৩১। সূরা লুকমান

হেদায়াত এর আলো আল্লাহ যে শুধু অতি উত্তম সৎকর্মশীলদের জন্য (৩১ তম সূরা লুকমান, আয়াত ২,৩)  তা নয়, বরং সাধারন মুমিন, মুত্তাকী পর্যন্ত বিস্তৃত (১০ তম সূরা ইউনুস, আয়াত ৫৭ ২য় সূরা বাকারা, আয়াত ২)। শুধু তাই নয়, আসলে এই হেদায়াত সকল মানুষের উপরই আল্লাহ সহজ করে দিয়েছেন।  (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৬) 

৩১ নং সূরা লুকমানের নং আয়াত এ বর্নিত শ্রোতা এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সে অহংকারবশতঃ এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয় যেন সে তা শুনতেই পায়নি, যেন তার দুই কানে বধিরতা আছে। মূলত অসার কথাবার্তা, হৈ হুল্লোড়, গান বাজনা তাকে শুনতে বাঁধা দেয়। 

অন্যদিকে একই ধরনের, প্রায় কাছাকাছি বর্ননা বিশিষ্ট আরেকটি আয়াত আছে ৪৫ তম সূরা জাসিয়াহ, আয়াত ৮ এ। তবে সেখানে বর্নিত শ্রোতা এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে; শোনে যা তার সামনে পাঠ করা হয়, অতঃপর ঔদ্ধত্যের সাথে অটল থাকে যেন সে তা শোনেইনি। অর্থাৎ এখানে বর্নিত শ্রোতা আরেক কাঠি সরেস; ভালভাবে শুনলেও অহংকার, দাম্ভিকতা তাকে দূরে রাখে, আবার সে পরবর্তীতে এ নিয়ে ঠাট্টাও করে।  আল্লাহ আমাদের এমন ২ ধরনের শ্রোতা না বানান। আমিন। 

১৭ নং আয়াতটি প্রাকৃতিক বিপদের সাথে সংশ্লিষ্ট। এজন্য এখানে সবর করা ছাড়া কিছু করার থাকে না, ক্ষমার বিষয় আসে না। তাই এই আয়াতে সবরকে সাধারন দৃঢ় সংকল্পের পরিচায়ক বলা হয়েছে। 

অন্যদিকে ৪২ নং সূরা শুরা এর ৪৩ নং আয়াতটি অন্যের দ্বারা সৃষ্ট বিপদের সাথে সংশ্লিষ্ট; এজন্য এখানে ক্ষমার বিষয় এসেছে। প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা করা উচ্চ নৈতিকতার পরিচায়ক। তাই এ আয়াতে অতিরিক্ত লাম ব্যবহার করে সবরকে অবশ্যই দৃঢ় সংকল্পের পরিচায়ক বলা হয়েছে। কি অসাধারন আল্লাহর শব্দ্‌ বর্ন চয়ন ও সঠিক প্রয়োগ! আমাদের এ থেকে অনেক শিক্ষা গ্রহনের সুযোগ রয়েছে। 

গাধার ডাক প্রকৃতির অন্যতম তীব্র, কর্কশ এবং অদ্ভুত একটি আওয়াজ। কুরআনে এই আওয়াজকে সবচেয়ে অপ্রীতিকর হিসেবে বর্ণনা করার পেছনে গভীর কিছু প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে।মানুষ বা অন্যান্য সিংহভাগ প্রাণী কেবল শ্বাস ছাড়ার সময় (Exhalation) শব্দ করতে পারে। কিন্তু গাধা একমাত্র প্রাণী যা শ্বাস নেওয়ার সময় (Inhalation) এবং শ্বাস ছাড়ার সময় (Exhalation) উভয় অবস্থাতেই সমান তীব্রতায় শব্দ উৎপন্ন করতে পারে। গাধা যখন বুক ফুলিয়ে বাতাস ভেতরে টানে তখন একটি উচ্চ কম্পাঙ্কের তীক্ষ্ণ শব্দ (অ্যাঁ) হয়, আর যখন তীব্র চাপে বাতাস বের করে দেয় তখন একটি গভীর ও কর্কশ শব্দ (চুঁ) হয়। এই অনবরত ইন-আউট বাতাসের ঘর্ষণ এবং ল্যারিংসের (Vocal cords) তীব্র কম্পনের ফলেই এই অদ্ভুত কর্কশ করাত কাটার মতো আওয়াজের সৃষ্টি হয়। গাধার ডাকের তীব্রতা প্রায় ৮০ থেকে ৯০ ডেসিবেল (dB) পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এটি একটি ব্যস্ত রাস্তার ট্রাফিক জ্যাম বা একটি বড় কারখানার ভেতরের শব্দদূষণের মাত্রার সমান। মরুভূমি বা খোলা প্রান্তরে গাধার এই তীব্র ডাক প্রায় ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার দূর থেকেও স্পষ্টভাবে শোনা যায়। গাধা মূলত একাকীত্ব দূর করতে বা অনেক দূরে থাকা অন্য সঙ্গীদের সাথে যোগাযোগ করতে এভাবে চিৎকার করে। মরুভূমির তীব্র গরমে যখন একে অপরকে দেখতে পায় না, তখন এই উচ্চ শব্দই তাদের একমাত্র ভরসা। মানসিক চাপে থাকলে কিংবা প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত হলে, বিপদে পড়লে এদের ডাকের তীব্রতা ও কর্কশতা বেড়ে যায়।

অনুগ্রহসমুহ বহুবচনমূলক; তবে এর শক্তিশালী ও দুর্বল অবস্থা রয়েছে। নিয়ামাহু (অনেক অনেক অনুগ্রহসমুহ; শক্তিশালী বহুবচন) অবস্থা ও আনউমিহি (অল্প  সংখ্যক অনুগ্রহসমুহ; দুর্বল বহুবচন) অবস্থা


৩১ নং সূরা লুকমান এর ২০ নং আয়াতে আল্লাহ মানুষদের প্রতি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনুগ্রহসমুহ এর কথা বর্ননা করেছেন। এই সকল অনুগ্রহের সংখ্যা আসলে অগনিত বলা যায় তাই এজন্য শক্তিশালী বহুবচনমুলক শব্দ এই আয়াতে ব্যবহৃত হয়েছে। 

অপরদিকে ১৬ নং সূরা নাহল এর ১২১ নং আয়াতে ইবরাহিম (আঃ) কর্তৃক আল্লাহর প্রতি  কৃতজ্ঞতা আদায়ের কথা বর্নিত হয়েছে যেখানে তিনি কেবলমাত্র অল্প সংখ্যক অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পেরেছেন। এজন্য দুর্বল বহুবচনমুলক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। 

আল্লাহ রাতকে দিনের মধ্যে এবং দিনকে রাতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেন। এখানে  অন্তর্ভুক্ত করা বলতে ধীরে ধীরে ক্রমান্বয়ে রাত থেকে দিনে বা দিন থেকে রাতে রুপান্তরিত হওয়া বুঝায়। গোলাকার হলেই এমন হতে পারে। চ্যাপ্টা বা সমান হলে হঠাৎ করে রাত বা দিন হয়ে যেত,  ক্রমান্বয়ে না। সুতরাং এই আয়াত পৃথিবী গোলাকার হওয়ার ইঙ্গিত। 

চাঁদ (কমার) শব্দটি আল কুরআনে এসেছে ২৭ বার (৬ঃ৭৭, ৬ঃ৯৬, ৭ঃ৫৪, ১০ঃ৫, ১২ঃ৪, ১৩ঃ২, ১৪ঃ৩৩, ১৬ঃ১২, ২১ঃ৩৩, ২২ঃ১৮, ২৫ঃ৬১, ২৯ঃ৬১, ৩১ঃ২৯,৩৫ঃ১৩, ৩৬ঃ৩৯, ৩৬ঃ৪০, ৩৯ঃ৫, ৪১ঃ৩৭, ৫৪ঃ১, ৫৫ঃ৫, ৭১ঃ১৬, ৭৪ঃ৩২, ৭৫ঃ৮, ৭৫ঃ৯, ৮৪ঃ১৮, ৯১ঃ২)। 


অবাক করা বিষয় হল চাঁদ পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতে ২৭ দিন সময় লাগে। তবে এই সময়ে পৃথিবী আবার সূর্যকে কেন্দ্র করে ২ দিন এগিয়ে যায়। এজন্য চাঁদকে আরও দুদিন বেশি ঘুরতে হয় এজন্য চন্দ্র মাস ২৯ দিনে হয়। 
আল কুর আনের সূরা গুলোর আয়াত ও ক্রম নিয়ে দারুন একটি বিশ্লেষণ। অবাক করার মত। আমরা জানি, আল কুরআনের মোট সূরা সংখ্যা ১১৪ টি। এর মধ্যে আয়াত সংখ্যা জোড় এমন সূরা ৫৪ টি, অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা বিজোড় এমন সূরা ৬০ টি। আয়াত সংখ্যা জোড় এমন সূরা ৫৪ টির মধ্যে ক্রম জোড় এমন সূরা ২৭ টি এবং ক্রম বিজোড় এমন সূরার সংখ্যাও সমান ২৭ টি। 

অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা বিজোড় এমন সূরা ৬০ টির মধ্যে ক্রম জোড় এমন সূরা ৩০ টি এবং ক্রম বিজোড় এমন সূরার সংখ্যাও ৩০ টি। 

আবার, আয়াত সংখ্যা জোড়+ক্রম জোড়, আয়াত সংখ্যা বিজোড়+ ক্রম বিজোড় এগুলোকে সমজাতীয় বলা হলে এমন সমজাতীয় সূরার সংখ্যা ৫৭ টি, অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা জোড়+ক্রম বিজোড়, আয়াত সংখ্যা বিজোড়+ ক্রম জোড় এগুলোকে অসমজাতীয় বলা হলে এমন অসমজাতীয় সূরার সংখ্যাও ৫৭ টি। 

এখানেই শেষ নয়, আয়াত সংখ্যা+ক্রম এটা যোগ করলে যোগফল জোড় এমন সূরার সংখ্যা ৫৭ টি আবার অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা+ক্রম এটা যোগ করলে যোগফল বিজোড় এমন সূরার সংখ্যাও ৫৭ টি এভাবে আল কুর আনে সূরার সংখ্যা, আয়াত সংখ্যা, ক্রম ইত্যাদি খুব সুন্দরভাবে গোছানো, বেশ অবাক করা তাইনা?
উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)