১০০। সূরা আল আদিয়াত (অভিযানকারী)

সূরার সারসংক্ষেপঃ

১ম অংশে (আয়াত ১-৫) আল্লাহ বেপরোয়া কিছু মানুষের কর্মকান্ড (তীব্র গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে আক্রমন করা) তুলে ধরেছেন।

বিভিন্ন মুভির আগে ট্রেইলার বের হয়। অথবা কোন মুভি সম্পর্কে মানুষকে আকর্ষন করতে একটি সার সংক্ষেপ ভিডিও বের করা হয় ট্রেইলার হিসাবে। অ্যাকশন মুভিগুলোর ট্রেইলারগুলো সেই রকম থ্রিলিং হয়। এটা দেখে মানুষ মুভি দেখতে আগ্রহী হয়। আল্লাহও কুরআনের এই সূরার ১ম অংশে একটি অ্যাকশন মুভির ট্রেইলার দেখিয়েছেন। তারপর ক্লাইম্যাক্সে এসে বিষয় অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন। অসাধারন! অসাধারন!!!

আরবের লোকেদের বিনোদন এর মধ্যে যুদ্ধ অনেকটা জায়গা দখল করে আছে। সেই সময়ের অন্যতম বাহন ছিলো ঘোড়া যা কিনা এখনকার নামী দামী গাড়ির মত। সূরা আল আদিয়াতে সেই ঘোড়া ও তা নিয়ে বেপরোয়া এর অভিযানের থ্রিলিং এক ট্রেইলারকে চিত্রিত করেছেন আল্লাহ। দেখুন সেই অসাধারন চিত্রটি।

১ নং আয়াতে দ্রুতগামী নারী ঘোড়া এর কথা বলা হয়েছে। পুরুষ ঘোড়ার চেয়ে নারী ঘোড়া সাধারনত বেশি জোরে দৌড়াতে পারে, তাই যুদ্ধ বা অভিযানে এই ঘোড়াকে প্রিফার করা হতো। সেই ঘোড়া দ্রুত দৌড়ানোর কারনে মুখ দিয়ে শব্দ বের হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ সে বেপরোয়া ভাবে এগুচ্ছে। ঘোড়া যখন দ্রুত দৌড়ায়, তখন তার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে যায়। একটি সুস্থ ঘোড়া মিনিটে ১৫ বারের পরিবর্তে দৌড়ানোর সময় ১২০-১৫০ বার পর্যন্ত শ্বাস নিতে পারে। তাদের ফুসফুসের ক্ষমতা এতই বেশি যে তারা প্রতি সেকেন্ডে কয়েক লিটার বাতাস গ্রহণ করতে পারে, যা তাদের পেশিকে অক্সিজেন সরবরাহ করে দীর্ঘক্ষণ সচল রাখে।

ক্ষুরের লোহার সাথে পাথর ও জমিনের আঘাতে অগ্নি স্ফুলিঙ্গ তৈরি হওয়াটা সেই ঘোড়া ও আরোহীর ক্ষীপ্রতা ও বেপরোয়াভাবকেই আরো ভালভাবে প্রকাশ করছে ২য় আয়াতে। ঘোড়ার ক্ষুর মূলত 'কেরাটিন' (মানুষের নখের মতো উপাদান) দিয়ে তৈরি হলেও এটি অত্যন্ত শক্ত। মরুভূমি বা পাথুরে পথে দ্রুত দৌড়ানোর সময় যখন ঘোড়ার ক্ষুর পাথরের সাথে তীব্র ঘর্ষণ তৈরি করে, তখন সেখানে ঘর্ষণজাত তাপের কারণে স্ফুলিঙ্গ বের হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি পদার্থবিজ্ঞানসম্মত ঘটনা। এই প্রাণী মাটির কম্পন বা বাতাসের গন্ধ থেকে শত্রুর উপস্থিতি টের পায়। 

সাধারনত মানুষ আক্রমন করতে চায় রাতে বা অন্ধকারে কিন্তু এই আরোহী এতটাই নির্লিপ্ত ও অহংকারী এবং কাউকে পরোয়া না করেই দিনের আলোতেই আক্রমন করে বসে যা বর্নিত হয়েছে ৩য় আয়াতে। তার বাহনের নানা সুবিধা তাকে এই আত্মবিশ্বাস এনে দেয়। ঘোড়ার চোখ স্থলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ এবং তাদের চোখের অবস্থান মাথার দুই পাশে। এর ফলে ঘোড়া প্রায় ৩৫০ ডিগ্রি পর্যন্ত দেখতে পায়। অর্থাৎ, মাথা না ঘুরিয়েই সে তার চারপাশের প্রায় সবদিক দেখতে পারে। যুদ্ধের ময়দানে বা শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচতে বা শত্রুর উপর আক্রমণ করতে 'ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল' ভিশন তাদের অদ্বিতীয় করে তোলে। 

৪র্থ আয়াতে বলা হচ্ছে এরা ধুলি উড়িয়ে এলাকাটাকে রহস্যময় করে দেয়। তবে ঘোড়ার চোখ ধুলা বালির মধেও ভাল দেখতে পায়। ঘোড়া যুদ্ধের বিশৃঙ্খলা (Chaos of war) সহ্য করতে সক্ষম। ৫ম আয়াতের ক্লাইম্যাক্সে পৌছায় জনসমাগমের ভিতরে ঢুকে পড়ে। এতে ঘোড়া একটি বিশেষ সুবিধা পায়।অশ্বারোহী যোদ্ধা পদাতিক সৈন্যের চেয়ে উচ্চতায় এগিয়ে থাকে, High Ground Advantage পায়। যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর চারপাশ দিয়ে ঘুরে গিয়ে পেছন থেকে আক্রমণ করার জন্য ঘোড়ার গতি ও ফ্ল্যাঙ্কিং ম্যানুভার দারুন কাজে দেয়। এটি আধুনিককালের 'ট্যাংক' বা 'আর্মার্ড ভেহিকল'-এর আদি রূপ। ঘোড়ার পা’র পেশি এবং হাড়ের সন্ধিতে একটি বিশেষ ব্যবস্থা থাকে যাকে বলা হয় 'Stay Apparatus'। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা পেশিতে কোনো চাপ না দিয়েই পা লক করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। ফলে তারা দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হতে পারে এবং কোনো বিপদ দেখলে মুহূর্তের মধ্যে দৌড় শুরু করতে পারে।


এরপর কি হলো? সেটা না বলে আল্লাহ আসল কথাটি বলে দিলেন। এই ঘটনাগুলো সব ঘোড়া করলেও ঘোড়া কিন্তু এখানে মূল না। ঘোড়ার পরিচালক এখানে মানুষ, তাই পরে আল্লাহ মানুষের চরিত্র, অবস্থা বলে দিচ্ছেন। সূরায় ঘোড়ার মালিকের প্রতি আনুগত্যের একটি পরোক্ষ ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মানুষ যখন অকৃতজ্ঞ হয়, তখন ঘোড়া তার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালিকের জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। 

ঘোড়ার স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর। তারা দীর্ঘকাল আগে দেখা কোনো পথ বা কোনো ব্যক্তির আচরণ মনে রাখতে পারে। বিশেষ করে প্রশিক্ষকের প্রতি তাদের আবেগীয় সংযোগ এবং বিশ্বস্ততা অনেক বেশি। 'Man-Machine Interface'-এর প্রাকৃতিক সংস্করণ দেখা যায় মানুষ আর ঘোড়ার ক্ষেত্রে। অলিখিত যোগাযোগ: মনিব অশ্বারোহীর পায়ের সামান্য চাপ বা শরীরের ভারসাম্য পরিবর্তন ঘোড়া বুঝতে পারে। যুদ্ধের চরম মুহূর্তে যখন যোদ্ধা দুই হাত দিয়ে তলোয়ার বা ধনুক চালান, তখন ঘোড়া কেবল তার শরীরের ইশারা বুঝে সঠিক পথে চলে। আত্মত্যাগ: ঘোড়া তার মালিককে রক্ষা করার জন্য নিজের জীবন বাজি রেখে আগুনের কুণ্ডলী বা বল্লমের সারির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধা করে না। এই অটল আনুগত্যই তাকে প্রকৃত 'অয়ারিয়র এনিমেল' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ঐ আরোহীদের মতই মানুষ বেপরোয়াভাবে আল্লাহকে অমান্য করে, অকৃতজ্ঞতা দেখায়। ঘোড়ার পূর্ন নিয়ন্ত্রণ এর মতই সে নিজেকেও নিজে পূর্ন নিয়ন্ত্রনে রাখতে চায় এবং ঘোড়ার চরিত্রের বিপরীতে সে নিজের মনিবের প্রতি কৃতজ্ঞ না হয়ে অকৃতজ্ঞ থাকতেই পছন্দ করে। ঘোড়া জীবনকে বাজি রেখে বিপদের মুখে নিজেকে ফেলে দিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে কিন্তু মানুষ তো তাঁর মনিবের জন্য ঝুকিপূর্ন যুদ্ধে যাওয়া দূরে থাক, সামান্য ইবাদাতই করতে চায় না।

২য় অংশে (আয়াত ৬-৮) আল্লাহ মানুষের কিছু বেসিক দূর্বলতার কথা বলেছেন। আগের অংশের ঘটনার মত মানুষ আসলেই বেপরোয়া এবং ঘোড়ার মত সে মনিবের বাধ্যগত নয় বরং অবাধ্য। এই অবাধ্যতা সে নিজেই জানে, স্বীকার করে। সে দৌড়ায় ধন সম্পদের দিকে যেটিকে সে একমাত্র ভালো বিষয় হিসাবে জানে।

৩য় অংশে (আয়াত ৯-১১) তে মূলত আখিরাতের কথা বলা হয়েছে যেদিন তাঁর এই বেপরোয়া ভাব প্রকাশ পাবে যা সে দেখাতো বা লুকিয়ে রাখতো। সেদিন রবের প্রতি অকৃতজ্ঞ হলেও বা বেপরোয়া হলেও তাকে জবাবদিহী করতে হবে।   
অনেকে মনে করে মানুষ কবরে গেলে মাটির সাথে মিশে যাবে, আর তাকে বের করা যাবে না। এটা খুবই কঠিন কাজ। কিন্তু আল্লাহ বলছেন, এটাই হবে। আল্লাহ প্রতিটি কণা বের করে আনবেন। মানুষকে পুনরায় জীবিত করবেন।  
অনেকে মনে করে হৃদয়ে যা থাকে তা লুকিয়ে থাকে, কেউ জানে না; এগুলো কোনদিন প্রকাশও পাবে না। এটা ভুল প্রমান করে দিবেন আল্লাহ। তিনি প্রতিটি আবেগ, চিন্তা বের করে আনতে সক্ষম। তিনি মাটি হতে শুধু মানুষের দেহই বের করে আনবেন না, সাথে সাথে মাটির দেহ থেকে সেই দেহের হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা সকল অদৃশ্য, গোপন আবেগ, চিন্তা সবই বের করে আনবেন।
সূরার সারমর্মঃ
আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ  ৯৯ তম সূরা আল যিলযালের শেষ ২ আয়াতে মানুষের কর্মের খুটিনাটি বিষয় প্রকাশ পাবে তা বলা হয়েছে, এই সূরা আল আদিয়াতের শেষ ২ আয়াতে মানুষের  চিন্তা/পরিকল্পনার খুটিনাটি বিষয় প্রকাশ পাবে তা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ২ টা  সূরা মিলিয়ে মানুষের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীন সবই প্রকাশ পাবে তা বলা হয়েছে। 
সূরা ঝিলঝাল এ আখিরাতে মানুষের অবস্থার কথা এসেছে এবং এই সূরায় দুনিয়ায় মানুষের অবস্থার কথা এসেছে। আখিরাতের অবস্থা জানার পরও মানুষ তার মালিকের ব্যাপারে বড়ই অকৃতজ্ঞ!!! (আয়াত ৬) 

পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ সূরা আল আদিয়াতে রবের প্রতি অকৃতজ্ঞা, বেশি বেশি ধন-সম্পদ এর লোভে মত্ততা প্রকাশ পেয়েছে। পরের সূরা আল ক্বরিয়াহ তে কিয়ামতের ভয়াবহতা প্রকাশিত হয়েছে। অকৃতজ্ঞতা, লোভ ছেড়ে ভালো কাজের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। কিয়ামতের ভয়াবহতা জেনেও মানুষ তা ভুলে থেকে ধন-সম্পদের লোভে মত্ত রয়ে যায়! এটি বর্নিত আছে সূরা আত তাকাসূর এ। 
৯৯-১০২ এই ৪ টি সূরায় অল্টারনেট ভাবে আখিরাত ও দুনিয়ার কথা এসেছে।  (৯৯ তম) সূরা আল যিলযালে যেমন আখিরাতের কথা এসেছিলো তেমনি (১০১ তম) আল ক্বরিয়াহ তে আবার আখিরাতের কথা এসেছে। ১০০ তম সূরা আল আদিয়াত ও ১০২ তম সূরা আত তাকাসুর আবার দুনিয়া বিষয়ক। আল্লাহ এভাবে আখিরাত, দুনিয়া, আবার আখিরাত, আবার দুনিয়া এর বিষয় নিয়ে এসে মানুষকে বারবার সাবধান করেছেন এবং দুনিয়ার সাথে যে আখিরাত অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত তা বোঝাতে চেয়েছেন।   

এছাড়া (৯৯ নং) সূরা আল যিলযাল এ মানুষ উত্থিত হবে ও কর্মকান্ড দেখানো হবে তা বলা হয়েছে। (১০০ নং) সূরা আদিয়াত এ মানুষের কর্মকান্ডের পাশাপাশি মনের  লুকায়িত উদ্দেশ্যও চিন্তা প্রকাশিত হবে তা বলা হয়েছে। যেহেতু সকল কর্মকান্ড ও চিন্তা প্রকাশিত হবে তাই এর পরের লজিকাল সিকুয়েন্স হলো বিচার। সেই চুলচেরা বিচার এর কথাই উঠে এসেছে (১০১ নং) সূরা আল ক্বরিয়াহ তে। সবশেষে এই সিরিজের শেষ (১০২ নং) সূরা আত তাকাসুর এ বিচারের পর মানুষের পরিনতি দৃশ্যমান হবে তার বর্ননা এসেছে। এ যেন এক অসাধারন লজিকাল সিকুয়েন্স, Continuous process! আল্লাহু আকবার। 


উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)