১৬। সূরা আন নাহল (মৌমাছি)

মানুষের সৃষ্টির সূচনা আল্লাহ নিখুঁতভাবে বর্ননা করেছেন। যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই তো জানেন কিভাবে এই সৃষ্টি হয়েছে। তাই তিনি মানুশকে তার সৃষ্টি সম্পর্কে অন্ধকারে রাখেননি, বিভিন্ন আয়াতে বলে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি ‘নুতফাহ’(নগণ্য পরিমান তরল/শুক্রাণু) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এটি পাওয়া যায় আল কুরআনের ১৬:৪, ১৮:৩৭, ২২:৫, ২৩:১৩, ৩৫:১১, ৩৬:৭৭, ৪০:৬৭, ৫৩:৪৬, ৭৫:৩৭, ৮০:১৯ তে।  

চাঁদ (কমার) শব্দটি আল কুরআনে এসেছে ২৭ বার (৬ঃ৭৭, ৬ঃ৯৬, ৭ঃ৫৪, ১০ঃ৫, ১২ঃ৪, ১৩ঃ২, ১৪ঃ৩৩, ১৬ঃ১২, ২১ঃ৩৩, ২২ঃ১৮, ২৫ঃ৬১, ২৯ঃ৬১, ৩১ঃ২৯,৩৫ঃ১৩, ৩৬ঃ৩৯, ৩৬ঃ৪০, ৩৯ঃ৫, ৪১ঃ৩৭, ৫৪ঃ১, ৫৫ঃ৫, ৭১ঃ১৬, ৭৪ঃ৩২, ৭৫ঃ৮, ৭৫ঃ৯, ৮৪ঃ১৮, ৯১ঃ২)। 

অবাক করা বিষয় হল চাঁদ পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতে ২৭ দিন সময় লাগে। তবে এই সময়ে পৃথিবী আবার সূর্যকে কেন্দ্র করে ২ দিন এগিয়ে যায়। এজন্য চাঁদকে আরও দুদিন বেশি ঘুরতে হয় এজন্য চন্দ্র মাস ২৯ দিনে হয়। 

রঙ শব্দের আরবি প্রতিশব্দ لون (লাওনুন)| বহুবচনে ألوان (আল ওয়ানুন) বা রংসমূহ। পবিত্র কুরআনে রঙ শব্দের বহুবচন ব্যবহৃত হয়েছে মোট সাত (৭) বার! (16:13, 16:69, 30:22, 35:27, 35:27, 35:28, 39:21)  যা রংধনুর ৭ রঙের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ন 


আল কুরআনে রঙ এর বহুবচন ‘আল ওয়ানুন’ শব্দটি এসেছে সূরা আন নাহলের ১৩ নং আয়াতে এই ১৩ নং আয়াতে মোট শব্দ আছে ১৩ টি এবং বাম দিক ডান দিক উভয় দিক থেকেই ‘আল ওয়ানুন’ শব্দটি ৭ম


সূরা আন নাহলের ১৩ নং আয়াতে হরফ আছে মোট ৪৯ টি (৭ X ৭ = ৪৯) শুরুর থেকে এই ১৩ নং আয়াত পর্যন্ত মোট শব্দ আছে ১৪৭ টি (৭ X ৭ X ৩ = ১৪৭) আমরা জানি রঙধনুর রঙ ৭ টি (বেগুনী, নীল, আকাশী, সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল) এখানে তাহলে ৩ সংখ্যাটি কি? আমরা জানি মৌলিক রঙ ৩ টি (নীল, সবুজ, লাল)

সবুজ শব্দটি কুরআনে এসেছে ৮ বার। জান্নাতের দরজা ৮ টি। জান্নাতের সাথে সবুজ শব্দটি সবচেয়ে সম্পর্কিত। আল কুরআনের সূরা আনআম, ইউসুফ, কাহাফ, হজ্জ, ইয়াসীন, রহমান, দাহরে এসেছে সবুজ শব্দটি। কালো শব্দটি কুরআনে এসেছে ৭ বার। জাহান্নামের দরজা ৭ টি। জাহান্নামের সাথে কালো শব্দটি সবচেয়ে সম্পর্কিত। আল কুরআনের সূরা বাকারা, আলে ইমরান, নাহল, ফাতির, জুমার, জুখরুফ এ এসেছে কালো শব্দটি।

অর্থাৎ জান্নাত ও জাহান্নামের দরজা মোট ১৫ টি। আল কুরআনে দরজা শব্দটির বহুবচনঃ দরজাসমূহও এসেছে ১৫ বার। এগুলো এসেছে বাকারা, আনআম, আরাফ, ইউসুফ, হিজর, নাহল, সোয়াদ, জুমার, মুমিন, জুখরুফ, কমার, নাবা তে। মজার ব্যাপার হলো, ৭ম বারে আসা দরজা শব্দটির আয়াতটি জাহান্নামের দরজা সম্পর্কিত এবং ৮ম বারে আসা দরজা শব্দটির আয়াতটি জান্নাতের দরজা সম্পর্কিত। কি দারুন মিল!

আধুনিক বিজ্ঞান, বিশেষ করে প্রাণিবিদ্যার অন্তর্গত শরীরতত্ত্ব (Physiology), দুধ উৎপাদনের যে প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছে, তা কুরআনের এই সূরার ৬৬ নং আয়াতের সংক্ষিপ্ত বর্ণনার সাথে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়। 

১. হজম প্রক্রিয়া এবং পুষ্টির শোষণ (কুরআনের শব্দ: فَرْثٍ - 'হজমকৃত খাবার') গরু বা ছাগল যখন ঘাস বা খাবার খায়, তখন তা তাদের জটিল পাকস্থলীতে (Rumen-এ) যায়। সেখানে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ও এনজাইমের সাহায্যে খাবারটি ভেঙে হজম হয়। এই হজম হওয়া খাবারের অবশিষ্টাংশ পরে গোবর হিসেবে বেরিয়ে যায়। কিন্তু কুরআনে দুধ উৎপাদনের প্রাথমিক উৎস হিসেবে এই হজমকৃত খাবারের (ফার্থ) কথা বলা হয়েছে, কারণ এখান থেকেই দুধের মূল উপাদানগুলো আসে।

২. রক্তে পুষ্টির প্রবেশ (কুরআনের শব্দ: دَمٍ - 'রক্ত') হজম হওয়া খাবার থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান (যেমন: অ্যামিনো অ্যাসিড, গ্লুকোজ, ফ্যাটি অ্যাসিড ইত্যাদি) অন্ত্রের দেয়াল দিয়ে শোষিত হয়ে সরাসরি রক্তে প্রবেশ করে। রক্ত তখন এই পুষ্টি উপাদানগুলো বহন করে শরীরের বিভিন্ন অংশে, বিশেষ করে ওলান বা স্তনগ্রন্থিতে নিয়ে যায়।

৩. স্তনগ্রন্থিতে দুধ সংশ্লেষণ (কুরআনের শব্দ: লবানান খালিসান - 'বিশুদ্ধ দুধ') ওলানে পৌঁছানোর পর, স্তনগ্রন্থির বিশেষ কোষগুলো (Secretory Cells) রক্ত থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানগুলো বেছে নেয়। এই কোষগুলো একটি জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই উপাদানগুলোকে দুধে রূপান্তরিত করে।

হজমকৃত খাবারের পুষ্টি রক্তে মেষে, আর রক্ত সেই পুষ্টি স্তনগ্রন্থিতে নিয়ে দুধ তৈরি করে। দুধ সরাসরি রক্ত বা গোবর থেকে তৈরি হয় না, বরং এই দুটির মাঝামাঝি একটি জটিল শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয়। অথচ, তৈরি হওয়ার পর এই দুধের মধ্যে রক্ত বা গোবরের কোনো রং, গন্ধ বা উপাদান থাকে না—এটি হয় সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ ও সুস্বাদু।

চৌদ্দশ বছর আগে, যখন মানুষের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া বা পরিপাকতন্ত্র সম্পর্কে কোনো জ্ঞান ছিল না, তখন পবিত্র কুরআনে এই জটিল প্রক্রিয়ার এমন নিখুঁত ও বৈজ্ঞানিক বিবরণ নিঃসন্দেহে একটি অলৌকিক নিদর্শন।

১৬ তম সূরা আন নাহল, আয়াত ৬৮ এ আল্লাহ বলেছেন, তোমার প্রতিপালক (নারী) মৌমাছির প্রতি ওহী নাযিল করেছেন যে, পাহাড়ে, বৃক্ষে আর উঁচু চালে বাসা তৈরি কর।

আধুনিক বিজ্ঞান জানতে পেরেছে যে, মৌচাক তৈরি করে যে মৌমাছি তারা নারী, কর্মী মৌমাছি। সাধারনত ঘর বানানোর কাজ পুরুষরা করে থাকলেও মৌমাছির ক্ষেত্রে তা উল্টা। সেটা আল্লাহ এই আয়াতে নিখুঁতভাবে বর্ননা করেছেন। কারন আল্লাহই তাদের সৃষ্টি করেছেন এবং সুন্দর ঘর বানানো শিখিয়েছেন। সুবহানাল্লহ 

মৌমাছি কেন ছয় কোনাকার ঘর তৈরি করে মৌচাকে? সেটা বোঝার চেষ্টা। আমরা আর কেমন ইঞ্জিনিয়ার! আসুন চিনি প্রকৃতির ইঞ্জিনিয়ারঃ আমাদের অনেকেরই জীবনের লক্ষ্য ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। বিজ্ঞানকে সঠিক উপায়ে ব্যবহার করে ইঞ্জিনিয়াররা অনেক নতুন নতুন জিনিস তৈরি করে। মানুষের মত বুদ্ধিমান প্রানী যদি আবার বিজ্ঞান ব্যবহার করে তাহলে তা সত্যিই অসাধারন কিছু হিসাবে তৈরি হয়। তবে শুধু মানুষ নয়। আমাদের এই পৃথিবীতে আরো অনেক ইঞ্জিনিয়ার রয়েছে যাদের কর্মকান্ড হয়তো আমরা তেমন ভালো জানিনা বা ভেবে দেখিনা। তাদের কর্মকান্ড মানুষের থেকে কোন অংশে কম নয়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এক কথায় বিস্ময়কর! 

তাদের ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি না। এরা প্রকৃতির একঝাক অসাধারন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। তোমরা কি কেউ মৌচাক কে কাছ থেকে ভালোভাবে দেখেছো? দেখলে খেয়াল করবে মৌচাকের এক একটা কোষ ছয় কোনাকার হয়ে থাকে। এত সহজ সহজ আকৃতি থাকতে ৬ কোনাকার কেন? মৌমাছিরা মনে হয় একটু বোকাই হবে! আসলে কি তাই? এসো জ্যামিতি নিয়ে একটু ভেবে দেখি।

কোন জায়গাকে পুরন করতে বা কোন জায়গায় মৌমাছির ঘর বানাতে কয়েক ধরনের শেপ বা আকৃতি ব্যবহার করা যেতে পারে। আকাবাকা শেপ ব্যবহার করলে মেলানো কঠিন হয়ে যায়। তাই তাদের জন্য প্রয়োজন একটি সহজ ও সোজাসাপ্টা শেপ। এমনি একটি সহজ একটি শেপ হলো বৃত্ত। তবে এটার একটা সমস্যা আছে। পাশাপাশি কয়েকটা রাখলে মাঝে ফাক থেকে যায়। ইফেকটিভ হয় না। আবার জোড়া লাগাতে বেশি মোমের দরকার হয়। মোম তৈরি করতে মোমের পরিমানের প্রায় ৮ গুন মধু ব্যবহার করতে হয়। তাই এই মোম তাদের কাছে বেশ মূল্যবান।   

তবে ত্রিভুজ বা চতুর্ভুজ এর দ্বারাও ইফেকটিভ উপায়ে মৌচাক বানানো যেতে পারতো কিন্তু তা না করে মৌমাছিরা কেন একটি কমপ্লিকেটেড শেপঃ ষড়ভুজ বেছে নেয়? এখানেই রয়েছে তাদের ইঞ্জিনিয়ারিং এর মুল কেরামতি! ত্রিভুজ ও চতুর্ভুজের দ্বারা তৈরি একটি ক্ষেত্রফলের পরিসীমা এর চাইতে ষড়ভুজ এর পরিসীমা কম হয়। 

অর্থাৎ মৌচাকটি দৃঢ় ও কমপ্যাক্ট (compact) হয় যদি তা ষড়ভুজ দিয়ে বানানো হয়! সুতরাং ষড়ভুজ বেশি স্পেস ইফিসিয়েন্ট। আরেকটি বিষয় সুবিধা হয়। তা হলো জোড়া লাগানো। একসাথে অনেক মৌমাছি মৌচাক বানানোর কাজ করে। ৬ কোনা থাকার কারনে একজনের সাথে আরেকজনের বানানো কোষ গুলো সহজেই জোড়া লাগানো যায়, অনেক বেশি অপশন পাওয়া যায়। ভাবতে কি অবাক লাগে তাইনা? একটা ছোট্ট সৃষ্টি কিভাবে এত ক্যালকুলেশন করে তাদের বাড়ি বানায়? কোন ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে পড়ে তারা? 

মৌচাকের ভেতরে মধুর গন্ধ ও উষ্ণতা অনেক ছোট প্রাণীকেই আকর্ষণ করে - ইঁদুর, টিকটিকি, এমনকি কিছু পাখি মৌমাছিরা অনুপ্রবেশকারীকে আক্রমণ করে মেরে ফেলে। কিন্তু সমস্যা হয় মৃতদেহটি মৌচাকের বাইরে নিতে, কারন এটি বড় হওয়ার কারনে বের করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। 

এজন্য মৌমাছি তাদের তৈরি প্রপোলিস নামক এক প্রকার জিবানুনাশক যা অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল অ্যান্টিফাঙ্গাল আর্দ্রতা প্রতিরোধী এবং অত্যন্ত শক্তিশালী প্রাকৃতিক সিল্যান্ট দ্বারা মৃত দেহকে ঢেকে ফেলে। ফলে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, পচন থেকে মৌচাক ও মৌমাছিরা নিরাপদ থাকে; কোন দুর্গন্ধ বা সংক্রমন ছড়ায় না। এভাবে সেই মমিকৃত মৃতদেহ বছরের পর বছর মৌচাকে থাকে কিন্তু মৌচাক ও মৌমাছিদের কোন ক্ষতি করতে পারে না। সুতরাং আল্লাহর ওহীর সাহায্যে তারা বাসা তৈরি করে এবং তা নিরাপদও রাখে।   

আল্লাহ ৬৯ নং আয়াতে আরও বলেছেন, খাবার খেয়ে রবের নির্ধারিত পথ ধরে এগিয়ে চলো। অর্থাৎ তাদের চলা, খাবারের সন্ধান দেয়া ও অন্যরা আবার খাবারের কাছে আসা এগুলো রবের দেখানো, শেখানো পথ। 

মৌমাছি খাবারের সন্ধান পেলে এসে অন্যকে সুন্দরভাবে তার অবস্থান জানিয়ে দেয় এক ধরনের বিশেষ নাচ এর মাধ্যমে। একে ওয়াগল ড্যান্স বলে। কতক্ষণ ধরে এবং কতবার শরীর ঝাঁকায় তার উপর নির্ভর করে অন্যরা দূরত্ব বুঝতে পারে। নাচের দিক ও কোণ দেখে সূর্যের সাপেক্ষে কোণ নির্নয় করা হয়। এছাড়া মৌমাছি বৃত্তাকারে ঘুরলে বোঝা যায় খুব কাছেই খাদ্য উৎস রয়েছে।  

মৌমাছিই একমাত্র পতঙ্গ বা পোকা যা সরাসরি মানুষের খাবার/পানীয় (মধু) তৈরি করে। মৌমাছি ফুলের নেক্টার সংগ্রহ করে তা নিজের শরীরে এনজাইমের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে এই মধু বানায়। মৌমাছির পেটে মূলত দুটি থলি থাকে। একটা মধুর থলি (মধু/খাদ্য জমা রাখার জন্য) আরেকটি প্রধান পাকস্থলী (হজম ও পুষ্টি শোষনের জন্য)। 

মৌমাছির মধু মানুষের জন্য আরোগ্য এবং এই মধু কখনও নষ্ট হয়না বা পচে যায়না।

বিভিন্ন গাছ থেকে মধু সংগ্রহ করার কারনে মধুর রং বিভিন্ন হয়। 


মধু একটা উপাদেয় খাদ্য। এটির উপকারিতাও অনেক। রোগ নিরাময়ে রয়েছে এর অনন্য ভূমিকা। ৬৯ আয়াতে আল্লাহ এর উল্লেখ করেছেন। 


মধুর প্রধান ৫ টি নিরাময় গুন; ১. অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট (Antioxidant) মধু শরীরের ক্ষতিকর 'ফ্রি র‍্যাডিক্যালস' দূর করে। এটি হৃদরোগ এবং অকাল বার্ধক্য প্রতিরোধে সাহায্য করে। এতে থাকা ফেনোলিক যৌগগুলো কোষের সুরক্ষা দেয়।  ২. অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি (Anti-inflammatory) এটি শরীরের ভেতরের বা বাইরের প্রদাহ বা ফোলা কমাতে সাহায্য করে। বিশেষ করে গলা ব্যথা বা ফুসফুসের সমস্যায় এটি খুব কার্যকর।  ৩. অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-ফাঙ্গাল (Antibacterial & Antifungal) মধু প্রাকৃতিক 'হাইড্রোজেন পারক্সাইড' তৈরি করে, যা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক ধ্বংস করে। এটি প্রাকৃতিকভাবে পচন রোধ করতে পারে।  ৪. ক্ষত নিরাময়কারী (Wound Healing) মধুর অম্লীয় (acidic) গুণ এবং আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতা ক্ষতস্থান দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে। পুড়ে যাওয়া স্থানে বা আলসারে মধু ব্যবহার করলে দ্রুত টিস্যু পুনর্গঠিত হয়।  ৫. প্রিবায়োটিক (Prebiotic) মধু পেটের ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলোর (Probiotics) খাবার হিসেবে কাজ করে। এটি হজম শক্তি বাড়ায় এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে।

আল কোরআনে বর্ণিত পোকামাকড়ের তিনটি সূরা আন নাহল (মৌমাছি), সূরা আন নামল (পিঁপড়া) এবং সূরা আল আনকাবুত (মাকড়সা) সূরাতেই তাদের ঘরের কথা বলা আছে। মজার ব্যাপার হল এই তিন প্রজাতির নারীরাই মূলত ঘর বানায়, পুরুষরা নয়। এটি কি মানুষের বিপরীতে প্রকৃতিতে ব্যাল্যান্স?

মৌমাছি এবং পিঁপড়া এর শব্দ আন নাহল ও আন নামল বহুবচনে এলেও মাকড়সা এর শব্দ আল আনকাবুত একবচনে এসেছে আল কোরআনে। 

মৌমাছি এবং পিঁপড়ারা অনেকে একসাথে দলবদ্ধ ভাবে, সামাজিকভাবে থাকে এবং একসাথে বাসা তৈরি করে। অন্যদিকে মাকড়সা একাই থাকে এবং একাই বাসা তৈরি করে।

পৃথিবী খুব আনন্দ, প্রশান্তি ও নিরাপত্তার জীবন যাপন করছিল। বিভিন্ন দেশের মধ্যে নানা যোগাযোগ ছিল। পুরা পৃথিবীটাই ছিল গ্লোবাল ভিলেজ। সবদিক থেকে খাবার, পোশাক, আনন্দ, চিকিৎসা, শিক্ষা আসছিল প্রতিটি দেশে। দারুন সুন্দর যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল। হঠাত এলো করোনা ভাইরাস। সবদিক থেকে আসা নানা সুবিধা বন্ধ হয়ে গেল। দেশগুলো লকড ডাউন হয়ে গেল। সবদিক থেকে নানান সুবিধা আসার বদলে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরলো ভয়। এক বিচিত্র, গা ছমছমে ভয়! মারা যাবার ভয়, নানা দ্রব্য না পাবার ভয়, ক্ষুধার ভয়। এর কারন ও এর থেকে বাঁচার উপায় খুঁজতে থাকলো দেশগুলো, মানুষগুলো।

এই পরিস্থিতির ঠিক এমনই একটি খবর আল্লাহ দিয়ে রেখেছেন সাড়ে ১৪০০ বছর আগে! পড়ে দেখুন কথাগুলোঃ "আল্লাহ একটি জনপদের দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন: সেটি শান্তি ও নিরাপত্তার জীবন যাপন করছিল এবং সবদিক দিয়ে সেখানে আসছিল ব্যাপক রিযিক, এ সময় তাঁর অধিবাসীরা আল্লাহর নিয়ামতসমূহ অস্বীকার করলো। তখন আল্লাহ তাদেরকে ক্ষুধা ও ভীতির পোশাক পরিয়ে শাস্তি দিলেন; তারা যা করছিল তার প্রতিদান হিসাবে"। (আল কুরআন; ১৬ নং সূরা আন নাহল, আয়াত ১১২)  

এখান থেকে আমরা জানতে পারলাম, এই বিপর্যয় এর অন্যতম প্রধান কারন হলো আল্লাহর নিয়ামতসমূহ অস্বীকার করা, পাপাচার করা। এটা শুধু ১/২ দিন/মাস/বছর এর কারনে নয় বরং এখানে বলা হয়েছে, 'তারা যা করছিল' মানে অনেক সময় ধরেই করছিল। এমন ধরনের যে এটা তাদের অভ্যাসে পরিনত হয়ে গিয়েছিল। পুরানো ইতিহাস আল্লাহ বর্ণনা করেন যেন আমরা তা থেকে শিক্ষা নিতে পারি। পুরানো কোন এক জনপদের বর্ণনা আল্লাহ এই জন্যই করেছেন  এই আয়াতের পরিস্থিতির সাথে আমাদের বর্তমান পরিস্থিতি হুবুহু মিলে যায়। জামা/পোশাক যেমন আমাদের দেহের সাথে লেগে থাকে, কখনও আলাদা হয় না, তেমনি ভয় আমাদের নিত্য সঙ্গী হয়ে গেছে। আমরা অজানা আশঙ্কায় পড়ে গেছি। ক্ষুধার ভয়ে আমরা জিনিসপত্র মজুদ করা শুরু করে দিয়েছি!  

আল কুরআন যে সব যুগের সব মানুষের জন্যই শিক্ষনীয় তা আরেকবার প্রমানিত হচ্ছে। এভাবে যুগে যুগে আল কুরআন তাঁর অলৌকিকত্ব, সময়ের গন্ডী উত্তীর্ণ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করতেই থাকবে। এমনটি হবেই কারন এই সব কিছুর স্রষ্টা, সময়েরও স্রষ্টা আল্লাহ। আমরা সেটা বুঝতে ও মানতে এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে পারবো কিনা এটাই হলো মূল কথা।  এই বিপর্যয় থেকে মুক্তির অন্যতম উপায় হলো এর কারন থেকে সরে আসা। আল্লাহর নিয়ামত এর শুকরিয়া আদায় করে পাপকাজ ছেড়ে দেয়া। আসুন আমরা সবাই তাওবা করি। নিজের যার যার পাপ কাজ ছেড়ে দেই। মানবতার নিরাপত্তার জন্য আমাদের নিজেদের সংশোধন হওয়া ছাড়া উপায় নাই।

আল কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় মানুষের শ্রবণেন্দ্রীয়, দর্শনেন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণ/মন মস্তিষ্ক এর ব্যাপারে উল্লেখ আছে (যেমন ১৬:৭৮, ১৭:৩৬, ২৩:৭৮, ৩২:৯)। এই ইন্দ্রীয়গুলোর ক্রম মায়ের পেট এ সূচনা ও উন্নয়ন এর ক্রম অনুসারেই লিপিবদ্ধ হয়েছে! অর্থাৎ সবার আগে কানের এর পর চোখের ও পরে হৃদয় ও মস্তিস্কের গঠন ও পূর্নতা সাধিত হয়েছে! পরে প্রাপ্ত বয়স্ক হয়েও এই ধারা কার্যকরী। 

কোন কথা প্রথমে শুনেই হুট করে বিশ্বাস না করে নিজের চোখ দিয়ে দেখে যাচাই করা উচিৎ এরপর শোনা ও দেখা বস্তুটি সম্পর্কে অন্তর ও বুদ্ধি বিবেক দিয়ে যাচাই ও পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিৎ। 

আল্লাহ আল কুরআন এ বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন যেন তোমরা হতে পারো (লাআল্লাকুম)। এটা বলার মাধ্যমে তিনি মানুষের কাঙ্খিত মূল গুণাবলীগুলোর পরিচয় দিয়েছে। তিনি বলেছেন যেন তোমরা মুত্তাকী (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ২১, ১৮৩), কৃতজ্ঞ (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ৫২, ১৬ তম সূরা নাহল, আয়াত ৭৮), সঠিক পথপ্রাপ্ত (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ৫৩, ৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৩), চিন্তা ভাবনাকারী (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ২১৯, ২৬৬), বিচক্ষণ (১২ সূরা ইউসুফ, আয়াত ২, ৪৩ তম সূরা জুখরুফ, আয়াত ৩), সফল (৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩০, ২২ তম সূরা হজ্জ, আয়াত ৭৭), উপদেশ গ্রহণকারী  (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ২২১, ১৬ তম সূরা নাহল, আয়াত ৯০), দয়া ও রহমতপ্রাপ্ত  (৬ষ্ঠ সূরা আনআম, আয়াত ১৫৫, ২৪ তম সূরা নুর, আয়াত ৫৬), 

আমাদের সেগুলো অর্জনের চেষ্টা করতে হবে।

অনুগ্রহসমুহ বহুবচনমূলক; তবে এর শক্তিশালী ও দুর্বল অবস্থা রয়েছে। নিয়ামাহু (অনেক অনেক অনুগ্রহসমুহ; শক্তিশালী বহুবচন) অবস্থা ও আনউমিহি (অল্প  সংখ্যক অনুগ্রহসমুহ; দুর্বল বহুবচন) অবস্থা


৩১ নং সূরা লুকমান এর ২০ নং আয়াতে আল্লাহ মানুষদের প্রতি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনুগ্রহসমুহ এর কথা বর্ননা করেছেন। এই সকল অনুগ্রহের সংখ্যা আসলে অগনিত বলা যায় তাই এজন্য শক্তিশালী বহুবচনমুলক শব্দ এই আয়াতে ব্যবহৃত হয়েছে। 

অপরদিকে ১৬ নং সূরা নাহল এর ১২১ নং আয়াতে ইবরাহিম (আঃ) কর্তৃক আল্লাহর প্রতি  কৃতজ্ঞতা আদায়ের কথা বর্নিত হয়েছে যেখানে তিনি কেবলমাত্র অল্প সংখ্যক অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পেরেছেন। এজন্য দুর্বল বহুবচনমুলক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।

আল্লাহ কাদের সাথে আছেন? যারা শক্তিশালী বা সম্পদশালী? যাদের চেহারা সুন্দর তাদের সাথে? না, যে বিষয়গুলো যে কেউ চাইলেই এবং চেষ্টা করলেই অর্জন করতে পারে না এমন গুণাবলী বা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন মানুষের সাথেই আল্লাহ থাকবেন এমন অবিবেচক তিনি নন। তিনি এমন গুন সম্পন্ন কিছু মানুষদের সাথে থাকেন যেগুলো সকলেই ইচ্ছা ও চেষ্টা করলে অর্জন করতে পারে। যেমন আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে, মুত্তাকীদের সাথে, সৎকর্মশীলদের সাথে আছেন। (২য় সূরা আল বাকারা, আয়াত ১৫৩, ১৯৪,  ১৬ তম সূরা আন নাহল , আয়াত ১২৮

পুরুষ মৌমাছির ক্রোমোজোম সংখ্যা ১৬ টি, নারী কর্মী ও রানী মৌমাছির ক্রোমোজোম সংখ্যা ১৬ জোড়া,  রানী মৌমাছি হতে সময় লাগে ১৬ দিন আল কুরআনে মৌমাছি নামের সূরাটি? হ্যা ১৬ তম সূরা।



উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)