৩। সূরা আলে ইমরান (ইমরানের বংশধর)

এই সূরার মূল বিষয় হলো ইসলাম। আগের সূরা আল বাকারার মূল বিষয় ছিল ঈমান।

আয়াত (আংশিক) তে আল্লাহ বলছেনঃ তিনি তোমার ওপর এই সত্য সহকারে এই কিতাব বার বার নাযিল করেছেন..  এখানে نَزَّلَ দ্বারা মুহাম্মাদ (স) এর জীবনের ২৩ বছরে বারবার (১ম আসমান হতে পৃথিবীতে) নাযিল হওয়া বোঝানো হয়েছে। ২য় সূরা আল বাকারা এর আয়াত ১৮৫ (আংশিক) তে আল্লাহ বলছেনঃ রমযান মাস, এ মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে..  এখানে أُنزِلَ দ্বারা লাইলাতুল কদরে একবার (৭ম আসমান হতে ১ম আসমান) নাযিল হওয়া বোঝানো হয়েছে। 

মূল কিতাবসমূহ বিশ্বাস করা ঈমানের অংশ। মুসলিমরা আল্লাহর নাযিল করা ইঞ্জিল  বিশ্বাস করে তবে মূল কিতাবটি, কোন পরিবর্তিত কিতাব নয়। ইঞ্জিল এর উপর  মুসলিমদের ও খৃষ্টানদের বিশ্বাস এক নয়। খৃষ্টানরা ইঞ্জিল/বাইবেল বিশ্বাস  করে তবে যেটির অনেক ধরনের সংস্করন রয়েছে যা তারা স্বীকার করে। সংযোজন, বিয়োজন, পরিবর্তন, অনুবাদ ইত্যাদির কারনে এই ইঞ্জিল/বাইবেল আর আগের মূল ইঞ্জিল হিসাবে নেই।  

আল কুরআন সর্বশেষ কিতাব, যার মধ্যে আগের কিতাবসমূহের সকল মূল শিক্ষাই রয়েছে। তাই আসমানী কিতাবসমূহের সর্বশেষ, নির্ভুল সংস্করনটিই বিশ্বাস ও মেনে চলাই যৌক্তিক।    

সূরা আলে ইমরান এর কয়েকটি আয়াতে রব্বানা শব্দটি এসেছে, যেমনঃ ৮, ১৬, ১৪৭। ‘রব্বি’ ও ‘রব্বানা’ শব্দটি মূলত দুটি করে শব্দ। ‘ইয়া রব্বি’ ও ‘ইয়া রব্বানা’। কিন্তু ‘ইয়া’ বা ‘হে’ শব্দটি আল্লাহর ক্ষেত্রে বিলুপ্ত করে ব্যবহার করা হয়। আল্লাহ  আমাদের খুবই কাছের, আপন বিধায় দূরবর্তি সংক্রান্ত শব্দ ‘হে’ বাদ দিয়ে শুধু রব্বি বা রব্বানা বলা হয়। সুবহানাল্লহ!

বনী ইসরাইল জাতির একটি ভ্রান্ত ধারনা ছিল যে তারা স্পেশাল, chosen জাতি। তারা খারাপ না, খারাপ কাজ করলেও তাদেরকে আল্লাহ জাহান্নামে দিবেন না। যদি একান্ত দেনই তাহলে খুবই অল্প সময়ের জন্য বা অল্প দিনের জন্য। 

৩য় সূরা আলে ইমরান আয়াত ২৪ এ বলা হয়েছে اَيَّامًا مَّعۡدُوۡدٰتٍ বা অল্প কিছু সময়। সূরা আলে ইমরানে উল্লেখিত বনী ইসরাইলগন কম অপরাধের সাথে জড়িত। তাই তারা জাহান্নামে অল্প সময় কাটানোর চিন্তায় উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে ২য় সূরা বাকারা আয়াত ৮০ তে প্রায় একই রকম শব্দ কিন্তু একটু আলাদা করে বলা হয়েছে  اَيَّامًا مَّعۡدُوۡدَةً ​মাত্র কয়েকদিন। সূরা বাকারায় উল্লেখিত বনী ইসরাইলগন বেশি অপরাধের সাথে জড়িত। তাই তারা জাহান্নামে কিছুটা বেশি সময় কাটানোর চিন্তায় উদ্বিগ্ন। 

আয়াত ২৪ এ কত বড় ধৃষ্টতার প্রমান মিলিছে সেই আহলে কিতাব/ ইহুদীদের!!! যেখানে মুমিন বান্দাহরা  জাহান্নামে এক মুহুর্তের জন্যও যাওয়ার সাহস করে না (অল্প সময়ের আশ্রয়স্থল বা অধিক সময়ের স্থায়ী আবাস হিসেবেও না) (২৫ তম সূরা আল ফুরকন; আয়াত ৬৫,৬৬) সেখানে তারা (আহলে  কিতাব/ ইহুদীরা) কিভাবে নিশ্চিত হয় যে তারা জাহান্নামে যাবেই না বা গেলেও অল্প সময়ের জন্য?

৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৫২ তে বলা হয়েছে; অতঃপর ঈসা যখন তাদের অবিশ্বাস অনুভব করল, তখন বলল, কেউ আছে যে আল্লাহর পথে আমার সহায়ক হবে। হাওয়ারীগণ বলল, ‘আমরাই আল্লাহর সাহায্যকারী,  নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি এবং সাক্ষী থাকুন যে, আমরা মুসলিম’। যখন তারা নবির আহবানে সাড়া দিয়ে ঈমানের ঘোষণা দিয়েছে তখন بِاَنَّا  (নিশ্চয়ই) ব্যবহার করে বিষয়টি বর্ননা করেছে। সেই সাথে কেবলমাত্র আল্লাহর উপর ঈমান আনার বিষয় উল্লেখ করেছে, অন্য কোন বিষয় নয়। 

অন্যদিকে ৫ম সূরা আল মায়িদাহ, আয়াত ১১১ তে বলা হয়েছে; স্মরণ কর যখন আমি হাওয়ারীদের অন্তরে ইলহাম করেছিলাম যে, আমার প্রতি আর আমার রসূলের প্রতি ঈমান আন; তারা বলেছিল, অবশ্যই, নিশ্চয়ই আমরা ঈমান এনেছি আর সাক্ষী থাকুন যে, আমরা মুসলিম। যখন তারা আল্লাহর ইলহামের অনুপ্রেরণায় ঈমানের ঘোষণা দিয়েছে তখন بِاَنَّـنَا (অবশ্যই, নিশ্চয়ই) ব্যবহার করে বর্ননা করেছে। সেই সাথে শুধু ঈমান আনার বিষয় উল্লেখ করে আল্লাহসহ সকল বিষয়ে ঈমান আনার বিষয় উল্লেখ করেছে। 

সুতরাং নবির আহবানে নিশ্চয়তাসহ ঈমান আনা এর বিপরীতে আল্লাহর ইলহামের কারনে অধিক নিশ্চয়তাসহ ঈমান আনা এর বিষয় উল্লেখ রয়েছে। সেই সাথে নবির আহবানে শুধু আল্লাহর উপর ঈমান আনা এর বিপরীতে আল্লাহর ইলহামের কারনে ঈমানের সকল দিক উদ্ভাসিত হবার বিষয়টি উল্লেখিত হয়েছে। নবীর চাইতে আল্লাহর প্রভাব বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক। 

হযতর আদম (আঃ) ও ঈসা (আঃ) এর নাম আল কুরআন এর বিভিন্ন সূরায় মোট ২৫ বার করে এসেছে। ৬ষ্ঠ তম বার, ৩য় সূরা আলে ইমরানের ৫৯ নং আয়াতে তাদের দুজনের নাম একসাথে এসেছে। সেখানে আল্লাহ বলছেনঃ "নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত হচ্ছে আদমেরই মত; তাকে তিনি মাটি দিয়ে তৈরি করেছিলেন তারপর তাকে বলেছিলেন, হয়ে যাও- সঙ্গে সঙ্গে তিনি হয়ে গেলেন"। 

আয়াতের বিষয়বস্তুর সাথে এই মিল কি সুন্দরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ন! কি অসাধারন এই মিল! 



এছাড়াও আদম (আ) পৃথিবীতে নেমে এসেছেন, এরপর পৃথিবীতে অবস্থান করে পরে মৃত্যুবরন করেছেন। তেমনি ঈসা(আ) ও পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছেন, আল্লাহ তাকে তুলে নিয়েছেন, পরে আবার তিনি পৃথিবীতে নেমে আসবেন। এরপর পৃথিবীতে অবস্থান করে পরে মৃত্যুবরন করবেন। 

অন্য কোন নবী এভাবে পৃথিবীতে নেমে আসেননি। সুতরাং পৃথিবীতে নেমে আসার ক্ষেত্রেও আদম (আ) ও ঈসা(আ) এর মিল রয়েছে। 

২য় সূরা আল বাকারা, আয়াত ১৪৭ তে কিবলা পরিবর্তন সংক্রান্ত বিষয়ে ইহুদিদের পক্ষ থেকে আসা ইন্টেলেকচুয়াল বা বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমন এর কারনে সৃষ্ট সন্দেহ এর কথা আলোচনা করা হয়েছে যা বেশি তীব্র সন্দেহ এজন্য বাক্যের শব্দে নুন ن বেশি। 

অন্যদিকে ৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৬০ তে আদম ও ঈসা (আ) সংক্রান্ত বিষয়ে খ্রিষ্টানদের পক্ষ থেকে আসা ইমোশনাল বা আবেগময় আক্রমন এর কারনে সৃষ্ট সন্দেহ এর কথা আলোচনা করা হয়েছে যা কম তীব্র সন্দেহ এজন্য বাক্যের শব্দে নুন ن কম। কি দারুন আল্লাহর প্রকাশভঙ্গি, বাস্তবতার সাথে মিল রেখে শব্দচয়ন।  

২য় অংশে (আয়াত ৬-১৩) মুমিনদের বৈশিষ্ট্য (ঈমানের প্রতি ভালবাসা, কুফরী, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে ঘৃণা) এবং অন্য মুমিন ও মানুষের সাথে মুমিনদের কেমন ব্যবহার (লড়াইরত/বিবাদমান দলের মধ্যে মিমাংসা, ইনসাফ করা, বিদ্রূপ না করা, খারাপ নামে না ডাকা, বেশী ধারণা ও অনুমান করা থেকে বিরত থাকা, দোষ অন্বেষণ না করা, গীবত না করা, পরহেজগারী) করা উচিৎ ও তা না করলে কি পরিনাম সেটা বর্ননা করা হয়েছে।    

আল্লাহর প্রিয় মানুষদের বৈশিষ্ট্য আল্লাহ বিভিন্ন জায়গায় বর্ণনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সৎকর্মশীল (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ১৯৫, ৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৪, ১৪৮), , তাওবাকারী (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ২২২), পবিত্রতা অর্জনকারী (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ২২২, ৯ম সূরা আত তাওবা, আয়াত ১০৮), মুত্তাকী (৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৭৬, ৯ম সূরা আত তাওবা, আয়াত ৪, ৭), ধৈর্যশীল (৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৪৬), তাওয়াক্কুলকারী (ভরসাকারী)  (৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৫৯), ন্যায় বিচারক (৫ম সূরা আল মায়িদাহ ৪২, ৪৯ তম সূরা আল হুজুরত আয়াত ৯), আল্লাহর পথে সুশৃঙ্খল লড়াকু (৬১ তম সূরা আস সফ, আয়াত ৪)। এই গুনগুলো মানুষের মৌলিক সুন্দর গুণাবলী। আল্লাহ চান আমরা এসব গুণাবলী অর্জন করি। এগুলো অর্জন করার জন্য আল্লাহ বিভিন্ন ইবাদত, নিয়ম নীতি দিয়েছেন। 


আল কুরআনে মক্কাকে ২ ভাবে বর্ননা করা হয়েছে। আরবীতে এক জায়গায় বলা হয়েছে মাক্কাহ (সূরা মুহাম্মাদ) আর এক জায়গায় বাক্কাহ (সূরা আলে ইমরান)। অনেকে বলেন প্রথমে নাম ছিলো বাক্কাহ, পরে মক্কা হয়েছে; মক্কা মূল নাম, বাক্কাহ হলো ডাকনাম ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে আল কুরআনের সৌন্দর্য্য অন্য খানে লুকিয়ে আছে।   বাক্কাহ নামটির সাথে জমায়েত, Gathering জড়িত। সূরা আলে ইমরানের ৯৬ নং আয়াতে বাক্কাহ নামটি ব্যবহার করা হয়েছে। এর পরের আয়াতেই হজ্জের কথা বলা হয়েছে যা কিনা জমায়েত, Gathering এর সাথে সম্পর্কিত। অপরদিকে সূরা মুহাম্মাদ এ মাক্কাহ শব্দটি ব্যবহার করেছেন আল্লাহ যেখানে হজ্জের বিষয়টির উল্লেখ নেই, অর্থাৎ জমায়েত, Gathering জড়িত নয়। আল্লাহর শব্দচয়ন, selection কত নিখুঁত! এমন আরো হাজারো উদাহরন থেকে খুব সহজেই বোঝা যায় আল কুরআনের ভাষা কত উচ্চ মাপের, শব্দ চয়নে, placement এ আল কুরআন কতটা perfect. 

আয়াত ৮ এর ১ম অংশ এর অর্থঃ হে আমাদের রব! আমাদের অন্তরকে বক্রতায় আচ্ছন্ন করে দিয়ো না…   অন্তর বক্রতায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলে, সঠিক পথে না থাকলে, বাঁকা হয়ে দূরে সরে গেলে সম্পূর্ণ মানুষটিই আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে যায়। এর প্রমান পাওয়া যায় পরের অংশ (بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا) থেকেই।
আমাদের অন্তর (কুলুবানা) এর কথা বলার পর পথ প্রদর্শনের কথা বলার সময় আমাদের সম্পূর্ণ মানব শরীর ও সত্ত্বাকে একসাথে বলা হয়েছে। অর্থাৎ অন্তরকে সঠিক পথ প্রদর্শন এর কথা (হাদাইতাহা) না বলে আমাদেরকে (হাদাইতানা) সঠিক পথ প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে। সুতরাং অন্তর সঠিক পথে থাকলে মানুষ সঠিক পথে থাকে একথাটি বোঝানো হয়েছে।      


৩ নং সূরা আলে ইমরান এর ৩৭ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, আমবাতাহা নাবাতান হাসানা; অর্থাৎ তিনি তাকে লালনপালন করেছেন সর্বত্তোম বেড়ে ওঠার মত। সচারচর ব্যাকরণের নিয়মে হওয়ার কথা ছিল আমবাতাহা ইমবাতান হাসানা;  অর্থাৎ তিনি তাকে লালনপালন করেছেন সর্বত্তোম লালনপালন করার মত। 

এভাবে বলার মাধ্যমে আল্লাহ ব্যতিক্রমীভাবে সর্বোচ্চ সুন্দরভাবে লালন পালন করার ক্ষেত্রে শুধু যাকারিয়া (আঃ) কেই কৃতিত্ব দিয়েছেন এমন নয়, সাথে মারিয়াম (আঃ) এর অন্তর্নিহিত বিশুদ্ধতা, উত্তম গুণাবলীর সন্নিবেশকেও বিরাট কৃতিত্বের সাথে সামিল করেছেন।

৮৫ নং আয়াতে বলে হয়েছে, ইসলাম ছাড়া অন্য সকল পথ, জীবন বিধান পরিপূর্ন নয়। তাই ইসলাম বাদে অন্য কিছুর পিছে চললে বা অনুসন্ধান করলে আসলে এক প্রকার শয়তানের পথেই চলা হয়, তাকেই অনুসরন করা হয়। ইসলাম ভিন্ন অন্য পথের, বিধানের পরিনতি তাই কঠিন, খারাপই হবে। আখিরাতে শয়তানের মতই চরম ব্যর্থ হতে হবে। 
আল কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ৯২ নং আয়াতে আল্লাহ  সাফল্য অর্জন কথাটি বলার সময় তিনি খইর বা অন্য শব্দ ব্যবহার না করে 'বির' ব্যবহার করেছেন। যা কিনা 'বার' শব্দের সাথে সম্পর্ক যুক্ত। বার অর্থ ভূমি বা ডাঙ্গা। ঝড়-বৃষ্টিতে মাঝ নদী থেকে ডাঙ্গায় পৌছাতে (সাফল্য অর্জন করতে) প্রিয় জিনিস নদীতে ফেলা লাগতে পারে।  
তেমনি দানে সাফল্য পেতে হলে প্রিয় বস্তু দান করতে হবে। অসাধারন মিল!!   

আল্লাহ আল কুরআন এ বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন যেন তোমরা হতে পারো (লাআল্লাকুম)। এটা বলার মাধ্যমে তিনি মানুষের কাঙ্খিত মূল গুণাবলীগুলোর পরিচয় দিয়েছে। তিনি বলেছেন যেন তোমরা মুত্তাকী (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ২১, ১৮৩), কৃতজ্ঞ (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ৫২, ১৬ তম সূরা নাহল, আয়াত ৭৮), সঠিক পথপ্রাপ্ত (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ৫৩, ৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৩), চিন্তা ভাবনাকারী (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ২১৯, ২৬৬), বিচক্ষণ (১২ সূরা ইউসুফ, আয়াত ২, ৪৩ তম সূরা জুখরুফ, আয়াত ৩), সফল (৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩০, ২২ তম সূরা হজ্জ, আয়াত ৭৭), উপদেশ গ্রহণকারী  (২য় সূরা বাকারা, আয়াত ২২১, ১৬ তম সূরা নাহল, আয়াত ৯০), দয়া ও রহমতপ্রাপ্ত  (৬ষ্ঠ সূরা আনআম, আয়াত ১৫৫, ২৪ তম সূরা নুর, আয়াত ৫৬), 

আমাদের সেগুলো অর্জনের চেষ্টা করতে হবে।  

৩য় সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৩  এ বর্নিত জান্নাতের আকার বা বিস্তৃতি ঃ  সাত আসমান-যমীন অনুরূপ। ‘আস সামাওয়াত’ শব্দটি বহুবচন হলেও এটি শুধুমাত্র সাত আসমান-যমীন বোঝায়। এই জান্নাত তাদের জন্য যারা তাকওয়া সমৃদ্ধ, দান কারী, ক্রোধের সময় সংযত ও ক্ষমাশীল। একসাথে এত গুন সম্পন্ন মানুষের সংখ্যা নিঃসন্দেহে কম বিধায় তাদের জন্য জান্নাতের জায়গাও কম লাগবে। এজন্য এই আয়াতে বর্নিত জান্নাতের আকার বা বিস্তৃতি কম।  


অন্যদিকে ৫৭ তম সূরা হাদিদ, আয়াত ২১  এ বর্নিত জান্নাতের আকার বা বিস্তৃতি ঃ  সকল আসমান-যমীন অনুরূপ। ‘আস সামা’ শব্দটি একবচন হলেও এটি সাত আসমান সহ সকল আসমান-যমীন বোঝায়। এই জান্নাত তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের উপর ঈমান এনেছে। এটা তুলনামুলক সহজ হওয়ায় এমন মানুষের সংখ্যা নিঃসন্দেহে বেশি বিধায় তাদের জন্য জান্নাতের জায়গাও অনেক বেশি লাগবে। এজন্য এই আয়াতে বর্নিত জান্নাতের আকার বা বিস্তৃতি বেশি।  

সবুজ শব্দটি কুরআনে এসেছে ৮ বার। জান্নাতের দরজা ৮ টি। জান্নাতের সাথে সবুজ শব্দটি সবচেয়ে সম্পর্কিত। আল কুরআনের সূরা আনআম, ইউসুফ, কাহাফ, হজ্জ, ইয়াসীন, রহমান, দাহরে এসেছে সবুজ শব্দটি। কালো শব্দটি কুরআনে এসেছে ৭ বার। জাহান্নামের দরজা ৭ টি। জাহান্নামের সাথে কালো শব্দটি সবচেয়ে সম্পর্কিত। আল কুরআনের সূরা বাকারা, আলে ইমরান, নাহল, ফাতির, জুমার, জুখরুফ এ এসেছে কালো শব্দটি।

অর্থাৎ জান্নাত ও জাহান্নামের দরজা মোট ১৫ টি। আল কুরআনে দরজা শব্দটির বহুবচনঃ দরজাসমূহও এসেছে ১৫ বার। এগুলো এসেছে বাকারা, আনআম, আরাফ, ইউসুফ, হিজর, নাহল, সোয়াদ, জুমার, মুমিন, জুখরুফ, কমার, নাবা তে। মজার ব্যাপার হলো, ৭ম বারে আসা দরজা শব্দটির আয়াতটি জাহান্নামের দরজা সম্পর্কিত এবং ৮ম বারে আসা দরজা শব্দটির আয়াতটি জান্নাতের দরজা সম্পর্কিত। কি দারুন মিল!


১৩৩ তম আয়াতে বলা হয়েছে তাদেরই জন্য জান্নাত প্রস্তুত রাখা আছে; যাদের ১ম  বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছেঃ যারা আল্লাহকে ভয় করে। এরপর তাদের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য (অর্থ-সম্পদ ব্যয়, ক্রোধ দমন,  অন্যের দোষ-ক্রটি মাফ,  অশ্লীল কাজ বা  নিজেদের ওপর জুলুম করে বসলে আল্লাহর স্মরণ করে মাফ চাওয়া, গুনাহে অটল না থাকা) হিসাবে ১৩৪ ও ১৩৫ আয়াতে বর্নিত কাজগুলোর কথা বর্ননা করেছেন আল্লাহ। তারা ভালো কাজগুলো  করতে থাকে এবং ভালো কাজ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে। কোন  খারাপ কাজ হয়ে গেলে ক্ষমা চায় এবং পরে খারাপ কাজ আর না করে তা থেকে বিরত  থাকে।  

আল্লাহ চলাচলের জন্য আল কুরআনে কয়েকটি শব্দ ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন সূরায়। ৬৭ নং সূরা আল মূলক এর  ১৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে "হাটো", এটা মূলত রিযিক অন্বেষণের জন্য অল্প গতির চলাচল। ৬২ নং সূরা আল জুমুয়া এর  ৯ নং আয়াতে নামাজে যাওয়ার ক্ষেত্রেঃ  “ধাবিত হও” বলা হয়েছে যা আরেকটু বেশি গতির চলাচল। 

৩ নং সূরা আলে ইমরান এর  ১৩৩ নং আয়াতে জান্নাত  লাভের  ক্ষেত্রেঃ “পাল্লা দিয়ে দৌড়াও” বলা হয়েছে যা আরো বেশি গতির চলাচল। ৫১ নং সূরা আয যারিয়াত এর  ৫০ নং আয়াতে আল্লাহর দিকে  চলার  ক্ষেত্রেঃ  “ছুটে চলো” বলা হয়েছে যা আগের সকল গতির বেশি গতির চলাচল।  এভাবে আল্লাহ গুরুত্ব ও লক্ষ্য এর বিবেচনায় চলার গতি বাড়াতে বলেছেন খুব সুন্দরভাবে। সুবহানাল্লহ।  

আয়াত ১৪০ এ আল্লাহ বুঝিয়েছেন যে, আল্লাহ মানুষের মধ্যে উত্থান–পতন এর আবর্তন ঘটান এই জন্য যে তিনি দেখে নিতে চান কারা সত্যিকারের ঈমানদার। ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের সাময়িক পরাজয় ও ক্ষয়-ক্ষতির মাধ্যমে আল্লাহ মুসলিমদের ঈমান এর পরীক্ষা করে নিয়েছেন।   
ওহুদের যুদ্ধের পরও মুসলিমরা আল্লাহর উপর বিশ্বাস রেখেছে। মুসলিমরদের ঈমান ওহুদের আগুনে পুড়ে নিখাদ হয়েছে। অর্থাৎ আগুনের মত কষ্টে পড়ে সোনার মত ঈমান নিখাদ হয়েছে।  

আল কুরআনের আলোকে ২ ধরনের বাতাসের পার্থক্যঃ  বহুবচনের বাতাস ‘রিয়াহ’  এই বাতাস নিয়ামত হিসাবে আসে। হেলেদুলে প্রবাহিত হয়, কখনও এদিক থেকে কখনও  ওদিক থেকে বিক্ষিপ্তাকারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বইতে থাকে; কেমন যেন সেখানে অনেকগুলো বাতাস থাকে । এমন উদাহরন আছে বিভিন্ন সূরা ও আয়াতে। যেমনঃ ২:১৬৪, ৭:৫৭, ১৫:২২, ১৮:৪৫, ২৫:৪৮, ২৭:৬৩, ৩০:৪৬, ৩৫:০৯, ৪৫:০৫

অপরদিকে এক বচনের বাতাস ‘রীহ’। এই বাতাস আযাব হিসাবে আসে। বজ্রকঠিন ও একে অন্যের সাথে লাগোয়া। অনেক বেশি জমাটবাঁধা, ঘনীভূত ও সঙ্ঘত; কেমন যেন একটাই মাত্র তাবাস থাকে। এমন উদাহরন আছে বিভিন্ন সূরা ও আয়াতে। যেমনঃ  ৩:১১৭, ১৪:১৮, ১৭:৬৯, ২২:৩১, ৩০:৫১, ৩৩:৯, ৪২:৩৩, ৪৬:২৪ সাধারনভাবে একবচন ও বহুবচন নেকই ধরনের অর্থ প্রকাশ করলেও আল কুরআন এখানে বহুবচনে নিয়ামত ও একবচনে আযাব প্রকাশ করেছে।    

যারা ঈমান এনেছে (আল্লাযী-না আ-মানু) ও যারা মুমিন (মু’মিনূ-ন) তাদের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। যারা ঈমান এনেছে শব্দগুলো ক্রিয়া/কাজ এর সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং মুমিন শব্দটি বিশেষ্য এর সাথে সম্পর্কযুক্ত। সাধারনত ক্রিয়া পরিবর্তনশীল ও অস্থায়ী এবং বিশেষ্য সাধারনত গুনবাচক ও স্থায়ী হয়, অস্তিত্বের সাথে মিশে যায় এমন।  

যারা ঈমান এনেছে বলতে সেই সব মানুষদের বোঝায় যারা মুখে ঈমান এনে ইসলামে প্রবেশ করেছে কিন্তু অন্তরে ঈমান এখনও পুরাপুরি গেঁথে যায় নাই। অপরদিকে মুমিন বলতে সেই সব মানুষদের বোঝায় যারা মুখে ও অন্তরে ঈমান রাখে এবং স্থায়ী ও দৃঢ় ভাবে তাতে প্রতিষ্ঠিত থাকে। 

আল্লাহ ৪ ধরনের মানুষদের ৪ ভাবে চিত্রায়িত করেছেন; ও হে যারা ঈমান এনেছ, মুমিন, ও হে যারা কুফরী করেছ, ও হে যারা কাফির। মুমিনদের একান্ত নৈকট্য ও যারা ঈমান এনেছে তাদের ক্ষেত্রে কিছুটা দূরত্ব রাখলেও যারা কুফরী করেছে ও কাফির উভয়ের ক্ষেত্রেই আল্লাহ দূরত্বসূচক শব্দ ইয়া (ও হে) ব্যবহার করেছেন 


আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ আগের সূরা (২য় সূরা আল বাকারা) এর মূল বিষয় হলো ঈমান, আর পরের (এই) ৩য় সূরা আলে ইমরানের মূল বিষয় হলো ঈমানের পরের ধাপ; ইসলাম। দুটি সূরাই ‘আলিফ লাম মীম’ দিয়ে শুরু হয়েছে।     

পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ




উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ










মন্তব্যসমূহ