২৭। সূরা আন নামল (পিঁপড়া)

আমাদের বিজয় দিবসে সাধারনত সামরিক কুচকাওয়াজ, মহড়া ও সমরাস্ত্র প্রদর্শনী হয়। আল কুরআনে বিশাল শক্তিশালী এক সামরিক কুচকাওয়াজ, মহড়া ও সমরাস্ত্র (সম্ভাব্য) প্রদর্শনীর উল্লেখ আছে এই সূরায়, ১৭ নং আয়াতে। সুলাইমান (আ) এর মানুষ, জিন ও পাখী(সহ সম্ভাব্য আরও প্রাণী) এর বাহিনীর একত্রিত, সুগঠিত মহড়া সত্যই ব্যতিক্রমী কারন এই বাহিনীতে জিন জাতিও ছিল।

"অবশেষে যখন তারা 'নামল' (পিঁপড়া) উপত্যকায় পৌঁছাল, এক পিঁপড়া বলল, ‘হে পিঁপড়ারা! তোমরা তোমাদের ঘরসমূহতে প্রবেশ কর, নাহলে সুলাইমান ও তার বাহিনী অজ্ঞাতসারে তোমাদের পিষ্ট করে ফেলবে’।"  ২৭ তম সূরা নামল, আয়াত ১৮  এখানে পিঁপড়া উপত্যকা বলা হয়েছে এর অর্থ হল

পিঁপড়ারা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে মিলেমিশে একতাবদ্ধ, সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করে। তাদের রয়েছে একতাবদ্ধভাবে বিভিন্ন দায়িত্ব বিভাজন করে কাজ করা, বাসা বানানো, দলগত প্রতিরক্ষা ইত্যাদি।  সুতরাং এর মাধ্যমে আল্লাহ পিঁপড়ার সমাজবদ্ধ জীবনের ইঙ্গিত দিয়ে দিয়েছেন।

প্রবেশ করার ক্ষেত্রে ‘ঘরে’ না বলে বহুবচনে ‘ঘরসমূহ’তে প্রবেশ করতে বলা হয়েছে। (২৭ঃ১৮)   আবিষ্কৃত হয়েছে যে পিঁপড়াদের কয়েক ধরনের ঘর থাকে। কোনটাতে ডিম, রানী, কোনটাতে কর্মী,  কোনটাতে পুরুষ আবার কোনটাতে খাদ্যশস্য মজুদ থাকে।  

এক পিঁপড়া বলল, ‘হে পিঁপড়ারা! এই কথার মাধ্যমে আল্লাহ ইঙ্গিত দিয়ে দিয়েছেন যে, পিঁপড়ারা রাসায়নিক গন্ধ (pheromone) ও কথার মত কম্পনের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে যা বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমানিত হয়েছে। 

নারী পিঁপড়ারা মূলত বাইরের সকল কাজ করে, খাদ্য সংগ্রহ, পাহারা, লড়াই ইত্যাদি আর অন্যদিকে পুরুষ পিঁপড়ারা মূলত প্রজননে অংশগ্রহণ করে। 

আয়াত ১৮ তে কলোনির বাহিরের কথা নারী পিঁপড়াই বলেছে যা আরবি ‘কলা’  (পুরুষ বলল)  নয় বরং ‘কলাত’ (নারী বলল) শব্দের মাধ্যমে আল্লাহ প্রকাশ করেছেন। সুবহানাল্লহ

এখানে উল্লেখ্য যে পিষে/ পিষ্ট করে এর আরেকটি অর্থ হল গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলা। পিষে ফেলার জন্য আরবি ‘লা ইয়াহত্বিমান্নাকুম’ (لَا يَحْطِمَنَّكُمْ) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আরবি ভাষায় ‘হাত্বাম’ (حَطْم) শব্দটির মূল অর্থ হলো এমন কোনো শক্ত বা ভঙ্গুর জিনিসকে ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলা যা নরম নয়—যেমন কাচ, শুকনো হাড় বা মাটির পাত্র। নরম চামড়া বা মাংসের কোনো প্রাণীকে পিষে ফেলার ক্ষেত্রে সাধারণত এই শব্দ ব্যবহৃত হয় না। মানুষ বা অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর কঙ্কাল থাকে শরীরের ভেতরে এবং তা নরম মাংস দ্বারা আবৃত থাকে। কিন্তু পিঁপড়াদের কোনো অভ্যন্তরীণ হাড় বা নরম চামড়া থাকে না। এদের পুরো শরীর বাইরে থেকে একটি অত্যন্ত শক্ত আবরণ বা বহিঃকঙ্কাল দ্বারা আবৃত থাকে, যাকে এক্সোস্কেলিটন (Exoskeleton) বলা হয়। এটি মূলত কাইটিন (Chitin) নামক এক ধরণের জটিল পলিস্যাকারাইড এবং বিশেষ প্রোটিনের সমন্বয়ে গঠিত। কাইটিনের এই আবরণটি এতটাই শক্ত, শুষ্ক এবং ভঙ্গুর প্রকৃতির হয় যে, এর ওপর ভারী কোনো চাপ পড়লে তা মানুষের মাংসপেশীর মতো তুবড়ে বা থেঁতলে যায় না, বরং কাচের পাত্রের মতো মড়মড় শব্দে ভেঙে টুকরো টুকরো বা গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যায়কাচ তৈরির প্রধান উপাদান হলো সিলিকা বা সিলিকন ডাই-অক্সাইড ($SiO_2$)। আধুনিক রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পিঁপড়ার কাইটিন নির্মিত বহিঃকঙ্কালকে আরও শক্ত এবং টেকসই করার জন্য এর মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই সিলিকা (Silica) এবং বিভিন্ন খনিজ উপাদান (যেমন জিঙ্ক ও ম্যাঙ্গানিজ) জমা থাকে। 

পিঁপড়ার এক্সোস্কেলিটনের ভেতরের স্তরগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং আণুবীক্ষণিক স্তরে সাজানো থাকে। কিছু কিছু প্রজাতির পিঁপড়ার শরীরের বাইরের অংশ এতটাই পাতলা এবং শক্ত হয় যে তা প্রায় কাচের মতোই অর্ধ-স্বচ্ছ দেখায়। কোনো ভারী বস্তুর নিচে পড়লে এদের বাইরের এই শক্ত কাচ-সদৃশ আবরণটি ভেঙে চূর্ণ হয়ে যায়।

এখানেই শেষ নয়। আরবিতে বুদ্ধিমান, বিবেকবান, জ্ঞানসম্পন্নদের সম্বোধন করতে 'ইয়া আয়্যুহা' শব্দ ব্যবহার করা হয়। এখানে পিঁপড়াদের ও একই ভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। দেখুন তার কিছু কারন। গবেষণা করে জানা গিয়েছে যে, পিঁপড়ারা রোগাক্রান্ত হলে দূরে আইসোলেশন এ চলে যায়, আবার মৃত পিঁপড়াকে অন্য পিঁপড়ারা কবরস্থ করে। পিঁপড়াদের রয়েছে শ্রমবণ্টন ও মাল্টিলেয়ার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম; ম্যানেজার, সুপারভাইজার, ওয়ার্কার ইত্যাদি।

পিঁপড়ারা খাদ্য বিনিময়ের হাট বসায়, শস্য অঙ্কুরোদগম ঠেকাতে ভেঙ্গে/ ভাগ করে ফেলে। শস্য  বৃষ্টিতে বা আদ্রতায় ভিজে গেলে রোদে শুকাতে বাইরে নিয়ে আসে আবার শুকিয়ে ঘরে ফেরত নিয়ে  যায়

কখনো কখনো পশু পাখি থেকেও শিক্ষা নিতে হয়। অনেক আগে, হযরত সুলাইমান (আ) এর সময়ে এক পিঁপড়ার কথা শুনেনঃ “হে পিঁপড়ার দল; তোমাদের গর্তে (ঘরে) ঢুকে পড়ো; যেন এমন না হয় যে, সুলাইমান ও তার সৈন্যরা তাদের অজান্তেই তোমাদের পিষে ফেলবে”।  

আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা পেতে সে তার জাতিকে হোম কোয়ারেন্টাইনে যাওয়ার জন্য উপদেশ দিয়েছিল। যা আল কুরআনে আল্লাহ দৃষ্টান্ত হিসাবে রেখে দিয়েছেন/  আল কুরআন যে সব যুগের সব মানুষের জন্যই শিক্ষনীয় তা আরেকবার প্রমানিত হচ্ছে। এভাবে যুগে যুগে আল কুরআন তাঁর অলৌকিকত্ব, সময়ের গন্ডী উত্তীর্ণ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করতেই থাকবে। 

এমনটি হবেই কারন এই সব কিছুর স্রষ্টা, সময়েরও স্রষ্টা আল্লাহ। আমরা সেটা বুঝতে ও মানতে এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে পারবো কিনা এটাই হলো মূল কথা। 

কোটি কোটি বছরের পুরানো কৃষক পিঁপড়া! লিফকাটার পিঁপড়া অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ করে আসছে। বড় বড় পাতার টুকরো বহন করে নিয়ে যায়, তখন অনেকেই মনে করেন তারা পাতাগুলো খাবে। কিন্তু আসলে তারা পাতা খায় না। তারা এই পাতাগুলোকে সার হিসেবে ব্যবহার করে মাটির নিচে তাদের বিশেষ খামারে ছত্রাক (Fungus) চাষ করে। 

নিজ দেহে উৎপাদিত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করে খামারকে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া থেকে রক্ষা করে। ছত্রাক উৎপাদন করা ও তা ফসল হিসাবে তুলে খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে। 

লিফকাটার পিঁপড়ারা তাদের মাটির নিচের খামারে ছত্রাক বা ফাঙ্গাস চাষকে সফল করতে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করে। ১. নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখা, ২. আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে ছত্রাক বাঁচানো, ৩. সুড়ঙ্গের মাধ্যমে বিশুদ্ধ বাতাস চলাচল নিশ্চিত করা ইত্যাদির মাধ্যমে অনেকটা আধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার (Air Conditioning) মতো HVAC system কার্যকরী রাখে। 

পিঁপড়াদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ১।বিশেষ কর্মী পিঁপড়ারা undertaker মৃতদেহ কলোনির বাইরে নিয়ে যায়, ২।খাবার খাওয়ার পর অযোগ্য অংশ বা পচে যাওয়া খাবার নির্দিষ্ট বর্জ্য ঘরে জমা করে। ৩।পিঁপড়ারা সাধারণত কলোনির বাইরে গিয়ে মলত্যাগ করে। কিছু প্রজাতি কলোনির ভেতরেই আলাদা 'টয়লেট চেম্বার' বা শৌচাগার তৈরি করে, যা অন্যান্য ঘর থেকে অনেক দূরে থাকে। লিফকাটার পিঁপড়ারা তাদের মলকে ছত্রাকের বাগানে সার হিসেবে ব্যবহার করে।

বর্জ্য ঘর বা মিডেনগুলি সাধারণত কলোনির মূল অংশ (যেখানে রানী বা ডিম থাকে) থেকে দূরে স্থাপন করা হয়। খাবারের খোঁজে যাওয়া কর্মী পিঁপড়ারা সাধারণত আবর্জনার স্তূপ বা মিডেনের পাশ দিয়ে হাঁটা এড়িয়ে চলে, যাতে তাদের গায়ে কোনো রোগজীবাণু বা ক্ষতিকর ছত্রাক লেগে না যায়।

কলোনির সব পিঁপড়া ময়লা পরিষ্কারের কাজ করে না। কিছু নির্দিষ্ট কর্মী পিঁপড়া শুধুমাত্র বর্জ্য অপসারণ এবং মৃতদেহ সৎকারের কাজে নিয়োজিত থাকে। বর্জ্য নিয়ে কাজ করা পিঁপড়ারা সাধারণত কলোনির ভেতরের অন্যান্য সাধারণ কাজ, যেমন—খাদ্য সংগ্রহ বা বাচ্চার যত্ন নেওয়ার কাজে অংশ নেয় না। এর ফলে ময়লা থেকে রোগজীবাণু কলোনির সুস্থ সদস্যদের মধ্যে ছড়াতে পারে না।

পিঁপড়ারা অনেক সময় 'অ্যাফিড' (Aphids) নামক ক্ষুদ্র পতঙ্গদের গবাদি পশুর মতো লালন-পালন করে। অ্যাফিডরা গাছের রস খেয়ে এক ধরণের মিষ্টি তরল বা 'হানিডিউ' নিঃসরণ করে, যা পিঁপড়াদের অত্যন্ত প্রিয় খাদ্য। নিজেদের খাদ্যের উৎস নিশ্চিত করতে পিঁপড়ারা এই অ্যাফিডদের অন্যান্য শিকারি পতঙ্গ (যেমন: লেডিবাগ) থেকে পাহারা দিয়ে রক্ষা করে। প্রয়োজন হলে পিঁপড়ারা এই পতঙ্গদের এক গাছ থেকে অন্য সতেজ গাছে সরিয়ে নিয়ে যায়, যাতে তারা পর্যাপ্ত খাবার পায়। এমনকি শীতকালে পিঁপড়ারা অ্যাফিডের ডিম নিজেদের কলোনিতে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখে এবং বসন্ত এলে আবার বাইরে বের করে দেয়।

পিঁপড়ারাও দক্ষ সার্জন! কোনো যোদ্ধা পিঁপড়ে আহত হয় বা তার পায়ে সংক্রমণ দেখা দেয়, তখন কলোনির অন্য পিঁপড়েরা মিলে সেই অসুস্থ পিঁপড়েটিকে শক্ত করে ধরে রাখে এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তার ক্ষতিগ্রস্ত পা টি দাত ও চোয়াল দিয়ে সার্জারি করে কেটে আলাদা করে দেয়। এই সার্জারির সফলতা ৮০% এর চেয়ে বেশি হয়, এর ফলে তারা দ্রুত সুস্থ হয়ে যায়। 

কিছু পিঁপড়া বাঁধা অতিক্রম করার জন্য বা ভিন্ন পথ অবলম্বন করার জন্য নিজেদের শরীর দিয়ে বিস্ময়কর এক শারীরিক সেতু বা ব্রিজ তৈরি করে। নিজেদের শরীর একে অপরের সাথে জোড়া লাগিয়ে শক্তিশালী স্থিতিশীল এই কাঠামো একতাবদ্ধতার এক দারুন উদাহরন। 

এখানেই শেষ নয়। পিঁপড়ারা তাদের চমৎকার সামাজিক শৃঙ্খলা এবং যাতায়াত ব্যবস্থার জন্য পরিচিত। তারা কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল বা পুলিশ ছাড়াই হাজার হাজার সদস্যের চলাচল অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তাদের এই ট্রাফিক ব্যবস্থার মূল বিষয়গুলো;

১. ফেরোমোন ট্রেইল (Pheromone Trails) পিঁপড়ারা রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারে। যখন কোনো পিঁপড়া খাবারের সন্ধান পায়, তখন সে ফেরার পথে এক ধরণের রাসায়নিক বা ফেরোমোন নিঃসরণ করে আসে। অন্য পিঁপড়ারা তাদের অ্যান্টেনার সাহায্যে এই গন্ধ অনুসরণ করে খাবারের উৎসে পৌঁছায়। এই পথটি যত বেশি ব্যবহৃত হয়, গন্ধ তত তীব্র হয় এবং ট্রাফিক সেদিকেই ধাবিত হয়।

২. স্ব-সংগঠিত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ; মানুষের রাস্তায় যানজট লাগলেও পিঁপড়াদের ক্ষেত্রে তা খুব কমই ঘটে। গবেষকরা দেখেছেন যে, পিঁপড়ারা তিনটি প্রধান লেনে চলাচল করে। মাঝের লেন: যারা খাবার নিয়ে বাসায় ফিরছে তারা সাধারণত মাঝের লেন দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যায়। দুই পাশের লেন: যারা খাবারের সন্ধানে বাইরে যাচ্ছে তারা দুই পাশ দিয়ে চলাচল করে। এই বিভাজনটি সংঘর্ষ এড়াতে এবং চলাচলের গতি বজায় রাখতে সাহায্য করে।

৩. গতি ও ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ; পিঁপড়ারা রাস্তার ঘনত্ব অনুযায়ী নিজেদের গতি কমিয়ে বা বাড়িয়ে দেয়। যদি সামনের পথে ভিড় বেশি থাকে, তবে তারা তাদের গতি ধীর করে দেয় কিন্তু চলাচল বন্ধ করে না। এর ফলে কোনো 'গ্রিডলক' বা স্থবির অবস্থার সৃষ্টি হয় না।

৪. জ্যাম এড়ানোর কৌশল; যদি কোনো পথে বাধা আসে বা ভিড় অসহনীয় হয়ে ওঠে, তবে পিঁপড়ারা বিকল্প পথ তৈরি করে। তাদের মধ্যে এক ধরণের 'স্বার্থহীন' আচরণ দেখা যায়; যেমন—প্রয়োজনে তারা নিজেদের শরীর দিয়ে তৈরি জীবন্ত সেতু ব্যবহার করে অন্যদের পথ সহজ করে দেয়। 

৫. দলগত বুদ্ধিমত্তা (Swarm Intelligence) প্রতিটি পিঁপড়া তার আশেপাশের পিঁপড়াদের আচরণ দেখে সিদ্ধান্ত নেয়। এই সামষ্টিক বুদ্ধিমত্তার কারণে তারা অত্যন্ত জটিল বাধাগুলোও অনায়াসেই পার হয়ে যেতে পারে।

তাদের এই বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থা বর্তমানে কম্পিউটার সায়েন্স এবং লজিস্টিক ম্যানেজমেন্টে (Ant Colony Optimization) অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সুলাইমান (আ) এর বাহিনী চলা শুরু করলে পিঁপড়া এর কথা শুনে তিনি বাহিনীর চলার পথ পরিবর্তন করে পিঁপড়াদের ক্ষতি থেকে রক্ষা করেন। এটা যুদ্ধের বা কোন অভিযানের একটি দারুন সামরিক রীতি। 

একে বলে কো- ল্যাটেরাল ড্যামেজ থেকে রক্ষা (co-lateral damage prevention)। এর মাধ্যমে তিনি সুশৃঙ্খল বাহিনীর মানবিকতার বহিঃপ্রকাশ করেছেন।  

আল কোরআনে বর্ণিত পোকামাকড়ের তিনটি সূরা আন নাহল (মৌমাছি), সূরা আন নামল (পিঁপড়া) এবং সূরা আল আনকাবুত (মাকড়সা) সূরাতেই তাদের ঘরের কথা বলা আছে। মজার ব্যাপার হল এই তিন প্রজাতির নারীরাই মূলত ঘর বানায়, পুরুষরা নয়। এটি কি মানুষের বিপরীতে প্রকৃতিতে ব্যাল্যান্স?

মৌমাছি এবং পিঁপড়া এর শব্দ আন নাহল ও আন নামল বহুবচনে এলেও মাকড়সা এর শব্দ আল আনকাবুত একবচনে এসেছে আল কোরআনে। 

মৌমাছি এবং পিঁপড়ারা অনেকে একসাথে দলবদ্ধ ভাবে, সামাজিকভাবে থাকে এবং একসাথে বাসা তৈরি করে। অন্যদিকে মাকড়সা একাই থাকে এবং একাই বাসা তৈরি করে। 

হুদহুদ পাখি সময়মত উপস্থিত ছিল না। নির্দিষ্ট দায়িত্বের সময়াবদ্ধ দায়বদ্ধতা রয়েছে। পালন করতে না পারলে শাস্তির বিধানও রয়েছে। এই সুন্দর সামরিক বিধান আমরা জানতে পারি এখান থেকে। 

আল কুরআনের বর্ণনায় হুদহুদ পাখি যা করেছে:  

Phase-1: Intelligence & Reconnaissance Operation। Military Term: ISR (Intelligence, Surveillance, Reconnaissance)  নতুন এলাকা (সাবা) পর্যবেক্ষণ,  শাসনব্যবস্থা (রাণী) শনাক্ত, ধর্মীয় অবস্থা (সূর্য পূজা) বিশ্লেষণ,  তথ্য যাচাই করে রিপোর্ট প্রদান। 

 Phase-2: Strategic Messaging & Diplomatic Delivery  । Military Term: Strategic Communication (STRATCOM)  হুদহুদ পরে যা করেছে:  সুলায়মান (আ.)–এর চিঠি বহন,  নির্দিষ্ট টার্গেটে (রাণী) পৌঁছানো  বার্তা, সঠিকভাবে ডেলিভারি।  

এখানে একটি বড় সামরিক নীতি দেখা যায়:   “No Engagement Without Intelligence”  (তথ্য ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নয়)  এবং   “Communication Before Confrontation”  (সংঘর্ষের আগে বার্তা)

আল কুরআনের আলোকে ২ ধরনের বাতাসের পার্থক্যঃ  বহুবচনের বাতাস ‘রিয়াহ’  এই বাতাস নিয়ামত হিসাবে আসে। হেলেদুলে প্রবাহিত হয়, কখনও এদিক থেকে কখনও  ওদিক থেকে বিক্ষিপ্তাকারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বইতে থাকে; কেমন যেন সেখানে অনেকগুলো বাতাস থাকে । এমন উদাহরন আছে বিভিন্ন সূরা ও আয়াতে। যেমনঃ ২:১৬৪, ৭:৫৭, ১৫:২২, ১৮:৪৫, ২৫:৪৮, ২৭:৬৩, ৩০:৪৬, ৩৫:০৯, ৪৫:০৫

অপরদিকে এক বচনের বাতাস ‘রীহ’। এই বাতাস আযাব হিসাবে আসে। বজ্রকঠিন ও একে অন্যের সাথে লাগোয়া। অনেক বেশি জমাটবাঁধা, ঘনীভূত ও সঙ্ঘত; কেমন যেন একটাই মাত্র তাবাস থাকে। এমন উদাহরন আছে বিভিন্ন সূরা ও আয়াতে। যেমনঃ  ৩:১১৭, ১৪:১৮, ১৭:৬৯, ২২:৩১, ৩০:৫১, ৩৩:৯, ৪২:৩৩, ৪৬:২৪ সাধারনভাবে একবচন ও বহুবচন নেকই ধরনের অর্থ প্রকাশ করলেও আল কুরআন এখানে বহুবচনে নিয়ামত ও একবচনে আযাব প্রকাশ করেছে।    


উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ





মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)