৯৪। সূরা আল ইনশিরাহ (বক্ষ প্রশস্তকরন)
সূরার সারসংক্ষেপঃ
১ম অংশে (আয়াত ১-৬) এ আল্লাহ মুহাম্মাদ (স) এর প্রতি যে অনুগ্রহ ও নিয়ামত দান করেছেন তা বর্ননা করেছেন।
২য় অংশে (আয়াত ৭-৮) আল্লাহর দেয়া নিয়ামত ও অনুগ্রহ পাওয়ার পর প্রতিদান দেওয়ার জন্য মুহাম্মাদ (স) কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিষয়বস্তুঃ
কিছু মানুষ নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে; বিনোদন, অর্থহীন কাজে মত্ত থাকে। কিছু মানুষ খাওয়া দাওয়া, ফুর্তিতে নিমজ্জিত থাকে। অন্যের সম্পর্কে চিন্তা বা গভীর চিন্তা করে না। কিছু মানুষ নিজের সহ আশেপাশের কিছু দরিদ্র মানুষ নিয়ে চিন্তা করে। কিছু মানুষ আশেপাশের প্রতিবেশি, সমাজ নিয়ে চিন্তা করে। অল্প কিছু মানুষ নীতি নির্ধারন, নৈতিকতা ইত্যাদি উচ্চ বিষয় নিয়ে চিন্তা করে। তবে এদের সবারই চিন্তা শুধু এই দুনিয়া কেন্দ্রিক।
খুবই অল্প পরিমান মানুষই সৃষ্টি, আবির্ভাব, অস্তিত্ব, উদ্দেশ্য, চুড়ান্ত পরিনতি ইত্যাদি নিয়ে গভীর চিন্তা করে। এদের চিন্তার পরিমান ও ক্ষেত্র যেহেতু বেশি তাই আশেপাশের অসঙ্গতি দেখে পেরেশানী, চিন্তাও অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। এরা দুনিয়ার পাশাপাশি পরের জীবন (আখিরাত) সম্পর্কে চিন্তা করে কিন্তু সরাসরি ওহী লাভ না করার কারনে নবীদের মত পেরেশান থাকে না।
এই চাপ ও তার পরে আর কোন নবী আসবেন না জেনে মুহাম্মাদ (স) তার কাজকে বোঝা মনে করতেন ও পেরেশান হয়ে উঠেছিলেন।
অন্য মানুষ শুধু তার আশেপাশের মানুষদের প্রভাবিত করার জন্য চেষ্টা করে। অন্য নবীরাও হয়তো সেই সময়কার সকল মানুষের জন্য নবী ছিলেননা। কিন্তু মুহাম্মাদ (স) এর দায়িত্ব ছিল সেই সময়ে পৃথিবীতে ভৌগলিকভাবে বসবাস করা সকল মানুষের জন্য আদর্শ স্থাপন করা ও তাদের কাছে তা পৌছে দেয়া। যা তিনি নিজে ও সাহাবীদের মাধ্যমে করেছেন।
অন্য সব নবীদের ক্ষেত্রে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের জন্য বিধান/আদর্শ সেট করা ছিল। কিন্তু মুহাম্মাদ (স) সর্বশেষ নবী হওয়ায় তার পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত বিরাট সময়ের (তার সময়কার ও ভবিষ্যত সকল সময়ের)মানুষের জন্য তার বিধান/আদর্শ কার্যকরী।
অর্থাৎ তাকে Space ও Time দুইটাকেই Cover করে মানুষের জন্য আদর্শ স্থাপন করতে হয়েছে।
মুহাম্মাদ (স) এর যোগাযোগ শুধু মানুষের সাথে ছিল না, অন্য অনেক জড়, উদ্ভিদ ও জীব এর সাথেও ছিল। তারা তাকে তাদের সুবিধা অসুবিধার কথা জানাতো। শয়তান, জীন, ফেরেশতা জাতিদের সাথেও তার সান্নিধ্য হয়েছে। তার কাছে নাযিল হয়েছে আসমানী কিতাব। আল্লাহর সাথেও তার সান্নিধ্য হয়েছে। অর্থাৎ অনেক জাগতিক ও মহাজাগতিক সৃষ্টি ও তাদের স্রষ্টার সাথে সান্নিধ্যের বিচিত্র ও বিস্তৃত অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ব তিনি পেয়েছেন।
১ম ৩ আয়াতে এই বিষয় ফুটে উঠেছে।
৪র্থ আয়াতে মুহাম্মাদ (স) কে শুধু চাপ ও পেরেশানী থেকেই মুক্তি দেওয়া হয় নি বরং তাকে উচ্চতর মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। তার কিছু নমুনা পাই
ঈমান এর জন্য কালেমাতে মুহাম্মাদ (সঃ) এর নাম পাঠ করতে হয়। প্রতিবার আযানে মুহাম্মাদ (সঃ) এর নাম উচ্চারিত হচ্ছে। দুনিয়ায় প্রায় সব সময়েই আযান উচ্চারিত হচ্ছে; কোথাও ফযরের, কোথাও আসরের বা মাগরিব অথবা ঈশারঃ এভাবে প্রায় সব সময়ই তাঁর নাম ও মর্যাদার কথা উচ্চারিত হচ্ছে। নামাজ শুরুর আগে ইকামতে ও নামাযের মধ্যে মুহাম্মাদ (সঃ) এর নাম উচ্চারিত হচ্ছে তাশাহুদ এ। সকল মুমিনের অন্তরে রয়েছে তাঁর প্রতি নিখাদ ভালোবাসা ও মস্তিস্কে রয়েছে তাঁর মহত্ব, বড়ত্ব ভালোবাসার চিন্তা।
পূর্ববর্তি কিতাব সমূহেও মুহাম্মাদ (সঃ) এর নাম ও বর্ননা উল্লেখ ছিলো। পূর্ববর্তি নবীরাও মুহাম্মাদ (সঃ) এর শ্রেষ্ঠ্যত্ব স্বীকার করেছেন। মুহাম্মাদ (সঃ) এর ম্যাসেজ ও নাম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। মুহাম্মাদ (সঃ) এর রেখে যাওয়া আল কুরআন আজও অবিকৃত অবস্থায় আছে। আখিরাতেও মুহাম্মাদ (সঃ) সর্বোচ্চ মর্যাদা পাবেন। স্বয়ং আল্লাহ ও ফেরেশতারা মুহাম্মাদ (সঃ) এর দরুদ পাঠ করেন। আল্লাহ মুমিনদেরকেও মুহাম্মাদ (সঃ) এর দরুদ পাঠ করার জন্য বলেছেন এবং তা না পাঠকারীদের জন্য ধ্বংসের কথা বলেছেন। মুহাম্মাদ (সঃ) কে অনুসরন করার ম্যাধ্যমে আল্লাহকে অনুসরন করা হয়। অন্য নবীদের নাম ধরে ডাকলেও আল কুরআনে আল্লাহ নবী মুহাম্মাদ (সঃ) কে নাম ধরে ডাকেননি। তিনি ভালোবাসাপূর্ন সম্বোধন ব্যবহার করেছেন। আল্লাহ নবী মুহাম্মাদ (সঃ) কে আল কাউসার দান করেছেন।
আল্লাহ তার নেয়ামত বর্ননা করার পর মুহাম্মাদ (স) কে কষ্টের সাথে যে স্বস্তি রয়েছে তা বুঝিয়েছেন। যা ৫-৬ নং আয়াতে বোঝানো হয়েছে। অতঃপর নিশ্চয়ই (নির্দিষ্ট) কষ্ট এর সাথে আছে (অনির্দিষ্ট অনেক) স্বস্তি নিশ্চয়ই (নির্দিষ্ট) কষ্ট এর সাথে আছে (অনির্দিষ্ট অনেক) স্বস্তি (৯৪: ৫,৬)। এখানে এমন বলা হয়নি যে কষ্টের পর স্বস্তি আসে, বরং কষ্টের সাথেই স্বস্তি থাকে।
আল্লাহর নেয়ামত এর প্রতিদান হিসাবে তাঁকে কিছু দেওয়ার কথা এসেছে শেষ ভাগে (আয়াত ৭-৮)। এবং এই কাজেই মনের শান্তি খুজে পেতেন মুহাম্মাদ (স)। এই সূরা তাঁকে উদ্দেশ্য করে নাযিল হলেও যুগে যুগে পেরেশানী ও কষ্টের মধ্যে থাকা সকল মানুষের জন্য এই সূরাটি সান্তনাবানী হিসাবে কাজ করে গেছে ও যাবে।আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ
বিষয়বস্তুর দিক থেকে আগের (৯৩ নং) সূরা আদ দুহা এর সাথে এই (৯৪ তম) সূরা আল ইনশিরাহ এর গভীর মিল রয়েছে। ১ম ভাগে আল্লাহর দেয়া বিষয়বস্তু বর্নিত হয়েছে, পরের ভাগে পাওয়ার পর বিনিময়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। সূরা আদ দুহার ৬ নং আয়াতের গঠন ও বিষয়বস্তুর সাথে সূরা আল ইনশিরাহ এর ১ নং আয়াতের গঠন ও বিষয়বস্তুর মিল রয়েছে। এভাবে ৭, ৮ এর সাথে ২; ১১ এর সাথে ৮ এর মিল রয়েছে। এক কথায় ২ টি সূরার গঠন, বিষয়বস্তু, ধারা-বর্ননাতে গভীর মিল বিদ্যমান।
পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ
আল্লাহ মানুষকে নিচু থেকে নিচু স্তরে নামিয়ে দিয়েছেন পরের সূরায় (৯৫ তম সূরা আত ত্বীনঃ goo.gl/XhX1d7 এ)। কি অসাধারন সিকুয়েন্স!!!
আরো কয়েকটি সূরা সম্পর্কে পড়তেঃ goo.gl/LqecG4
রেফারেন্স ও কৃতজ্ঞতাঃ বিভিন্ন তাফসীর, বিশেষ করে Nouman Ali Khan এর তাফসীর, বিভিন্ন লেকচার, ভিডিও ইত্যাদি।








.jpg)


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন