১০৫। সূরা আল ফীল (হাতি)
সূরাটি ভালভাবে বোঝার জন্য পটভূমি জানা প্রয়োজন। তৎকালীন ইয়েমেন এর খ্রীস্টান শাসক ছিলো আবরাহা। কাবাকে ঘিরে মক্কায় ধর্মীয় কেন্দ্র ও সেই সুবিধায় অর্থনৈতিক, বানিজ্যিক কেন্দ্রে রুপান্তরিত হওয়ায় আবরহা ঈর্ষায় ফেটে পড়ে। সে কাবার সাথে চ্যালেঞ্জ করার জন্য ইয়েমেনের রাজধানী সানায় একটি বিশাল গির্জা নির্মাণ করেছিল এবং আশা করেছিল মানুষ এখানে আসবে ও নতুন কেন্দ্রে পরিনত হবে ইয়েমেন। কিন্তু এই কাজে তেমন কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। এজন্য সে ক্ষুদ্ধ হয়ে কাবা ধ্বংসের উদ্যোগ নেয়। যদিও সে এটাকে ধর্মীয় যুদ্ধ হিসাবে দেখাতে চায় কিন্তু তার মনে ছিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। সে বিশাল বিশাল হাতি (৯-১৩ টি) ও বিপুল সৈন্য (৬০ হাজার) নিয়ে কাবার অভিমুখে রওনা হয়।
রাসূল (স) জন্মের বছর এটি ঘটে। এটি এত গুরুত্ব পুর্ন একটা ঘটনা ছিল যে সেই বছরকে হস্তী বাহিনীর বছর নামে অভিহিত করা হয়। তখন কুরইশরাসহ সকলে এত বড় বাহিনী ও হাতি দেখে ভীত হয়ে দূরে অবস্থান করে।
সূরার সারসংক্ষেপঃ
সূরার শুরুতেই ১ম আয়াতে আল্লাহ তার নবীকে বলছেন, তুমি কি দেখনি? এখানে বলা দরকার নবী এর জন্মের আগেই ঘটেছিল তাই তাঁর এটি দেখার কথা নয়। কিন্তু এই ঘটনা এত প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল যে তা এক প্রকার দেখার মতই হয়ে গিয়েছিল।
এরপর আল্লাহ বললেন, যে তুমি কি জানোনা যে তোমার রব কিভাবে, কি উপায়ে ব্যবহার করেছেন? ‘কি উপায়ে’ তিনি তাদের ব্যর্থ করে দিয়েছেন বলে আল্লাহ তার ডিটেইল বর্ননা এর পরেই তিনি দিয়ে দিয়েছেন। এখানে আল্লাহ ‘রব্বুকা’ মানে তোমার রব বলে নবীর সাথে তাঁর সম্পর্কের গভীরে প্রবেশ করে আশস্ত করতে চেয়েছেন যে, তোমার রব যেহেতু আগেও বিরুদ্ধচারনকারীদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে পেরেছেন তাই তোমার জন্য তিনি এখনো এই ধরনের কাজ করতে পরিপূর্ন ক্ষমতাবান।
আল্লাহ ঐ বাহিনীকে আসহাবে ফিল বলে বর্ননা করেছেন। এর দ্বারা আরো একটি বিষয় উঠে এসেছে তা হলো আল্লাহ ঐ হতভাগার নাম নেননি এই পবিত্র কুরআনে এবং তার পরেও এমন যত হতভাগা আসবে পৃথিবীতে সবাইও একই ধরনের পরিনতির সম্মুখিন হবে। অর্থাৎ আল্লাহ ইতিহাস সংরক্ষন করেছেন।
২য় আয়াতে বোঝানো হয়েছেঃ বৃহৎ হাতি বাহিনীসহ প্রচন্ড ক্ষমতাশালী, দাম্ভিক (হাতি বাহিনীর নেতা) আবরাহাকে আল্লাহ প্ল্যান করতে, তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে পর্যন্ত সুযোগ দিয়েছেন।
এই আয়াতের ‘ইয়াজয়াল’ দ্বারা বুঝায় যে কোন কিছু ছিল এবং তা রুপান্তর করা হলো; অর্থাৎ আল্লাহ তাদের প্ল্যানকে শুরু থেকে ঠিকঠাক মত হতে দিয়েছেন, বাঁধা দেন নাই। এবং তা শেষ মুহুর্তে রুপান্তর করে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে দিয়েছেন। আল্লাহ হস্তী বাহিনীকে শুরু থেকে প্ল্যান করে এগিয়ে যেতে দিয়েছেন; মাঝপথে বাঁধা দেন নাই, বুঝতে দেন নাই যে শেষে তিনি কি করবেন। অর্থ জোগাড়, আর্মি ট্রেনিং, সাজসজ্জা, সফর ইত্যাদি সব করে কাবাঘর পর্যন্ত পৌছে দিয়েছেন। কিন্তু সবশেষে তাদের পুরা প্ল্যান, আয়োজন সব কিছু ভন্ডুল করে দিয়ে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছেন।
‘কায়িদা’ শব্দটি এখানে ব্যবহার করা হয়েছে যার অর্থ গোপন ষড়যন্ত্র। এখানে গোপন কি ছিল? আক্রমন তো প্রকাশ্য ছিল। আসলে তার আক্রমন টি ধর্মীয় কাবাঘরের প্রতি ধর্ম যুদ্ধের লেবাস পরিহিত থাকলেও গোপনে তার উদ্দেশ্য ছিল মক্কার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্য সরিয়ে ইয়েমেন এ আনা। ‘তাদলিল’ এর অর্থ এমনভাবে ধ্বংস হওয়া যার আর ব্যবহার যোগ্যতা না থাকে। তার এই আক্রমন এমনভাবে বিফলে গিয়েছিল যে সে ওখানে না মরে ইয়েমেন এ গিয়ে মরে এবং পরে ইয়েমেন বাসী আর কাবাকে আক্রমনের কথা চিন্তা করেনি। তার সেই গির্জাও আর চালু হয়নি।
এরপর (৩য় আয়াতে জানা যায়) তাকে শায়েস্তা করতে আল্লাহ তাঁর ক্ষুদ্র পাখিকে ব্যবহার করেছেন। এখানে ‘তইরন’ একটি সমষ্টিবাচক বহুবচন যার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পাখিকে বোঝানো হয়েছে এবং শব্দের উপর ‘তানভিন’ বিষয়টার ভয়াবহতা প্রকাশ করেছে। আবাবিল অর্থ ঝাঁকে ঝাঁকে বহু পাখি। পাখিগুলো তাদেরকে চিবানো খড় কুটার মত করে সকল দাম্ভিকতাসহ ছোট পাথরের মাধ্যমে (৪র্থ আয়াত অনুযায়ী) গুড়িয়ে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এখানে তারমিহিম এর রমি অর্থ নির্দিষ্ট টার্গেটে নিক্ষেপ করা। এখানে পাখিদের ২ পা ও ঠোটে বহন করে আনা পাথর তারা হস্তিবাহিনীর প্রত্যেকের মাথার খুলি বরাবর টার্গেট করে নিক্ষেপ করে।
সূরা আল ফিল থেকে সব যুগের সব অসৎ, অত্যাচারী, দাম্ভিক ক্ষমতাশালীরই শিক্ষা নেওয়া উচিৎ আর তাদের মোকাবেলায় আল্লাহ যে কতটা পারদর্শী সে সম্পর্কে সকল যুগের সকল মুমিনেরই বিশ্বাস রাখা উচিৎ।
আল্লাহ তাআলা এই সূরায় ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, কাবার মর্যাদা যারা লঙ্ঘন করতে যাবে তাদেরকে তিনি অমর্যাদাকর পরিনতি দান করবেন। আগে আবরাহা কাবার ক্ষতি করতে এসেছিল, আর রাসূল (স) এর যুগের কাবার তত্ত্বাবধায়করাও কাবার অমর্যাদা করছিল একে শিরকের মধ্যে ডুবিয়ে রাখার মাধ্যমে। আর মুহাম্মাদ (স) কে আল্লাহ এই সূরায় এই বিষয়টি দেখিয়েছেন যে, পূর্বে যেমন আল্লাহ কাবাকে রক্ষা করেছেন তেমনি সামনে মুহাম্মাদ (স) এর রবই মুহাম্মাদ (স) এর মাধ্যমে কাবার নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার দ্বারা কাবার বিরোধীদের শায়েস্তা করবেন, কাবাকে বিপদমুক্ত করবেন।
আল্লাহ আবরাহার বাহিনীর করুন পরিনতি মুহাম্মাদ (স) কে জানানোর মাধ্যমে তাঁর মনে প্রশান্তি এনে দিয়েছিলেন এবং সেই সাথে ভবিষ্যতে পবিত্র কাবাঘর হতে মূর্তি/শিরক অপসারনের প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন
পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ ১০৬ তম সূরা আল কুরইশ (goo.gl/zfWSpu) এর সাথে ১০৫ তম সূরা আল ফিলের মিল খুব বেশি। অনেকে এই ২ টিকে একসাথে মিলিয়ে পড়েন ও একই ধারাবাহিক সূরা মনে করেন। সূরা ফিলে কুরইশদের আবরাহার ভীতি থেকে মুক্ত করে নিরাপত্তা দানের কথা বলা হয়েছে, যা সূরা আল কুরইশ এর শেষ আয়াতেও পুনরায় আল্লাহ বলেছেন। অর্থাৎ ১০৫ তম সূরা আল ফিল এ কুরইশদের শান্তি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা এবং ১০৬ তম সূরা আল কুরইশে কুরইশদের সমৃদ্ধির (অর্থনৈতিক ও খাদ্যের) কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎসূরা আল ফিল এ আবরাহার বাহিনীর আক্রমন প্রতিহত করে আল্লাহ কুরইশদের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন এবং সূরা আল কুরইশ এ চলাচল ও ব্যবসায়িক নিরাপত্তা দানের মাধ্যমে আল্লাহ কুরইশদের ক্ষুধা ও ভয় হতে নিরাপদ করেছেন।
অবাক করা ব্যাপার হলো, এই চাওয়া ছিলো কিন্তু মুসলিমদের জাতির পিতা, কাবা ঘর ও এই মক্কা নগরীর প্রতিষ্ঠাতা হযরত ইবরহীমের!!! দেখুন তিনি কি দোয়া করেছিলেনঃ আর এও স্মরণ করো যে, ইবরাহীম দোয়া করেছিলঃ “হে আমার রব! এই শহরকে শান্তি ও নিরাপত্তার শহর বানিয়ে দাও। আর এর অধিবাসীদের মধ্য থেকে যারা আল্লাহ ও আখেরাতকে মানবে তাদেরকে সব রকমের ফলের আহার্য দান করো।” জবাবে তার রব বললেনঃ “আর যে মানবে না, দুনিয়ার গুটিকয় দিনের জীবনের সামগ্রী আমি তাকেও দেবো। কিন্তু সব শেষে তাকে জাহান্নামের আযাবের মধ্যে নিক্ষেপ করবো এবং সেটি নিকৃষ্টতম আবাস।” (সূরা আল বাকারা, আয়াত ১২৬) আল্লাহ তাঁর দোয়াকে কবুল করেছেন যার প্রমান সূরা ফিল ও কুরইশ। আল্লাহু আকবার।
সূরা আল ফিল এর ১ম আয়াতে আল্লাহ নিজেকে মুহাম্মাদ (স) এর রব হিসাবে পরিচয় দেন। সূরা আল কুরইশ এর ৩য় আয়াতে আল্লাহ নিজেকে কাবা এর রব হিসাবে পরিচয় দেন। সূরা আন নাছর এর ১ম আয়াতে আল্লাহ মুহাম্মাদ (স) কেকাবার নিয়ন্ত্রণ দেন। অর্থাৎ সূরা আল ফিল ও আল কুরইশ এ যথাক্রমে মুহাম্মাদ (স) ও কাবার রব হিসাবে আল্লাহ নিজেকে পরিচিত করার মাধ্যমে অতি দ্রুতই তিনি তাঁর রাসূলকে তাঁর ঘরের নিয়ন্ত্রণ দিবেন মর্মে ইঙ্গিত দেন। এই ইঙ্গিত বাস্তবে রূপ নেয় সূরা আন নাছরে; আল্লাহর সাহায্যে মুহাম্মাদ এর মক্কা বিজয় ও কাবার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার মাধ্যমে।
এটা এমন হয়েছে যে, এক সূরায় আল্লাহ বীজ লাগান, আরেক সূরায় গাছ জন্মায়, আরেক সূরায় তাঁর ফুল ফোটে, ফল হয়! এখানে আল্লাহ সূরা আল ফিল এ বীজ, আল কুরইশ এ গাছ ও সূরা আন নাছর এ ফুল ও ফল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।
বিশেষ কিছুঃ আল্লাহ হস্তিবাহিনী বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এখানে উদ্ধত আবরাহার নাম পর্যন্ত নেন নাই। তিনি আবরাহাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে বরং হাতির দিকে ফোকাস করিয়েছেন।
কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে এমন জীব জন্তুর (মানুষ বাদে) সংখ্যা অনেক। এর মধ্যে সবচেয়ে শেষে বর্ননা করা হয়েছে ‘হাতি’ এর নাম। যেই হাতি হলো সচারচর দেখা যায় এমন সবচাইতে বড় প্রানী। সর্বপ্রথম উল্লেখ করা হয়েছে কোনটি জানেন? সচারচর দেখা যায় এমন সবচেয়ে ক্ষুদ্র ও আপাতদৃষ্টিতে সবচেয়ে দূর্বল; মশার কথা। “অবশ্য আল্লাহ লজ্জা করেন না মশা বা তার চেয়ে তুচ্ছ কোন জিনিসের দৃষ্টান্ত দিতে। যারা সত্য গ্রহণকারী তারা এ দৃষ্টান্ত –উপমাগুলো দেখে জানতে পারে এগুলো সত্য, এগুলো এসেছে তাদের রবেরই পক্ষ থেকে, আর যারা (সত্যকে) গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয় তারা এগুলো শুনে বলতে থাকে, এ ধরনের দৃষ্টান্ত –উপমার সাথে আল্লাহর কী সম্পর্ক? এভাবে আল্লাহ একই কথার সাহায্যে অনেককে গোমরাহীতে লিপ্ত করেন আবার অনেককে দেখান সরল সোজা পথ” -(২য় সূরা আল বাক্বারা- আয়াত ২৬)।
সুতরাং, একদম শুরুতে ছোট ও একদম শেষে বড়। কি সুন্দর আল্লাহর sequence!!! হবেই বা না কেন বলুন? সবই তো তারই সৃষ্টি ।
কাব্য, ছন্দ পারদর্শিতার আরব যুগে আল কুরআন দিয়েছে শৈল্পিক কাব্য, ছন্দের অনন্য উদাহরন। একারনে ঐ যুগেও আল কুরআন ছিল এক বিস্ময়কর সাহিত্য। সূরা আল ফীল এর সব আয়াতের শেষেই ل ‘লাম’ এর অপূর্ব ছন্দ পাওয়া যায়।











মাশা আল্লাহ। সুন্দর।
উত্তরমুছুনঅসাধারণ
উত্তরমুছুনVery nice
উত্তরমুছুন