আরবী ভাষায় 'আম' এবং 'সানাহ' শব্দ দুটি দিয়ে বছর বোঝায়। তবে আম শব্দটি ব্যবহার হয় ভাল অর্থের ক্ষেত্রে ও সানাহ শব্দটি ব্যবহার হয় খারাপ অর্থের ক্ষেত্রে।
২৯ নং সূরা আল আনকাবুত, আয়াত ১৪ এ আল্লাহ বলেছেন, আমি নূহকে তার সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলাম, অতঃপর সে পঞ্চাশ বছর কম হাজার বছর তাদের মাঝে অবস্থান করেছিল। অতঃপর মহাপ্লাবন তাদেরকে গ্রাস করল কারণ তারা ছিল সীমালঙ্ঘনকারী।
নূহ (আ) এর সম্প্রদায় অনেক বেশি বছর ধরে আল্লাহর নাফরমানী করে ও নবীর দাওয়াত গ্রহন করতে অস্বীকার করে, অল্প বছর অল্প কিছু অনুসারী বাদে। এজন্য আল্লাহ বেশি সময় প্রকাশক হাজার বছরের ক্ষেত্রে নেতিবাচক শব্দ সানাহ এবং কম সময় প্রকাশক পঞ্চাশ বছরের ক্ষেত্রে ইতিবাচক শব্দ ‘আম’ ব্যবহার করেছেন। কি অসাধারন সামঞ্জস্যপূর্ন আল্লাহর শব্দচয়ন!
মাকড়সা জাল প্রকৃতির সেরা শক্তিশালী ম্যাটেরিয়াল। এটি স্টিলের চেয়েও বেশি শক্তিশালী, ফ্লেক্সিবল। কিন্তু এই ম্যাটারিয়াল দিয়ে তৈরি জাল আর্কিটেকচারালি এবং স্ট্রাকচারালি এমন ভাবে অ্যারেঞ্জড যে এটি উইকেস্ট ডিজাইনে একত্রিত হয়। এটি সহজেই ভঙ্গুর ও ধ্বংসযোগ্য। অর্থাৎ স্ট্রঙ্গেস্ট মেটেরিয়াল ইজ ইউজড ইন উইকেস্ট ওয়ে।
এই সূরাতে ৪১ নং আয়াতে আল্লাহ বিরোধীদের মাকড়সার সাথে তুলনা করা হয়েছে। কাফেরদেরও মাকড়সার মত বেস্ট material, বেস্ট মানি, ওয়েপন থাকে কিন্তু তাদের প্ল্যানিং এবং এক্সিকিউশন সবচেয়ে দুর্বল হয়। অর্থাৎ উপাদান যতই শক্তিশালী হোক, সঠিক লক্ষ্য ও মজবুত ভিত্তি (ঈমান) ছাড়া সব পরিকল্পনাই মাকড়সার জালের মতো নড়বড়ে।
সাধারন বাসার সংজ্ঞার সাথে মিলে না মাকড়সা এর বাসা। এই বাসা একেবারে খোলা। কোন প্রোটেকশন নাই; ঝড়, বৃষ্টি, রোদ থেকে। এটা কোন সুরক্ষা দেয় না বরং অন্যকে আক্রমন করার জন্য, ফাঁদে ফেলে হত্যা করা বা খেয়ে ফেলার জন্য বানানো। নিজে নিজে টিকে থাকতে পারে না, অন্য কিছুর অবলম্বন লাগে, যার সাহায্যে বোনা হয় জাল। এটা আসলে কোন বাসাই না, এটি প্রকৃতিতে বড়ই বেমানান।
মাকড়সার বাসা যে শুধু কার্যকারিতা, গঠনেই দুর্বল এমন নয়। বাসার আরেকটি অর্থ হল পারবারিক স্থায়িত্ব বা সম্পর্ক, সেদিক থেকেও এই বাসা বা মাকড়সার আচরণ দুর্বলতম। মাকড়সার জগত বেশ বৈচিত্র্যময় এবং কখনো কখনো বেশ নিষ্ঠুর। তারা শুধু অন্য পতঙ্গই নয়, বরং নিজের প্রজাতির সদস্যদেরও খেয়ে ফেলে।
অনেক প্রজাতির স্ত্রী মাকড়সা মিলনের পর পুরুষ মাকড়সাটিকে খেয়ে ফেলে। এর ফলে স্ত্রী মাকড়সা প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়, যা তার ডিম পাড়তে সাহায্য করে। কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে মা মাকড়সা নিজেই নিজেকে সন্তানদের জন্য উৎসর্গ করে। বাচ্চাগুলো জন্মের পর তাদের মাকে জীবন্ত খেয়ে বড় হয়। ডিম ফুটে বের হওয়ার পর খাবারের অভাব হলে বা শক্তিশালী হওয়ার জন্য বড় বাচ্চারা অনেক সময় তাদের ছোট ভাই-বোনদের খেয়ে ফেলে।
আল কোরআনে বর্ণিত পোকামাকড়ের তিনটি সূরা আন নাহল (মৌমাছি), সূরা আন নামল (পিঁপড়া) এবং সূরা আল আনকাবুত (মাকড়সা) সূরাতেই তাদের ঘরের কথা বলা আছে। মজার ব্যাপার হল এই তিন প্রজাতির নারীরাই মূলত ঘর বানায়, পুরুষরা নয়। এটি কি মানুষের বিপরীতে প্রকৃতিতে ব্যাল্যান্স?
মৌমাছি এবং পিঁপড়া এর শব্দ আন নাহল ও আন নামল বহুবচনে এলেও মাকড়সা এর শব্দ আল আনকাবুত একবচনে এসেছে আল কোরআনে।
মৌমাছি এবং পিঁপড়ারা অনেকে একসাথে দলবদ্ধ ভাবে, সামাজিকভাবে থাকে এবং একসাথে বাসা তৈরি করে। অন্যদিকে মাকড়সা একাই থাকে এবং একাই বাসা তৈরি করে।
১১ তম সূরা হুদ, আয়াত ৭৭ এ আল্লাহর পাঠানো ফেরেশতাগণের লূত (আ) এর নিকট আগমনের কথা বর্ননা করা হয়েছে। অন্যদিকে ২৯ তম সূরা আনকাবুত, আয়াত ৩৩ এ এই আয়াতে আল্লাহর পাঠানো ফেরেশতাগণের দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর অবশেষে লূত (আ) এর নিকট আগমনের কথা বর্ননা করা হয়েছে।

সূরা হুদের আয়াতটি এবং সূরা আনকাবুত এর আয়াতটি প্রায় একই শব্দসমূহ দিয়ে গঠিত হলেও সূরা আনকাবুত এর আয়াতে আন (اَنۡ) শব্দটি বেশি রয়েছে; যার দ্বারা বোঝানো হয় দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর অবশেষে আল্লাহর পাঠানো ফেরেশতাগণের লূত (আ) এর নিকট আগমন করেছেন। এটি মূলত দুই সূরার নাযিলের সময়কাল ও প্রেক্ষাপটের দিকে নজর দিলে সুস্পষ্ট হবে। সূরা হুদ নাযিল হয় মুহাম্মাদ (স) এর দাওয়াতের শুরুর দিকে, তখন নির্যাতন কম ছিল। এরপর সূরা আনকাবুত নাযিল হয়েছিল যখন নির্যাতন চরমে পৌঁছে। এজন্য সেই সূরায় এই ঘটনা বলার সময় বলা হয়েছে যে, দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর অবশেষে আল্লাহর সাহায্য বা ব্যবস্থা হিসাবে ফেরেশতাগণকে পাঠানো হয়। এই ঘটনার দ্বারা যেন মুহাম্মাদ (স) এর কাছে ইঙ্গিত দেয়া হয় যে, লূত (আ) এর ঘটনার মত দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর অবশেষে আল্লাহর সাহায্য আসন্ন। কি সুন্দর আল্লাহর বাচনভঙ্গি, শব্দচয়ন, সময়কাল ও প্রেক্ষাপটের সামঞ্জস্যতা
চাঁদ (কমার) শব্দটি আল কুরআনে এসেছে ২৭ বার (৬ঃ৭৭, ৬ঃ৯৬, ৭ঃ৫৪, ১০ঃ৫, ১২ঃ৪, ১৩ঃ২, ১৪ঃ৩৩, ১৬ঃ১২, ২১ঃ৩৩, ২২ঃ১৮, ২৫ঃ৬১, ২৯ঃ৬১, ৩১ঃ২৯,৩৫ঃ১৩, ৩৬ঃ৩৯, ৩৬ঃ৪০, ৩৯ঃ৫, ৪১ঃ৩৭, ৫৪ঃ১, ৫৫ঃ৫, ৭১ঃ১৬, ৭৪ঃ৩২, ৭৫ঃ৮, ৭৫ঃ৯, ৮৪ঃ১৮, ৯১ঃ২)।
অবাক করা বিষয় হল চাঁদ পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতে ২৭ দিন সময় লাগে। তবে এই সময়ে পৃথিবী আবার সূর্যকে কেন্দ্র করে ২ দিন এগিয়ে যায়। এজন্য চাঁদকে আরও দুদিন বেশি ঘুরতে হয় এজন্য চন্দ্র মাস ২৯ দিনে হয়।
মা বাবার সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘ইহসান’ শব্দটি ব্যবহার করে হয়েছে প্রায় সব ক্ষেত্রেই তবে একটি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে ‘হুসন’ শব্দটি। আরবীতে শব্দের ক্ষেত্রে একই ধরনের শব্দে বর্ণ সংখ্যা বেশি হলে তার অর্থতেও সেই প্রভাব পড়ে, বেশি বর্ণ মানে বেশি প্রকট অর্থ বুঝায়। স্বাভাবিকভাবে ২:৮৩, ৪:৩৬, ৬:১৫১, ১৭:২৩, ৪৬:১৫ আয়াতগুলোতে নেককার মা বাবা হওয়ায় তাদের প্রতি ইহসান বা সর্বোচ্চ সুন্দর ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ। অন্যদিকে ২৯:৮৮ আয়াতে সর্বোচ্চ সুন্দর ব্যবহারের চেয়ে কম মাত্রার অর্থবহ ‘হুসন’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে সেই সকল মা বাবার প্রতি যারা শিরক করার জন্য চাপ দেয়। আল্লাহর শব্দ ব্যবহার কত যুক্তিপূর্ণ ও নিখুঁত!

আল কুর আনের সূরা গুলোর আয়াত ও ক্রম নিয়ে দারুন একটি বিশ্লেষণ। অবাক করার মত। আমরা জানি, আল কুরআনের মোট সূরা সংখ্যা ১১৪ টি। এর মধ্যে আয়াত সংখ্যা জোড় এমন সূরা ৫৪ টি, অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা বিজোড় এমন সূরা ৬০ টি। আয়াত সংখ্যা জোড় এমন সূরা ৫৪ টির মধ্যে ক্রম জোড় এমন সূরা ২৭ টি এবং ক্রম বিজোড় এমন সূরার সংখ্যাও সমান ২৭ টি।
অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা বিজোড় এমন সূরা ৬০ টির মধ্যে ক্রম জোড় এমন সূরা ৩০ টি এবং ক্রম বিজোড় এমন সূরার সংখ্যাও ৩০ টি।
আবার, আয়াত সংখ্যা জোড়+ক্রম জোড়, আয়াত সংখ্যা বিজোড়+ ক্রম বিজোড় এগুলোকে সমজাতীয় বলা হলে এমন সমজাতীয় সূরার সংখ্যা ৫৭ টি, অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা জোড়+ক্রম বিজোড়, আয়াত সংখ্যা বিজোড়+ ক্রম জোড় এগুলোকে অসমজাতীয় বলা হলে এমন অসমজাতীয় সূরার সংখ্যাও ৫৭ টি।
এখানেই শেষ নয়, আয়াত সংখ্যা+ক্রম এটা যোগ করলে যোগফল জোড় এমন সূরার সংখ্যা ৫৭ টি আবার অন্যদিকে আয়াত সংখ্যা+ক্রম এটা যোগ করলে যোগফল বিজোড় এমন সূরার সংখ্যাও ৫৭ টি এভাবে আল কুর আনে সূরার সংখ্যা, আয়াত সংখ্যা, ক্রম ইত্যাদি খুব সুন্দরভাবে গোছানো, বেশ অবাক করা তাইনা?
উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন