৫৯। সূরা আল হাশর

সূরার ১০ আয়াতে রব্বানা শব্দটি এসেছে। ‘রব্বি’ ও ‘রব্বানা’ শব্দটি মূলত দুটি করে শব্দ। ‘ইয়া রব্বি’ ও ‘ইয়া রব্বানা’। কিন্তু ‘ইয়া’ বা ‘হে’ শব্দটি আল্লাহর ক্ষেত্রে বিলুপ্ত করে ব্যবহার করা হয়। আল্লাহ  আমাদের খুবই কাছের, আপন বিধায় দূরবর্তি সংক্রান্ত শব্দ ‘হে’ বাদ দিয়ে শুধু রব্বি বা রব্বানা বলা হয়। সুবহানাল্লহ!

তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে আল্লাহও তাদেরকে করেছেন আত্মভোলা; এরা পাপাচারী লোক  ৫৯ তম সূরা আল হাশর, আয়াত ১৯

আল্লাহকে ভুলে গেলে আসলে নিজেকেই ভুলে যাওয়া হয়। মানুষ তখন তার বাস্তবতা, অস্তিত্ব সম্পর্কেই সন্দিহান, বিভ্রান্ত হয়ে যায়। কিসে তার মূল্যায়ন তা বুঝতে পারে না। আত্মমর্যাদা হারিয়ে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। স্রষ্টাকে না চিনলে, তার সাথে সম্পর্ক না রাখলে সৃষ্টি মূল্যহীন হয়ে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। তখন মানুষ স্রষ্টার উচ্চ মর্যাদা ও স্ট্যান্ডার্ড বাদ দিয়ে আশেপাশের নিচু সৃষ্টির স্ট্যান্ডার্ড গ্রহণ করে নিজেকে এক প্রকার গননার বাইরে বা অদৃশ্য করে তোলে। 

সাধারন মানুষ ও জীন জাতিকে আল্লাহ সার্বক্ষনিক একটানা তাসবিহ পাঠকারী (মুসাব্বিহুন) হিসাবে বিশেষ্যবাচক শব্দে উল্লেখ করেননি বরং তাসবিহ পাঠ করা সংক্রান্ত ক্রিয়া বাচক শব্দে (সাব্বাহা) উল্লেখ করেছেন।  কারন তারা দিনের কিছু সময় তাসবিহ পাঠ করলেও সারাক্ষন একটানা তাসবিহ পাঠ করা হয়ে ওঠে না। এই সূরার শুরু হয়েছে এভাবে। 

তবে ব্যতিক্রম হযরত ইউনুস (আ), তিনি মাছের পেটে চলে যাওয়ার পর মুসাব্বিহুন হয়ে একটানা তাসবিহ পাঠ করতে থাকেন, যার ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তাকে উদ্ধার করেন। (সূরা আস সফফাত আয়াত ১৪৩ ) 

সেই সাথে ফেরেশতারাও একটানা তাসবিহ পাঠকারী (মুসাব্বিহুন) যার প্রমান মেলে সূরা আস সফফাত এর ১৬৬ নং আয়াতে 

বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কালের ক্রিয়ার কাল মোট ৩ টি হলেও আরবীতে ২ টি শব্দে তা প্রকাশ করা হয়ে থাকে। মাদ্বী দ্বারা অতীত আর মুদ্বারি দ্বারা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উভয়ই বুঝায়। সূরা  হাদীদ, হাশর ও সফ এর শুরুতে তাসবীহ পাঠ করার মাদ্বী তথা অতীত এর ক্রিয়া আবার সূরা জুমুয়াহ ও তাগাবুন এর শুরুতে তাসবীহ পাঠ করার মুদ্বারি তথা বর্তমান ও ভবিষ্যত এর ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে।   

সূরাগুলোর মূল বিষয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটা খুবই সঙ্গতিপূর্ণ। সূরা  হাদীদ, হাশর ও সফ এর মূল বিষয় সূরার অতীত সংশ্লিষ্ট এবং সূরা জুমুয়াহ ও তাগাবুন এর মূল বিষয় বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সংশ্লিষ্ট। মাশা আল্লাহ, সুন্দর, প্রজ্ঞাপূর্ণ মিল

সূরা হাশর, সফ, জুমুয়া এবং তাগাবুন এর শুরু হয়েছে আসমানসমূহে যা কিছু আছে  ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর তাসবিহ করে দিয়ে। এরপর আয়াতে এসেছে যমীনের সাথে সংশ্লিষ্ট নানা বিষয় তাই শুরুর আয়াতে পরের আয়াতগুলোর সাথে মিল রেখে আলাদা করে যমীনের বর্ননার সময় অতিরিক্ত وَمَا فِى  শব্দ এসেছে। 

অন্যদিকে সূরা হাদিদ এ আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর তাসবিহ করে দিয়ে শুরু হয়েছে। এরপর কয়েকটি আয়াতে এসেছে আল্লাহর গুনগান  ও  বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বর্ণনা।যেহেতু পরের আয়াতগুলোতে যমীনের বিষয় কম বর্ননা তাই শুরুর আয়াতে অতিরিক্ত শব্দ নাই। কি দারুন মিল। পরবর্তি প্রেক্ষাপটের সাথে পুর্ববর্তি শব্দের অপূর্ব সামঞ্জস্যতা  

আল কুর আনের সূরা গুলোর আয়াত ও ক্রম নিয়ে দারুন একটি বিশ্লেষণ। অবাক করার মত। আমরা জানি, আল কুরআনের মোট সূরা সংখ্যা ১১৪ টি। এর মধ্যে আয়াত সংখ্যা জোড় এমন সূরা ৫৪ টি, অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা বিজোড় এমন সূরা ৬০ টি। আয়াত সংখ্যা জোড় এমন সূরা ৫৪ টির মধ্যে ক্রম জোড় এমন সূরা ১৭ টি এবং ক্রম বিজোড় এমন সূরার সংখ্যাও সমান ১৭ টি। 

অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা বিজোড় এমন সূরা ৬০ টির মধ্যে ক্রম জোড় এমন সূরা ৩০ টি এবং ক্রম বিজোড় এমন সূরার সংখ্যাও ৩০ টি। 

আবার, আয়াত সংখ্যা জোড়+ক্রম জোড়, আয়াত সংখ্যা বিজোড়+ ক্রম বিজোড় এগুলোকে সমজাতীয় বলা হলে এমন সমজাতীয় সূরার সংখ্যা ৫৭ টি, অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা জোড়+ক্রম বিজোড়, আয়াত সংখ্যা বিজোড়+ ক্রম জোড় এগুলোকে অসমজাতীয় বলা হলে এমন অসমজাতীয় সূরার সংখ্যাও ৫৭ টি। 

এখানেই শেষ নয়, আয়াত সংখ্যা+ক্রম এটা যোগ করলে যোগফল জোড় এমন সূরার সংখ্যা ৫৭ টি আবার অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা+ক্রম এটা যোগ করলে যোগফল বিজোড় এমন সূরার সংখ্যাও ৫৭ টি এভাবে আল কুর আনে সূরার সংখ্যা, আয়াত সংখ্যা, ক্রম ইত্যাদি খুব সুন্দরভাবে গোছানো, বেশ অবাক করা তাইনা?
উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)