৯৩। সূরা আদ দুহা (পূর্বাহ্নের সূর্যকিরন)
মুহাম্মাদ (সঃ) এর উপর কিছুদিন আল কুরআন নাযিল হওয়া বন্ধ ছিলো। তখন মুশরিকরা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতে শুরু করলো ও বলতে লাগলো, আজ কিছু নাযিল হয়নি? আসলে আল্লাহ তোমাকে পরিত্যাগ করেছেন ও তোমার উপর অখুশি হয়েছেন। এতে মুহাম্মাদ (সঃ) কিছুটা বিচলিত ও মর্মাহত হয়ে পড়েছিলেন। মনের কোনে হয়ত এমন চিন্তাও উঁকি দিয়েছিলো যে, তাঁর কোন ভুল হয়ে যাচ্ছে না তো? সেই সময়েই সূরা আদ দুহা নাযিল হয় মুহাম্মাদ (সঃ) কে সান্তনা দেয়ার জন্য ও কঠিন সময়ে আশার বানী এবং শক্তি যোগানোর জন্য। আল কুরআন যেহেতু সার্বজনীন পথ প্রদর্শক, জীবনের গাইডবুক; তাই এভাবে মুহাম্মাদ (সঃ) এর সকল উম্মত তথা মানবজাতির জন্য সান্তনাদায়ক হিসাবে এই সূরাটি নাযিল হয়েছে। আমার আপনার কঠিন সময়ের মধ্যে আশার আলো হিসাবে এই সূরাটি কাজ করে। অনেকেই আশপাশ থেকে অনেক কথা বলবে কিন্তু মনে রাখতে হবে আল্লাহ আমাদের সাথেই আছেন।
সূরার শুরুতে ১ম আয়াতে আল্লাহ শপথ করেছেন। যে দুটি বিষয়ের শপথ করেছেন তা খুবই যৌক্তিক ও ভাবার্থ্পূর্ন। ‘দুহা’ বলতে এমন একটা সময় বোঝায় যখন দিনের কর্মব্যস্ততা শুরু হয় এবং সূর্যের আলোও প্রখর নয়। ২য় আয়াতের ‘লাইল’ বলতে রাত বোঝায়। এখানে বলা হয়েছে যখন তা গভীর ও নিঝুম হয়। তখন শান্তি ও বিশ্রাম নেয় মানুষ। সূর্যের আলোর উপস্থিতি (দুহা) ও অনুপস্থিতি (লাইল) এর মাধ্যমে ওহী এর উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। দুটিই প্রকৃতির অংশ এবং দুটিরই দরকার আছে। সবসময় দিনের আলো থাকলে যেমন শান্তি পাওয়া যেত না তেমনি সবসময় ওহীর আগমনও শান্তিদায়ক নয়। দিনের পর রাত আসে আবার রাতের পর দিন; এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। তেমনি কিছু সময় ওহীর অনুপস্থিতি ও উপস্থিতিও তেমন একটি প্রক্রিয়া। সূর্যের কষ্টদায়ক প্রখর রোদের সময়ের শপথ না করে ‘দুহা’ এর শপথ করা হয়েছে অর্থাৎ আল্লাহ এমন বেশি কষ্ট দিতে চান না যেন তার নবী অতিরিক্ত ওহীর ভার সহ্য করতে না পারেন। এজন্যই ওহীর বিরতি। আলোকে সাধারনত আশা হিসাবে বিবেচনা করা হয়; বলা হয় আশার আলো। তাই আল্লাহ শুরুতেই আশার বানী শুনিয়েছেন। আবার প্রশান্তির রাতের কথা বলে আল্লাহ তার প্রিয় নবীকে প্রশান্ত করেছেন।
৩য় আয়াতে আল্লাহ সরাসরি নবীকে আশ্বস্ত করেছেন যে, তিনি তাঁকে পরিত্যাগ করেননি এবং তার প্রতি খারাপ ধারনা পোষন করে বা তার কাজে অখুশি হয়ে তার প্রতি বিরুপ হননি। বরং এটা একটি স্বাভাবিক ঘটনা।
এরপর আল্লাহ আশ্বস্ত করার সাথে সাথেই ৪র্থ ও ৫ম আয়াতে উত্তম ভবিষ্যত ও সন্তোষজনক প্রতিদান এর আগাম সুসংবাদ জানিয়ে আরো প্রফুল্ল ও উজ্জীবিত করতে চেয়েছেন তাঁর প্রিয় নবীকে।
৬ষ্ঠ থেকে ৮ম আয়াতে আল্লাহ তাঁর নবীকে কি (ইয়াতীম, সথিক পথ প্রত্যাশী, অভাবযুক্ত) অবস্থায় পেয়েছেন এবং এরপর কিভাবে তাঁকে নিজ রহমতের চাদর দিয়ে ঢেকে দিয়ে অবস্থার উন্নতি সাধন করেছেন তা উল্লেখ করে মনে করিয়ে দিয়েছেন এবং আগের ২ আয়াতের ভবিষ্যতবানী যে সঠিক হবে তাঁর একটি নমুনা দেখিয়ে দিয়েছেন।
৯ম আয়াতে ইয়াতিমদের প্রতি কঠোর না হওয়ার নির্দেশনা এসেছে। ৬ষ্ঠ আয়াতে ইয়াতিমের প্রতি আল্লাহর আচরনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মানুষকেও আল্লাহ তাঁর গুনে গুণান্বিত হওয়ার আহবান জানিয়েছেন। এতিমরা সমাজের সবচাইতে অসহায় মানুষ। তাই তাদের প্রতি কঠোরতা অবলম্বন করা উচিৎ নয়। বিশেষ করে মুহাম্মাদ (স) এতিম ছিলেন তাই তিনি এই নির্দেশের মর্ম সবচাইতে ভালো বুঝতে পেরেছেন। সার্বজনীন এই নির্দেশের মাধ্যমে ইসলাম সমাজে সম্মান ও সহমর্মিতার সুন্দর সংস্কৃতি উপহার দিতে চায়।
১০ম আয়াতে প্রার্থীদেরকে তিরস্কার করতে নিষেধ করা হয়েছে। যার আছে আর যার নেই, উভয়েই আল্লাহর বান্দা। যার আছে তার সব কিছুই আল্লাহরই দেয়া, নিজের কিছু নেই। মানুষ আসলে প্রকৃত মালিক নয়। তাই যে চাইতে আসে (প্রার্থী) তাকে তিরস্কার করা যাবে না। এই আদেশ ও তা প্রয়োগের মাধ্যমে সামাজিক মর্যাদা ও ভারসাম্যও বজায় থাকে।আসলে এই সূরাটি শুধু মুহাম্মাদ (স) এর জন্য প্রশান্তি দায়ক ও আশার বানী হিসাবে নয় বরং যুগে যুগে সকল পেরেশান মানুষের জন্য একটি অতি গুরুত্বপূর্ন ও কার্যকরী সূরা। হতাশার আঁধার ফুঁড়ে এই সূরাটি যেন আশার আলো হয়ে জ্বলতে থাকে।
আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ সূরা আল লাইলে মূলত ভালো মানুষের একটি স্তর (সাহাবী) এর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পরের ২ টি সূরায় সরাসরি মুহাম্মাদ (স) এর কথা এসেছে। এই সূরা দুহায় মুহাম্মাদ (স) কে সান্তনা দেওয়া হয়েছে ও তাঁর প্রতি অনুগ্রহ বর্ননা করা হয়েছে এবং পরের সূরা আল ইনশিরাহ তে মুহাম্মাদ (স) কে সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। আল্লাহ ৯২-৯৪ এই ৩ সূরায় মানুষের ভালো থেকে ভালোর দিকে অর্থাৎ উচু থেকে উচু স্তরে ক্রমানুসারে উঠিয়েছেন (সাহাবী-নবী মুহাম্মাদ)। পরে আবার ৯৫-৯৬ তম সূরায় নিচু থেকে নিচু স্তরের মানুষদের বর্ননা এসেছে।






Mashallah
উত্তরমুছুন