১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

সূরার মূল থীম হলো বিস্ময়কর বিষয়। তবে কুরআন বিস্ময়কর সব কিছু সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করে দিতে পারে তাই আধুনিক যুগের নতুন কোন বিস্ময়কর বিষয় সামনে এলে কুরআন যে সমাধান দিয়ে রেখেছে তাই সর্ব শ্রেষ্ঠ সেটা মনে প্রানে বিশ্বাস করে মেনে নিতে হবে।   

দাজ্জালের ফিতনা এই উম্মাতের উপর সবচাইতে বড় ফিতনা। এই দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য সূরা আল কাহাফ বার বার পড়ার উপদেশ এসেছে। যেহেতু সবচাইতে বড় ফিতনার রক্ষাকবচ হিসাবে এই সূরাকে নির্ধারন করা হয়েছে সেহেতু বর্তমানে আমাদের সমাজে ঘটে যাওয়া অন্য যে কোন ফিতনা ঐ দাজ্জালের ফিতনা থেকে কম এটা স্বাভাবিক; আর যেহেতু দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য সূরা আল কাহাফকে রক্ষাকবচ হিসাবে নির্ধারন করা হয়েছে সেহেতু আমাদের আশেপাশের সব ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য এই সূরা অনেক কার্যকরী হবে এটাই লজিকাল। আর ৭ দিন পর পর এই সূরা পড়া, বোঝার মাধ্যমে একজন মুসলিম তার আশেপাশের ফিতনার মোকাবেলায় শক্তি পাবে এটাই আল্লাহ চান।

আল্লাহ এই সূরার শুরুতে মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় সত্য এবং এই কিতাবের চূড়ান্ত, স্পষ্ট অবস্থানের বিশ্বব্যাপী ঘোষণা দিয়ে শুরু করেছেন। মানুষের আধুনিক, পোস্ট-মডার্নিজম (Post-modernism), মনোবিজ্ঞান, তার ফাঁপা বিশ্বাস এবং তার বস্তুগত মতবাদকে মূল থেকে উপড়ে ফেলে, মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে চূড়ান্ত ঐশ্বরিক দার্শনিক চেতনার ভিত্তি স্থাপন করেছেন।

মানবিক আধুনিক দর্শন এবং লিবারেলিজম বলে যে সত্য “আপেক্ষিক” (Relative)। অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষের সত্য তার নিজের অবস্থা এবং স্বার্থ অনুসারে বাঁকা বা সোজা হতে পারে, মহাবিশ্বে কোনো এক চূড়ান্ত সত্য নেই। এর বিপরীতে আল্লাহ বলেছেন, এই কিতাব চূড়ান্ত এবং পরিপূর্ণ অটল, সুরক্ষিত। তাতে মতবাদের কোনো সংঘর্ষ, কোনো ঝুলন্ত অবস্থা বা কোনো অন্ধ মোড় নেই যা মানুষের বুদ্ধিকে কোনো বিভ্রান্তিতে ঠেলে দেয়।

এই কিতাব মুনাফেকি, দাজ্জালী ব্যবস্থার সেই 'বক্রতা' যা মানুষকে মিথ্যা এবং মন্দের মধ্যে জড়িয়ে তার আত্মাকে অন্ধ ও পঙ্গু করে দেয়। এর চূড়ান্ত প্রতিষেধক (Antidote) এই আল কুরআন।

এই সূরায় তিনি ৪ টি সুন্দর কাহিনীর সমাবেশ ঘটিয়েছেন।

তিনি কাহিনীর মাঝে মাঝে আবার কিছু উপদেশ দিয়েছেন। অসাধারনভাবে মিশিয়েছেন তিনি কাহিনী, বক্তব্য ও উপদেশ। দেখুন তার নমুনা। (১-৮) আয়াতে তিনি বক্তব্য দিয়েছেন। (৯-২৬) আয়াতে বর্ননা করেছেন আসহাবে কাহাফের ঘটনা। (২৭-৩১) আয়াতে আবার বক্তব্য দিয়ে (৩২-৪৪) আয়াতে দুটি বাগানের মালিক এর ঘটনা  বলেছেন। 

এরপর আবার লম্বা বক্তব্য ও উপদেশ দিয়েছেন (৪৫-৫৯) আয়াতে। যেহেতু বক্তব্য ও উপদেশ একটু লম্বা হয়েছে, সেজন্যই মনে হয় টানা ২ টি কাহিনী বর্ননা করেছেন তিনি (৬০-১০১) আয়াতে। সে দুটি হলোঃ মুসা (আঃ) এবং খিজির নামক জ্ঞানী ব্যক্তির ঘটনা ও যুলকারনাইন সম্পর্কিত ঘটনা। আবার সূরা শেষ করেছেন (১০২-১১০) নং আয়াতের বক্তব্য ও উপদেশ দিয়ে। কি অসাধারন কম্বিনেশন। ৪ টা ঘটনা, ৪ টা বক্তব্য ও উপদেশ এর সমাবেশ!!!           

এভাবেও বলা যায়ঃ ১ম ২ টি ঘটনা ও বক্তব্য normal symmetry তে আছে আর পরের ২ টি ঘটনা ও বক্তব্য mirror symmetry তে আছে। ১ম ১০ আয়াতকে দাজ্জালের ফিতনার বিপক্ষে রক্ষাকবচ হিসাবে অনেকে মানেন ও মুখস্ত করে পড়তে বলেন। দেখুন, ১০ম আয়াতে কি সুন্দরভাবে তৎকালীন যুবকদের দোয়ার সাথে আমাদের দোয়া মিলে যায়!      

আয়াত ২-৪ এর মধ্যে সুন্দর mirror symmetry দেখা যায়। ২য় আয়াতের শুরুর অংশ সতর্ক করার সাথে ৪র্থ আয়াতের সতর্ক করার বিষয়টি মিলে। 

২য় আয়াতের পরের অংশ সুসংবাদ ২য় আয়াতের শেষ অংশ ও ৩য় আয়াতের সাথে মিলে যায়। এই নিয়ে সুন্দর একটি গঠন লক্ষ্য করা যায় 

প্রথমে Summary  তারপর Step by Step বিশদ বর্ননাঃ 

আল্লাহর কাহিনী বর্ননা  শৈলী অসাধারন। আসহাবে কাহাফের ঘটনা প্রথমে তিনি Summary আকারে সূচনায় পুরা ঘটনাটা  বলে দিয়েছেন। তারপর Step by Step বিশদ বর্ননা দিয়েছেন। Summary বলেছেন  (১০-১৩) নং আয়াতে। এরপর ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন। ১০ নং আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন  (১৪-১৬) নং আয়াতে, ১১ নং আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন (১৭-১৮) নং আয়াতে, ১২ নং  আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন (১৯-২১) নং আয়াতে এবং ১৩ নং আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন  (২২-২৬) নং আয়াতে। কি সুন্দর Systemic বর্ননা!!!     

আসহাবে কাহাফদের আশেপাশে কোন নবী, সাহাবী, আলেম ছিলেন না বরং মুশরিকরা ছিলো তবুও তারা আল্লাহর দেখানো পথে হেদায়াত প্রাপ্ত হয়েছিলো তাদের চিন্তার পরিশুদ্ধতা, নৈতিক দৃঢ়তা ইত্যাদির কারনে। 

তাদের তেমন জ্ঞানও ছিলো না। কিন্তু সেই যে তাদের ঘটনা তা থেকে  কিয়ামত পর্যন্ত বহু জ্ঞানী প্রতি জুমুয়াবার শিক্ষা গ্রহন করতে থাকবে।       

আল কুরআন আমাদের যেমন সরাসরি বেশ কিছু যুদ্ধ কৌশল শেখায় তেমনি আত্মরক্ষা কৌশল ও শেখায়। আসহাবে কাহাফ এর যুবকরা কাপুরুষ নন বরং faith preservation strategy বা বিশ্বাস সংরক্ষন কৌশলের অংশ হিসাবে প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তার বিবেচনায় সরাসরি encounter এ না গিয়ে কৌশলগতভাবে সাময়িক সরে গিয়ে গোপন অবস্থান নিয়েছিলেন যা হিকমাহপূর্ণ আত্মরক্ষা কৌশল।

১১ নং আয়াতে আল্লাহ (Neuro-Acoustics) এবং ঘুম বিজ্ঞান (Sleep Science) এর দারুন নিদর্শন দেখিয়েছেন। যখন মানুষ গভীর ঘুমে ঘুমায়, তখন “শ্রবণ” (Hearing) সেই একমাত্র ইন্দ্রিয় ব্যবস্থা (Sensory System) যা ঘুমের মধ্যেও জাগ্রত এবং সতর্ক থাকে। সামান্য শব্দ বা ক্ষীণ আওয়াজ মানুষকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে। আল্লাহ তাদের মস্তিষ্কের “অডিটরি কর্টেক্স” (Auditory Cortex) এর সাথে বাইরের দুনিয়ার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এটা কোনো সাধারণ ঘুম ছিল না, বরং এটা সম্ভবত একটি মহাজাগতিক “সেন্সরি ডিপ্রিভেশন” (Sensory Deprivation) এবং মেটাবলিক ফ্রিজ (Metabolic Freeze) এর প্রক্রিয়া ছিল যাতে বাইরের আওয়াজ মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছানো সম্পূর্ণরূপে ব্লক করে দেয়া হয় যাতে তাদের স্নায়ু শতাব্দী ধরে সম্পূর্ণ শান্ত অবস্থায় থাকে।

১৭ এবং ১৮ নম্বর আয়াতে গুহাবাসীদের (আসহাবে কাহাফ) দীর্ঘ শত শত বছরের ঘুম, গুহার ভেতরের পরিবেশ এবং তাদের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে অবাক করা কিছু বর্ণনা রয়েছে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং শরীরতত্ত্ব (Physiology) দিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই বর্ণনাগুলোর পেছনে অত্যন্ত নিখুঁত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও জীবনরক্ষাকারী কৌশল লুকিয়ে রয়েছে।

দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকার জন্য একটি আর্দ্র, অন্ধকার এবং নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার পরিবেশ প্রয়োজন। সূর্যের আলো যদি সরাসরি তাদের শরীরে পড়ত, তবে অতিবেগুনী রশ্মি (UV rays) এবং অতিরিক্ত তাপের কারণে তাদের ত্বক পুড়ে যেত ও টিস্যু নষ্ট হতো। আলো সরাসরি না পড়লেও পাশ কেটে যাওয়ার কারণে গুহার ভেতরে বাতাস চলাচল সচল ছিল এবং পরোক্ষ আলো প্রবেশ করত। এটি গুহার ভেতরের স্যাঁতসেঁতে ভাব দূর করে ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ থেকে তাদের শরীরকে রক্ষা করেছে। অর্থাৎ তাদের জন্য Heat, ventilation, humidity and light control সঠিক ভাবে হয়েছে।


১৮ নং আয়াতে ঘুমিয়ে থাকলেও চোখ খোলা থাকার কথা এসেছে। চোখ খোলা থাকলে কর্নিয়া সরাসরি বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে। মাঝে মাঝে চোখের পলক পড়ার (Blinking) মাধ্যমে চোখের ল্যাক্রিমাল ফ্লুইড কর্নিয়াকে আর্দ্র ও সতেজ রাখে।

মেডিকেল সাইন্স বলেঃ দীর্ঘ সময় চোখ বন্ধ রাখলে অপটিক স্নায়ু সঙ্কুচিত হয়ে মারা যায় আবার দীর্ঘ সময় চোখ খোলা রাখলে কর্নিয়াসহ চোখ শুকিয়ে যায়। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় চোখ খোলা বা বন্ধ থাকলে চোখ অন্ধ হয়ে যায়।     

ঘুমিয়ে থাকাকালীন অবস্থায় আসহাবে কাহাফদের চোখ একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খোলা ও বন্ধ রাখার মাধ্যমে আল্লাহ তাদের অন্ধত্ব থেকে রক্ষা করেছেন।     

কোনো মানুষ যদি একটানা কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহ একভাবে শুয়ে থাকে, তবে শরীরের ওজনের কারণে মাটির সংস্পর্শে থাকা অংশের রক্তনালীগুলো চেপে যায়। ফলে ওই অংশের কোষগুলো অক্সিজেন ও পুষ্টি পায় না এবং পচন ধরে। একটানা শুয়ে থাকলে হাড়ের জয়েন্টগুলো শক্ত হয়ে যায়, পেশীগুলোও অকেজো হয়ে যায়।

দীর্ঘক্ষন একপাশে শুয়ে থাকলে তা ডীপ ভেইন থ্রম্বোসিস (রক্তনালিতে রক্ত জমাট বাধা) এর সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে সৃষ্ট ব্লাড ক্লট (জমাট বাঁধা রক্ত) রক্তনালির মাধ্যমে ফুসফুসে গিয়ে ফুসফুস অচল করে দিতে পারে, কখনো কখনো বা মস্তিষ্কে গিয়ে রক্তনালি বন্ধ করে দিয়ে স্ট্রোক এর সৃষ্টি করে দিতে পারে। যা মানুষকে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেয়।

এজন্য আল্লাহ তাদের পাশ পরিবর্তন করিয়েছেন, রক্ত সঞ্চালন রেখেছেন, ত্বক, পেশী সুস্থ রেখেছেন। 

সুতরাং, সূরা কাহাফে গুহাবাসীরা গুহার মধ্যে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বহু বছর প্রায় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় অবস্থায় বেঁচে ছিলেন। হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস ও বিপাকীয় হার অনেক কমে যাওয়া Hibernation, Metabolic Suppression ইত্যাদি টার্ম এর সাথে সামঞ্জস্যতা থাকতে পারে। দেহ দীর্ঘ সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খেয়ে একটি অবস্থায় পৌছে গিয়েছিল ও স্থিতিশীল ছিল যা Chronobiology টার্ম এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা যায়। দীর্ঘ সময় অপরিবর্তিত অবস্থায় ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ হিসাবে এই ঘটনাটি Time Capsule Analogy (টাইম ক্যাপসুল উপমা), ইনকিউবেশন হিসাবেও বিবেচনা করা যেতে পারে।

মানুষের সৃষ্টির সূচনা আল্লাহ নিখুঁতভাবে বর্ননা করেছেন। যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই তো জানেন কিভাবে এই সৃষ্টি হয়েছে। তাই তিনি মানুশকে তার সৃষ্টি সম্পর্কে অন্ধকারে রাখেননি, বিভিন্ন আয়াতে বলে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি ‘নুতফাহ’(নগণ্য পরিমান তরল/শুক্রাণু) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এটি পাওয়া যায় আল কুরআনের ১৬:৪, ১৮:৩৭, ২২:৫, ২৩:১৩, ৩৫:১১, ৩৬:৭৭, ৪০:৬৭, ৫৩:৪৬, ৭৫:৩৭, ৮০:১৯ তে।  

মূসা (আ) যখন অবস্থা বিবেচনায় ধৈর্য্য ধরতে পারছিলেন না তখন ১৮ নং সূরা আল কাহাফের ৭২, ৭৫ ও ৭৮ নং আয়াতে তার ধৈর্য্যে ধারণ করতে না পারার অবস্থাকে তীব্র বিবেচনায় تَسۡتَطِيۡعَ শব্দ দ্বারা বর্ননা করা হয়েছে। 

ব্যাখা প্রদান করার পর বিষয় ও রহস্যগুলো পরিষ্কার হওয়ায় তখন ধৈর্য্যে ধারণ করতে না পারার অবস্থাকে কম/মৃদু বিবেচনায় تَ বর্নটি বাদ দিয়ে تَسۡطِعْ শব্দ দ্বারা বর্ননা করা হয়েছে। অর্থাৎ মাত্রা কমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বর্ন কমিয়ে বর্ননা করা হয়েছে। আল্লাহর বর্ননা কত নিখুঁত, প্রজ্ঞাময়!

আয়াত ৯৩ অনুযায়ী দুই পর্বত এর মাঝে পাদদেশে যুলকরনাইন এমন এক জাতির সন্ধান পেলেন যারা জুলকারনাইন ও তার সেনাবাহিনীর কথা সম্পূর্ণ বুঝতে অক্ষম ছিল। এই ভাষার অবোধ্যতা (language Barrier) ও যোগাযোগের বাধা (Communication Barrier) প্রমান করে বিশ্বের মূলধারার (Mainstream) সভ্যতা ও ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। 

আয়াত ৯৪ এর আলোকে ঐ দুর্বল জাতি আপাত দৃষ্টিতে সুরক্ষিত, দুর্গম মনে হলেও কূটনীতি ও ক্ষতিকর প্রতিবেশি থেকে নিরাপদ ছিল না। সুতরাং আমাদের বর্তমানের বিশ্বায়ন ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি এর এই যুগে আমরাও নই। মানব সভ্যতার ইতিহাস এবং ভূ-রাজনীতির (Geo-politics) সচারচর নিয়ম অনুযায়ী ঐ দুর্বল জাতি যুলকারনাইনকে প্রস্তাব দেয়। ভূ-রাজনীতি অনুযায়ী যখনই কোনো দুর্বল জাতি কোনো জালিম, বর্বর ও ধ্বংসাত্মক বাইরের শক্তির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, তখন তারা নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য অপেক্ষাকৃত বড় কোন শক্তির (Super power) দিকে তাকায় বা সাহায্য চায়। সেই সাথে প্রয়োজনে কর দিয়ে বা কিছু দিয়ে দ্বি পাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক চুক্তি করে diplomacy এর মাধ্যমে নিজেদের সুরক্ষা, প্রতিরক্ষা shield, defence নিশ্চিতের চেষ্টা করে। 

আজকের কোনো মহাশক্তি (যেমন আমেরিকা বা পাশ্চাত্য দেশগুলো) যদি কোনো দুর্বল দেশকে প্রতিরক্ষা সরবরাহ করে, তবে তার বিনিময়ে তাদের সম্পদ নিংড়ে নেয়। কিন্তু সাহায্য এর কথা শুনে মহাশক্তিমান জুলকারনাইনের উত্তর ছিল এক বিশুদ্ধ আদর্শিক ও মহানুভব শাসকের উদাহরন যিনি সকল রাজাদের রাজা, সর্বশক্তিমান আল্লাহর দেয়া তার প্রতি অনুগ্রহ ও ক্ষমতা স্বীকার করে নিয়েছেন। (আয়াত ৯৫)। 

তাদের প্রতি কোন অবিচার, অত্যাচার, সাধ্যের বাইরে কিছু চাপিয়ে দেন নাই বা তাদেরকে বিনামূল্যে ভোগের অভ্যাসও গড়ে তোলাননি, তিনি রাজনৈতিক সম্প্রদায় ও সক্ষমতা গঠনের (political Community and capacity Building) নীতি প্রয়োগ করেছিলেন, মাল নয়, বরং প্রতিরক্ষার জন্য তাদের বাহুবল ও জনশক্তি চেয়েছিলেন।

আয়াত ৯৬ এর বর্ননা অনুযায়ী তিনি একটি শক্তিশালী দেয়াল নির্মান করে দেন। লোহা ও তামার সংমিশ্রনে সংকর ধাতু তৈরির ধাতবকৌশল বিদ্যা (Metallurgy) এর নিদর্শন যা সম্ভবত ঐ সময়ে পৃথিবীর মানুষ জানতো না। লোহার পাত গলিয়ে বর্জ্য দূর ও ব্যবহার উপযোগী করা, হাপরের মাধ্যমে বাতাস দেওয়া এবং এক ধাতুর উপর আরেক ধাতুর প্রলেপ এগুলো ধাতবকৌশল বিদ্যা (Metallurgy) এর মূল বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। যদি শুধু লোহাই থাকত তবে সময়ের সাথে বৃষ্টি, আর্দ্রতা ও অক্সিজেনের কারণে তাতে মরিচা (Rust / Iron Oxide) ধরত এবং সেই দেয়াল দুর্বল হয়ে ভেঙে পড়ত।  এজন্য  তামার সংমিশ্রনের উপকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা ছিল। 

যুলকারনাইন কর্তৃক তৈরিকৃত লোহা ও তার উপর তামা দিয়ে তৈরি সুদৃঢ় দেয়ালটি অতিক্রম করা যেমন কঠিন তেমনি তা ভেদ করা আরো কঠিন। 

এজন্য অতিক্রমের অক্ষমতাকে مَا اسۡطَاعُوۡۤا (মাসতঊ) এবং ভেদ করার অক্ষমতা আরো বেশি কঠিন বিধায় একটি অতিরিক্ত تَ (তা) যুক্ত করে مَا اسۡتَطَاعُوۡا (মাসতাতঊ) শব্দে বর্ননা করা হয়েছে। কি সৌন্দর্য্যময় এবং বিজ্ঞতাপূর্ন এই বর্ননা!

জুলকারনাইন দেয়ালকে নিজের প্রকৌশল, নিজের বিজ্ঞান বা সামরিক শক্তির পরিপূর্ণতা হিসেবে ঘোষণা না করে, নিজের নাম খোদাই বা নিজের মূর্তি স্থাপন না করে সরাসরি মহাবিশ্বের রবের সাথে সম্পর্কিত করে করেছেন। এই আয়াত মানুষের বস্তুগত অহংকারের সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক (Antidote)। ঐ দেয়াল ঐ সময়ে অজেয়, ভাঙা সম্ভব নয় কিন্তু এটি “অনন্তকাল” (Eternity) এর জন্য নয়। এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা এই দেয়াল ভাঙারও এক মহাজাগতিক টাইমার, কসমিক ফাইনাল ডেসটিনেশন নির্ধারণ করে রেখেছেন। যেদিন সেই সময় আসবে (অর্থাৎ কিয়ামতের নিকটবর্তী), তখন সেই বিশাল দেয়ালের কাঠামো ভেঙে যাবে এবং মহাবিশ্বের রব একে চূর্ণবিচূর্ণ করে ভূমির সমান করে দেবেন। 

সবুজ শব্দটি কুরআনে এসেছে ৮ বার। জান্নাতের দরজা ৮ টি। জান্নাতের সাথে সবুজ শব্দটি সবচেয়ে সম্পর্কিত। আল কুরআনের সূরা আনআম, ইউসুফ, কাহাফ, হজ্জ, ইয়াসীন, রহমান, দাহরে এসেছে সবুজ শব্দটি। কালো শব্দটি কুরআনে এসেছে ৭ বার। জাহান্নামের দরজা ৭ টি। জাহান্নামের সাথে কালো শব্দটি সবচেয়ে সম্পর্কিত। আল কুরআনের সূরা বাকারা, আলে ইমরান, নাহল, ফাতির, জুমার, জুখরুফ এ এসেছে কালো শব্দটি।

অর্থাৎ জান্নাত ও জাহান্নামের দরজা মোট ১৫ টি। আল কুরআনে দরজা শব্দটির বহুবচনঃ দরজাসমূহও এসেছে ১৫ বার। এগুলো এসেছে বাকারা, আনআম, আরাফ, ইউসুফ, হিজর, নাহল, সোয়াদ, জুমার, মুমিন, জুখরুফ, কমার, নাবা তে। মজার ব্যাপার হলো, ৭ম বারে আসা দরজা শব্দটির আয়াতটি জাহান্নামের দরজা সম্পর্কিত এবং ৮ম বারে আসা দরজা শব্দটির আয়াতটি জান্নাতের দরজা সম্পর্কিত। কি দারুন মিল!

৪ টি ঘটনা থেকে ৪ রকম পরীক্ষার কথা জানা যায়। আসহাবে কাহাফের ঘটনা থেকে ধর্মবিশ্বাসের উপর পরীক্ষা, দুটি বাগানের মালিক এর ঘটনা থেকে সম্পদের উপর পরীক্ষা, মুসা (আঃ) এবং খিজির নামক জ্ঞানী ব্যক্তির ঘটনা থেকে জ্ঞানের পরীক্ষা ও যুলকারনাইন এর ঘটনা থেকে ক্ষমতার পরীক্ষার বিষয়ে জানা যায়। দাজ্জাল এর সময়ে এই পরীক্ষাগুলো আসবে এবং এই সব পরীক্ষায় যেন আমরা উত্তীর্ন হতে পারি সেই লক্ষ্যেই এই সূরা আয়ত্ব করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।      

এই সূরার অন্যতম বার্তা হলো: অদেখা বাস্তবতা, চোখের সামনের দেখা বাস্তবতার মত আরেকটি শক্তিশালী বিষয়। দৃশ্যমান জগতে কাজ করছে পদার্থবিজ্ঞান, মাধ্যাকর্ষণ, রসায়ন। আর অদৃশ্য জগতে নিরন্তর কাজ করছেন স্বয়ং আল্লাহ। সূরার চারটা ঘটনা এই একটা সত্যকেই চার দিক থেকে দেখায়। আল্লাহর হস্তক্ষেপ কখন দেখা যায়, আর কখন যায় না? অর্থাৎ আল্লাহর হস্তক্ষেপের দৃশ্যময়তা। আল্লাহর হস্তক্ষেপ এর ফলাফল কি পরিত্রান বা মুক্তি নাকি আযাব বা ক্ষতি নিয়ে আসে? অর্থাৎ মোট ৪ টি কম্বিনেশন। উদাহরনে আরও সহজে বোঝা যাবে।

প্রথম ঘটনা: গুহার তরুণেরা। এখানে আল্লাহর হস্তক্ষেপ ছিল প্রকাশ্য—কয়েকজন তরুণ শত শত বছর ঘুমিয়ে থাকলেন, যা বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব। আর ফলাফলও ছিল প্রকাশ্য পরিত্রাণ। আল্লাহর হস্তক্ষেপ দেখা গেল, আর সেই হস্তক্ষেপেই এলো মুক্তি।

দ্বিতীয় ঘটনা: বাগানের মালিক। এখানেও আল্লাহর হস্তক্ষেপ প্রকাশ্য—আকাশ থেকে নেমে আসা দুর্যোগে গোটা বাগান ধ্বংস। কোনো মানুষ আগুন দেয়নি, কেউ কেটে ফেলেনি। কিন্তু এবার ফলাফলটা দেখতে বিপর্যয়। আল্লাহর হস্তক্ষেপ দেখা গেল, আর সেই হস্তক্ষেপে সব চলে গেল।

তৃতীয় ঘটনা: মুসা (আ) ও খিজির এর। খিজির নৌকা ফুটো করছেন, একটা বালককে হত্যা করছেন, বিনা পারিশ্রমিকে দেয়াল তুলে দিচ্ছেন। প্রতিটা কাজ ঘটেছে মানুষের হাতে। আল্লাহর হস্তক্ষেপ সরাসরি কোথাও চোখে পড়েনি। ফলাফলটা দেখতে বিপর্যয়। যদিও পরে খিজির এর ব্যাখ্যার পর এগুলোর পিছে আল্লাহর হস্তক্ষেপ ও ইচ্ছা এবং যুক্তি বোঝা গিয়েছিল। 

চতুর্থ ঘটনা: যুল-কারনাইন এর। তিনি পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছেন, অন্যায়ের বিচার করছেন, এক জাতিকে ইয়াজুজ-মাজুজ থেকে বাঁচাতে লোহা-তামার বিশাল প্রাচীর তুলে দিচ্ছেন। এবারও সব ঘটছে মানুষের হাতে।আল্লাহর হস্তক্ষেপ সরাসরি কোথাও চোখে পড়েনি। তবে এবার ঘটছে কল্যাণ।  

১ম ঘটনায় বিশ্বাসী যুবকেরা যেমন তাদের দ্বীন রক্ষা করার জন্য বিরুদ্ধবাদী শক্তি হতে দূরে চলে গিয়ে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলো ঠিক তেমনিভাবে মুহাম্মাদ (স) ও হযরত আবু বকর কে সাথে নিয়ে বিরুদ্ধবাদী শক্তি হতে দূরে চলে গিয়ে (হিজরত করে) গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরবর্তিতে আল্লাহ যেমন যুবকদের আবার ফিরিয়ে নিয়ে এসেছেন এবং বিজয় দান করেছেন তেমনি মুহাম্মাদ (স) ও মক্কায় ফিরে এসে বিজয় লাভ করেছেন। 

এভাবেই আল্লাহ বিভিন্ন ঘটনা থেকে বাস্তব শিক্ষা নেওয়ার উদাহরন সৃষ্টি করেছেন। এই সব ঘটনা শুধু নিছক ঘটনা নয় বরং নিজের জীবনে কাজে লাগানোর জন্যই এত সুন্দরভাবে আল্লাহ আমাদের কাছে বর্ননা করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ     

দাওয়াতঃ এ সূরায় বিভিন্নভাবে দাওয়াতের কথা এসেছে। ৪ টি ঘটনায় দাওয়াতের কথা রয়েছে। আর আল্লাহ তো সবসময়েই আমাদের দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছেন।      

১৪ নং আয়াতে যুবকগন বাদশাহকে দাওয়াত দিয়েছে (আসহাবে কাহাফের ঘটনা)  

৩৭ নং আয়াতে একজন সঙ্গী আরেক সঙ্গীকে দাওয়াত দিয়েছে (দুটি বাগানের মালিক এর ঘটনা)  

৭০ নং আয়াতে একজন শিক্ষক তার ছাত্রকে দাওয়াত দিয়েছে (মুসা (আঃ) এবং জ্ঞানী ব্যক্তির ঘটনা) 

৮৭-৮৮ আয়াতে একজন শাসক তার প্রজাদেরকে দাওয়াত দিয়েছে। (যুলকারনাইন এর ঘটনা)       

ঘটনার মিলঃ কাহিনীর ১ম ২ টা connected আবার পরের ২ টা connected.       

১ম ২ টার  connection: আসহাবে কাহাফের যুবকদের জাগতিক ম্যাটেরিয়াল ছিলো না। তাদের  ম্যাটেরিয়ালকে underestimate করা হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাদের ঐ limited material এর উপরেই সাফল্য এনে দিয়েছেন। অন্যদিকে ২ বাগানের মালিকের বিপুল


পরিমান জাগতিক materialছিলো। তাদের ম্যাটেরিয়ালকে over estimate করা হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাদের ঐ বিপুল material এর উপরে চরম ব্যর্থতা নামিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং material থাকা বা না থাকাটা মূল বিষয় না। মূল বিষয় হলো আল্লাহর পথে থাকা। আমরা যা দেখি তার উপর Rely করাটা বুদ্ধিমানের কাজ নয় বরং আল্লাহর জ্ঞান এর উপর ভরসা করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।     

পরের ২ কাহিনীর connection: মূসা (আঃ) ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং ৩ বার থেমেছেন। যুলকারনাইন ও ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং ৩ বার থেমেছেন। ২ জনই ন্যায়বিচার করার, মানুষের কল্যান করার জন্য উদগ্রীব ছিলেন। তাদের সেই ক্ষমতাও ছিলো। মূসা (আঃ) শক্তিমান নবী হওয়ার পরও তাঁর জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে কল্যান সাধন করতে পারেন নাই যদিও আল্লাহর এক বান্দাহ (খিজির) এর উপর আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান থাকার কারনে তিনি কল্যান সাধন করতে পেরেছিলেন। অপরদিকে যুলকারনাইন তাঁর জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে কল্যান সাধন করতে পেরেছিলেন। সুতরাং ন্যায়বিচার বা কল্যান সাধনের ইচ্ছা, শক্তি থাকলেই যে তা বাস্তবায়ন করা যাবে এমনটি নয়। সাথে আল্লাহর ইচ্ছা ও সাহায্যও লাগবে।      

১ম ঘটনা (আসহাবে কাহাফ) ও ৩য় ঘটনা (মূসা (আঃ) ও খিজির এর ঘটনা) এর মধ্যে কিছু মিল আছে...।।    

 # মূসা (আঃ) ও খিজির এর ঘটনায় মূসা (আঃ) তাঁর যুবক খাদেমকে সাথে নিয়ে  চলছিলেন (আয়াতঃ ৬০-৬৫)। আগের ঘটনায় আমরা দেখতে পাই যে কয়েকজন যুবক চলছিলো।     

# ১ম ঘটনায় তারা এক জায়গা থেকে পালিয়ে যাচ্ছিলো আর ৩য় ঘটনায় ২ জন (মূসা (আঃ) ও তাঁর খাদেম) এক জায়গার দিকে যাচ্ছিলেন।     

# আসহাবে কাহাফের ঘটনায় যুবকরা গুহায় বিশ্রাম নিয়েছিল, মূসা (আঃ) ও তাঁর সাথী  পাথরের পাশে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। যুবকরা ঘুম থেকে উঠে ক্ষুধার্ত হয়েছিলো  এবং এর মাঝে একটা অবাক করা ঘটনা (অনেক বছর অতিক্রান্ত হওয়া) ঘটেছিলো, মূসা (আঃ) ও তাঁর সাথীও বিশ্রাম থেকে উঠে ক্ষুধার্ত হয়েছিলেন এবং এর মাঝে একটা অবাক করা ঘটনা (মাছটি সুড়ঙ্গের মত পথ করে সাগরে চলে গিয়েছিলো) ঘটেছিলো। কি অসাধারন মিল!!!       

# ১ম ঘটনা বলার সময়ে আল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন যে ভবিষ্যতের কোন কাজ করার  ইচ্ছা করার ক্ষেত্রে বলার সময়ে ইনশা আল্লাহ বলতে (আয়াত ২৩, ২৪)। এবং কখনও ভুলে গেলে আল্লাহর স্মরন করতে। এই বিষয়টা ৩য় ঘটনায় খুব ভালো ভাবে বারবার এসেছে। ৬০ নং আয়াতে মূসা (আঃ) ইনশা আল্লাহ বলেননি, ৬১ নং আয়াতে তিনি ও তাঁর  খাদেম মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলেন। এরপর ৬৯ নং আয়াতে তিনি ইনশা আল্লাহ বলেন  এবং ধৈর্য্য ধারন করার জন্য ওয়াদা করেন। এরপর তিনি বারবার সেটা ভুলে যান। এভাবে আল্লাহ ১ম ঘটনায় দেওয়া তাঁর ঐ উপদেশের ব্যবহারিক প্রয়োগ দেখিয়ে দিয়েছেন ৩য় ঘটনায়। আলহামদুলিল্লাহ।       

আল্লাহ মহান, বান্দাহ ক্ষুদ্রঃ সূরা আল কাহাফে আল্লাহ তাঁর শক্তমান নবী যিনি কিনা সরাসরি আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন; সেই মূসা (আঃ) কে ছাত্র বানিয়েছেন আর তাঁর শিক্ষক হিসাবে কিছু সময়ের জন্য নিয়োগ করেছেন আরেকজনকে যিনি নবী নন!!! নবীকে শিক্ষা দিয়েছেন আরেকজন!!! হ্যা, এটাই হয়েছে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে দিয়ে যাকে ইচ্ছা তাকে শিক্ষা দিতে পারেন। 

আরেকটা লক্ষনীয় বিষয় হলো যিনি মূসা (আঃ) কে শিক্ষা দিয়েছেন অর্থাৎ যিনি কিছু সময়ের জন্য মূসা  (আঃ) এর শিক্ষক তাঁর পরিচয় আল্লাহ কুরআনে দিচ্ছেন এভাবে: "অতঃপর তাঁরা আমার বান্দাদের মধ্যে এমন একজনের সাক্ষাত পেলেন, যাকে আমি  আমার পক্ষ থেকে রহমত দান করেছিলাম ও আমার পক্ষ থেকে দিয়েছিলাম এক বিশেষ  জ্ঞান"। (আয়াত ৬৫) কি সিম্পল ভাবে তাঁর বর্ননা দিচ্ছেন আল্লাহ!!!  তাঁর নামও তিনি প্রকাশ করেন নাই। শুধু বলেছেন 'আল্লাহর বান্দাহ'। 

তিনি এমন একজন মানুষ যিনি আল্লাহর একজন শক্তিমান ও সবচেয়ে বেশি বর্নিত নবী তাকে শিক্ষা দিয়েছেন অথচ আল্লাহ তাকে সামান্য 'আল্লাহর বান্দাহ' বলে তার নামও প্রকাশ করলেন না!!! এর দ্বারা হয়তো তিনি এটা বোঝাতে চাইলেন যে, মানুষ যত বড়ই হোক না কেন, তিনি যত বড় নবীর শিক্ষক হোন না কেন তাঁর চাইতে আল্লাহ অসীম গুন বড়। তিনিই মহান। 

এভাবে মুহাম্মাদ (সঃ) যখন মানব জাতির ইতিহাসে সবচাইতে বেশি মর্যাদা পেয়ে উর্ধগমন করেন (মিরাজ) তখনও আল্লাহ ঐ ঘটনা বর্ননা করতে  গিয়ে মুহাম্মাদ (সঃ) কে আল্লাহর বান্দা হিসাবে বর্ননা করেছেন। অর্থাৎ মানুষ যত উপরেই উঠুক না কেন কখনও আল্লাহর সমকক্ষ হতে পারে না। তাই বড় বড় বিষয় যখন উত্থাপিত হয়েছে তখনই আল্লাহ মানুষকে তাঁর ক্ষুদ্রত্ব, অসহায়ত্বের কথা স্মরন করে দিয়েছেন। আল্লাহু আকবার     

মূসা (আঃ) ও খিজির এর ঘটনা থেকে শিক্ষা-ছাত্র-শিক্ষক বিষয়ক অনেক শিক্ষা পাওয়া যায়। তার মধ্যে কয়েকটিঃ     

 # শিক্ষককে প্রশ্ন করার সময়ে সর্বোচ্চ বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন করা  

# নিজেকে শিক্ষকের চেয়ে বেশি জ্ঞানী না মনে করা  

# ধৈর্য্য না থাকলে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করা যায় না  

# শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে শর্টকাট পদ্ধতি অবলম্বন করতে গেলে তা কোন কোন সময়ে বিপরীত ফলাফল বয়ে নিয়ে আসে      

সূরার বর্ণনায় মুসা (আ)-এর সফর শেষ হয়েছিল একটা দেয়াল দিয়ে, যুল-কারনাইনের সফরও শেষ হলো একটা দেয়াল দিয়ে। খিজিরের দেয়ালটা তোলা হয়েছিল দুই এতিমের গুপ্তধন আড়াল করতে—সেই দেয়াল একদিন ভেঙে পড়বে, এতিমরা বড় হয়ে নিচ থেকে সম্পদ বের করবে। ভেঙে পড়াটাই সেখানে রহমত। আর যুল-কারনাইনের দেয়াল ঠেকিয়ে রেখেছে ইয়াজুজ-মাজুজকে—যতদিন দাঁড়িয়ে আছে, ততদিনই রহমত; যেদিন ভাঙবে, নেমে আসবে মহাবিপর্যয়।

একটা দেয়াল ভাঙলে রহমত। আরেকটা টিকে থাকলে রহমত। আর দুটোর পরিণতিই আল্লাহ বেঁধে দিয়েছেন একই শব্দে—খিজির বললেন "রাহমাতাম মির রাব্বিক", আয়াত ৮২, যুল-কারনাইন বললেন "রাহমাতুম মির রাব্বি্‌ আয়াত ৯৮। ভাঙা-গড়া কোনোটাই এলোমেলো নয়; সবটাই এক মহাপরিকল্পনার অংশ।



আল কুরআনের আলোকে ২ ধরনের বাতাসের পার্থক্যঃ  বহুবচনের বাতাস ‘রিয়াহ’  এই বাতাস নিয়ামত হিসাবে আসে। হেলেদুলে প্রবাহিত হয়, কখনও এদিক থেকে কখনও  ওদিক থেকে বিক্ষিপ্তাকারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বইতে থাকে; কেমন যেন সেখানে অনেকগুলো বাতাস থাকে । এমন উদাহরন আছে বিভিন্ন সূরা ও আয়াতে। যেমনঃ ২:১৬৪, ৭:৫৭, ১৫:২২, ১৮:৪৫, ২৫:৪৮, ২৭:৬৩, ৩০:৪৬, ৩৫:০৯, ৪৫:০৫

অপরদিকে এক বচনের বাতাস ‘রীহ’। এই বাতাস আযাব হিসাবে আসে। বজ্রকঠিন ও একে অন্যের সাথে লাগোয়া। অনেক বেশি জমাটবাঁধা, ঘনীভূত ও সঙ্ঘত; কেমন যেন একটাই মাত্র তাবাস থাকে। এমন উদাহরন আছে বিভিন্ন সূরা ও আয়াতে। যেমনঃ  ৩:১১৭, ১৪:১৮, ১৭:৬৯, ২২:৩১, ৩০:৫১, ৩৩:৯, ৪২:৩৩, ৪৬:২৪ সাধারনভাবে একবচন ও বহুবচন নেকই ধরনের অর্থ প্রকাশ করলেও আল কুরআন এখানে বহুবচনে নিয়ামত ও একবচনে আযাব প্রকাশ করেছে।  

দাজ্জালের এক চোখের কিছু বিশ্লেষণ 

আলো দুই ধরনের। একটা বস্তুগত আলো—যেমন বাতির আলো। আরেকটা রূহানী আলো—যেমন কুরআনের আলো, হিদায়াতের আলো—অদৃশ্য জগতের আলো। আলো যেমন দুই ধরনের, দৃষ্টিও তেমনি দুই ধরনের। একটা দৈহিক দৃষ্টি—চর্মচোখ, যা বস্তুগত আলোয় দেখে। আর আরেকটা চোখ—রূহানী চোখ—যার দেখার জন্য বস্তুগত আলো লাগে না; লাগে রূহানী আলো, ওহীর আলো।

দাজ্জালের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণরূপে পার্থিব। তার গোটা দৃষ্টিভঙ্গিতে অদৃশ্য জগতের (গায়েবের) কোনো স্থানই থাকবে না। সে নানা রকম অলৌকিক কাণ্ড দেখাবে—কিন্তু সবই বস্তুগত, সবই পার্থিব। সে এই দুনিয়াটাকেই সাজিয়ে দেখাবে, আখিরাতকে নয়; মানুষকে এই দুনিয়ার সৌন্দর্যে মোহগ্রস্ত করে ফেলবে। আর তার অনুসারীরাও একরকম এক চোখওয়ালা হয়ে যাবে। কারণ তারা চোখ ছাড়া আর যে লেন্স দিয়ে দেখার কথা—রূহানী চোখ, হিদায়াত, ওহী, কুরআন, সুন্নাহ, নবীদের শিক্ষা—সেই লেন্স দিয়ে দেখা বন্ধ করে দেবে। সেই আলোর দরজা বন্ধ কারণ তারা নিজেরাই সেই চোখটা বুজে ফেলবে

হিদায়াতের চোখটা বন্ধ হলে, যখন আর হিদায়াতের লেন্স দিয়ে কিছু দেখা যায় না—তখনে থাকে কেবল বস্তুজগৎ। আর বস্তুজগৎ প্রতিনিয়ত বদলায়। ভাষা এক থাকে না। সংস্কৃতি, পোশাক, প্রযুক্তি—কিছুই না। হিদায়াতের চোখ দিয়ে দেখুন—আল্লাহ কিছু মানদণ্ড স্থির করে দিয়েছেন, চৌদ্দশ বছর আগে নাযিল করেছেন। ফ্যাশন বদলায়, ভাষা বদলায়, সংস্কৃতি বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, সরকার বদলায়—কিন্তু আল্লাহর মানদণ্ড কখনো বদলায় না। 

আর কেবল তারাই বিষয়টা এভাবে দেখতে পাবে, যাদের কোনো চোখই বন্ধ নেই। তাঁদের শারীরিক এবং রূহানী উভয় চোখই খোলা। দুনিয়া বদলালে তারা ঘাবড়াবে না। নতুন প্রযুক্তি এলে তারা আতঙ্কিত হবে না—যতক্ষণ অন্য চোখটা খোলা থাকে।

প্রতি জুমু'আয় সূরা কাহাফ কেবল একটা আমল নয়—এ যেন প্রতি সপ্তাহে রূহানী চোখটা খুলে রাখার অনুশীলন। এই সূরার ৪ টি কাহিনী ৪ ধরনের পরীক্ষা ও রূহানী চোখ খোলার এক একটা মাস্টারপিস উদাহরন। দাজ্জালের যুগ আসার আগেই তার ফিতনার মূল দর্শনটা চিনে রাখা: এক চোখে দুনিয়া দেখা। আর আমরা কিন্তু এক চোখে দুনিয়া দেখি না, আমরা উভয় চোখে দুনিয়া দেখি। 

এই সূরায় মোট ১১০ টি আয়াত আছে। প্রতিটি আয়াতেই একটি মিল রয়েছে! প্রতিটি আয়াতের শেষেই তানবীন [২ যবর (আরবীর ‘আ’ কার) বা ২ জের (আরবীর ‘ই’ কার) বা ২ পেশ (আরবীর ‘উ’ কার)] রয়েছে!!! শুধুমাত্র ১০০ তম আয়াতের শেষে নেই; তাও ঐ আয়াতের শেষে ‘লাম আলিফ’ রয়েছে যেখানে থামতে মানা। কি অসাধারন ছন্দ!!! 


আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ এর আগের (১৭ তম) সূরাটা হলো সূরা বানী ইসরঈল। এর শেষ আয়াতে বলা হলো; "বলো সকল  প্রশংসা আল্লাহর জন্য..." আর সূরা আল কাহাফ (১৮ তম সূরা) শুরু করা হলো এভাবে, "সকল  প্রশংসা আল্লাহর জন্য..." । আগের সূরা বানী ইসরঈল এর শুরু হয়েছে মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর হেদায়াত বানী  পেতে ও সান্নিধ্য অর্জন করতে উর্ধ গমন করেছেন সেই ঘটনা দিয়ে। অর্থাৎ  মুহাম্মাদ (সঃ) হেদায়াত নিতে আল্লাহর কাছে গিয়েছেন। আর এই সূরা অর্থাৎ সূরা আল কাহাফ শুরু হয়েছে আল্লাহ মুহাম্মাদ (সঃ) এর কাছে হেদায়াত বানী পাঠিয়েছেন অর্থাৎ হেদায়াত মুহাম্মাদ (সঃ) এর কাছে এসেছে এই কথা দিয়ে। 

এক সূরার পর আরেক সূরার প্লেসমেন্ট যে এতটা নিখুত তা আগে বুঝতে পারতাম না।       

১৭ তম সূরা বানী ইসরঈল ও ১৮ তম সূরা আল কাহাফ এর ১ম ও শেষ আয়াতে সুন্দর ছন্দ বিদ্যমান। এখানে সুবহানল্লহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লহ ও আল্লহু আকবার এই ৪ টি কালিমার সুন্দর ছন্দময়, চক্রাকার ব্যবহার (সরাসরি ও অর্থগত মিল) রয়েছে। 


উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ


মন্তব্যসমূহ

  1. আলহামদুলিল্লাহ
    ভাইয়া, আপনার লেখনীর ধারা আমার খুবই পছন্দ হয়♥️💖

    উত্তরমুছুন
  2. আলহামদুলিল্লাহ। অসাধারণ

    উত্তরমুছুন
  3. মা শা আল্লহ। আল্লহ পাক আপনাকে উত্তম প্রতিদান এবং হায়াতে তাইয়্যেবাহ দান করুন প্রিয় মুহতারম

    উত্তরমুছুন
  4. আলহামদুলিল্লাহ, খুবই গুরুত্বপূর্ণ নোট। জাযাকাল্লাহু খইর।

    উত্তরমুছুন
  5. মাশাআল্লাহ। আল্লাহ উত্তম জাঝাহ দান করুন।

    উত্তরমুছুন
  6. আলহামদুলিল্লাহ, অনেক গোছালো আলোচনা

    উত্তরমুছুন
  7. মাশাআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ অনেক সুন্দর হয়েছে কাজটি । সত্যিই অসাধারণ, এভাবে, এমন ভাবে যদি কোনো মানুষ পবিত্র আল-কুরআনের কোন সূরা সম্পর্কে অবগত হয়, তাহলে সেই ব্যক্তির মাঝে পুরোপুরি ওই সূরা সম্পর্কে সকল প্রকার ধারণা, যেমন কোরআন নাজিলের প্রেক্ষাপট, সময়, স্থান এ সমস্ত বিষয় আয়নার মতো একজন মানুষের স্মৃতিতে ভাসতে থাকে। মনে রাখা এবং অনুধাবন করা এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাস্তব জীবনের চলার পথে (অন্তত কাহিনীটি মনে পড়ে যাবে) কার্যে ব্যবহার করাও সম্ভব। যেটি অন্য কোথাও আজ পর্যন্ত আমি পাইনি। আপনার জন্য দোয়া ও ভালোবাসা।

    উত্তরমুছুন
  8. মা শা আল্লাহ। অনেক informative.

    উত্তরমুছুন
  9. মাশা আল্লাহ

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)