৯৭। সূরা আল ক্বদর (মহিমান্বিত)
সূরার সারসংক্ষেপঃ
শুরুতেই (১ম আয়াতে) বলা হয়েছে অবশ্যই আমি একে নাযিল করেছি কদর (মর্যাদাপূর্ন) রাতে। কদর শব্দটির সাথে ক্যালকুলেশন/হিসাব জড়িত। তার মানে হলো ‘তাকদীর’ বা ভাগ্য বিষয়টিও জড়িত।
আল্লাহ এখানে ‘আমরা’ নামক রাজসিক বহুবচনের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করেছেন যা আসলে উচ্চতর, ভাষার সৌন্দর্য্যের রাজসিক বহুবচন (Royal Plural) যা এক প্রকার একবচন। আল্লাহ নিজের নাম ব্যবহার না করে সর্বনাম ব্যবহার করেছেন এবং এর মাধ্যমে আল কুরআনের সাথে নিজের সম্পর্কের ঘনিষ্টতা বেশি প্রবলভাবে প্রকাশ করেছেন।
এখানে আল কুরআন নাযিলের ব্যাপারে
আল্লাহ ‘আনঝালনা’
শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এর অর্থ একবার নাযিল হওয়া। এটি ঐ সময়ে ৭ম আসমান হতে ১ম
আসমানে নাযিল হয়। অন্য জায়গায় (৩য় সূরা আলে ইমরান এর ৩ নং আয়াতে) এসেছে ‘নাঝঝালা’
অর্থ বার বার নাযিল হওয়া, এটি দ্বারা মুহাম্মাদ (স) এর উপর ২৩ বছরে ধাপে ধাপে আল
কুরআন নাযিল হওয়ার বিষয়টি এসেছে।
এর পরই (২য় আয়াতে) প্রশ্ন করা হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে যে, আপনি কি জানেন এই কদরের রাত সম্পর্কে? যেহেতু নবী মুহাম্মাদ (সঃ) ও তাঁর পরবর্তি সকল মানুষকে জানিয়ে দেওয়া না হলে তারা জানতে পারেন না, তাই আল্লাহ প্রশ্ন করে আবার (৩য় আয়াতে) তিনিই জানিয়ে দিলেন যে, কদরের রাত হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। হাজার মাস মানে হলো ৮৩ বছরেরও বেশি সময়, অর্থাৎ একজন মানুষের গড় আয়ুর চেয়ে বেশি। কিন্তু কেন এমন হলো? এই প্রশ্নের জবাবে একটু চিন্তা করে দেখতে হবে ...
লাইলাতুল কদরের আরেক নাম The night of power. ম্যাথমেটিক্সে আমরা পড়েছি কোন কিছুর উপর পাওয়ার মানে সেইটা তত সংখ্যক বার গুণ হওয়া। ১০ এর উপরে পাওয়ার ২ মানে ১০ দুইবার গুণ হওয়া। ইসলামে ভালো কাজ এর প্রতিদান ১০ থেকে ৭০০ গুন পর্যন্ত সাধারণত হয়ে থাকে। এটা এভাবে তুলনা করা যেতে পারে যে, কদরের রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। এক মাসে ৩০ রাত, হাজার মাসে ৩০ হাজার রাত। মানে ৩০ হাজার গুণ বা ৩০ হাজার পাওয়ার (যেহেতু সমান না, উত্তম বলা হয়েছে, তাই লিমিট বা গণ্ডি বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে মনে করা যায়)। সুতরাং এই রাতে ভালো কাজের প্রতিদান ভালো গুন ৩০০০০ বা ভাল টু দি পাওয়ার ৩০০০০! কি পাওয়ারফুল নাইট!!!
আল কুরআন ওহী আকারে বহন করে নিয়ে এসেছেন বলেই জীবরাঈল (আঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ ফেরেশতা; আল কুরআন মুহাম্মাদ (সঃ) এর উপর নাযিল হয়েছে বলেই তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল। রমাদন মাস-এ আল কুরআন নাযিল হয়েছে বিধায় এটি বছরের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মাস। কদরের রাত অন্যান্য সকল রাত এর চাইতে মহিমান্বিত কারন এই রাতেই আল কুরআন নাযিল হয়েছে। সুতরাং আল কুরআন পরশ-পাথরের মত। যে/যা কিছুই এর সাথে সম্পর্কযুক্ত হয় সেই/তাই শ্রেষ্ঠ হয়ে যায়। সুতরাং আসুন আমরা শ্রেষ্ঠ উম্মত হতে আল কুরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলি। কারন আমাদের পথপ্রদর্শক মুহাম্মাদ (স) বলেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে কুরআন শিখে এবং অন্যকে শিখায়” (-বুখারী)
৪র্থ আয়াতে এই রাতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফেরেশতারা নাযিল হয় (যা অন্যান্য রাতে হয় না) মানুষদের জন্য এ কথা বলার মাধ্যমে মানুষদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছ। এই রাতকে আরো মহিমান্বিত করেছেন রূহ (জীবরঈল); যিনি মুহাম্মাদ (স) এর সময়ে আল কুরআন নিয়ে আসতেন স্বয়ং তিনিও নাযিল হন। ওহী নাযিলের এখন আর প্রয়োজন না হলেও প্রতিবছর তিনি এই রাতের মর্যাদার কারনে নাযিল হন। হয়তো এই কারনেই জীবরঈল (আ) ফেরেশতা হওয়া সত্ত্বেও তার নাম আবার স্পেশালী বলা হয়েছে।
প্রাচীন রোমান সভ্যতায় ক্যালেন্ডারে বছরে ১০ মাস ছিল। আল্লাহ আল কুরআনে ঘোষনা করেছেন বছরে মাস ১২ টি।
شهر (শাহরুন) শব্দের অর্থ মাস। বছরে মাস মোট ১২ টি; আল কুরআনে শাহরুন শব্দটি এসেছে মোট ১২ বার! (২:১৮৫, ২:১৮৫, ২:১৯৪, ২:১৯৪, ২:২১৭, ৫:২, ৫:৯৭, ৯:৩৬, ৩৪:১২, ৩৪:১২, ৪৬:১৫, ৯৭:৩)। বেশ সুন্দর মিল!!!
আল্লাহর নির্দেশেই তারা আসেন ও সকল নির্দেশনা তাঁরই দেয়া। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে কোন ওলী আউলিয়া, পীর, দরবেশ এর কথায় বা ইচ্ছায় ভাগ্য আসে না বা পরিবর্তন হয় না, যা হয় আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়। আল্লাহ এই বিষয়ে এককভাবে ক্ষমতাশীল।
জিব্রাঈল (আঃ) কে রূহ হিসাবে বর্ননা করে অন্য ফেরেশতাদের সাথে তাঁর উপস্থিতিকে বর্ননা করা হয়েছে ৪র্থ আয়াতে। তবে তাঁর কথা এক জায়গায় (সূরা আন নাবা) আগে ও এক জায়গায় (সূরা আল কদর) পরে বলা হয়েছে। এর কারনটা খুব ক্লিয়ার; আল্লাহ অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান। নেতা কোথাও সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালে অন্যদের সামনে দাঁড়ান। আবার কোন কাজ করতে গেলে শেষে যান, সব কিছু ঠিকঠাক আছে কিনা দেখেন। সূরা আন নাবাতে অন্য ফেরেশতাদের সাথে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর কথা বলা আছে তাই ওখানে তিনি আগে দাঁড়ান তাই তাঁর কথা আগে এসেছে। অন্যদিকে, সূরা আল কদরে ফেরেশতারা মালিকের সব ধরনের আদেশ নিয়ে অবতরন করে বলা হয়েছে এখানে নেতা জীবরাঈল (আঃ) এর কথা পরা বলা হয়েছে কারন নেতার কাজের পার্টটা সাধারনত পরেই হয়। আল্লাহ কি সুন্দরভাবে আমাদের শেখাচ্ছেন!!! আলহামদুলিল্লাহ।
৫ম ও শেষ আয়াতে বলা হয়েছে যে শান্তি ঐ রাতে বিরাজ করতে থাকে, ফযরের আগ পর্যন্ত। এই আয়াতের ব্যাখ্যা এভাবে করা যেতে পারে যে, ফেরেশতারা এই রাতে খারাপ নয় বরং ভালো কাজের আদেশ/হুকুম নিয়ে আসে এবং মানুষদের সালাম জানাতে থাকে ফযর পর্যন্ত। অর্থাৎ শান্তি বিরাজ করতে থাকে এই রাতে।
কোরআন নাজিলের সময়টিকে কোন উৎসবের মাধ্যমে পালন করা হয় না, খানা, পানাহার করেও না। বরং দান সদকা ক্ষমাপ্রার্থনা, অশ্রু বিসর্জন, তাওবার মাধ্যমে আবেগপূর্ণভাবে পালন করা হয়। এটাই শবে কদরের মহত্ব, এটিই প্রকৃত শান্তি যা ফজর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে
আল্লাহ ঐ রাতের কথা বলেছেন কিন্তু কোন রাত সেটা ক্লিয়ার করে বলেন নি। আমাদের বেশি বেশি ইবাদাত করার, সিজদাহ করার, তাঁর কাছে আসার সুযোগ দিয়েছেন।আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ
আগের (৯৬ নং) সূরা আল আলাক্ব (goo.gl/LqPR1V) এ আল্লাহর ওহি কিভাবে (How?) এসেছিলো তার বর্ননা আছে। এই (৯৭ নং) সূরায় ওহি কখন (When?) নাযিল হয়েছে তার বর্ননা এসেছে। সূরা আল আলাক্ব এবং সূরা আল ক্বদর; উভয়ই আল কুরআনের কথা দিয়ে শুরু হয়েছে। ৯৬ নং সূরায় পড়তে বলা হয়েছে, আর ৯৭ নং সূরায় কি পড়তে হবে তা বলা হয়েছে।
আল সূরা আল আলাক্ব এর শেষে আল্লাহর
দরবারে সিজদাহ করার কথা ও তাঁর নিকটবর্তি হওয়ার কথা এসেছে। এই সূরার প্রথমেই
লাইলাতুল কদরের কথা এসেছে যেই রাতেই কিনা আল্লাহর দরবারে সবচাইতে বেশি সিজদাহ করা হয়
ও তাঁর নিকটবর্তি হওয়ার চেষ্টা করা হয়। অর্থাৎ আল্লাহ শুধু আদেশ দিয়েই থেমে
থাকেননি, আদেশ বাস্তবায়নের পথও দেখিয়ে দিয়েছেন।
বিশেষ
বিষয়ঃ
সূরায় ৫ টি আয়াত আছে। রমাদনের শেষ
দশকের বিজোড় রাত ৫ টি । এই ৫ টির যেকোন একটিতে লাইলাতুল ক্বদর হতে পারে। لَيْلَةِ
الْقَدْرِ
শব্দ দুটিতে মোট ৯ টি বর্ন আছে। আবার ঐ শব্দ দুটি মোট ৩ বার এসেছে। ৯ কে ৩ দিয়ে
গুন করলে ২৭ হয়। যদিও এটি প্রমান করে না তবুও কোন কোন তাফসীরকারকের মতে ২৭ এ রাত
লাইলাতুল কদর হতে পারে। আবার সূরায় মোট ৩০ টি শব্দ আছে যা ৩০ দিনকে বুঝাতে পারে। هِيَ
শব্দটি দ্বারা ঐ রাতটির কথা বলা হয়েছে যা কিনা ২৭ তম শব্দ। এসব সংখ্যাগত বিষয় যদিও
প্রমান বহন করে না তবুও কোন কোন তাফসীরকারকগন এ বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। আমাদের সকল
বিজোড় রাতেই লাইলাতুল ক্বদর হতে পারে মনে করে আমল করা উচিত, এতে কোন রিস্ক থাকবে
না।







.png)

আল্লাহ আরো বারাকাহ দিক, আমিন
উত্তরমুছুনআপনার ফেসবুক নোট এ অনেক গুলো ছিল কিন্তু সেগুলোর লিংক আর কাজ করছে না। সেগুলোও ব্লগে রমাদানের আগেই পোস্ট করার অনুরোধ রইল ইনশাআল্লাহ।