৬৬। সূরা তাহরীম

যারা কুফরী করেছে (আল্লাযী-না কাফারু) ও যারা কাফির (কাফিরুন) তাদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যারা কুফরী করেছে শব্দগুলো ক্রিয়া/কাজ এর সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং কাফিরুন শব্দটি বিশেষ্য এর সাথে সম্পর্কযুক্ত। সাধারনত ক্রিয়া পরিবর্তনশীল ও অস্থায়ী এবং বিশেষ্য গুনবাচক ও স্থায়ী হয়, অস্তিত্বের সাথে মিশে যায় এমন।  ৭ নং আয়াতে এই বিষয়টি লক্ষ্যনীয়। 

যারা কুফরী করেছে বলতে সেই সব মানুষদের বোঝায় যারা অন্তরে কুফর লালন করে এবং তেমন কাজও করে তবে এখনো পুরাপুরি কাফির হিসাবে স্থায়ী ও দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়নি, এখনও তাওবার সুযোগ আছে। অপরদিকে কাফিরুন বলতে সেই সব মানুষদের বোঝায় যারা অন্তরে কুফর লালন করে এবং তেমন কাজও করে এবং কুফরীতে তারা স্থায়ী ও দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।  

এই পার্থক্য আল্লাহই ভালভাবে করতে পারেন। 

আল্লাহ ৪ ধরনের মানুষদের ৪ ভাবে চিত্রায়িত করেছেন; ও হে যারা ঈমান এনেছ, মুমিন, ও হে যারা কুফরী করেছ, ও হে যারা কাফির। মুমিনদের একান্ত নৈকট্য ও যারা ঈমান এনেছে তাদের ক্ষেত্রে কিছুটা দূরত্ব রাখলেও যারা কুফরী করেছে ও কাফির উভয়ের ক্ষেত্রেই আল্লাহ দূরত্বসূচক শব্দ ইয়া (ও হে) ব্যবহার করেছেন 


সূরাটি শুরু হয়েছে "ইয়া আইয়্যুহান্নাবী"—হে নবী! সম্বোধন করে।সূরাটির শেষ অনুচ্ছেদও শুরু হয়েছে ঠিক একই সম্বোধনে—"ইয়া আইয়্যুহান্নাবী"! কিন্তু দুই জায়গায় প্রসঙ্গ সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুরুতে আলোচনা নবীজী (স)-এর একান্ত ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে: আর শেষে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নয়, বরং কাফের, মুনাফেকদের বিরুদ্ধে তাঁর মহান ঐশ্বরিক মিশনের কথা। আল্লাহ কোন বিষয়টিকে সূরার শুরুতে রাখলেন? ব্যক্তিগত বিষয়টিকে! মদিনার শাসক হিসেবে অভ্যন্তরীণ সংকট সামলানো, ইসলামকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত শত্রুদের মোকাবেলা করা—এসব বিশাল দায়িত্বের আলোচনা এলো পরে। যেন আল্লাহ আমাদের শেখাচ্ছেন—আপনার ব্যক্তিগত জীবন যদি শৃঙ্খলাপূর্ণ না হয়, ঘরের ছোট ছোট বিষয়গুলো যদি আবেগের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে জীবনের বড় দায়িত্বগুলো আপনি কখনোই পূর্ণ সামর্থ্যে পালন করতে পারবেন না। ঘর ঠিক তো মিশন ঠিক।

সূরার দ্বিতীয় স্তরে। শুরুর দিকে রয়েছে নারীদের একটি ঘটনা—নবীজী (স) তাঁর এক স্ত্রীকে একটি গোপন কথা বলেছিলেন, কিন্তু সেই আমানত রক্ষিত হয়নি। আর শেষের দিক থেকে দ্বিতীয় অংশে? আবারও নারীদের কথা! তবে এবার ইতিহাসের চার নারীর অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত। নূহ (আ) ও লুত (আ)-এর স্ত্রী—শ্রেষ্ঠ পরিবেশে থেকেও যারা ব্যর্থ। ফেরাউনের স্ত্রী—জঘন্যতম পরিবেশে থেকেও যিনি জান্নাতের ঘরের জন্য দুআ করেছেন। আর মারইয়াম (আ)—পবিত্র নারী, পবিত্র পরিবেশ। ভালো ঘরে মন্দ নারী, মন্দ ঘরে ভালো নারী, ভালো ঘরে ভালো নারী। একটি সম্ভাবনা বাকি রইলো—মন্দ ঘরে মন্দ নারী। সেটার জন্য আলাদা সূরা রয়েছে: "তাব্বাত ইয়াদা আবি লাহাব"—আবু লাহাবের স্ত্রী, লাকড়ি বহনকারিণী! এই দৃষ্টান্তগুলোর মূল বার্তা: আপনার পরিবেশ আপনার পরিণতি নির্ধারণ করে না—ঈমানই নির্ধারণ করে।

এই আয়না-বিন্যাসের একদম কেন্দ্রে কী রইলো? তওবা। আল্লাহ প্রথমে সেই দুই স্ত্রীকে সম্বোধন করলেন: —তোমরা উভয়ে যদি আল্লাহর কাছে তওবা করো... আর যদি না করো? তাহলে আল্লাহ, জিবরীল, নেককার মুমিনগণ এবং ফেরেশতারা সবাই রাসূলের পক্ষে। আর এর আয়না-প্রতিবিম্বে আল্লাহ সমগ্র উম্মাহকে ডাকলেন: —হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর কাছে তওবা করো। সুবহানাল্লাহ! ক্রিয়াপদ পর্যন্ত মিলে যাচ্ছে—"তাতুবা" আর "তুবু"। এমনকি দুই জায়গাতেই ফেরেশতাদের উল্লেখ—একদিকে রাসূলের সাহায্যকারী ফেরেশতা, অন্যদিকে জাহান্নামের কঠোর ফেরেশতা, যারা কোনো অজুহাত শুনবেন না।


আল কুর আনের সূরা গুলোর আয়াত ও ক্রম নিয়ে দারুন একটি বিশ্লেষণ। অবাক করার মত। আমরা জানি, আল কুরআনের মোট সূরা সংখ্যা ১১৪ টি। এর মধ্যে আয়াত সংখ্যা জোড় এমন সূরা ৫৪ টি, অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা বিজোড় এমন সূরা ৬০ টি। আয়াত সংখ্যা জোড় এমন সূরা ৫৪ টির মধ্যে ক্রম জোড় এমন সূরা ১৭ টি এবং ক্রম বিজোড় এমন সূরার সংখ্যাও সমান ১৭ টি। 

অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা বিজোড় এমন সূরা ৬০ টির মধ্যে ক্রম জোড় এমন সূরা ৩০ টি এবং ক্রম বিজোড় এমন সূরার সংখ্যাও ৩০ টি। 

আবার, আয়াত সংখ্যা জোড়+ক্রম জোড়, আয়াত সংখ্যা বিজোড়+ ক্রম বিজোড় এগুলোকে সমজাতীয় বলা হলে এমন সমজাতীয় সূরার সংখ্যা ৫৭ টি, অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা জোড়+ক্রম বিজোড়, আয়াত সংখ্যা বিজোড়+ ক্রম জোড় এগুলোকে অসমজাতীয় বলা হলে এমন অসমজাতীয় সূরার সংখ্যাও ৫৭ টি। 

এখানেই শেষ নয়, আয়াত সংখ্যা+ক্রম এটা যোগ করলে যোগফল জোড় এমন সূরার সংখ্যা ৫৭ টি আবার অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা+ক্রম এটা যোগ করলে যোগফল বিজোড় এমন সূরার সংখ্যাও ৫৭ টি এভাবে আল কুর আনে সূরার সংখ্যা, আয়াত সংখ্যা, ক্রম ইত্যাদি খুব সুন্দরভাবে গোছানো, বেশ অবাক করা তাইনা?

উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)