৩৭। সূরা আস সফফাত

সূরা আস সফফাত আয়াত ১৪৩২ নং আয়াতের বর্ননামতে ইউনুস (আ.)-কে যে মাছটি গিলেছিল, সেটি সম্ভবত ছিল একটি Blue Whale বা নীল তিমি। একটি পূর্ণাঙ্গ নীল তিমির মুখ এতটাই বড় হয় যে, তার মুখের ভেতর একসাথে প্রায় ১০০ জন মানুষ অনায়াসে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে। তিমির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এরা খাবার চিবিয়ে খায় না। এদের মুখের ভেতরে মানুষের মতো দাঁত থাকে না, বরং 'ব্যালিন' (Baleen) নামক এক ধরণের ছাঁকনি থাকে। ফলে এরা যেকোনো বড় বস্তুকে আস্ত বা আক্ষরিক অর্থেই সরাসরি গিলে (Swallow) ফেলে। এই কারণেই হযরত ইউনুস (আ.) কোনো চোট বা আঘাত পাওয়া ছাড়াই আস্ত মাছের পেটে চলে গিয়েছিলেন।

সাধারণত যেকোনো প্রাণীর পেটের ভেতরের পরিবেশ কোনো মানুষের বেঁচে থাকার জন্য সম্পূর্ণ প্রতিকূল। তবে ইউনুস (আ.)-এর ক্ষেত্রে আল্লাহর বিশেষ হুকুম ছিল যেন মাছটি তাকে হজম না করে বা ক্ষতি না করে। কটি তিমির পাকস্থলীতে অত্যন্ত শক্তিশালী এসিড (যেমন হাইড্রোক্লোরিক এসিড) এবং এনজাইম থাকে, যা শক্ত হাড় বা কচ্ছপের খোলসকেও গলিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু আল্লাহর কুদরতে সেই এসিড ইউনুস (আ.)-এর শরীরকে স্পর্শ করেনি। তিমির পেটের ভেতর বাতাস বা অক্সিজেনের কোনো সরবরাহ থাকে না। উপরন্তু সেখানে তীব্র কার্বন-ডাই-অক্সাইড এবং অন্যান্য গ্যাসের আধিক্য থাকে। বিজ্ঞানীদের মতে, কোনো অলৌকিক সুরক্ষা ছাড়া সেখানে কয়েক মিনিটের বেশি মানুষের বেঁচে থাকা অসম্ভব।

পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭ তে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত ইউনুস (আ.) "অন্ধকার থেকে" আল্লাহকে ডেকেছিলেন। মুফাসসিরগণের মতে, এই অন্ধকার ছিল মূলত তিন স্তরের বা তিনটি গভীর অন্ধকার: প্রথম অন্ধকার: গভীর সমুদ্রের অন্ধকার (সমুদ্রের নির্দিষ্ট গভীরতার পর সূর্যের আলো একদম পৌঁছায় না)। দ্বিতীয় অন্ধকার: মাছের পেটের ভেতরের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। তৃতীয় অন্ধকার: মেঘাচ্ছন্ন রাতের অন্ধকার (যে রাতে ঘটনাটি ঘটেছিল)। এই অলৌকিক ও ভীতিকর পরিবেশেই তিনি তাঁর সেই বিখ্যাত দোয়াটি পাঠ করেন: "লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ জোয়ালেমিন। এই দোয়া পাঠ না করলে আল্লাহ তাকে ঐ অবস্থায় কিয়ামত পর্যন্ত রেখে দিতেন। আল্লাহ দোয়া কবুল ও উদ্ধারকারী।

সাধারন মানুষ ও জীন জাতিকে আল্লাহ সার্বক্ষনিক একটানা তাসবিহ পাঠকারী (মুসাব্বিহুন) হিসাবে বিশেষ্যবাচক শব্দে উল্লেখ করেননি বরং তাসবিহ পাঠ করা সংক্রান্ত ক্রিয়া বাচক শব্দে (সাব্বাহা) উল্লেখ করেছেন। কারন তারা দিনের কিছু সময় তাসবিহ পাঠ করলেও সারাক্ষন একটানা তাসবিহ পাঠ করা হয়ে ওঠে না। এই সূরার শুরু হয়েছে এভাবে।
তবে ব্যতিক্রম হযরত ইউনুস (আ), তিনি মাছের পেটে চলে যাওয়ার পর মুসাব্বিহুন হয়ে একটানা তাসবিহ পাঠ করতে থাকেন, যার ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তাকে উদ্ধার করেন। (সূরা আস সফফাত আয়াত ১৪৩ )। সেই সাথে ফেরেশতারাও একটানা তাসবিহ পাঠকারী (মুসাব্বিহুন) যার প্রমান মেলে সূরা আস সফফাত এর ১৬৬ নং আয়াতে

১৭৫ নং আয়াতে যারা কুফুরী করে তাদেরকে দেখতে বলছেন আল্লাহ। এরপর তাদেরকে উপেক্ষা করতে বলেছেন। এরপর আল্লাহর শাস্তি তাদের উপর নেমে আসে। 

আয়াত ১৭৯ তে সকালে তাদের উপর নেমে আসা আল্লাহর শাস্তির দিকে দৃষ্টিপাত করতে বলা হয়েছে তাদেরকে উল্লেখ না করে; যেন তারা দৃশ্যপটে, ইকুয়েশনে বা ধর্তব্যেই নেই। 

আল কুর আনের সূরা গুলোর আয়াত ও ক্রম নিয়ে দারুন একটি বিশ্লেষণ। অবাক করার মত। আমরা জানি, আল কুরআনের মোট সূরা সংখ্যা ১১৪ টি। এর মধ্যে আয়াত সংখ্যা জোড় এমন সূরা ৫৪ টি, অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা বিজোড় এমন সূরা ৬০ টি। আয়াত সংখ্যা জোড় এমন সূরা ৫৪ টির মধ্যে ক্রম জোড় এমন সূরা ১৭ টি এবং ক্রম বিজোড় এমন সূরার সংখ্যাও সমান ১৭ টি। 

অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা বিজোড় এমন সূরা ৬০ টির মধ্যে ক্রম জোড় এমন সূরা ৩০ টি এবং ক্রম বিজোড় এমন সূরার সংখ্যাও ৩০ টি। 

আবার, আয়াত সংখ্যা জোড়+ক্রম জোড়, আয়াত সংখ্যা বিজোড়+ ক্রম বিজোড় এগুলোকে সমজাতীয় বলা হলে এমন সমজাতীয় সূরার সংখ্যা ৫৭ টি, অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা জোড়+ক্রম বিজোড়, আয়াত সংখ্যা বিজোড়+ ক্রম জোড় এগুলোকে অসমজাতীয় বলা হলে এমন অসমজাতীয় সূরার সংখ্যাও ৫৭ টি। 

এখানেই শেষ নয়, আয়াত সংখ্যা+ক্রম এটা যোগ করলে যোগফল জোড় এমন সূরার সংখ্যা ৫৭ টি আবার অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা+ক্রম এটা যোগ করলে যোগফল বিজোড় এমন সূরার সংখ্যাও ৫৭ টি এভাবে আল কুর আনে সূরার সংখ্যা, আয়াত সংখ্যা, ক্রম ইত্যাদি খুব সুন্দরভাবে গোছানো, বেশ অবাক করা তাইনা?

উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ


 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)