৯৯। সূরা আল ঝিলঝাল (প্রবল কম্পন)

১ম আয়াতে পৃথিবীর কম্পনকে দুবার বর্ননা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে এর চুড়ান্ত প্রচন্ডতা প্রকাশ পেয়েছে। আল্লাহ এখানে যদি না বলে যখন বলেছেন। অর্থাৎ পৃথিবী যে ধ্বংস হবেই এটা নিশ্চিত, কোন সন্দেহ নাই। আয়াতটি passive বা কর্ম বাচ্যে বর্ননা করা হয়েছে। যখন বাক্যে কর্তা না থাকে তখন সে কাজটি সহজেই সম্পন্ন হয় হিসাবে ধরা হয়। এখানে এভাবে বর্ননা করে আল্লাহ বুঝিয়েছেন যে, কিয়ামত ঘটানো তাঁর কাছে খুবই সহজ। এখানে পৃথিবীর কম্পন বলতে পুরা পৃথিবীর কম্পন বোঝানো হয়েছে, অল্প কয়েক জায়গার নয়, পুরা পৃথিবীর কম্পন।



এই ভূমিকম্পনের ফলে পৃথিবী তাঁর বোঝাসমূহ বের করে দিয়ে মুক্তি পেয়ে যাবে; যা বর্নিত হয়েছে ২য় আয়াতে। এই বোঝা বলতে অনেকেই পৃথিবীর অভ্যন্তরের বিভিন্ন খনিজ সম্পদের কথা বলেছেন তবে আসলে যমীনের মূল বোঝা হলো মানুষ ও তাঁর কৃত অপরাধগুলো যা সে কষ্ট করে এতদিন ধারন করে যাচ্ছে।


 ঐ দিন প্রতিটি মানুষ আলাদা আলাদা ভাবে উঠবে এবং একক ব্যক্তি হিসাবে যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালিত করবে। এজন্য এখানে আল্লাহ মানুষকে বোঝাতে একবচন ইনসান শব্দটি ব্যবহার করেছেন। সেদিন অবাক হয়ে কিছু মানুষ ভাবতে থাকবে এই পৃথিবীর কি হলো? এটাই বর্ননা করা হয়েছে ৩য় আয়াতে। মানুষ পৃথিবীর কি হলো সেই চিন্তা করার ও প্রশ্ন করার পর পৃথিবী ও আল্লাহ তাদের বুঝিয়ে দিবেন যে, পৃথিবী ও তার পরিনতি নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই বরং মানুষ, নিজেকে নিয়ে চিন্তা করো, তোমার পরিনতি কি হবে?

১ম আয়াতে ইযা বলে সময়টাকে নির্দিষ্ট না করা হলেও আল্লাহ তাঁর ক্রোধ এর প্রকাশ হিসাবে ৪র্থ আয়াতে এসে ইয়াওমায়িযিন সেদিন’ বলে সেই স্পেসিফিক দিনটিকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। পৃথিবীর উপর মানুষ যা যা করেছে সেগুলো পৃথিবী বর্ননা করবে আল্লাহর কাছে এবং/অথবা মানুষদের কাছে। পৃথিবী সব কিছুর সাক্ষ্য দিবে, তার কোথায় কোন কাজ করা হয়েছে।

৫ম আয়াতে বলা হয়েছেঃ পৃথিবী এই কাজটি সহজেই করতে পারবে কারন আল্লাহ পৃথিবীকে ওহি দিবেন। এখানে ওহি বলতে স্পেশাল নির্দেশনা বোঝানো হয়েছে। সচারচর নিয়ম অনুসারে আওহা ইলাইহা হওয়ার কথা কিন্তু এ আয়াতে বলা হয়েছে আওহা লাহা। এটি কি ভুল? না, এখানে সম্ভবত আরবীর ভাষার একটি অসাধারন সৌন্দর্য্য ব্যবহার করা হয়েছে। অব্যয় হিসাবে এখানে ইলা এর বদলে লা হয়েছে। যখন ১ টা ক্রিয়া তার সাথে অব্যয় ও এর পরে আরেকটা ২য় ক্রিয়া তার সাথে ২য় অব্যয় আসে তখন ১ম অব্যয় ও ২য় ক্রিয়া লুপ্ত করে দেয়া যায়। সম্ভবত আল্লাহ এখানে বোঝাতে চেয়েছেন আওহা ইলাইহা আযিনা লাহা। উপরের নিয়ম অনুসারে হয়ে গেছে আওহা লাহা। অর্থাৎ পৃথিবীকে আল্লাহ সব কিছু বের করে প্রকাশ করে দিতে অনুপ্রাণিত করবেন এবং অনুমতি দিবেন। অর্থাৎ আমাদের পাপের বোঝা বের করে দিতে পৃথিবী সব সময়েই ব্যাকুল রয়েছে, অনুমতি প্রার্থনা করছে।


৬ষ্ঠ আয়াতে ইয়াসদুর দ্বারা প্রত্যাবর্তন বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ যমীনে ছিল এরপরে কবরে যাওয়ার পর আবার যমীনে ফিরে আসবে। মানুষ তখন বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে জড়ো হবে। এখানে আমাল শব্দ দ্বারা ইচ্ছাকৃত কাজগুলোকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ সচেতনভাবে যা করেছে তা দেখানো হবে।


আয়াত ৭ এ ফা শব্দটি দ্বারা আগের সব আলোচনার মূল কারন ও সমাপ্তি টানা হয়েছে। যাররা বলতে বুঝায় এমন জিনিস ক্ষুদ্রতম জিনিস যা প্রায় উপেক্ষা করা যায়। এখানে দেখা বিষয়টি হাইলাইট করা হয়েছে কারন কিয়ামতের কিছুই এখন দেখা যায় না কিন্তু সেই দিন অবশ্যই সেগুলো দেখা যাবে।


৮ম আয়াতে বোঝানো হয়েছে যে, ক্ষুদ্রতম ভালো কাজ যেমন দেখা যাবে তেমনি ক্ষুদ্রতম খারাপ কাজও দেখা যাবে। এখানে দেখা বিষয়টি চোখ দ্বারা দেখার সাথে সাথে বুঝতে পারা বিষয়টিও প্রকাশ পেয়েছে। অর্থাৎ মানুষ ঐ কাজসমূহের ফলাফল এর বিষয়ও বুঝতে পারেবে।


অর্থাৎ এই ছোট ছোট ভালো ও খারাপ কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ন। এগুলো তেমন চোখে পড়ে না কিন্তু অনেকবার এগুলো করতে থাকলে তা এক সময় বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। আল্লাহ আমাদেরকে ছোট ছোট ভালো ও খারাপ কাজগুলোর দিকে এই দুনিয়াতেই নজর ও গুরুত্ব দেয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।

মহাবিশ্বে সকল ক্ষুদ্রতম (জাররা) পরিমান বস্তু এর বিষয় আল্লাহ জানেন। বিজ্ঞানের এই যুগে অনু, পরমানু ও এর বিভিন্ন উপাদান আবিষ্কৃত হওয়ার পর এটি ভালভাবে বোঝা যায় যে কত ক্ষুদ্র জিনিসের বিষয়ও আল্লাহ জানেন। সুবহানাল্লহ 

সূরার শুরু হয়েছিল অনেক বড় জিনিস ও ঘটনা দিয়ে কিন্তু শেষ হয়েছে ক্ষুদ্রতম জিনিস দিয়ে। এটা এই সূরার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য।

আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ

আগের ৯৮ তম সূরা আল বায়্যিনাহ এর শেষের দিকে (আয়াত ৬ এবং ৭) সবচেয়ে খারাপ ও সবচেয়ে ভাল সৃষ্টি এর কথা বর্নিত হয়েছে। এই ৯৯ তম সূরা আল ঝিলঝাল এর শেষে ক্ষুদ্রতম ভাল ও ক্ষুদ্রতম খারাপ এর কথা বর্নিত হয়েছে। 


একে দুটি ভাবে বিশ্লেষন করা যেতে পারে।

ক্ষুদ্রতম ভাল কাজের সমন্বয়ে ভাল সৃষ্টি তৈরি হয় এবং সেই সৃষ্টির পরিনাম হবে ভাল । আবার ক্ষুদ্রতম খারাপ কাজের সমন্বয়ে খারাপ সৃষ্টি তৈরি হয় এবং সেই সৃষ্টির পরিনাম হবে খারাপ যা সূরা আল বায়্যিনাহতে বলা হয়েছে।

আবার খারাপ সৃষ্টির ক্ষুদ্রতম ভাল কাজটিও সেই সৃষ্টি দেখতে পাবে, বিপরীতভাবে, ভালো সৃষ্টির ক্ষুদ্রতম খারাপ কাজটিও সেই সৃষ্টি দেখতে পাবে, যা সূরা আল ঝিলঝাল এ বলা হয়েছে। 

পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ

৯৯ তম সূরা আল যিলযালের শেষ ২ আয়াতে মানুষের কর্মের খুটিনাটি বিষয় প্রকাশ পাবে তা বলা হয়েছে, এই সূরা আল আদিয়াতের শেষ ২ আয়াতে মানুষের চিন্তা/পরিকল্পনার খুটিনাটি বিষয় প্রকাশ পাবে তা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ২ টা সূরা মিলিয়ে মানুষের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীন সবই প্রকাশ পাবে তা বলা হয়েছে।


সূরা ঝিলঝাল এ আখিরাতে মানুষের অবস্থার কথা এসেছে এবং এই সূরায় দুনিয়ায় মানুষের অবস্থার কথা এসেছে। আখিরাতের অবস্থা জানার পরও মানুষ তার মালিকের ব্যাপারে বড়ই অকৃতজ্ঞ!!! (আয়াত ৬) ৯৯-১০২ এই ৪ টি সূরায় অল্টারনেট ভাবে আখিরাত ও দুনিয়ার কথা এসেছে। (৯৯ তম) সূরা আল যিলযালে যেমন আখিরাতের কথা এসেছিলো তেমনি (১০১ তম) আল ক্বরিয়াহ তে আবার আখিরাতের কথা এসেছে। ১০০ তম সূরা আল আদিয়াত ও ১০২ তম সূরা আত তাকাসুর আবার দুনিয়া বিষয়ক। আল্লাহ এভাবে আখিরাত, দুনিয়া, আবার আখিরাত, আবার দুনিয়া এর বিষয় নিয়ে এসে মানুষকে বারবার সাবধান করেছেন এবং দুনিয়ার সাথে যে আখিরাত অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত তা বোঝাতে চেয়েছেন।


এছাড়া (৯৯ নং) সূরা আল যিলযাল এ মানুষ উত্থিত হবে ও কর্মকান্ড দেখানো হবে তা বলা হয়েছে। (১০০ নং) সূরা আদিয়াত এ মানুষের কর্মকান্ডের পাশাপাশি মনের লুকায়িত উদ্দেশ্যও চিন্তা প্রকাশিত হবে তা বলা হয়েছে। যেহেতু সকল কর্মকান্ড ও চিন্তা প্রকাশিত হবে তাই এর পরের লজিকাল সিকুয়েন্স হলো বিচার। সেই চুলচেরা বিচার এর কথাই উঠে এসেছে (১০১ নং) সূরা আল ক্বরিয়াহ তে। সবশেষে এই সিরিজের শেষ (১০২ নং) সূরা আত তাকাসুর এ বিচারের পর মানুষের পরিনতি দৃশ্যমান হবে তার বর্ননা এসেছে। এ যেন এক অসাধারন লজিকাল সিকুয়েন্স, Continuous process! আল্লাহু আকবার।
উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)