১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)

সূরা আল ফাতিহা আল কুরআনের ১ম সূরা। এর নাম (সূচনা, প্রারম্ভিকা) থেকেই এটা বোঝা যায়। এটি নাযিলকৃত ১ম পূর্নাঙ্গ সূরা। নামাজে অন্য যেকোন সূরা পড়ার আগেও এটি পড়তে হয়। সুতরাং নামাজ পড়তে সূরা ফাতিহার মাধ্যমে অন্য সূরা বা আয়াতগুলো পড়তে হয়। কিছু মুফাসসির বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম কে আই সূরার ১ম আয়াত হিসাবে বিবেচনা করেন। বিসমিল্লাহ এর শাব্দিক অর্থ ‘আল্লাহর নামে’। এটা আসলে একটা অসম্পূর্ন বাক্য। এই বাক্য তখনই সম্পূর্ন হয় যখন এর পর কিছু বলা হয়/করা হয়। যেমন, আল্লাহর নামে.. খাওয়া শুরু করলাম। আল্লাহ ইচ্ছা করেই এমন অসম্পূর্ন বাক্য দিয়েছেন যেন আমরা তার নামেই সব কিছু শুরু করি এবং তার নাম সহকারেই যেন আমাদের সকল কাজ সম্পূর্ন হয়।   

কি অমূল্য আল্লাহর এই দান! বিসমিল্লাহ না বললে আসলে কিছুই সম্পুর্ন হয় না। আল্লাহর সম্পূর্ন বরকত পাওয়া যায় না।   

তবে আলহামদুলিল্লাহ...থেকে শুরু এই সূরা এমন মতামতই বেশি যুক্তিযুক্ত।  

এটা এমন একটি সূরা যার প্রতিটি আয়াতের জবাব আল্লাহ দেন। বান্দাহ যখন একটি আয়াত পড়ে, আল্লাহ সাথে সাথে সেই আয়াতের জবাব দিয়ে দেন। এই সূরা যেন বান্দাহ এর সাথে আল্লাহর সরাসরি যোগাযোগ!       

১ম আয়াতের শুরুর শব্দ ‘আলহামদুলিল্লাহ’ শব্দটি একই সাথে ‘প্রশংসা’ ও ‘ কৃতজ্ঞতা’ জ্ঞাপন করার উপায়। অন্য কোন শব্দ দ্বারা একই সাথে ‘প্রশংসা’ ও ‘ কৃতজ্ঞতা’ দেওয়ার উপায় নাই। এমন কিছু ক্ষেত্র আছে যখন প্রশংসা করা হয় কিন্তু কৃতজ্ঞতা জানানো হয় না। যেমন একটি সুন্দর গাড়ি বা খেলোয়াড়ের প্রশংসা করা হয় কিন্তু কৃতজ্ঞতা জানানো হয় না। আবার এমনও হয় যে, কৃতজ্ঞতা জানানো হয় কিন্তু প্রশংসা করা হয় না। যেমন বাবা যদি ইসলাম ছাড়তে বলে তাহলে তার প্রশংসা করা যাবে না কিন্তু তার অবদানের জন্য তাঁকে কৃতজ্ঞতা না জানিয়েও থাকা যাবে না। এমনটি মূসা (আঃ) ও করেছিলেন। তিনি অবদানের জন্য ফেরাঊনকেও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন কিন্তু তিনি ফেরাউনের প্রশংসা করেন নি। সুতরাং এসব ক্ষেত্রে ‘হামদ’ শব্দটি খাটে না। প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা একসাথে হলেই কেবল ‘হামদ’ হয়।

 

এই যে আল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ বললেন; এই কথাটি এভাবে বলা যেত: আল মাদহু  ওয়াশশুকরু লিল্লাহ। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ আলাদাভাবে আল-মাদহুলিল্লাহ বা  আশ-শুকরুলিল্লাহ বলার চেয়েও বেশী কার্যকরী। আল্লাহ এমন একটি শব্দ বেছে  নিয়েছেন যা একত্রে ঐ দুইটি শব্দের চেয়েও আকারে সংক্ষেপিত, অর্থের দিক থেকে  ব্যাপক ও ভাল। আবার আল মাদহু ওয়াশশুকরু লিল্লাহ বললে প্রশংসা এবং  কৃতজ্ঞতা বুঝাতো। “এবং” শব্দটি দুটি জিনিসকে আলাদা করে এমনকি অর্থের দিক  দিয়েও। এটা সবসময় একত্রিত হয় না। কারণ শব্দগুলো একত্রিত না। যদি আলাদা করা  হতো তাহলে, কখনো আল্লাহর প্রশংসা করা হচ্ছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে, আবার  কখনো  আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হচ্ছে তাঁর প্রশংসা না করে- এমন বোঝার  সম্ভাবনা দেখা দিত। কিন্তু আল্লাহ তা দূর করে এক শব্দে আলহামদুলিল্লাহ  বলেছেন।  

আমরা প্রতিটি কাজেই আল্লাহর ‘প্রশংসা’ করি ও তাকে ধন্যবাদ জানাই। এই শব্দটি Noun ফর্ম এ আছে। এটি পার্মানেন্ট। অর্থাৎ আল্লাহর প্রশংসা ও  ধন্যবাদ পাওয়ার বিষয়টা পার্মানেন্ট, Time dependent না। আবার এখানে  ‘আলহামদুলিল্লাহ’ কে বলছে, কারা বলছে এটাও ক্লিয়ার করা নাই। যার মানে  বোঝাচ্ছে আল্লাহর প্রশংসা ও ধন্যবাদ পাওয়ার বিষয়টি ব্যক্তি বা সংখ্যা dependent নয়।  কি অসাধারন আল্লাহর ভাষা!!! কি নিখুঁত তার সৃষ্টি!!!  

রব শব্দটি একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। একটি মাত্র শব্দ দিয়ে অনেক অর্থ বুঝায়। রব শব্দটি দ্বারা একই সাথে মালিক, পরিপূর্ন কর্তৃত্বশীল, বৃদ্ধি নিশ্চিতকারী, পরিচালনাকারী, অস্তিত্ব রক্ষাকারী, পুরষ্কার প্রদানকারী ইত্যাদি বুঝায়। অল্প কথায় বলা যায় যে, রব হলেন সেই মালিক যিনি পরিপূর্ন কর্তৃত্বশীল থেকে অস্তিত্ব রক্ষা করে লালন-পালন করে বৃদ্ধি নিশ্চিত করা সহ পূর্ণতায় পৌঁছান এবং পুরষ্কার দেন।

এত ক্ষমতাবান যে সত্ত্বা তিনি হয়তো খুব রাগি বা কাঠখোট্টা টাইপের কেউ হবেন এমন মনে হওয়া শুরু হতে পারে। কিন্তু আল্লাহ তখনই বলে দিচ্ছেনঃ তিনি রহমান এবং রহীম।  

রহমান শব্দটি ইসলাম আগমনের পূর্বে আরবরা আল্লাহর গুনবাচক নাম হিসাবে ব্যবহার করত না। এজন্য আল কুরআনে এসেছে; যখন তাদেরকে বলা হল তোমরা রহমানকে সিজদাহ করো, তারা বলল, রহমান আবার কি জিনিস? (২৫ তম সূরা ফুরকন, আয়াত ৬০)।

এর পর আল্লাহ তাদেরকে চিনিয়েছেন। মাক্কি সুরাগুলোতে রহমান শব্দটি বেশি এসেছে।

২য় আয়াতের ‘আর রহমান’ ও আর রহীম শব্দটি এসেছে 'র-হ-ম' (ر-ح-م)  শব্দ হতে যার অর্থ গর্ভ। গর্ভের সন্তান কিছু বুঝে ওঠার আগেই, সন্তান মাকে ভালোবাসা শুরু করার আগে থেকেই থেকেই মা তাঁকে ভালোবাসেন। গর্ভের একজন এর কাছে তার মা ই দুনিয়া। মা তার সব প্রয়োজন মিটিয়ে আগলে রাখেন যেকোন বিপদ থেকে। বিপদে অন্য সবাই দেহের গুরুত্বপূর্ন অংশ বাঁচানোর চেষ্টায় মাথায় হাত দিলেও মা পেটে হাত দেন। যেকোন সম্ভাব্য বিপদ থেকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সন্তানকে রক্ষার চেষ্টা করেন। টেবিলের কোনা বা বিপদ হতে দূরে থাকার চেষ্টা করেন। সন্তান সম্ভবা মা চিকন, সরু পথ এড়িয়ে চলেন। সাবধানে হাটাচলা করেন গর্ভের সন্তানের যেন ক্ষতি না হয়।  

গর্ভের সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা, সকল প্রয়োজন মেটানো ও Care এর সাথে তুলনা করে আমাদের প্রতি আল্লাহর 'রহমান' ও রহীম হওয়ার বিষয়টা কিছুটা বোঝা যায়।  

রহমান শব্দ দ্বারা দয়া বিষয়টা এখনই কার্যকর, অনেক বেশি পরিমানে আছে বুঝায়। এই শব্দ দ্বারা বোঝায় যে এটা চিরস্থায়ী নয়। আগে রহমান শব্দটি এসেছে কারন এটি মূলত দুনিয়ার জন্য। মানুষ নগদ কিছু পেতে চায়, বেশি পরিমানে। তাৎক্ষনিকের জন্য রহমান, ভবিষ্যতের জন্য রহিম। রহিম দ্বারা বুঝায় এটি স্থায়ী, সার্বক্ষনিক গুনটি বিদ্যমান তবে প্রয়োগ সার্বক্ষনিক নয়। 

মানুষের তাড়াহুড়াপ্রবন স্বভাবের কারনে আল্লাহ আগে তাৎক্ষনিক প্রাপ্তির রহমান নাম আগে এনেছেন ও পরে ধৈর্য ধরে আস্থা সহকারে অপেক্ষার জন্য রহিম পরে এনেছেন। যেহেতু এই দুনিয়া চিরস্থায়ী নয় তাই রহমানের কার্যকারীতাও এই দুনিয়াতে শেষ। রহমান গুনটি মুমিন, কাফের, মুশরিক, মুনাফিক সবার জন্য প্রযোজ্য তাই এটি সার্বজনীন, সর্বব্যাপী ও এই দুনিয়ার ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য। অন্যদিকে রহীম গুনটি কাফির, মুনাফিকদের প্রতি সর্বব্যাপী নয় বরং বিশেষ করে মুমিনদের জন্য নির্দিষ্ট পরিসরে, তাই এটি আখিরাতে বেশি প্রযোজ্য।  

রহমান ও রহীম এর অর্থ জানার পর মানুষ হয়তো একদম গা ছেড়ে দিতে পারে। কেউ কেউ আবার দয়ার সুযোগ নিয়ে ভিন্ন পথে চলে যেতে পারে; এটা রোধ করতেই যেন আল্লাহ ৩য় আয়াতেই বলে দিলেন যে তিনি বিচার দিনের মালিকও বটে!  এসব কিছু জানার পর তার আনুগত্য না করার আর কোন কারন অবশিষ্ট থাকে না। তাই মানুষ একান্ত সবতস্ফূর্তভাবেই ৪র্থ আয়াত এর মত বলে ওঠে যে, আমি তার ইবাদাত করার জন্য প্রস্তুত।  এই ইবাদাত অর্থ বুঝতে এর বিস্তারিত জানা প্রয়োজন। ইবাদাত আসলে ২ টি কাজের সংমিশ্রন। ১। উপাসনা ও ২। দাসত্ব। যেকোন একটি অনুপস্থিত থাকলে ইবাদাত পরিপূর্ন হয় না। 

আনুষ্ঠানিকভাবে আল্লাহর উপাসনা করা ও উপাসনা বাদে অন্য সব সময়ে আল্লাহর দাসত্ব করাই হলো আল্লাহর ইবাদাত করা।   

যেহেতু শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদাত (উপাসনা ও দাসত্ব) করা উচিত তাই শুধু তাঁরই সাহায্য আমরা চাই। সাহায্য চাওয়া বুঝাতে এখানে আল্লাহ ‘নাসতাঈন’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। ‘নাসতাঈন’ বলতে শুরুতে নিজে চেষ্টা করতে থাকা ও পরে সাহায্য চাওয়া বিষয়টি বোঝায়। নিজে কোন পদক্ষেপ না নিয়ে শুধু সাহায্যের জন্য চাওয়াকে বোঝায় না। যেমনঃ কারো গাড়ির টায়ার পাংচার হয়ে গেলে সে যদি গাড়িতে আরামে বসে সাহায্য চায় তবে সেই সাহায্য চাওয়াকে ‘নাসতাঈন’ বলা যাবে না। বরং সে যদি মেশিন বের করে নিজে চেষ্টা করতে থাকে, সাথে সাহায্য চায় তবেই সেই সাহায্য চাওয়াকে ‘নাসতাঈন’ বলা যাবে।   

সুতরাং আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার জন্য তাঁর ইবাদাত করা দরকার এবং আল্লাহ্র সাহায্য চাওয়া ও তা পাওয়ার আশা করার জন্য নিজের চেষ্টা করা দরকার।  

তার কাছে সাহায্য চাওয়ার বিষয়টা হলো আমরা যেন সহজ সরল পথে চলতে পারি। যেহেতু এই পথটা আমরা শুরুতেই চিনতে পারি না। যেকোন নতুন পথ, সিদ্ধান্ত এর আগে এই সূরা পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া উচিৎ। যারা সফল তাদের পথ চেয়ে এবং যারা বিফল তাদের পথ যেন না হয় সেই দোয়া করে সূরাটি শেষ হয়।    

বিশেষ বিষয়ঃ  knowledge (জ্ঞান) আর Action (কর্ম) এর এক অপুর্ব সমন্বয় রয়েছে এই সূরায়। সূরার ১ম ৩ আয়াতে আমরা আল্লাহর সম্পর্কে knowledge পাচ্ছি। সেটা পেয়ে পরের ২ আয়াতে Action করা উচিৎ। এই প্রাপ্ত সঠিক knowledge অনুযায়ী যারা সঠিক Action করেছেন তারাই সরল সঠিক পথে আছেন/ছিলেন। তাদের কথাই বলা হয়েছে ৬ নম্বর আয়াতে। ৭ম আয়াতের ১ম অংশে তাদের কথা বলা হয়েছে যাদের সঠিক knowledge আছে কিন্তু সঠিক Action নাই, ইহুদিদের সাথে মিলে আর ৭ম আয়াতের পরের অংশে বলা হয়েছে তাদের কথা যাদের  Action আছে কিন্তু সঠিক knowledge নাই যা নাসারা বা খ্রিষ্টান এর সাথে মিলে। কি অসাধারন সমন্বয়!!!  

সূরা আল ফাতিহার ১ম ৩ টি আয়াত আল্লাহ সম্পর্কিত। লাস্ট ৩ টি আয়াত মানুষ  অর্থাৎ আমাদের সম্পর্কিত। আর মাঝের আয়াত আল্লাহ এর সাথে আমাদের যুক্ত করে  দিয়েছে; অর্থাৎ আল্লাহ ও আমাদের সম্পর্কিত।  ১ম ৩ টি আয়াত এর  উপসংহার হলো মাঝের আয়াতের ১ম অংশ, আবার শেষ ৩ আয়াতের সূচনা হলো মাঝের  আয়াতের শেষ অংশ। কি অসাধারন বিন্যাস!!! আলহামদুলিল্লাহ।     

আবার ১ম অংশে আল্লহর পরিচয় দেওয়া হয়েছে যে আয়াতে (আয়াত ১) তাঁর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে পরের ২ আয়াতে (আয়াত ২,৩)। এবং শেষ অংশ (৩য় অংশ) তে আল্লাহর কাছে আমাদের চাওয়া বর্ননা করা হয়েছে 
যে আয়াতে (আয়াত ৫), তাঁর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে পরের ২ আয়াতে (আয়াত ৬,৭)। কি সুন্দর ছন্দ!!!    
আরবীতে কিছু বাক্য আছে Verb Based কিছু বাক্য Noun Based. Verb Based জিনিসগুলো temporary এবং Noun Based জিনিসগুলো permanent. সূরা ফাতিহার ১ম অংশ Noun Based. শেষ অংশ Verb Based. মাঝের অংশ Verb Based হলেও শুরু হয়েছে noun দিয়ে। অর্থাৎ মাঝের অংশ noun, Verb Based. ১ম অংশতে আল্লাহর কথা বর্ননা করা হয়েছে Noun Based  বাক্য দিয়ে যা permanent কিছু বোঝায় এবং আল্লাহ permanent. শেষ অংশতে আমাদের কথা বর্ননা করা হয়েছে Verb Based বাক্য দিয়ে যা temporary কিছু বোঝায়। আমরা কি পার্মানেন্ট? না। আমরা temporary. আর মাঝের অংশ noun, Verb Based বাক্য দিয়ে গঠন করা হয়েছে; এখানে temporary আমরা ও permanent আল্লাহর কথা বর্ননা করা হয়েছে। কি অসাধারন!!!     

সূরা ফাতিহা হলো information ও emotion এর অসাধারন এক প্রদর্শনী। সব গুলা আয়াতই information দিচ্ছে আবার এটি এমনিতেই emotion হিসাবে মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।   

৫ম আয়াতে আল্লাহ একটি পথের সন্ধান চাইতে বলেছেন । এটা আল্লাহর রহমত যে তিনি একটি পথের সন্ধান চাইতে বলেছেন। তিনি পথের সন্ধান চাওয়ার জন্য বলেছেন, কোন গন্তব্যের কথা বলেন নাই। এই শুরুর সূরাতেই একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের কথা বললে আমাদের জন্য তা অর্জন করা কঠিন হয়ে যেত কারন সবার যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা এক নয়।   আল্লাহ এই পথে চলার কোন স্পিড লিমিট দেন নাই। শুধু মাত্র সরল সঠিক পথে থাকলেও আল্লাহ সেটিকে সাফল্য হিসাবে গন্য করবেন। আল্লাহ কত বিজ্ঞ, মেহেরবান!  

আল কুরআনে পথ বোঝাতে কয়েকটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যেমনঃ সাবিল, সীরত, তরিক, ফাজ্জ ইত্যাদি। এর মধ্যে আলোচ্য সূরায় পথ বোঝাতে সীরত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যার উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ রয়েছে।  অর্থাৎ যে পথ ১। সোজা, ২। নরম ও কোমল ৩। চলার উপযোগী ৪। প্রশস্ত ৫। কাঙ্খিত গন্ত্যব্যে পৌছার মাধ্যমত তাকেই সীরত বলা হয়। 

সূরার শুরু ও শেষের মিল; শুরুতে স্রষ্টার পরিচয় ও কাজ বলা হয়েছে, শেষে সৃষ্টির পরিচয় ও কাজ বলা হয়েছে

পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ এই সূরার ৫ম আয়াতে আমরা সরল সঠিক পথের সন্ধান চাই। তার রেসপন্স আল্লাহ পরের (২য়) সূরা আল বাকারাতেই দিয়ে দিয়েছেন। সূরার ২য় আয়াতেই কুরআনকেই আল্লাহ সরল সঠিক পথ হিসাবে বর্ননা করেছেন!  

শেষ সূরার সাথে মিলঃ এই সূরার সাথে শেষ সূরা আন নাস এর অসাধারন কিছু মিল আছে। 

আল্লাহ দিয়ে শুরু, মানুষ দিয়ে শেষ। আলহামদুলিল্লাহ দিয়ে সূরা ফাতিহা শুরু, নাস দিয়ে সূরা নাস শেষ।

সূরা আল ফাতিহার  ১ম আয়াতে ‘রব্বিল আলামীন’ (সারা জাহানের রব) বলা হয়েছে আল্লাহকে আর শেষ  সূরায় ‘রব্বিন নাস’ (মানুষের রব) বলা হয়েছে। সূরা আল ফাতিহার ৩য় আয়াতে ‘মালিকি ইয়াওমিদ্দীন’ (বিচার দিনের মালিক) বলা হয়েছে আর সূরা আন নাসের ২য়  আয়াতে ‘মালিকিন নাস’ (মানুষের মালিক) বলা হয়েছে। সূরা আল ফাতিহার ৪র্থ আয়াতে ‘ইয়্যাকা না’বুদু’ (আমরা তোমারই  ইবাদত করি) বলা হয়েছে আর সূরা আন নাসের ৩য় আয়াতে বলা হচ্ছে ‘ইলাহিন নাস’ (মানুষের মাবুদের নিকট)। সূরা আল ফাতিহায় পথনির্দেশ চাওয়া হয়েছে আর সূরা আন নাসে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। কি অসাধারন মিল!!!

‘আল্লাহ’ এর নামের পরই ১ম যে নামটি নিয়ে তিনি পরিচিত হয়েছেন তা হলো ‘রব’।  আল কুরআনের ১ম সূরা আল ফাতিহায় ১ম এ ‘আল্লাহ’ নামের পরই ব্যাপক অর্থবোধক  নাম ‘রব’ এসেছে। আবার আল কুরআনের শেষ ৩ টা সূরার দিকে তাকালে একই  ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। ১১২ তম সূরা আল ইখলাসে ‘আল্লাহ’ ও পরের ২ টা (১১৩তম  ও ১১৪ তম) সূরাতে ‘রব’ নামটি এসেছে। কি সুন্দর ধারাবাহিকতা!!! আল্লাহু  আকবার।    
এখানেই শেষ নয়! সূরা আল ফাতিহার ৭ম আয়াতে অর্থাৎ শেষ আমরা ২ ধরনের  মানুষদের মতো পরিনতি না হওয়ার জন্য দোয়া চাইছি। ‘মাগদুব’ (অভিশপ্ত) এবং ‘দললিন’ (পথভ্রষ্ট)। অন্যদিকে আর সূরা আন নাসের ৬ষ্ঠ আয়াতে অর্থাৎ শেষ  আয়াতে আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে ২ ধরনের কুমন্ত্রনাদানকারীদের থেকে।  কুমন্ত্রনাদানকারী জিন ও মানুষদের কাছ থেকে। সূরা ফাতিহার ঐ ২ ধরনের সত্তা  হলো বাহ্যিক। আর সূরা আন নাসের ঐ ২ ধরনের সত্তা হলো অভ্যন্তরীন। কি অসাধারন  মিল এই ২ সূরায়!!! সূরা আল ফাতিহায় কিছু বলতে বলা হয় নাই। এমনিতেই  আল্লাহর প্রশংসা করে কথা চালিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু পুরা কুরআন বর্ননা  করার পর আল্লাহর একটা আলাদা টান, ইনফ্লুয়েন্স চলে এসেছে মানুষের উপর। এজন্য  তিনি আমাদের বলতে বলছেন ‘কূল’ শব্দ দ্বারা। সূরা ফাতিহা পজিটিভ টোনে এগিয়েছে কিন্তু সূরা আন নাস বিপদের সময়ে আশ্রয় চাওয়ার টোনে এগিয়েছে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহই আমাদের একমাত্র সম্বল এটাই বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অসাধারন। আল্লাহ তার কুরআনে ১ম সূরার সাথে শেষ সূরার কি অপূর্ব যোগসূত্র  করে রেখেছেন। সুবহানাল্লহ!!!  

রেফারেন্স ও কৃতজ্ঞতাঃ বিভিন্ন তাফসীর, বিশেষ করে Nouman Ali Khan এর তাফসীর, বিভিন্ন লেকচার, ভিডিও ইত্যাদি।



উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)