২৫। সূরা আল ফুরকান (সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী)

সারসংক্ষেপঃ

সূরার শুরুতে আল্লাহ তাঁর বড়ত্ব ও কার্যাবলীর কথা বলেছেন (আয়াত ১-২)। এরপর অজ্ঞ ও উদ্ধত লোকদের কথা ও আল্লাহর বড়ত্বের অস্বীকারকারী কার্যাবলীর বর্ননা দিয়েছেন (আয়াত ৩-৫)। আল্লাহ তাদের এসব কথার প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে, নিজে না বলে বরং অবজ্ঞার সাথে মুহাম্মাদ (স) কে দিয়ে বলিয়েছেন যে, আল্লাহ সব জানেন ও তিনি দয়ালু (আয়াত ৬)। এর জবাবে অজ্ঞ ও উদ্ধত অস্বীকারকারী লোকেরা আবার অযৌক্তিক কথা বলতে শুরু করে দেয় (আয়াত ৭-৮)। এর জবাবে আল্লাহ তাদের অযৌক্তিক ও পথভ্রষ্ট হিসাবে আখ্যা দিয়ে দেন (আয়াত ৯)। 

এরপর তিনি মুহাম্মাদ (স) এর পরিনতি (আয়াত ১০) ও আল্লাহর বানী এবং মুহাম্মাদ (স) এর রসূল হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করার মূল কারন ও সেজন্য কাফেরদের পরিনতির কথা বর্ননা করেন (আয়াত ১১-১৪)। ২ ধরনের পরিনাম বলার পর তাদের তুলনামূলক বিচার করার জন্য আল্লাহ আহবান জানিয়েছেন (১৫-১৬)। পথভ্রষ্টতার ও ঐ পরিনতির অযুহাত এর জবাব হিসাবে কাফেরদের উপাস্যদের হাজির করা হলে উপাস্যরা নিজেদের সংশ্লিষ্টতাকে অস্বীকার করবে এবং কাফেরদের পরিনতি হবে করুন (আয়াত ১৭-১৯) । (৭ম আয়াতে উত্থাপিত) তাদের প্রশ্ন ও যুক্তির জবাব আল্লাহ দিতে শুরু করেন (আয়াত ২০) এবং কিয়ামতের সময়ের ও কাফেরদের পরনিতি, তাদের আক্ষেপের, তাদের বন্ধু (উপাস্য, সাহায্যকারী) ও শত্রু (নবী) এর কথা বলতে থাকেন (আয়াত ২১-৩১)। 

এরপর হঠাতই আল্লাহ প্রসংগ পরিবর্তন করে আবার কাফেরদের আরেকটি প্রশ্নের কথা বলে তার উত্তর দেন (আয়াত ৩২-৩৩)। আমি ঐ আয়াত দুটো পড়ার সময় মনে করেছিলাম মাঝখানে এই ২ টা আয়াত কেন ঢুকলো? কিন্তু ভালোভাবে ঐ আয়াত ২ টা পড়ে, বুঝে অবাক হয়ে গেলাম আয়াত ২ টার প্লেসমেন্টের বিজ্ঞতা দেখে। আল্লাহু আকবার। ঐ ২ আয়াতের পর আবার কাফেরদের পরিনতির বিষয়টি বলে শেষ করেন (আয়াত ৩৪)। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতি আল্লাহর প্রেরিত নবী রসূলদের মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের পরিনাম বর্ননা করেছেন (আয়াত ৩৫-৪০)। এসব পরিনাম দেখেও মুহাম্মাদ (সঃ) এর প্রতি তাদের ধারনা ও তাদের অবুঝ অবস্থা বর্নিত হয়েছে (আয়াত ৪১-৪৩)। এই অবুঝদের বোঝানোর জন্য আল্লাহ তাঁর কিছু নিদর্শন এর কথা বর্ননা করেন (আয়াত ৪৫-৪৯)। (এসব নিদর্শন দেখে ও যুক্তি দেওয়ার পরও) যারা বোঝে না, সতর্ক হয় না তাদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য আল্লাহ তাঁর নবীকে নির্দেশ দেন। (আয়াত ৫০-৫২)   


কিছু আয়াতঃ 

২১ তম সূরা আম্বিয়া, আয়াত ৪ এ আল্লাহ বলছেন, বল : ‘তা তিনিই নাযিল করেছেন যিনি (সাত) আসমান-যমীনের যাবতীয় গোপন কথা জানেন। তিনি বড়ই ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু। ‘আস সামাওয়াত’ শব্দটি বহুবচন হলেও এটি শুধুমাত্র সাত আসমান-যমীন বোঝায়। ‘আস সির’ শব্দটি দিয়ে কথাসমূহের মধ্যে শুধুমাত্র গোপন কথা বোঝায়। অল্প সংখ্যক গোপন কথা এর সাথে আল্লাহ তুলনামুলক অল্প জায়গার সাত আসমান-যমীনের উল্লেখ করেছেন। 

অন্যদিকে ২৫ তম সূরা ফুরকন, আয়াত ৬ এ আল্লাহ বলছেন, বল, ‘আমার প্রতিপালক (সকল) আসমান ও যমীনের প্রতিটি কথাই জানেন, আর তিনি সব কিছু শোনেন, সব কিছু জানেন।’‘আস সামা’ শব্দটি একবচন হলেও এটি সকল আসমান-যমীন বোঝায়। ‘আল কওল’ শব্দটি দিয়ে সকল ধরনের কথাসমূহকে বোঝায় যার মধ্যে গোপন কথাও আছে। বেশি সংখ্যক সকল কথা এর সাথে আল্লাহ তুলনামুলক বেশি জায়গার সকল আসমান-যমীনের উল্লেখ করেছেন। কি সুন্দর আল্লাহর কথার সামঞ্জস্যতা, মিল। এ যেন গনিতের সেট আর সাব সেটের মত। সেট হলো (সকল) আসমান ও যমীন আর তার সাবসেট হলো (সাত) আসমান ও যমীন। অন্যদিকে সেট হলো সকল কথা আর তার সাবসেট হলো গোপন কথা। 

আল কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় 'হাযাল কুরআন' অর্থাৎ এই কুরআন  আবার কোথাও 'যালিকাল কিতাব' অর্থাৎ ঐ কিতাব (বই) বলা হয়েছে। এর কারন কি?    

কিতাব শব্দটি লেখার সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেহেতু মূল গ্রন্থটি লিখিত অবস্থায় লাওহে মাহফুয এ আছে যা দূরে অবস্থিত এজন্য এক্ষেত্রে ‘যালিকা’ (দূরবর্তীবাচক শব্দ) ব্যবহার  করা হয়েছে।   

কুরআন শব্দটি পড়ার সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেহেতু কুরআন গ্রন্থটি পড়ার মাধ্যমে এসেছে ও পৃথিবীতে তা পড়া হয় এবং যা কাছে অবস্থিত এজন্য এক্ষেত্রে ‘হাযা’ (নিকটবাচক শব্দ) ব্যবহার করা হয়েছে।   

২৫ তম আয়াতে ‘এই কুরআন’ বলা হয়েছে; অর্থাৎ তা চোখের সামনেই ছিলো। চোখের সামনে থাকার পরও পরিত্যাজ্য গন্য করা হয়েছে। বিচার দিবসে রসূল (স) ‘এই কুরআন’ কে সবার চোখের সামনে সাক্ষী হিসাবে গ্রহন করবেন। এই আয়াত অনুসারে আল কুরআন না পড়া, পড়লেও যথেষ্ট সময় ধরে না পড়া, যথেষ্ট সময় ধরে পড়লেও বুঝে বুঝে না পড়া, বুঝলেও তা থেকে উপদেশ গ্রহন না করা, উপদেশ গ্রহন করলেও তা না মানা, মানলেও ভালো না বাসা, ভালোবাসলেও সবচেয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে ভালো না বাসা ইত্যাদি সবই পরিত্যক্ত/পরিত্যাজ্য/বহুদূরে ফেলে রাখা (মাহজুরন) হিসাবে গন্য হতে পারে। 

তিনি আসমান, যমীন আর এ দু’য়ের ভিতরে যা আছে তা ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। (২৫ তম সূরা আল ফুরকন, আয়াত ৫৯)। 

আধুনিক বিজ্ঞান জানতে পেরেছে মহাবিশ্ব এর আকাশমণ্ডলী এবং পৃথিবীর মধ্যে নানা ধরনের গ্রহ ও অন্যান্য বস্তু ছাড়াও আন্তঃনাক্ষত্রিক নানা অদৃশ্য গ্যাস, প্লাজমা, ধুলিকনা ইত্যাদি রয়েছে।    

রহমান শব্দটি ইসলাম আগমনের পূর্বে আরবরা আল্লাহর গুনবাচক নাম হিসাবে ব্যবহার করত না। এজন্য আল কুরআনে এসেছে; যখন তাদেরকে বলা হল তোমরা রহমানকে সিজদাহ করো, তারা বলল, রহমান আবার কি জিনিস? (২৫ তম সূরা ফুরকন, আয়াত ৬০)।

এর পর আল্লাহ তাদেরকে চিনিয়েছেন। মাক্কি সুরাগুলোতে রহমান শব্দটি বেশি এসেছে।

৬১ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেনঃ “কত বরকতময় সত্তা তিনি! যিনি আকাশে বুরুজ (তারকা) নির্মাণ করেছেন এবং তার মধ্যে একটি প্রদীপ (সূর্য) ও একটি আলোকিত চাঁদ সৃষ্টি করেছেন৷    

সিরজান দ্বারা এখানে প্রদীপ বুঝানো হয়েছে যার আলো আছে; অর্থাৎ সূর্য। قَمَرًا অর্থ চাঁদ এবং চাঁদকে مُّنِيرًا বলা হয়েছে অর্থাৎ আলোকিত; যার নিজের আলো নেই, কোন আলোক উৎস হতে আলো নিয়ে আলোকিত হয়। আল কুরআন জ্যোতির্বিজ্ঞান এর এই তথ্য মানুষ কর্তৃক আবিষ্কারের আগেই দিয়েছে।   

চাঁদ (কমার) শব্দটি আল কুরআনে এসেছে ২৭ বার (৬ঃ৭৭, ৬ঃ৯৬, ৭ঃ৫৪, ১০ঃ৫, ১২ঃ৪, ১৩ঃ২, ১৪ঃ৩৩, ১৬ঃ১২, ২১ঃ৩৩, ২২ঃ১৮, ২৫ঃ৬১, ২৯ঃ৬১, ৩১ঃ২৯,৩৫ঃ১৩, ৩৬ঃ৩৯, ৩৬ঃ৪০, ৩৯ঃ৫, ৪১ঃ৩৭, ৫৪ঃ১, ৫৫ঃ৫, ৭১ঃ১৬, ৭৪ঃ৩২, ৭৫ঃ৮, ৭৫ঃ৯, ৮৪ঃ১৮, ৯১ঃ২)। 

অবাক করা বিষয় হল চাঁদ পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতে ২৭ দিন সময় লাগে। তবে এই সময়ে পৃথিবী আবার সূর্যকে কেন্দ্র করে ২ দিন এগিয়ে যায়। এজন্য চাঁদকে আরও দুদিন বেশি ঘুরতে হয় এজন্য চন্দ্র মাস ২৯ দিনে হয়। 

৬৩ নং আয়াতে আল্লাহ রহমানের বান্দাহ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যের মানুষদেরকে। আল্লাহর অনেক গুনবাচক নাম আছে যার মধ্যে তিনি ‘রহমান’ নামটিকে এখানে নির্বাচন করেছেন। এর কারন হলো আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত বিশেষভাবে এই বান্দাদের উপর বর্ষিত হয়। আর এই কারনেই এই সব বান্দা অন্যদের প্রতিও রহম করে অর্থাৎ এসব বান্দারা রহম-দিল। এদের বৈশিষ্টের ১ম টি হলো এরা নম্র, ভদ্রভাবে, নিরহংকারের সাথে চলাফেরা করে। যদিও এরা উচ্চ মর্যাদার মানুষ হয়ে থাকে তবুও নিজেকে বড় মনে না করে, নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করে চলাফেরা ও অন্যের (সকল জীব-জন্তু ও মানুষের) সাথে নম্র আচার- আচরন করে।      

এরা শুধু নিজেরা অগ্রবর্তি হয়ে অন্যের সাথে নম্র আচরন করেই নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ রাখে না বরং অন্য কেউ অজ্ঞতাবশত বা ইচ্ছাকৃতভাবে খারাপ, ঔদ্ধত্যপূর্ন আচরন করলে তারা শান্তিপূর্ন, মার্জিতভাবে জবাব দেয়। এখানে وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا অংশে ‘ইযা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ ‘যখন’, যদি নয়। 

‘যদি’ না বলে আল্লাহ ‘যখন’ বলার মাধ্যমে আমাদের বলে দিচ্ছেন যে এমন ঘটনা ঘটবেই। যদি বললে হতে পারতো যে ঘটনা ঘটতেও পারে আবার নাও ঘটতে পারে। কিন্তু যারা যমীনের বুকে নম্রভাবে চলে তাদেরকে বিরক্ত করতে মানুষেরা গায়ে পড়ে এসে খারাপ আচরন করে। এই কঠিন মূহুর্তেও রহমানের বান্দা নিজেকে কন্ট্রোল করে মুখে বলে সালাম বা শান্তি, বা শান্তিপূর্নভাবে কথা বলে বা তর্কে লিপ্ত না হয়ে স্থান ত্যাগ করে বা যুক্তি/তর্ক প্রয়োগ করলেও উত্তম পন্থায় করে। অর্থাৎ যখন অজ্ঞ/মূর্খ/উদ্ধতরা তাদের সাথে কথা বলতে থাকলে বলে দেয় তোমাদের প্রতি সালাম।    

অর্থাৎ তারা অন্যকে নিচু/অপমান করে না (১ম অংশে  الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا) এবং অন্যকেউ তাদেরকে অপমান করতে গেলে তারা বলে শান্তি/ শান্তিপুর্নভাবে কথা বলে (২য় অংশে وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا )      

এরা এমনভাবেই রহম দিলের পরিচয় দেয়। আর দিবেই বা না কেন? তারা যে রহমানের বান্দা। আল্লাহর ঐ রহমান নাম ও গুনে তারা নিজেদের রাঙিয়ে, গুণান্বিত করে নেয়। এরা শুধু সৃষ্টিকুলের প্রতি তার যথাযথ দায়িত্ব পালন করেই থেমে থাকে না বরং তাঁর স্রষ্টার প্রতিও দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠাবান থাকে। এবিষয়টি ৬৪ নং আয়াতে খুব ভালোভাবে ফুটে উঠেছে। 


সূরা আলে ইমরানের আয়াত ২৪ এ কত বড় ধৃষ্টতার প্রমান মিলিছে সেই আহলে কিতাব/ ইহুদীদের!!! যেখানে মুমিন বান্দাহরা  জাহান্নামে এক মুহুর্তের জন্যও যাওয়ার সাহস করে না (অল্প সময়ের আশ্রয়স্থল বা অধিক সময়ের স্থায়ী আবাস হিসেবেও না) (২৫ তম সূরা আল ফুরকন; আয়াত ৬৫,৬৬) সেখানে তারা (আহলে  কিতাব/ ইহুদীরা) কিভাবে নিশ্চিত হয় যে তারা জাহান্নামে যাবেই না বা গেলেও অল্প সময়ের জন্য?  

৬৭ নং আয়াতে ইসলামী ব্যয়নীতি বর্ননা করা হয়েছে। অযথা অতিরিক্ত ব্যয় এর মাধ্যমে অপচয় করা যেমন করা ঠিক না তেমনি অতি দরকারি জিনিস এর ব্যাপারে কার্পণ্যও করা ঠিক নয়। মাঝামাঝি অবস্থান গ্রহন সবসময়ই কল্যানকর; এতে অর্থনীতি শক্তিশালী হয়, সমাজে সাম্য বজায় থাকে।      

৬৮-৬৯ আয়াতে ৩ টি বড় গুনাহ ও তার ফলাফলের কথা বর্ননা করা হয়েছে

কিয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দ্বিগুন হবে কারন তারা জানতো এগুলো বড় অপরাধ তাও তারা করেছে। এছাড়া তারা অপমানিত অবস্থায় আযাব পেতে থাকবে কারন ঐ ৩ টি বড় গুনাহ হলো অন্যকে অপমান করার সর্বোচ্চ বড় উদাহরন।     

তবে ব্যতক্রম কারা ও কি করলে তা থেকে মুক্তি হবে তা বলা হয়েছে পরের ৭০ তম আয়াতেই। এখানে শর্ত দেওয়া হয়েছে যে তাওবা করে নতুন করে ঈমান আনার নিয়ত করে একনিষ্ঠভাবে সৎকাজ করতে থাকতে হবে। তাহলে তাদের জমাকৃত বিশাল (পাহাড়ের ন্যায়) গুনাহগুলোকে আল্লাহ মিটিয়ে দেবেন না বরং গুনাহ এর কাজগুলোকে আল্লাহ ভালো কাজ দ্বারা বদলে দিবেন।



এই ক্ষমা ও খারাপকে ভালো দ্বারা পরিবর্তনের কারনঃ তিনি রহমান। যার বর্ননা এসেছে ৬০ থেকে ৭৭ আয়াত পর্যন্ত। আর এর মাধ্যমেই শেষ হয়েছে সূরাটি।

সূরার ৭৪ আয়াতে রব্বানা শব্দটি এসেছে। ‘রব্বি’ ও ‘রব্বানা’ শব্দটি মূলত দুটি করে শব্দ। ‘ইয়া রব্বি’ ও ‘ইয়া রব্বানা’। কিন্তু ‘ইয়া’ বা ‘হে’ শব্দটি আল্লাহর ক্ষেত্রে বিলুপ্ত করে ব্যবহার করা হয়। আল্লাহ  আমাদের খুবই কাছের, আপন বিধায় দূরবর্তি সংক্রান্ত শব্দ ‘হে’ বাদ দিয়ে শুধু রব্বি বা রব্বানা বলা হয়। সুবহানাল্লহ!

আল কুরআনের আলোকে ২ ধরনের বাতাসের পার্থক্যঃ  বহুবচনের বাতাস ‘রিয়াহ’  এই বাতাস নিয়ামত হিসাবে আসে। হেলেদুলে প্রবাহিত হয়, কখনও এদিক থেকে কখনও  ওদিক থেকে বিক্ষিপ্তাকারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বইতে থাকে; কেমন যেন সেখানে অনেকগুলো বাতাস থাকে । এমন উদাহরন আছে বিভিন্ন সূরা ও আয়াতে। যেমনঃ ২:১৬৪, ৭:৫৭, ১৫:২২, ১৮:৪৫, ২৫:৪৮, ২৭:৬৩, ৩০:৪৬, ৩৫:০৯, ৪৫:০৫

অপরদিকে এক বচনের বাতাস ‘রীহ’। এই বাতাস আযাব হিসাবে আসে। বজ্রকঠিন ও একে অন্যের সাথে লাগোয়া। অনেক বেশি জমাটবাঁধা, ঘনীভূত ও সঙ্ঘত; কেমন যেন একটাই মাত্র তাবাস থাকে। এমন উদাহরন আছে বিভিন্ন সূরা ও আয়াতে। যেমনঃ  ৩:১১৭, ১৪:১৮, ১৭:৬৯, ২২:৩১, ৩০:৫১, ৩৩:৯, ৪২:৩৩, ৪৬:২৪ সাধারনভাবে একবচন ও বহুবচন নেকই ধরনের অর্থ প্রকাশ করলেও আল কুরআন এখানে বহুবচনে নিয়ামত ও একবচনে আযাব প্রকাশ করেছে।    

সূরা লাহাবের ৩য় আয়াতে আবু লাহাবের স্ত্রীকে ‘ইমরআ’ হিসাবে অবিহিত করা হয়েছে। ‘ঝাওজ’ শব্দটি দিয়েও স্ত্রী বুঝায়। ‘ইমরআ’ ও ‘ঝাওজ’ দুটি শব্দের অর্থ স্ত্রী কিন্তু সূক্ষ পার্থক্য আছে। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সফল বৈবাহিক জুটি ও সন্তান হলে কেবলমাত্র ‘ঝাওজ’ ব্যবহার করা যায়। অন্যথায় ইমরআ হিসাবে গণ্য হয়। 

নবী নূহ (আঃ), লুত (আ) ও ফেরাউন এর স্ত্রীকে আল কুরআনে ‘ইমরআ’ বলা হয়েছে। যেহেতু আবু লাহাব ও তার স্ত্রী দুজনেই খারাপ ছিলো তাই এটা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সফল বৈবাহিক জুটি ছিলো না। তাই আবু লাহাবের স্ত্রী  ‘ঝাওজ’ ছিলো না বরং ‘ইমরআ’ ছিলো।     

তবে হযরত যাকারিয়া (আ) এর স্ত্রীর ক্ষেত্রে ২ টিই ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯ তম সূরা মারইয়াম এ যাকারিয়া (আ) এর স্ত্রীকে ‘ইমরআ’ বলা হয়। কারন তখন তিনি ছিলেন বন্ধ্যা (সন্তানহীন)।    

এরপর ২১ তম সূরা আল আম্বিয়ার ৯০ নং আয়াতে বর্নিত আছে যে, তাদের একটি পুত্র সন্তান হয়। তখন যাকারিয়া (আ) এর স্ত্রীকে ‘ঝাওজ’ বলা হয়। কারন তখন তিনি স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সাফল বৈবাহিক জুটি ও সন্তান  এই দুটি বৈশিষ্ট্যেরই অধিকারী হন। কি অসাধারন আল্লাহর শব্দচয়ন!!!   

সূরা আবাসার ৩৬ নং আয়াতে বোঝানো হয়েছেঃ স্বামী-স্ত্রী উভয়ের বৈবাহিক জুটি সফল হোক বা না হোক, সন্তান থাকুক বা না থাকুক পরকালে কিয়ামতের সময় তারা একে অপর থেকে দূরে সরে যাবে। স্বামী-স্ত্রীর এই বিশেষ সম্পর্ককে বলা হচ্ছে সহিবাহ (সঙ্গী)। এই সময়ে মানুষ অন্য সকল সম্পর্কের মানুষকে ভুলে শুধুমাত্র নিজের চিন্তায় মগ্ন থাকবে। 

অর্থাৎ বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন শব্দের ব্যবহারের মাধ্যমে কোন বিষয় উপস্থাপন ও পর্যালোচনার এই সুন্দর পদ্ধতি কুরআন আমাদের শেখায়।  

এর মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ অবশ্যই 'ঝাওজ'। এজন্য আল্লাহ আমাদের দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন সূরা ২৫ নং আল ফুরকন এর ৭৪ নং আয়াতে। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এমন 'ঝাওজ' (জীবনসঙ্গী) ও সন্তানাদি দান কর যারা আমাদের চোখ জুড়িয়ে দেয় আর আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দাও।

তৎকালীন আরববাসীর কাছে পানির ঝরনা তাদের চোখ জুড়িয়ে দেয়ার কারন। তাই চোখ এবং ঝরনা শব্দ ২ টিকে তারা اَعۡيُنٍ এবং عُيُونٍ উভয় শব্দ দিয়েই প্রকাশ করতো।  

কিন্তু আল কুরআন সবসময়ই চোখ বোঝাতে اَعۡيُنٍ এবং ঝরনা বোঝাতে عُيُونٍ শব্দ ব্যবহার করেছে। নির্দিষ্ট এই নিয়ম কখনো পরিবর্তন হয়নি, যা তখনকার আরবদের জন্য ছিল অবাক ব্যাপার।


উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)