উড়িয়ে দিয়েছে।
৭ম আয়াতে আল্লাহ প্রশ্ন করছেন, তারা কি মনে করে তাদের কর্মকান্ড কেউ দেখছে না? অথচ আল্লাহ তিনিই যিনি মানুষকে দেখার জন্য চোখ দিয়েছেন কিন্তু নিজে দেখছেন না এমন কি হতে পারে? অবশ্যই না, যুক্তি অন্তত সেটা বলে না। ৮ম আয়াতেই আল্লাহ নিয়ামত হিসাবে চোখের কথা বলেছেন। ৮ম ও ৯ম আয়াতে আল্লাহ মানুষের যোগ্যতা বিকাশে সহায়ক এমন ৩ প্রকার অঙ্গের কথা স্মরন করিয়ে দিচ্ছেন। ২ টি চোখ, ১ টি জিহবা ও ঐ জিহবাকে সংযত রাখার জন্য ২ টি ঠোট (যা দিয়ে মানুষ অহঙ্গকার প্রকাশ করে) দিয়ে মানুষ অনেক কঠিন কাজ করতে পারে, কঠিন পথ পাড়ি দিতে পারে।
১০ম আয়াতে বর্নিত হয়েছে; আল্লাহ মানবজাতিকে অন্য প্রানীদের থেকে শ্রেষ্ঠত্য দিয়ে দুটি কঠিন পথ দেখান। ভালো ও খারাপ দুটি পথেই কঠিন পরিশ্রম করে এগুতে হয় এবং সেই পথে চলার ক্ষেত্রে বাধা না দিয়ে চলতে দেন। মানুষ ভালো পথে চললেও আল্লাহ তাকে স্বাধীনভাবে চলতে দেন, খারাপ পথে চললেও।
১১ তম আয়াতে আল্লাহ কিছুটা হতাশার সুরে বলছেন যে, মানুষ দুটি পথের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কঠিন দুর্গম পথটির দিকে যেতে চায় না- যে পথের পরিসমাপ্তি সহজ ও সুন্দর বলে সে জানে; যদিও মানুষ কঠিন পরিশ্রমের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে (আয়াত ৪) এবং তিনি মানুষকে পরিশ্রম করার উপযোগী করেই নিয়ামত দিয়েছেন (আয়াত ৮, ৯, ১০)
১৩ তম আয়াত এর ‘ফাক্কু’ শব্দটির সাথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধতা, বার বার করার উৎসাহ জড়িত আছে যার মাধ্যমে দাসত্ব এর শৃঙ্খল থেকে মুক্তির জন্য ইসলামের আন্তরিকতার প্রমান মেলে। ‘রকবাহ’ শব্দ দিয়ে বোঝায় শেকল পিছন থেকে বাঁধা তাই টান দিলে ফাঁস পড়ে যাবে গলায়। সুতরাং এই কঠিন বাঁধন থেকে মুক্তি দানকে একটি সাহসিকতাপূর্ন, কষ্টসাধ্য ও ভালো পরিনামের কাজ হিসাবে বর্ননা করা হয়েছে।
আয়াত ১৪ তে সেই সব মানুষদের কথা বলা হয়েছে যারা শুধু যে অন্যকে খাওয়ায় তা নয় বরং সেই খাওয়ানোটা হয় খুবই কঠিন দূর্ভিক্ষ এর সময়ে। অর্থাৎ সুখ সাচ্ছন্দ্যের সময়ে তো বটেই এমনকি বিপদের সময়েও তারা অন্যের প্রতি খেয়াল রাখে, সাহায্য করে।
আয়াত ১৫ তে এসেছে সমাজের সবচাইতে দূর্বল, অসহায় সম্প্রদায় ইয়াতীমদেরকে সাহায্য করা এবং পরের আয়াত ১৬ তে এসেছে আরেক দূর্বল, অসহায় সম্প্রদায় ধুলিমলিন মিসকীনদেরকে সাহায্য করার কথা।
১৭ তম আয়াতে বোঝানো হয়েছে ঈমান আনার পর ঈমানদাররা একাকী থাকার পরিবর্তে একটি দলে পরিনত হয়। তারা একে অপরকে বিপদে, কঠিন কাজে (আয়াত ১২-১৬) ধৈর্য্য ধরার উপদেশ দেয় এবং একে অপরের প্রতি দয়া পরবশ হয়।
এরপর ভালো মানুষ ও খারাপ মানুষদের দুটি ভিন্ন দিকের মানুষ বলে তাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে; ডানপন্থি (আয়াত ১৮) ও বামপন্থি (আয়াত ১৯) হিসাবে।
বিশেষ বিষয়ঃ সূরা আত ত্বীন এ কসম করা হয়েছে নিরাপদ শহরের (মক্কার)। মানুষ তো এই শহরে নিরাপদই এমনকি বনের পশুদের মেরে ফেলা এবং গাছপালা পর্যন্ত কেটে ফেলা আরববাসীদের নিকট হারাম। সবাই এখানে নিরাপত্তা লাভ করে তাই একে নিরাপদ শহর বলা হয়। কিন্তু সূরা আল বালাদের শুরুতে একইভাবে কসম করা হয়েছে নগরের কিন্তু তখন তাকে নিরাপদ বলা হয় নাই। কারন সেই সময়ে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, নবী মুহাম্মাদ (স) এর জন্য সেখানে কোন নিরাপত্তা ছিলো না। তাকে কষ্ট ও যন্ত্রনা দেয়া এবং তাকে হত্যা করার উপায় উদ্ভাবন করা হালাল করে নেয়া হয়েছিল। কি সুক্ষ একটা শব্দের প্রয়োগ কি আসাধারন বৃহৎ অর্থ বহন করে। এমন ভাষাশৈলী শুধু স্রষ্টার বানীতেই পাওয়া সম্ভব।
আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ আগের ৮৯ তম সূরা আল ফাজর এর শেষে প্রশান্ত আত্মাকে আল্লাহর দিকে সন্তুষ্ট চিত্তে অন্য বান্দাদের সাথে সামিল হওয়ার কথা বলা হয়েছে। (আয়াত ২৭-২৯) এই ৯০ তম সূরা (আল বালাদ) য় শুরুতেই (আয়াত ১) মক্কার কথা বলা হয়েছে যে জায়গাটি দুনিয়ার সবচাইতে প্রশান্ত। এখানে হজ্জের সময় তো অবশ্যই, অন্য সময়েও মানুষ সন্তুষ্ট চিত্তে অন্য বান্দাদের সাথে সামিল হয় ‘লাব্বাইক’ বলে।
আগের সূরায় (৬-১০ আয়াতে) আদ, ইরাম, সামুদ ও ফেরাউন এর জনপদের কথা বলে অতিতে ঘুরিয়ে আনা হয়েছে এবং তার সাথে তুলনা করে এই সূরায় মক্কা জনপদ/নগরীর কথা এসেছে। এভাবে আগের নগরীগুলোর পরিনতির কথা বর্ননা করে এখন মক্কায় সেই একই ধরনের বিরুদ্ধাচরন করলে যে একই পরিনতি হবে তার একটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। আগের সূরায় (৬-১০ আয়াতে) আদ, ইরাম, সামুদ ও ফেরাউন এর খারাপ/খল বংশধারার কথা বর্ননা করে আল্লাহ তাদেরই বিপরীতধর্মী ন্যায়/ভালো আদম (আ) থেকে শুরু করে ইবরহীম (আ) এর বংশধারার বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন (আয়াত ৩)।
সূরা ফাজর এর আয়াত ১৭ তে এতীমদের উপযুক্ত সম্মান না দেয়া মানুষদের কথা বর্নিত হয়েছে, অপরদিকে সূরা আল বালাদের আয়াত ১৫ তে এতীমদের সম্মান দিয়ে সাহায্যকারী মানুষদের কথা বর্নিত হয়েছে।
একই ভাবে একই ধারাবাহিকতায় দুটি সূরার একটিতে মিসকীনদেরকে খাওয়াবার জন্য নিজে তো উৎসাহী না উপরন্তু অন্যকেও উতসাহ দেয়া না এমন মানুষদের কথা বলা হয়েছে। এবং অপরটিতে নিজেদের সুসময়ে তো বটেই উপরন্তু কঠিন দুঃসময়েও মিসকীনদেরকে খাওয়ায়, সাহায্য করে এমন মানুষদের কথা বলা হয়েছে।পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ এই (৯০ তম) সূরা আল বালাদ এর ১০ নম্বর আয়াতে দুটি সুস্পষ্ট ভিন্ন পথের কথা উল্লেখ রয়েছে। এবং ১৮ ও ১৯ নম্বর আয়াতে ই ২ পথের পথিকদের ২ টি (ডান ও বাম) পন্থী হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ঐ সূরার ৮ ও ৯ নম্বর আয়াতে সবারই চোখ, জিহবা ও ঠোট থাকার পরও কেন ভিন্ন ২ পথে তারা যায় তার বিবরন ও ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে পরের ৯১ তম সূরা আশ শামছ (goo.gl/u4Qhta) তে। মূলত নাফসের ২ টি ভিন্ন প্রবনতার কারনেই মানুষের পথ চলা ভিন্ন হয় যা সুন্দরভাবে বর্নিত হয়েছে সূরা আশ শামছ এর আয়াত ৮ এ।
এই সূরার শেষে ভুল পথে চলার পরকালীন পরিনতির কথা বলা হয়েছে (২০, শেষ আয়াত) এবং পরের সূরার শেষ দিকে (আয়াত ১৪) বলা হয়েছে যে, (শুধু পরকালে নয়) দুনিয়াতেও এর পরিনতি ভয়াবহ।
















মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন